বইকথা বিল- বাঘিয়ার প্রান্তরে ॥ গোপালকৃষ্ণ বাগচী : রঞ্জনা বিশ্বাস

বইকথা

বিল বাঘিয়ার প্রান্তরে ॥ গোপালকৃষ্ণ বাগচী

রঞ্জনা বিশ্বাস

বিল বাঘিয়ার প্রান্তরে

গোপাল কৃষ্ণ বাগচী

প্রচ্ছদ: এম এ আরিফ

প্রকাশক: শোভা প্রকাশ, বাংলা বাজার, ঢাকা

প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৬

মূল্য : ৫৭৫ টাকা মাত্র পৃষ্ঠা : ৪৫৬

 

আবদুল মান্নান সৈয়দের এক বয়ানে জেনেছিলামÑ সৃষ্টি হচ্ছে নদী আর তার দু’কূল হচ্ছে সমালোচনা। যোগ্যতার আর পা-িত্যের যে স্তরে থাকলে গোপালকৃষ্ণ বাগচীর বিল বাঘিয়ার প্রান্তরে বইটির কূল রক্ষা করা সম্ভবপর হতো, বলা বাহুল্য, সেই স্তরের পাঠক ও সমালোচক আমি নই। তাই বিল বাঘিয়ার প্রান্তরের ওপর আমার যা বক্তব্য তা নিতান্তই ব্যক্তিগত অনুজ্ঞা।

বিল বাঘিয়ার প্রন্তরে একটি গবেষণাগ্রন্থ হলেও এতে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক চরিত্র। চরিত্রটি নির্মাণ করতে গিয়ে গবেষক লোকসংস্কৃতির সাথে নৃ-বিজ্ঞানের নান্দনিক মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছেন। এছাড়া সংস্কৃতির সাথে বা সংস্কৃতির উপলব্ধির সাথে সম্পর্ক হওয়ার অর্থই হলো অতীত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা যা প্রাগ-ঐতিহাসিক সংস্কৃতিচর্চায় সহায়ক হয়। আর এ-কাজটিও গোপালকৃষ্ণ বাগচী তাঁর বইয়ে খুব চমৎকারভাবেই তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।

বিল বাঘিয়ার প্রান্তরে বইটির প্রধান চরিত্র হচ্ছে একটি গ্রাম। এই গ্রামটির পরিচয় দিতে গিয়ে লেখক এর অবস্থান, ভূ-প্রকৃতি, ইতিহাস ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি, ব্যক্তিগত অনুসন্ধান ও প্রখর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার সাহায্যে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন। লেখক তার নায়িকার পরিচয় শনাক্ত করতে গিয়ে বৃহত্তর ঐতিহ্য থেকে ক্ষুদ্রতর ঐতিহ্যের দিকে ধাবিত হয়েছেন যাতে করে ইতিহাসের আলোকে এই ক্ষুদ্র ঐতিহ্য সম্পর্কে পাঠক সহজেই স¦চ্ছ ধারণা পেয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে তিনি গোপালগঞ্জ ও কোটালিপাড়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও এর ভৌগোলিক অবস্থান শনাক্ত করে বিল বাঘিয়ার বর্ণনা এমনভাবে দিয়েছেন যে, পাঠক অবচেতনে বিল বাঘিয়ার উপস্থিতি তার হৃদয়ের মধ্যে অনুভব করতে সক্ষম হবেন। যেন এ গ্রামের ছবিটি তার কত চেনা!! একটি এলাকার জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে ঐ এলাকার ভূপ্রকৃতি, পরিবেশ ও ইতিহাসের গভীর প্রভাব থেকে যায়। বিল বাঘিয়ার মানুষেরাও সেই প্রভাব এড়াতে পারেনি। লেখক বলেনÑ ‘এ বিল ছাড়া যেন রামনগরের কোনো অস্তিত্বই নেই। একে ঘিরেই তার সব চাওয়া-পাওয়া আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ।’

বিলের মানুষের চাওয়া পাওয়া; সুখ-দুঃখের সাথে পাহাড় বা মরু এলাকার মানুষের সাথে নিশ্চয়ই মিলবে না! এর কারণ এক একটি এলাকার সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি হয় তার ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর। আর একারণে বিল বাঘিয়ার মানুষের চাওয়া পাওয়া ও সুখদুঃখ তাদের সংস্কৃতিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা যা গোপালকৃষ্ণ বাগচী তার বইয়ে তুলে এনেছেন। যেমন একটি ব্রতের গানে :

খাট্টে খাট্টো কলাগাছটি অরায় গলায় জল

তাইরো মধ্যে পইড়া পাইলাম সোনারই কোদাল

কোদালে কাটিয়া মাটি চাকেতে ঘুরাই

ঘাতেতে ছানিয়া মাটি পারুল বানাই

পারুল বানাইয়া মাটি রোদেতে শুকাই।

 

কিংবা-

আয় রে পায়রা ধৈঞ্চা

লম্বা বেগুন খাইয়া যা

যে দেবে এক কোষ

তার পেটে রাক্ষস

যে দেবে এক মুট

তার পেটে বইলগা ফুট

যে দেবে সরায় সরায়

তার লক্ষ্মী ঘরায় ঘরায়।

 

একটি শিশুতোষ লোকছড়ার উদ্ধৃতি রয়েছে, তা এমনÑ ঘুঘু সই তাপুত কই/ তাপুত গেছে হাটে, গরু বানছে মাঠে/ ভেরিক ধানের খই, নইদার মাথায় দই/ নইদা গেছে ধান দাইতে, হারাই আসছে কাঁচি/ সেই ধানের ভাত খাইয়া বুড়িলো বুড়ি নাচি/ বড় তালগাছটা নড়ে চড়ে, ছোট তালগাছটা ভাইঙ্গা পড়ে।

লেখক এই বিল বাঘিয়ার মানুষের লোকসংস্কৃতি তাদের চাওয়া-পাওয়ার আর্তির সাথে একাত্ম হয়ে তুলে ধরেছেন। আর এভাবে লোকজীবনের সার্বিক চেতনার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে গিয়ে লেখক তুলে নিয়ে এসেছেন বিল বাঘিয়ার জীবনযাত্রা, কৃষিবিষয়ক যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত, উৎসব, পূজা-পার্বণ, পূজার গান, নানা রকম লোকছড়া, ধাঁধা হেঁয়ালি, প্রবাদ-প্রবচন, মাছধরার পদ্ধতি ও উপকরণ, লোকিক দেবতা, মহাপুরুষ ও সন্তদের তীর্থ ও তন্ত্র মন্ত্রের বিষয় ইত্যাদি। এসব তথ্য উপাত্তের সন্ধান দিতে দিতে তিনি ব্যক্তি জীবনের স্মৃতিচারণের মাধ্যমে লোকজীবনের গল্পগুলো এমনভাবে তুলে ধরেছেন যা এ গবেষণা গ্রন্থকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। লেখকের বিশেষ পা-িত্যের কারণেই বইটি হয়ে উঠেছে সুখ পাঠ্য । যারা গবেষণা গ্রন্থের ক্ষেত্রে উন্নাসিক অর্থাৎ যারা প্রাতিষ্ঠানিক গ্রন্থকেই খুব কাজের বই বলে মনে করেন তাদের জন্য বলে রাখা ভালো যে ভালোবাসাহীন প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার চেয়ে বরং ভালোবাপূর্ণ এমন অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজই শেষ পর্যন্ত বিভ্রান্তি ও অপরিচ্ছন্ন পরিস্থিতি থেকে আমাদেও উদ্ধার করে। বিল বাঘিয়ার প্রান্তরে বইটির লেখক প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে গিয়ে সংস্কৃতির পরিবর্তনের ধারাটি যেভাবে ব্যাখ্যা করেন তাতে তাকে একজন  সফল নৃবিজ্ঞানী বললেও অন্যায় হয় না। লোক-সংস্কৃতি কিভাবে সংহত গ্রামীণ পরিবেশ ছেড়ে বৃহত্তর ভোক্তা সমাজের কাছে পৌঁছায় কেমন তার দ্রুতি, তাও তার দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে।

লেখক তাই বলেনÑ ‘কোন কিছু স্থায়ী নয়। শুধু পরিবর্তনটাই স্থায়ী কোন নির্দিষ্ট দিন তারিখ দিয়ে তা ঘটে না। ঘটে ধীরে ধীরে, খাপ খাইয়ে, বাস্তবতা ও প্রয়োজনের নিরিখে। জীবনধারার সাথে তাল মিলিয়ে সংস্কৃতি ও আচার-অনুষ্ঠানের পরিবর্তন হয়। তাতে পুরানো কিছু বিলুপ্তি যেমন ঘটে তেমনি নতুন কিছুর প্রচলন হয়।’ এর কারণ তিনি ব্যাখ্যা করেছেন একজন নৃবিজ্ঞানীর মতোÑ ‘ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা মানুষের প্রতি মুহূর্তে কাজে লাগছে। সচেতনতা ও মানুষের অধিকার বোধ বেড়েছে।…এখনকার মানুষ বেশি সচেতন বা অতীতের মানুষ সচেতন ছিল না, বিষয়টি ঠিক তা নয়। মানুষ আদিকাল থেকেই সচেতন ছিল। এটি একটি ক্রম ধারা।’ এরপর লেখক বস্তুগত ও অবস্তুগত লোক-উপাদানগুলোর পরিবর্তনের ধারা বর্ণনা করেন। এক্ষেত্রে প্রথমেই তিনি কৃষিতে যে পরিবর্তন ঘটেছে তার বর্ণনা দেন, আর এর ধারাবাহিকতায় খেলাধূলা, উৎসব-অনুষ্ঠানাদিতে কি ধরনের পরিবর্তন এসেছে তাও তুলে ধরেন।

বইটিতে বিল বাঘিয়ার ভাষার প্রশ্নটিও উপেক্ষিত হয়নি। বিল বাঘিয়ার লোকভাষা সংগ্রহ করেই লেখক ক্ষান্ত হন নি। তিনি এর গ্রমীণতার লক্ষণগুলি নিয়েও আলোচনা করেছেন। যেমন-‘কখনো কখনো যেমন সাবধানী উচ্চারণ আছে আবার তাতে বর্ণবিপর্যয়ও আছে। যেমন , সাসপাতাল, সারামজাদা, লড়াচড়া, লখ, লামা, লগেন, শরীল, অলিনদা, রিসকা, বাস্ক,…।’ এ স্থানে তিনি প্রচুর গ্রামীণ শব্দ সংগ্রহ করে তুলে দিয়েছেন যা ভাষা বিজ্ঞানীদের পরবর্তী গবেষণার কাজকে তরান্বিত করতে সাহায্য করবে এতে সন্দেহ নেই। লোককাহিনির পাশাপাশি প্রবাদ প্রবচন ধাঁধাগুলোও তুলে এনেছেন তিনি। উল্লেখ করেছেন প্রাচীন পরিমাপের এককের কথা, লোকদেবতা, মহাপুরুষ ও সাধুসন্তদের কথা, এলাকার বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের কথা, মন্ত্রতন্ত্র, খনার বচন, পঞ্জিকার ব্যবহার, যাত্রাগান কবিগান কীর্তনসহ লোকসংস্কৃতির আরও নানান দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এমন কি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিল বাঘিয়ার ভূমিকাও লেখক বর্ণনা করেছেন সাবলীল ভাষায়Ñ‘১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় গ্রামটি ছিল নিরাপদ। অন্যান্য গ্রাম থেকে বহু লোক আশ্রয় নিয়েছিল এ বাঘিয়ার বিলে। বিল, বড় বড় কচুরিপানা থাকায় ও যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় এ সুবিধে হয়েছিল। শাপে বর তখন। যে-কারণে সারা বছর আমরা কষ্ট পাই, সেই কচুরিপানার বিলই আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের হাত থেকে।’ স্বাধীনতাপরবর্তী পরিস্থিতিও লেখক ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতার নিরিখে বর্ণনা করেছেন সাবলীলভাবে।

একটি গবেষণা গ্রন্থও যে সুখ পাঠ্য হতে পারে তা বিল বাঘিয়ার প্রান্তরে বইটি না পড়লে জানা সম্ভব নয়। এছাড়া ছোট্ট একটি গ্রামকে কেন্দ্র করে যে এমন একটি বিশাল গবেষণা গ্রন্থও রচিত হতে পারে তাও অজানা থেকে যেত আমার। গবেষণার ক্ষেত্রে এরকম ব্যক্তিগত পদ্ধতি যে অনুসৃত হতে পারে তা কেবল একজন গুনী গবেষকের পক্ষেই বোঝা সম্ভব।

প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি জরুরি বলে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে করা এই গবেষণায় জনগণ, তাদের ভৌগোলিক পরিবেশ ও সংস্কৃতির সাথে যে সম্পর্ক তার ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়নি। লেখক তার বইটিতে সাংস্কৃতিক নানা উপাদানে গড়ে ওঠা বাহ্যিক চেহারা ও কাঠামোটুকুই তুলে ধরেছেন, অভ্যন্তরীণ দিকের ব্যাখ্যায় যাননি অর্থাৎ এর অন্তর্গত দিকটি বিশ্লেষণ করেননি। এ ক্ষেত্রে তিনি ক্ষুদ্র ঐতিহ্যের অন্তর্গত বৈশিষ্ট্যটিকে বৃহৎ ঐতিহ্যের সীমায় এনে এর সাদৃশ্য বা বৈপরীত্য ব্যাখ্যা করতে পারতেন। এতে করে গ্রামীণ সংস্কৃতির যে নকশা তৈরি হতো তাতে পাঠক একটি সংগত ধারণা লাভ করতে সমর্থ হতো।

যা-ই হোক-না কেন, লেখক সামাজিক সমস্যা পর্যালোচনার জন্য কোন প্রত্যয় নিয়ে আলোচনা না করলেও তিনি যে- বিল বাঘিয়ার মানুষের সামাজিক বিধান, প্রথা ও সংস্কৃতি অনুধাবনের ক্ষেত্রে পরবর্তী গবেষকের জন্য পথ নির্মাণ করে দিতে সক্ষম হয়েছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ-প্রসঙ্গে বইটির পরিচয় দিতে গিয়ে ড. তপন বাগচী যথার্থই বলেছেনÑ ইতিহাস গবেষণার প্রথাগত পদ্ধতি কিংবা লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্র-সমীক্ষার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি পুরোপুরি অবলম্বন না করেও যে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচিত হতে পারে, গোপালকৃষ্ণ বাগচী রচিত বিল বাঘিয়ার প্রান্তরে গ্রন্থটি তারই আদর্শ নমুনা।

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares