সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

পাঠ-প্রতিক্রিয়া- আমার ঠিকানা নিষিদ্ধ ঠিকানা : হরিপদ দত্ত

April 2nd, 2018 6:20 pm
পাঠ-প্রতিক্রিয়া- আমার ঠিকানা নিষিদ্ধ ঠিকানা : হরিপদ দত্ত

পাঠ-প্রতিক্রিয়া

আমার ঠিকানা

নিষিদ্ধ ঠিকানা

হরিপদ দত্ত

 

আগস্ট ২০১৬ শব্দঘর পত্রিকার নির্বাচিত বই সংখ্যাটি হাতে পেয়ে আমি বিস্মিত, স্তম্ভিত। বুঝতে পারি স্বাধীন বাংলাদেশে কর্পোরেট পরাধীন সাহিত্য-সংস্কৃতি কর্মীর মহাভিড়েও স্বাধীন মেরুদ-ীরাও আছেন। এমন একটি সংখ্যা তাঁরা বের করেছেন। অবক্ষয়ী সমাজে বিনোদনসর্বস্ব সর্বনাশা সাহিত্য প্রচেষ্টার বাইরে এ বড় পবিত্র দায়িত্ব। একাত্তরের এটাও তো ছিল অন্যতম অঙ্গীকার। সেই মহান কর্মযজ্ঞে আমার উপস্থিতি আমাকে চমকে দিয়েছে। সম্পাদক মহোদয় তো বটেই, আমাকে নিয়ে যিনি লিখেছেন সেই বিশুদ্ধ সাহিত্যকর্মী তপন বাগচীকেও ধন্যবাদ। লেখাটি লিখে তাঁরা আমাকে সমৃদ্ধ করলেন। সত্তর বৎসর বয়স পেরিয়ে আসা মানুষটি তাঁদের কাছে আনত।

আজও আমি মার্ক্সবাদে বিশ^াসী, অসংখ্য বিচ্যুতি ঘটলেও। সেই প্রেক্ষিতেই তপনের লেখাটির প্রতিলেখায় হাত দিলাম। এই প্রথম এবং শেষ আত্মপক্ষ সমর্থন। এর পূর্বে ঢাকা শহরের অনিক পত্রিকা আমার লেখা তো বটেই, ব্যক্তি আমাকেও আক্রমণ করেছে। আমি নীরব। নীরবতা ভাঙার  জন্য ছদ্মবেশ ধরে যোগাযোগ করে যুদ্ধে নামিয়ে দিতে ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। টলাতে পারেনি। কেননা মার্ক্সবাদী রাজনীতি ‘সমালোচনা’ ‘আত্মসমালোচনা’ তত্ত্বের ওপর আমাকে শিক্ষা দিয়েছে। সাহিত্যের নামে আমি বিবাদ করে মেধার অপব্যয়ের বদলে সৃষ্টি করতে এসেছি। তপনের কাছে আমি কৃতজ্ঞ এই কারণে যে, তিনিই প্রথম আমাকে আড়ালে থেকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, বড্ড বিলম্ব ঘটেছে, জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন, শুরু করুন, আত্মসমালোচনার হোক এবার উদ্যাপন।

তপন বাবুকে জানিয়ে দিলাম, বিগত এপ্রিল থেকে আমি নিজেই আমার সৃষ্টির সমালোচক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছি। গতিটা স্লো হলেও ৪৩ পৃষ্ঠা লেখা হয়ে গেছে। লেখক হরিপদ দত্তের সমালোচক অচেনা এক হরিপদ দত্ত। বড় নিষ্ঠুর সে। তরবারির মতো ধারাল নির্মম। এক কোপে ফালা ফালা, রক্তাক্ত। আমার সাহিত্যের সমালোচকেরাও চমকে উঠবে। ১৯ পৃষ্ঠায় লিখেছি, ‘ঈশ^র (বিশ^াস তিনি নেই) আমাকে সাহিত্য নির্মাণের নামে রথের মেলায় বাঁদর খেলায় নামিয়ে দিয়েছেন।’ একটি ছোটগল্পের চরিত্রের আচরণ নির্মাণের ক্ষেত্রে লিখেছি ‘বোধ করি গল্পটি লেখার সময় আমি মানসিক অসুস্থ তো বটেই, অবচেতন যৌনতায় আক্রান্ত ছিলাম।’ ৭ পৃষ্ঠায় খুব সহজেই প্রথম দিকের লেখা এবং বিখ্যাত একটি দৈনিকে প্রকাশিতগল্প সম্পর্কে মন্তব্য করেছি ‘মার্ক্সবাদী সাহিত্যতত্ত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকলে ছোটগল্পের নামে এমনই নির্লজ্জ আত্মপ্রতারণামূলক লেখা তো লিখতেই হবে। বুঝলাম না পত্রিকাটির সাহিত্য সম্পাদক কেন লেখাটি গুরুত্ব দিয়ে ছাপলেন।’

তপন বাবুকে জানিয়ে রাখছি আমার নিষিদ্ধ ঠিকানা উপন্যাস তো নয়ই কোনো সাহিত্যপদবাচ্য লেখাও নয়। এ হচ্ছে অস্থির সময়ে অস্থির কিংকর্তব্যবিমূঢ় মানুষের আত্মপ্রলাপ মাত্র। তা হলে বইটি ছাপা হলো কেন? পাঠকের সঙ্গে প্রতারণা নয় তো? খ্যাতির অন্ধ মোহ কি? না, ঠিক তা নয়। আজকের আমাকে জানার অধিকার যেমনি আছে পাঠকের, ঠিক তেমনি আমার সাহিত্যে জন্মের রক্তমাখা আঁতুড় ঘরকেও। জানান দেয়া আমার কর্তব্য। অন্য অনেক সাহিত্যিকের মতো দুর্বল লেখা গোপন করা বা জ¦ালিয়ে দেয়া নয়। মৃত লেখকের অপ্রকাশিত লেখার আলোর মুখ দেখার মতো জীবদ্দশায় দুর্বল লেখার দায় অস্বীকার করার মতো দুর্বল মন আমার নেই। পাঠককে আমার মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করার দরকার নেই দুর্বল অসাহিত্য খুঁজে দেখার। কিসের এত ভয়?

নিষিদ্ধ ঠিকানা আমার সাহিত্যে প্রস্তুতিপর্বের তৃতীয় উপন্যাস (তথাকথিত)। প্রথম উপন্যাসে কত আঁখি জল এবং দ্বিতীয়টি ধরার ধূলিতে। ছাত্র জীবনে লেখা। বাপের পয়সায় ছাপা। একাত্তরের যুদ্ধের ভেতর দুটি উপন্যাসই হারিয়ে যায়। প্রথমটি ভাগ্যক্রমে উদ্ধার হলে গেলবার পুনরায় ছাপা হয় কোনো এডিট ছাড়াই। ধরার ধূলিতে চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছে। খুঁজে পাইনি বলে বড় আক্ষেপ। রাজনীতির কারণে দীর্ঘ বিরতির পর নিষিদ্ধ ঠিকানা লেখা হয়। শুরুর উপন্যাস থেকে আলাদা। দাবি করা যায় এই উপন্যাস লেখার ভিতর দিয়েই প্রকৃত অর্থে আমার সাহিত্যযাত্রা। রাজনীতিতে স্বপ্ন ছিল সমাজবিপ্লব, সাহিত্যে বিপ্লবী সাহিত্য। কিন্তু প্রায় প্রস্তুতি ছাড়া। সোভিয়েত ইউনিয়ন, পূর্ব ইউরোপের সমাজ-তান্ত্রিক দেশ এবং চীনের সাহিত্যের তখন আমি পাঠক মাত্র। অপরিপক্ক চিন্তা, দুর্বল হাত। তাই তরুন লিখিয়েদের কাছে আমার পরামর্শ, আমার মত তারা যেন ভুল না করেন বাপের যতই টাকা থাকুক লেখাটি যেন কোনো পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক কর্তৃক এডিট হয়ে ছাপার আগে পর্যন্ত বই আকারে না-বেরোয়। আমার উপন্যাস অন্ধকূপে জন্মোৎসব বাংলা একাডেমির পত্রিকায় এডিট হয়ে ছাপা হয়। আমার সৌভাগ্য এই, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো মনীষীতুল্য মানুষের হাতে পড়েছিলাম। মুক্তধারার সাহিত্য পত্রের সম্পাদক ছিলেন তিনি। আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক উপন্যাস অজগর ধারাবাহিকভাবে সেখানেই প্রকাশিত হয়। কৌতূহলের বিষয়টা প্রথমেই ধরা পড়ে আমার চোখে। দেখি কি, আমার মূল লেখার অনেক বাক্য পাল্টে গেছে, শব্দের বদলে সমার্থক শব্দ বসে গেছে। কোনো কোনো বাক্যের ইমেজও বদলে গেছে। কিন্তু কোথায় কীভাবে কতটুকু বদলাল তা সামনাসামনি বসে সম্পাদকের সঙ্গে আলোচনা করার মতো বুকের পাটা তখনও আমার ছিল না, এখনও নাই। আমার কাছে এই হচ্ছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। কিন্তু আমি তো নাছোড়বান্দা। এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অধ্যাপক শিবপ্রসন্ন লাহিড়ি এবং যাদুঘরের প্রাক্তন কর্মকর্তা সৈয়দ আমিরুল ইসলাম, ইতিহাসবিদ। একদিন ভয়ে ভয়ে পত্রিকা অফিসে গিয়ে শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত  উপন্যাসে বর্ণিত কলিকাতার বাবু নতুন দার ধমক খাওয়া শ্রীকান্তের মতো তামাক সাজানে না-হলেও লাহিড়ি বাবুর ব্যাকরণের জটিল প্রশ্নে ঘাম ছুটে যায়। কেননা জানিয়েছিলাম আমি ঢাকা শহরের নামকরা একটি স্থলে বাংলা পড়াই। রক্ষা পেয়েছিলাম একথা বলে যে, তাঁর সম্পাদিত শিক্ষা বোর্ডের ব্যাকরণ বইটি আমিই পড়াই।

আমার আবদার প্রথমে বাতিল হলেও, সম্পাদকের দফতরে বসে এহেন কাজ অন্যায় না-হলেও, ্্উচিত নয় ভেবে  তাঁরা দু’জনই রাজি হলেন। কাজটি কি? আমার ধারাবাহিক উপন্যাসের সে অংশটুকু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্পাদনা করেছেন, প্রাককপি হিসেবে, যা এখন পরিত্যক্ত ময়লা কাগজের স্তূপে পড়ে আছে তা আমার হাতে তুলে দেয়া। বছরের পর বছর সংশোধিত অথচ পরিত্যক্ত কাগজই আমি কুড়িয়ে ঘরে তুলে এনে মূল কপির সঙ্গে মিলিয়ে শেখার চেষ্টা করেছি। আজও আমার সেই সাধনা চলছে। অন্য পথে । অন্য মতে। তখন মনে হতো আমিই সেই মহাভারতের অনার্য যুবক একলব্য। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী হচ্ছেন পা-বপুত্রদের অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য। নীচুবংশজাত বলে আর্য ব্রহ্মণ্যবাদী অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য একলব্যকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেনি। কিন্তু একলব্য গুরুর নকল মূর্তি তৈরি করে কল্পিত শিক্ষা দ্বারা অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হযে ওঠে। গুরু তাকে মুক্তি দেননি। গুরুদক্ষিণার নামে আপন আঙুল কর্তন করে একলব্য গুরু ঋণ শোধ করেছিল নিষ্ঠুর উপায়ে।

কিন্তু আমাকে গুরুদক্ষিণা দিতে হয়নি। বরং আরও ঋণী হয়েছি নতুন দিগন্ত পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হয়ে। গুরুকে  একেবারে সামনে পেয়েছি। শেখার চেষ্টা করেছি, কিভাবে প্রবন্ধের গদ্যভাষা নির্মাণ করতে হয়। এডিটরিয়াল লিখতে হয়। গুরু তা জানতেই পারেননি। তৎকালের আমরা সহকর্মীরাও। নতুন দিগন্ত এ ভাবেই আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। নতুন দিগন্তে আমি চাকরি করতে যাইনি, যাইনি সম্পাদনা সহযোগীর পদবী গ্রহণ করতে। গিয়েছিলাম শিখতে, নিজেকে সমৃদ্ধ করতে। এটা কেউ জানে না, জানেন না সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও। আজ তা প্রকাশ করার মহাসুযোগ এনে দিলেন তপন বাগচী

তপন বাগচীকে বলছি, আপনি আপনার লেখায় আমার লেখাটি সম্পর্কে যা যা মন্তব্য করেছেন সবই সত্য। আবারও বলছি, এটি উপন্যাস হয়নি। স্ক্যেচ, উপন্যাসের ভ্রুণ। ত্রুটিপূর্ণ জিন দ্বারা তৈরি ভ্রুণটি যদি আমার এডিট দ্বারা জন্মাতো তবে তা পূর্ণাঙ্গ শিশু রূপে নয় হতো বিকলাঙ্গ মানুষের পৃথিবীর অভিশপ্ত বোঝা হিসেবে জন্মানো। তাই এডিট নয়, পুনর্মুদ্রণ।

আমার বয়স হয়েছে। বেগ, আবেগ, প্রতিবেগ, কোনো কিছুই এখন আমাকে তাড়িত করে না। ৫০/৬০ বৎসর পূর্বের আমার কৈশোরিক চোখ দিয়ে দেখা পৃথিবীটা বদলে গেছে। বদলে যাওয়া নয়া জামানা, নয়া দুনিয়া বড় অচেনা আমার। দীর্ঘদিন প্রতীক্ষা করেছি আমার সাহিত্যের পৃথিবীতে নবী মোজাসের মতো তাঁর হাতের সর্বময় দ- দিয়ে দিয়ে নির্দোষ করেবেন, ‘হে ইজরাইল পুত্রগণ, গোলকধাঁধার এই পাথর আর বালিপূর্ণ মরুপ্রান্তর পরিত্যাগ করে আমাকে অনুসরণ করো, আমি তোমাদের ঈশ^র প্রতিশ্রুত মধ্ক্ষুরা সবুজ দ্রাক্ষাক্ষেত্রপূর্ণ পূর্ণ পবিত্র ভূমিতে নিয়ে যাব। আমার সাহিত্যের অহল্যা-অজন্মা-রসশূন্য ভূমি নির্দেশ করুক, এমন একজনের প্রতীক্ষায় ছিলাম আমিও। এবার তিনি এলেন। বড্ড বিলম্ব ঘটেনি তো?

সাহিত্যরচনা করা যত সহজ তত শক্ত উদ্দেশ্যপূর্ণ শত্রুতার বদলে নির্মোহ-নিরপেক্ষ-মেধা যুক্ত প্রায়োগিক আলোচনা করা। তপন তা করেছেন আকারে সংক্ষিপ্ত হলেও। শব্দ, বাক্য, ইমেজ ধরে ধরে তাঁর এই প্রচেষ্টা আজকের নষ্টসময়ে বড় অভাব। আমি বিশ্বাস করি আমার সাহিত্যের অন্ধকার দিকটা যদি পাঠকের কাছে অদেখা-অচেনা থেকে যায় তবে আলোর ঝিলিকটা কিভাবে দেখবে ওরা?

রাজনৈতিক বা বিপ্লবী উপন্যাস লেখার জেদ পেয়ে বসে আমাকে। সময়টা বড় এলোমেলো। যুদ্ধ, স্বাধীনতা, মানুষের অপ্রাপ্তি স্বপ্ন আর মৃত্যু মিছিলের দুর্ভিক্ষ। আমি বিস্মিত। এই দুঃসময়েও ঢাকা শহরে বিনোদন-সাহিত্য তৈরি হচ্ছে। কিন্তু কেনো? তপন নিশ্চয়ই জানেন তখন চীনা বিপ্লবী লাইনে কি ভয়ানক অন্তঃকলহ! ইনার কিলিং। পরস্পর পরস্পরকে শ্রেণিশত্রু নাম দিয়ে হত্যা। তত্ত্বগত বিবাদের পরিণাম, স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববঙ্গ তৈরির নামে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের একটি আংশ পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে যায়। অন্যদিকে চীন-সোভিয়েত তাত্ত্বিক বিতর্ক। লুটেরা বাঙালি বুর্জোয়া শ্রেণির উদ্ভব। গণলুণ্ঠন। মহা দুর্ভিক্ষ। আমাদের মতো সাধারণকর্মীরা বিভ্রান্ত। ব্যক্তি আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। পরস্পরের প্রতি আমরা এতটাই অবিশ^াসী যে, পরস্পর পরস্পরকে বিপ্লরের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে খতমের চিন্তায় আচ্ছন্ন। রক্ষিবাহিনীর তা-ব তো থাকছেই। এই অস্থির বিশৃঙ্খল সময়ে জন্ম আমার এই উপন্যাসের। অথচ বিপ্লবী সাহিত্য পাঠ নিয়ে যে শিল্পশিক্ষা তাও প্রায় ভাসাভাসা। বিপ্লবী সাহিত্যের এই অপূর্ব জ্ঞান নিয়ে আর যা হোক গোষ্ঠী হওয়া যায় না। লু-সুন হওয়া তো দূরের কথা।

অস্বীকার করার উপায় নেই যে, নিষিদ্ধ ঠিকানা লিখেছি বলেই আমি অজগর উপন্যাস লিখতে পেরেছি। তখনকার সময়ে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে দীর্ঘসময়াধারের প্রথম রাজনৈতিক উপন্যাস অজগর। আজগরের বীজ ভ্রƒণায়িত ছিল নিষিদ্ধ ঠিকানায়, এমনকি এই ব্যর্থ উপন্যাসটি আমাকে পথ বাতলিয়ে ছিল কোনদিকে আমার সাহিত্যের যাত্রা।

বিপুল সংখ্যক লেখক যা চননা, আমি তা চাই। আমি চাই পাঠক আগে খুঁজুক আমার অপূর্ণতাকে, তারপর পূর্ণতার সন্ধান। বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সেরা সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রথম লেখা পদ্মানদীর মাঝি আর পুতুল নাচের ইতিকথা বারবার, আজীবন এডিট করে গেছেন। আজকের বাজারে আমরা যে বই দেখতে পাই তা তার আদি রূপ নয়। বঙ্কিমের আনন্দ মঠও তাই।

আমার বোঝা তো আমাকেই বইতে হবে। এক কাঁধে অসফল সাহিত্য, অন্য কাঁধে সফল। মানববিবর্তনের মতো আমার সাহিত্যের আদি জন্মের ঠিকানা হচ্ছে নিষিদ্ধ ঠিকানা এবং ইত্যাদি। পাঠকের কাছে কবুল করছি আমার কাছে সংরক্ষিত আছে আমারই লেখা প্রয় একশত কবিতার একটা পা-ুলিপি। একাত্তরে এই পা-ুলিপি হাতে নিয়েই আমি আখাউড়া সীমান্ত পেরিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিল মাও-সে-তুঙ-এর বিখ্যাত সেই চটি লাল বই।

রচনাটির শুরুতে তপন লিখেছেন, ‘অন্যদের মতো মিডিয়ার আলো তাঁর দিকে কম প্রক্ষিপ্ত হলেও…। এই যে মিডিয়ার আলো, তা আসলে মরীচিকা। এই মরীচিকা সৃষ্টি করে রেখেছে দেশি-বিদেশি লগ্নিপুঁজি। বাণিজ্যপুঁজি। লুম্পেন পুঁজি। এর সর্বনাশা জালে যারাই পড়েছে আটকা, তাদেরকে পুঁজির মাকড়সা চুষে শুষে পতঙ্গের কংকাল বানিয়ে ছেড়েছে। নানারকম সুবিধে, পুরস্কার-পারিতোষিক দিয়ে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে প্রতিভাকে শেষ করে দূরে ঠেলে দিয়েছে। কলকাতা এর দৃষ্টান্ত, লেখকদের ওখানে বানিয়েছে বাণিজ্যের উপকরণ। পুঁজির ক্রীতদাস। এই হচ্ছে মিডিয়া, যে লেখককে সত্যের সামনে দাঁড়াতে দেয় না। ভেঙে গুড়িয়ে দেয় মেরুদ-, শোষিত মানুষের বিপক্ষে ঠেলে দেয়, তার প্রতিভার অপমৃত্যু ঘটায়। রাম রাজনীতি রক্ষাছাতা বলেই সেই প্রাণঘাতী আলো আমাকে স্পর্শ করতে পারেনি। আমি সতর্ক থেকেছি।

বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকু-লা আমার কাছে ভিন্ন অর্থ নিয়ে দাঁড়ায়। জীবনে আমি মাত্র একবার অত্যন্ত সচেতনভাবেই মেদিনীপুরের সমুদ্রতীরের ‘গঙ্গাসাগর’ নামের তীর্থে হাজার হাজার পুণ্যার্থীদের সঙ্গী হয়ে কপিলমুনির আশ্রম দর্শন করি যার পটভূমিকায় বঙ্কিম লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কপালকু-লা উপন্যাস। বঙ্কিমের কারণেই এর নাম ‘কপাল কু-লার মন্দির’। সারারাত পায়ে হেঁটে জঙ্গল ঘেরা সেই মন্দির দর্শন ছিল খুবই কষ্টসাধ্য। না। বঙ্কিমের কপালকু-লাকে খুঁজে পাইনি। পেয়েছিলাম অসংখ্য যুবতী সন্ন্যাসিনীদের। নিজেকে পথ হারিয়ে ফেলা নবকুমার ভাবলেও আমার প্রত্যাশা মতো কোনো আশ্রম বালিকা এগিয়ে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেনি; পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ?

এই সেই বঙ্কিমচন্দ্র যাঁর কপালকু-লা উপন্যাসের কারণে একটা প্রায় পরিত্যক্ত তীর্থভূমি এবং ভাঙামন্দির আজ বিশেষ দিনে লক্ষ লক্ষ মানুষের কোলাহলে পূর্ণ হয়ে যায়। বঙ্কিমের উপন্যাস এবং তার চলচ্চিত্রায়নের কী অকল্পনীয় প্রভাব। ওই যে নবীনা সন্ন্যাসিনী, ওরা বঙ্কিমচন্দ্রকে চেনে, চেনে কপালকু-লাকেও, ওরা সবাই শিক্ষিত মেয়ে, মাত্র ক’দিনের জন্যই কপালকু-লার রূপ ধরে। মেলা শেষে যে-যার ঘরে ফিরে যায়। কিন্তু বনমধ্যে পথ হারানো বঙ্কিমের নবকুমার আজ আর নেই। আমি খুঁজে পাইনি। এক যুবতী সন্ন্যাসিনীকে বঙ্কিমের নবকুমার আর কপালকু-লার কথা জিজ্ঞেস করলে হেসে হেসে মেদিনীপুরের স্থানীয় উচ্চারণে জানতে চায়; বাবুজি তুমি কি সেই নবকুমারের মতো পথ হারিয়ে ফেলেছ? একেবারেই না। পথ আমি হারাইনি। আজও হারাইনি। বঙ্কিমচন্দ্রের নবকুমার পথ হারালেও আমি হারাইনি। আমার পথটা তীর্থযাত্রার মতোই, সারারাত ক্রমাগত হেঁটে চলার মতোই কষ্টসাধ্য, অপ্রাপ্তি, নগদ প্রাপ্তিশূন্য।

তপন বাগচীকে জানাতে চাই, এই বইয়ের নতুন মুদ্রণে ভূমিকাটাই যোগ হয়েছে। প্রথম মুদ্রণে কোনো ভূমিকা ছিল  না। সেই ভূমিকা পাঠ করেই শ্রী বাগচী বইটি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু তিনি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন আধুনিক উপন্যাসের গঠনশৈলীতে এর ঘাটতি রয়েছে। সেই সত্যকে উন্মোচন তিনি করলেন না হয়তো এ কথা ভেবে যে, উপন্যাসের লেখকের প্রতি বড় নিষ্ঠুর আঘাত এসে যাবে। এমনটা হলে তিনি ঠিক কাজ  করেননি। তিনি নিষ্ঠুর সত্যের সঙ্গে আপস করেছেন মধ্যবিত্ত মানসের ধারক হিসেবে। এ ক্ষেত্রে তিনি লিখেছেন,‘কাহিনী , পটভূমি, চরিত্র, পরিণতি, এসব নিয়ে কথাবলার সুযোগ নেই।’ আমার প্রশ্ন, কোনো সুযোগ নেই? উপন্যাসের লেখক কষ্ট পাবেন বলে? তা হলে সাহিত্যের আলোচক কি সত্য উন্মোচনে দি¦ধাশূন্য নন? ভিতু?

আমি বিশ^াস করি খাঁটি সমালোচনায় ব্যক্তি আক্রমণের স্থান নেই। কিন্তু প্রকৃত আলোচকের দায় হচ্ছে এ কথা বুঝিয়ে দেয়া যে, উপন্যাস হতে গেলে গঠনরীতির বিশৃঙ্খলতা মানা যায় না। অথচ নিষিদ্ধ ঠিকানা উপন্যাস গঠনশৈলীর শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছে। নির্মম সত্য এই যে, তপন বাগচী সাহিত্যসমালোচক হিসেবে মধ্যবিত্ত মানসভীতি থেকে মুক্ত ননÑপাছে লেখক রুষ্ট হবেন।

অবশ্য সাহসী তপন বাগচীকে হঠাৎ আবির্ভূত হতে দেখা যায় পরবর্তীকালে। প্রকৃত সমালোচকের মতোই বইটিতে আমার লেখা ভূমিকাকে সাক্ষ্য রেখে উদ্ধৃত করেছেন, ‘বর্তমানে প্রকাশনাটি পরিমার্জিত, বলা যেতে পারে নতুন সংস্করণ।’ এমনি লেখার জন্য পাঠকের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। নিশ্চয়ই এটা এক ধরনের শৈল্পিক অপরাধ বা ক্রাইম। পরক্ষণই তপন বাগচী লিখেছেন ‘ভাষাগত অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলাই যেতে পারে। এই সমালোচনা গ্রহণ করার মতো ধৈর্য লেখকের আছে বলেই বিশ^াস করি।’ তপন বাগচী এটা বলতে পেরেছেন বলে লেখক হিসেবে আমি অবৈধ তো নই-ই, অসহিষ্ণুও নই, বরং আহ্লাদিত,আপ্লুত। মার্ক্সবাদ থেকে এ শিক্ষা আমি পেয়েছি। উদ্দেশ্যমূলক কোনো মহলের নির্দেশে ভাড়াটে সমালোচক হিসেবে তিনি আমার লেখার সীমাবদ্ধতাকে নির্দেশ করেননি, যেমনটা সর্বদাই ঘটে থাকে পশ্চিমবঙ্গে। তপনের এই সমালোচনা শিল্পের স্বার্থে। এমন সমালোচককেই বলে শিল্পের শিক্ষক।

সাহিত্যের সবচেয়ে জটিল অধ্যায় হচ্ছে উপমা, অলংকার, চিত্রকল্প নির্মাণ। এটি বিজ্ঞানের কঠিন গবেষণালব্ধ আবিষ্কারের মতো ঠিক। আমি এই বইটিতে চিত্রকল্প নির্মাণের জন্য, প্রতীকী অর্থ তৈরি জন্য যোগ্যতা অর্জনের আগেই বড্ড বেশি সাহস দেখাতে চেয়েছিলাম। এখানেই ঘটেছে শিল্পসূত্রের বিভ্রান্তি। তপন আমাকে অতীতে টেনে নিলেন। সেই দূর অতীতে শিল্পের যে গোলকধাঁধায় আমি ডুবে ছিলাম, আজ তা মনে পড়ছে। আলো জ¦ালাতে গিয়ে ধোঁয়াই তৈরি করে গেছি। কি নির্মম বাস্তবতা। তপন আমার বই থেকে উদ্ধৃত করেছেন, ‘শিউলির মেধাশক্তি অত্যন্ত উর্বর…মেট্রিকে… যোগ-বিয়োগ আজও ভীষণ ভয়। যদি না-ই মিলল?’ এই অনুচ্ছেদটি দ্বারা আমি একটি চিত্রকল্প নির্মাণ করতে চেয়েছিলাম। শিউলি আসলে কোনো ব্যক্তিমানুষ নয়, শ্রেণিÑ মধ্যবিত্ত শ্রেণি। মধ্যবিত্ত বিপ্লব চায়, কিন্তু তাতে রয়েছে সন্দেহের ভীতি। এই যে অংকে কাঁচা হয়েও সে পরীক্ষায় লেটার নম্বর পায় তা আসলে মধ্যবিত্ত সমাজের অচরিতার্থ স্বপ্ন। ফল না-মেলার ভয়ে যোগ-বিয়োগে যে ভীতি তা হচ্ছে অনিশ্চত বিপ্লবোত্তর বাস্তবতা। শিউলির যে মুখস্থ বিদ্যা তা আসলে মধ্যবিত্তের রক্তাক্ত বিপ্লবে অংশ গ্রহণের বাইরে তাত্ত্বিক পা-িত্য, যা বুদ্ধিজীবীরা করে থাকে নিরাপদ দূরত্বে বসে। অবশ্যই তপন তা জানেন।

এই যে আমি আত্মপক্ষ সমর্থন করে, তপন বাগচীকে ব্যাখ্যা দিলাম, তা আসলে একটি হাস্যকর যুক্তি। ব্যর্থ লেখার পক্ষে তার ¯্রষ্টা এমনি করেই দাঁড়ায়। প্রশ্ন উঠতেই পারে তা হলে আমি কি পাঠকের ঘরে ঘরে গিয়ে জনে জনে বলে আসব, ‘না ভাই, আমাকে ভুল বুঝবেন না, আমি কিন্তু এই বাক্যে এই কথা বলতে চেয়েছি, আপনি যা বুঝলেন তা নয়।’

একেই বলে শিল্পের গর্তে পড়া লেখকের আর্তচিৎকার! যা হোক , তপন বাবুকে বলে রাখি ১৯৬২ সাল অর্থাৎ আমার মেট্রিকুলেশন পাশের বৎসরই ছিল শেষ ‘মেট্রিক’ সনদের সাল। ১৯৬৩ সালে তা হয়ে যায় এসএসসি। কিন্তু ঔপনিবেশিক যুগের এই ‘মেট্রিক’ শব্দটি লোকস্মৃতিতে ৮০সালের পরেও টিকে ছিল। আজও সেই লোক স্মৃতির অবশেষ টিকে আছে নগর গ্রামে।

‘…ধ্বনিহীন হয়ে দূরে মিলিয়ে যায়। মরা মানুষ পোড়ার মতো অলৌকিক দুর্গন্ধ…।’ তপন বাবুকে বলছি ‘ধ্বনিহীন হওয়া’ আর ‘দূরে মিলিয়ে যাওয়া’ মোটেই এক অনুষঙ্গ নয়। এটা শব্দ আর দৃশ্যের জটিল ক্রিয়া। বিজ্ঞানে শব্দের গতির ব্যাখ্যা আছে। আরও ব্যাখ্যা আছে অদৃশ্যের। তাছাড়া আমার বাক্যে ‘অলৌকিক দুর্গন্ধ’ এই উপবাক্য বা খ- বাক্যটি আছে। এটা জীবনানন্দীয় উপমা নয়। স্বধীনতার স্বপ্নভঙ্গ সমাজের ঘরের চার দেয়ালের ভেতর বন্দিদশার প্রতীক, হতাশার প্রপঞ্চ। স্বীকার করছি এমনি শব্দচয়ন কেবল কাব্যের ক্ষেত্রে নয়, গদ্য ভাষাকেও দুর্বোধ্য কুয়াসায় ঢেকে দেয়। এটাও সত্য যে মার্ক্সবাদী শিল্পী ‘অলৌকিক’ শব্দ ব্যবহার করেন না। ‘অলৌকিক’ বা ‘ অলৌকিকবাদে’ তাঁরা বিশ^াসী নন। অন্যদিকে ‘দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ’ বিশ^াসী বিজ্ঞানীরা জানেন কেনো কিভাবে দৃষ্টির দ্বন্দ্ব, স্মৃতির দ্বন্দ্ব, শ্রুতির দ্বন্দ্ব, লৌকিকের ভেতর অলৌকিকের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। আমি তো বিজ্ঞানী নই।

তান্ত্রিক বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ যেমনি গুহ্যসাধনায় ধর্মের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হেঁয়ালি ভাবের প্রহেলিকা তৈরি করেন উপমা-অলংকারের নামে, সে দায় আমার নয়। আমার এই বইয়ে আপনার উদ্ধৃতির বাইরে আরও অসংখ্য প্রহেলিকামূলক খ-বাক্য আছে। কিছু কিছু সচেতনভাবেই লিখেছি। কেননা রাজনৈতিক কারণে আমার জন্য সেই সময়টা ছিল ভয়ের, আতঙ্কের। ওই যে আপনি উদ্ধৃত করেছেন,‘ত্রিভুজের মতো চোখ তুলে…।’ নিশ্চয়ই আপনি উপমাটির অর্থ বুঝেছেন, কৌশলগত রহস্যময় পিরামিড নয়, রাষ্ট্রযন্ত্রের ভয়ংকর জিঘাংসু প্রতীক।  যা নিক্ষিপ্ত ছিল সে সময় আমার বা আমাদের মাথায়।

তপন বাগচীর রচনায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বয়ান হচ্ছে রচনাটির প্রান্তঅধ্যায়। দীর্ঘক্ষণ তিনি শ্রম দিয়েছেন লেখক হরিপদ দত্তের দিকে। একক ব্যক্তির দিকে। এবার তিনি ব্যক্তি নয়, সমাজ-রাষ্ট্রর প্রায় নিরাময় অযোগ্য অসুখটির, ওপর নজর ফেলছেন। পৃথিবীর যে-কোনো লগ্নিপুঁজি, বাণিজ্য পুঁজি তথা লুম্পেন পুঁজির দেশে শিল্প-সংস্কৃতির শ্রেণিচরিত্র এমনই হওয়াটাই স্বাভাবিক। এখানে লেখকরা লেখে না, পুঁজি আর মুনাফা (প্রকাশনা ব্যবসা) লেখকদের ভাড়া করা কলমমজুরে পরিণত করে। লেখকরা হয়ে ওঠে আদর্শহীন, অমেরুদ-ী লোভী প্রাণী। সাহিত্য আলোচনায় অপ্রিয় সত্য কেউ সহ্য করে না। তপন বাগচীর মতো সাহিত্য ব্যক্তিত্বগণ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। তাঁদের সাহসের কলমটি ভেঙে ফেলা হয়। কেবল কলমই নয়, সমালোচকের মেধা বুদ্ধি ঔচিত্যবোধকেও আঘাত হানা হয় । তপন বাবুকে তাই লিখতে বাধ্য করা হয়,‘সমালোচনা করতে কি একটু বেশি ঝুঁকি নিয়ে ফেললাম? লেখক কি মেনে নিতে পারবেন? আমার মূর্খতা (!) তুলে ধরে উল্টো গালাগাল করবেন না তো?…লেখকের ভয়েই হয়তো আমাদের দেশে সমালোচানা সাহিত্য তৈরি হয় না… হরিপদ দত্তর উপর আস্থা বয়েছে…।’

তপন বাবু, জানবেন কেবল বাংলাদেশে নয়, বিশে^র প্রায় ৩০ কোটি বাঙালিকেই নিয়ন্ত্রণ করে বিশ^পুঁজির দেশিয় এজেন্ট শাসক শ্রেণি। অর্থনীতি আর রাজনীতি যারা নিয়ন্ত্রণ করে ,ওরাই শিল্প সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সাহিত্য সমালোচকগণ লেখকদের ভয় পাবেন কেনো? সামালোচকগণ কি  লেখকের  চোখে সন্ত্রাসীর ছায়া পান? বাঙালি আজ কোথায়ও দাঁড়াতে পারে না, জায়গা পায় না। ওরা লিখতে ভয় পায়, বলতে ভয় পায়, ছাপতে ভয় পায়। ভয়টাই বাঙালিকে পিছিয়ে দিয়েছে। আমার সমালোচনা করতে আপনি ভয় পাবেন না। আমি বিজ্ঞান-যুক্তিবাদী মানুষ। সামন্ত- আবেগবাদী নই। সমালোচকজনই আমার শিল্পপথের দিশারি। এই ঢাকা শহরের কিছু পত্রিকা আমার লেখাকে আক্রমণ করে আমাকে সাম্প্রদায়িক এবং হিন্দুবর্ণবাদী হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। না হয় করল, ক্ষতি কি। যারা করেছে তাদের প্রতি এতটুকু ক্ষোভ নেই আমার। কেন ক্ষোভ করব? এ তো আমার কাজ নয়, আমার কাজ একমাত্র লেখা। তাই বঙ্কিমের কপালকু-লার জিজ্ঞাসাই আমার আত্মজিজ্ঞাসা হয়ে বারবার জেগে ওঠে, ‘পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ?’

না, তপন বাগচী, না শব্দঘর-এর সম্পাদক সাহেব, আমি পথ হারাইনি। হারানের বিকল্প পথ যে আমার জন্য খোলা নেই। আমি তো নিষিদ্ধ ঠিকানার নিষিদ্ধ মানুষ। নিষিদ্ধ কথাশিল্পী।