লিটল ম্যাগ- ‘চিত্র শিল্পের বিউপনিবেশায়ন  ভাবনার তত্ত্বায়ন’ : মাসুদ রানা

লিটল ম্যাগ

‘চিত্র শিল্পের বিউপনিবেশায়ন  ভাবনার তত্ত্বায়ন’

মাসুদ রানা

মোহাম্মাদ আবদুল খালিক সম্পাদিত ফসল ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সংখ্যাটি ‘কবি দিলওয়ার’ সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু কোথাও এই বিশেষ সংখ্যার কথা নেই। এই সামান্য ত্রুটিকে ধেের নিয়ে পত্রিকাটির ভিতরে প্রবেশ করতে পারি।

‘তাঁর কথা শোনার জন্য কতদিন যে আমরা আড্ডায় মেতেছি। তবে আরও বেশি সময় প্রয়োজন ছিল; কারণ কোনো ঘটনা, কাহিনি, বইয়ের অংশবিশেষ, পুরাণ ও মিথ তাঁর স্মৃতিসত্তায় মুখর ও চঞ্চল। তা থেকে হুবহু বলে যেতেন, আর আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। কবি দিলওয়ার যেন চলমান এক বিশ^কোষ।’

প্রাবন্ধিক স্বপন নাথের উপরোক্ত বক্তব্য দিয়ে কবিকে বুঝা সম্ভবÑ তিনি কোন প্রকৃতির ‘কবি’ ও ‘মানুষ’ ছিলেন। তিনি শুধু কবি ছিলেন না, জ্ঞান-রাজ্যের একজন চলন্ত ভাবুক ছিলেন। কবি-সত্তার বাইরেও যে, তিনি একজন সামাজিক প্রাণী এ বোধকে কবি দিলওয়ার কোনোভাবেই অস্বীকার করেননি। তাই তিনি গণমানুষের কবি হিসেবে অভিধা পেয়েছেন পাঠক ও সমালোচক-সমাজের কাছে। কিন্তু রাজধানীর বাইরে অবস্থান করার কারণে কবি তেমন ভাবে পাঠক সমাজের কাছে হাজির হতে পারেননি।

স্বপন  নাথ ও মোস্তাক আহমাদ দীন কবি দিলওয়ারের কবি-বৈশিষ্ট্য ও তাঁর কবিতার স্বর, ভাব, বোধ ও ব্যঞ্জনা খুব চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। কবি দিলওয়ারকে বলা হয় গণমানুষের কবি। বাংলা অঞ্চলে কবিতায় সংগ্রামÑ বিদ্রোহ তুলে এনেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়। এই তিন অগ্রজের ভাববিশ^কে আত্মস্থ করেই কবি দিলওয়ারের আবির্ভাব। যেমন তিনি বলেছেন :

ওহো, আয়রে ছুটে মেনেতিরা

ছিঁড়তে ভাষার বৈরীশিরা,

শোষণ মুক্ত গড়তে সমাজ

নোইকো সময় থামবার

বাংলাÑ তোমার আমার।

 

‘মাউ মাউ দেরে’ কবিতায় বলেছেন :

বিপ্লব চাই, চাই বিপ্লব, চাইÑ

বিপ্লব ছাড়া মুক্তির উপায় নাই।

পুরাতন করে কর্তন

আনো নব পরিবর্তন।

 

শুধু তাঁর কবিতায় বিদ্রোহ-বিপ্লব নেই। এর পাশাপাশি আছে ইতিহাসÑ মিথের অপূর্ব কারুকার্য। যেমনÑ ‘ফেডিফাইডিসের প্রতি’ কবিতায় বলেছেন :

তারা নতুন যুগের প্রুয়োটাস। তারা

দানবনিন্দিত মুনাফা লোভের সুরম্য প্রাসাদ কক্ষে বসে;

ইউরিপিদিস, এস্কাইলাস, সফোক্লিস আর অ্যারিস্টফেনিসের

নাটকের পাতায় হিসাবের অংক কষে দেখো,

ফেডিফাইডিস, মনুষ্যের বীর্য রসে এরা কোন ধাতব রাক্ষস?

 

উপরোক্ত কবিতার কাঠামোটি দঁড়িয়ে আছে প্রাচীন গ্রিস আর রোমের মহাকাব্যের নায়কদের বীরোচিত আখ্যান নিয়ে। তিনি পুরাণকে উপজীব্য করে বর্তমান সময়কে তুলে এনেছেন। এখানেই প্রকৃত কবির কৃতিত্ব। তিনি কবি সত্তার বাইরে একজন সাংস্কৃতিক সংগঠকও ছিলেন। তাঁর উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় ১৯৭০ সালে সিলেটে প্রতিষ্ঠিতা হয় ‘সমস্বর লেখক ও শিল্প সংস্থা।’

তিনি কবিতার একজন চাষী হয়ে আজীবন সামাজিক দায়বদ্ধতার তাগিদ থেকে বিভিন্ন ধরনের কর্মপ্রচেষ্টার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন। ঢাকায় অবস্থানকালীন সময়ে ১৯৬৭ সালে বিখ্যাত দৈনিক দৈনিক সংবাদ-এর সহকারী সম্পাদক ছিলেন।

কবি দিলওয়ারকে নিয়ে সেলু বাসিতের জীবনপঞ্জির দিকে তাকালেই বুঝা যায় তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের ইতিবৃত্ত।

 

বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠান বিরোধী পত্রিকা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে তপন বড়–য়া সম্পাদিত গা-ীব। এ বছর পত্রিকাটির ২৯ বছর অতিক্রম আমাদের আশাবাদী করে তোলে।

গা-ীবের বর্তমান সংখ্যাটিতে (ফেব্রুয়ারি ২০১৬) সুলতানকে নিয়ে সৈয়দ নিজার আলমের দীর্ঘ প্রবন্ধ সংখ্যাটিকে ঋদ্ধ করেছে। ‘সুলতানের বিউপনিবেশায়ন ভাবনার তত্ত্বায়ন’ প্রবন্ধটি আমাদের এই অঞ্চলের চিত্রকলার সমালোচনা-ধারায় নতুন সংযোজন বলে আমার নিজের কাছে মনে হয়েছে। এর পূর্বে সম্ভবত আর কেউ এভাবে শিল্পী সুলতানকে উপস্থিত করতে পারেনি। ব্রিটিশদের এ উপমহাদেশে শাসনভার গ্রহণ করার পর থেকে শুধু আমরা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে কলোনিয়াল সিস্টেম দ্বারা পরিচালিত হয়েছি। শুধু তাই নয়, অপরাপর সকল ক্ষেত্রের মতো শিল্প-সাহিত্যেও আমরা তাঁদের দ্বারা প্রলুব্ধ হতে বাধ্য হয়েছি।

ব্রিটিশরা এ-উপমহাদেশে এত দীর্ঘসময় শাসন করতে পেরেছেন তাদের চাপিয়ে দেয়া বিভিন্ন ধরনের তত্ত্বের চাপে। আর আমরা তাঁদের এ শাসনকে আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করেছি। অনেক দীর্ঘ সময় ধরে ব্রিটিশরা এ ভূখ- ত্যাগ করে চলে গেছে, কিন্তু তাঁদের অনুপস্থিতির পরও আজও তাঁদের ঔপনিবেশিক শাসনের জের আমাদের সকল ক্ষেত্রে প্রবলভাবে জেঁকে বসে আছে।

আলোচ্য প্রবন্ধটিতে লেখক যথাযথভাবেই শিল্পকলাচর্চার ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক প্রভাব বিষয়ে ইতিহাসের দীর্ঘ পর্ব ধরে আলোচনা করেছেন। আর এস এম  সুলতান তাঁর আর্টের ক্ষেত্রে উপনিবেশের প্রভাবমুক্ত চিত্রকর্ম কিভাবে নির্মাণ করলেন, তাঁর ব্যাখ্যা লেখক দিয়েছেন। গবেষণা প্রবন্ধ হিসেবে লেখাটি অসাধারণ।

মুহম্মদ আনোয়ার হোসেন পরিচালিত ‘অদৃশ্যমান সুর’-এর চিত্রনাট্যটি আলোচ্য সংখ্যায় আছে। বিকল্পধারার চলচ্চিত্রের কাহিনি পাওয়া যাবে এখানে। আমাদের অসংখ্য জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ‘খাসিয়া’ জাতিগোষ্ঠী এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। খাসিয়াদের ভাষা, সংস্কৃতির ধ্বংসের ইতিবৃত্ত নিয়ে আলোচ্য প্রামাণ্যচিত্রটি বাংলাদেশে মূল ধারার প্রামাণ্য চিত্রের বাইরে  এ ধরনের উদ্যোগ অবশ্যই আশাব্যঞ্জক।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম কবি মাইকেল ম্যাকলুরের একটি সাক্ষাৎকার গা-ীব-এর বর্তমান সংখ্যাটির গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। সাক্ষাৎকারটি দীর্ঘ না হলেও গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ আছে।

বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠান বিরোধী যে কয়েকজন লেখক আছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন শান্তনু চৌধুরী। তাঁর ‘গ্রি-াড্ডাপ’ নামে একটি দীর্ঘ ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে।

গা-ীব-এর বর্তমান সংখ্যাটি আয়তনে ছোট হলেও, একটি গোছানো ও পরিপাটি সংখ্যা বলা যায়, প্রত্যাশা থাকবে, গা-ীব যেন তার লক্ষ থেকে বিচ্যুত না হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares