সাহিত্য-সম্মেলন- ঢাকা লিট ফেস্টের বাংলা সেশন সমকালীন সাহিত্য-সংস্কৃতি ও দেশকাল : রহমান মতি

সাহিত্য-সম্মেলন

ঢাকা লিট ফেস্টের বাংলা সেশন

সমকালীন সাহিত্য-সংস্কৃতি ও দেশকাল

রহমান মতি

 

‘হে ফেস্টিভাল’ থেকে ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’-এর আগমন ঘটেছিল গত ১৭-১৯ নভেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত। এ-আয়োজনের বাংলা সেশনগুলো সমকালীন সাহিত্য এবং দেশকালের বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়াবলি নিয়ে বিশ্লেষণ অনুষ্ঠিত হয়। সেগুলোর ধারাবাহিক আলোচনা বর্তমান লেখায় পাওয়া যাবে

‘ঢা কা লিট ফেস্ট’-এর বাংলা সেশনে সমকালীন বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার সমস্যা নিয়ে উন্মুক্ত বিশ্লেষণের পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রথম দিনে। হেমন্তের দুপুরে বাংলা একাডেমির লনে অনুষ্ঠিত হয়। আলোচক ছিলেন যথাক্রমে জহর সেন মজুমদার, মাসুদুল হক, সেমন্তী ঘোষ এবং সঞ্চালনা করেন আহমেদ রেজা। উপভোগ্য একটি বিশ্লেষণ ছিল। সাম্প্রদায়িকতা এখন বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। ভারতীয় উপমহাদেশে এ-সমস্যা প্রকট আকারে পৌঁছেছে। ধর্মকে ভুল ব্যাখ্যা করে মানুষের মনস্তত কে নেতিবাচক দিকে প্রভাবিত করে  সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষকে উপযুক্ত কারণ ছাড়াই ভুল বুঝে যাচ্ছে। এর পেছনে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রবল ভূমিকা আছে। সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর ধারণাকে কাজে লাগিয়ে শ্রেণি বিভাজন এনে পাল্টে ফেলা হচ্ছে সামাজিক দৃশ্যপট। সহনশীলতা থাকছে না। ভার্চুয়াল মিডিয়ার প্রত্যক্ষ প্রভাব তো আছেই। এসব মিলিয়ে রফবহঃরঃু ঢ়ড়ষরঃরপং-এর মাধ্যমে ব্যক্তিস্বার্থকে প্রধানভাবে তুলে ধরা হচ্ছে অথচ বহুত্ববাদী দর্শনই মনীষীদের লক্ষ্য ছিল। সাম্প্রদায়িকতার বীজ ভারতবর্ষে এভাবেই প্রভাব বিস্তার করেছে বলে ব্যাখ্যা দেন সেমন্তী ঘোষ।

জহর সেন মজুমদার ‘এপার ওপার’ কনসেপ্টটিকেই সাম্প্রদায়িকতার একটি মানদ- হিশেবে দেখতে চেয়েছেন। বিভাজনের প্রচ- মানসিক যন্ত্রণা আছে এতে, তিনি মনে করেন। ভারতীয় ভূগোলে তিনি সাম্প্রদায়িকতার ব্যাখ্যা দিলেও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দিকটি এড়িয়ে গেছেন যা সাম্প্রদায়িকতার প্রধান শক্তি। তিনি তাঁর মতো বলেছেন এবং সেটি অবশ্যই তাঁর নিজস্ব অবস্থানকে তুলে ধরার জন্য। মাসুদুল হক অল্প কথায় আরাকান রাজ্যের ঐতিহাসিক ভূমিকায় আলাদাভাবে একে ভৌগোলিক সীমানায় নিয়ে যেভাবে সাহিত্যের ইতিহাস ব্যাখ্যা করা হয় সেখানে সাম্প্রদায়িক মনোভঙ্গি আছে বলে মনে করেন।

সঞ্চালক আহমেদ রেজা বৃটিশদের মাধ্যমে শুরু হওয়া সাম্প্রদায়িকতার চর্চা এখনও চলমান অবস্থার অবসান চেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, তিন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের লেখায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভূমিকা স্মরণ করেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গীতাঞ্জলি-তে সে চেতনা এনেছেন। তিনি দৃঢ়আশাবাদ ব্যক্ত করেন এ কথা বলে-‘আমি স্বপ্ন দেখি সেদিনের যেদিন সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন পড়বে না। ‘সাম্প্রদায়িকতার মতো বৈশ্বিক রাজনৈতিক সমস্যার অবসান সব রাষ্ট্রের চাওয়া উচিত। এর ভূগোল বিস্তৃত যাতে না হয় সেজন্য সংগ্রামী হতে হবে সব রাষ্ট্রকে।’

 

২.

ঢাকা লিট ফেস্টিভাল-২০১৬-র দ্বিতীয় দিনে আয়োজিত সাহিত্য আলোচনায় সাহিত্য সর্বজনীন হতে পারে কিনা এ বিষয়ক উন্মুক্ত আলোচনা হলো বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে। আলোচনায় সঞ্চালনা করেন অনুবাদক আন্দালিব রাশদী। অন্যান্য আলোচক ছিলেন লেখক ইমদাদুল হক মিলন, মঈনুল আহসান সাবের, ইমতিয়ার শামীম এবং সঙ্গীতা ব্যানার্জী। আন্দালিব রাশদীর মৃদু রসবোধ থেকে আলোচনাপর্ব শুরু হয়। তিনি কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করেছেন এর আগে। ইমদাদুল হক মিলন তাঁর ব্যক্তিক অনুভূতি থেকে সাহিত্যকে সবার মনে করেন না। তাঁর কাছে মনে হয়েছে সতেরো কোটি জনগণের এই দেশে যদি এক কোটিও বই পড়ত নিয়মিত তবে সবার কাছে বই পৌঁছাত। যেহেতু সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না তাই সাহিত্যকে সবার জন্য ভাবতে চান না তিনি। তাঁর কথায়Ñ ‘বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, মানিক, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, সতীনাথ ভাদুড়ী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ওয়ালীউল্লাহÑ আমরা কয়জন তাদের চিনি। শরৎচন্দ্রের দেবদাস সবার কাছে পৌঁছেছিল কিন্তু আমরা কি সবার কাছে পৌঁছাতে পেরেছি।’ তাঁর এ কথাগুলোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণে নিজের লেখাচর্চায় প্রেম বিষয়ক বই লিখে জনপ্রিয়তা অর্জনের কথা স্বীকার করেন। অথচ এটা তাঁকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করেনি। মঈনুল আহসান সাবের সাহিত্য সবার কিনা এ বিচার-বিশ্লেষণকে পাঠ্যপুস্তকের পদ্ধতির সাথে তুলনা করেছেন। যেখানে প্রশ্নোত্তর-পর্বের মতো কিছু বিষয় থাকে কি করলে কি হয় এ জাতীয়। তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলেছেন মহৎ সাহিত্যের সর্বজনগ্রাহ্যতা নিয়ে। বলেনÑ ‘হোমার বা মহাভারত সবার কাছে কি পৌঁছেছে অথচ এগুলো বহুলপঠিত।’ এক-এক পাঠক এক-এক পাঠকশ্রেণিকে লক্ষ্য করে লেখেন। সিনেমা যত লোকে দেখে গান দেখে তার থেকে বেশি এভাবে ভাবেন তিনি। তিনি আরও বলেছেন-‘এক শ্রেণির পাঠক বলেন সাহিত্য হবে নির্যাতিত মানুষের জন্য। তাহলে অন্যসব শ্রেণির কি হবে? যখন বিভিন্ন লেখক বিভিন্ন শ্রেণির বিভিন্ন কথা বলবে তখনই সাহিত্য অধিকাংশ মানুষের সাহিত্য হবে।’

ইমতিয়ার শামীম ‘কেন লিখি’ বিষয়ে বলতে গিয়ে বলেন, ‘লেখক তার নিজের জন্যই লেখেন এবং পরে তা জনগণের স¤পদ হয়। ‘সবার জন্য সাহিত্য’ বিষয়টা আইডিয়ালি ভালো তবে বাস্তবতা আলাদা হতে পারে’ এ মতামতটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল সবচেয়ে বেশি। সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় মৌখিক ও লিখিত সাহিত্যের কথা বলেন। মৌখিকের সীমানা নেই তাই এটা অনেকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ বেশি। লিখিত সাহিত্য সবসময় সেটি পারে না। তিনি চমৎকার একটি থিম ধরে বলেছেনÑ‘বুদ্ধিবৃত্তি নিয়ে যে সাহিত্য সে সাহিত্য সবার কাছে পৌঁছায় না কারণ অহমবোধ থাকে বেশি। মৌখিক সাহিত্য সহজতা থেকে সবার কাছে পৌঁছানোর সুযোগ থাকে। ‘তাঁর বিশ্বাস ‘সাহিত্য শুরু হয় ভালোবাসা থেকে।’ ব্যক্তিগত আইডিওলজি থেকে সবাই বলেছেন। আলোচকবৃন্দ প্রত্যক্ষভাবে ‘সাহিত্য সবার জন্য’ এটুকু টেকনিক্যালি বলেছেন। সাহিত্যকে সর্বজনীন হতে হবে বা হোক সেটি তাঁরা মনেপ্রাণে কামনা করেন তবে বাস্তবে সাহিত্য সবার কাছে পৌঁছায় না এ-কথা বলেন। বাস্তবসম্মত মন-মানসিকতা থেকে আলোচনাপর্বটি।

৩.

কবি চান কবিতা লিখতে। তাঁর কবি হয়ে ওঠার পথটি মসৃণ হয় না। সমাজে সংগ্রামী মানুষের একজন হয়ে কবিও তাঁর জীবনকে এগিয়ে নেন। শুরুটা কীভাবে হচ্ছে আর লক্ষ্যের মধ্যে কবিতা-ই কীভাবে দানা বেঁধে চূড়ান্ত কিছু হয়ে উঠছে সেটা বেশ দৃষ্টিনন্দন ঘটনা। কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর কবিজীবন বর্ণনায় ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’-এর দ্বিতীয় দিনে পড়ন্ত বিকেলকে মাতিয়ে তোলেন স্মৃতিচারণায়। এ-অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কবি শামীম রেজা। শামীম রেজা ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’ হয়েও নির্মলেন্দু গুণের  ‘কবি’ ও ‘প্রেমিক’ হয়ে ওঠার কথা জানতে চান দর্শকের একজন প্রতিনিধি হয়ে। কৈশোর থেকে যৌবনের দিনগুলোতে একজন কবি হয়ে ওঠার দুরন্ত দিনলিপি উপস্থিত দর্শককে আনন্দ দিয়েছে। তিনি যথেষ্ট রসবোধ থেকে কথা বলে গেছেন ধারাবাহিকভাবে। তার আগে সম্প্রতি সরকার থেকে বিশেষ প্রজ্ঞাপন যারা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন তাঁদের সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা বলা হবে। তিনি ছিলেন তখনকার ‘শব্দসৈনিক। তাই তাঁর নতুন পরিচয় মুক্তিযোদ্ধা কবি নির্মলেন্দু গুণ এবং এ পরিচয়ে তিনি গর্ববোধ করেন। কবি তাঁর ফেসবুক পোস্টে এ বিষয়টি সবাইকে জানিয়েছেন। তাঁর অনুভূতিতে বিশেষভাবে এসেছেÑ ‘একদিন কালের গর্ভে সব পরিচয়বিলীন হতে পারে কিন্তু স্বাধীন দেশের পতাকা যতদিন পতপত করে উড়বে আমার মুক্তিযোদ্ধা কবির পরিচয়টি গর্ব করে লোকজন জানবে।’ এরপর তিনি ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’-এর শুভ উদ্বোধন নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ভি.এস. নাইপলের মাধ্যমে হওয়াতে এবারের আয়োজনের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে মনে করেন। নিজের ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আমার ছেলেবেলা, আত্মকথা-৭১ এবং রক্তঝরা ৭৪Ñএ তিনটি বইয়ের কথা বলেন। বইগুলিতে তাঁর আত্মজীবনী লিপিবদ্ধ হয়েছে। একজন কবির কবিতাযাত্রা বিশেষ কারণ থেকে সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। উদাহরণস্বরূপ কবি শামসুর রাহমানের কথা বলেন। তিনি তাঁর অল্পবয়সী বোনের রোগে ভুগে মৃত্যুর পর একটি কবিতা লিখেছিলেন বোনকে নিয়ে। তাঁর অন্য ভাইরা কবিতা লেখেননি। তাঁর কবিতা লেখার আলাদা জায়গা বা প্রতিভা যে আছে সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। নির্মলেন্দু গুণ নিজের জীবনে আসেন ঐ পর¤পরা থেকেই।ম্যাক্সিম গোর্কির ছেলেবেলা তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। গুণ তাঁর মায়ের মৃত্যুর দিন মা তাঁকে ইশারা করেছিল কাছে বসার জন্য কিন্তু ফুটবল খেলার সময় পার হয়ে যাচ্ছে ভেবে খেলতে যান। মায়ের অসুস্থতা বা মৃত্যু বোঝার মতো অনুভূতি ছিল না তখন। মা মারা গেলে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। নতুন মা তাঁকে পছন্দ করতেন। তাঁর কাছেই লেখাপড়ার হাতেখড়ি। পাঁচালি শিখেছিলেন তখন যেগুলো কবিতার সাথে পরিচয় ঘটায়। তাঁর নিজের গ্রামে ‘বীরচরণ মঞ্চ’ তৈরি করেন ছেলেবেলার কবি আদর্শে। আর একজন যতীন চক্রবর্তী। উনার কাছে মৌখিক কবিতা লেখার বিদ্যা শেখেন। যতীন চক্রবর্তী টাকার বিনিময়ে কবিতা লিখে জীবিকা চালাতেন। হাতুড়ে ডাক্তার ছিল একজন তাঁর গ্রামে যে-লোকটি ঘরজামাই থাকতে চাইত জোর করে। তাকে তাড়াতে দুই পঙক্তির ছড়া লিখেছিলেন নির্মলেন্দু গুণ :

‘কচি পাঠা বৃদ্ধ মেষ

ভগল কবিরাজ ডাক্তার এষ।’

এ ছড়া তখন লোকমুখে জনপ্রিয় হয় এবং ডাক্তার এষ গ্রাম ছাড়ে। স্কুল শিক্ষক মণীন্দ্র রায় এক বৃষ্টির দিনে কবিতা লিখতে দিয়েছিলেন। সেদিন তিনি লেখেন :

‘আমি এখন পড়ি যে ভাই

বার হাঁটা স্কুলে

একে অন্যে থাকি হেথায়

ভাই বন্ধু বলে

এই স্কুলটি অবস্থিত কংস নদীর ধারে

আমাদের বাড়ি হইতে দেড় মাইল উত্তরে।’

 

শিক্ষক খুশি হন পড়ে। অন্যদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলে কবিতাটিতে মিথ্যে কিছু নেই। কবি শামীম রেজা যোগ করেনÑ‘কবিরা তাহলে সত্যদ্রষ্টা।’ ঢাকাকেন্দ্রিক ‘রংধনু’ পত্রিকায় কবিতা পাঠানোর সময় নির্মলেন্দু গুণ পাঠাগার ঘেঁটে ‘প্রবাসী’ পত্রিকা থেকে মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতা নিজের বলে চালাতে পাঠান। স¤পাদক তাঁকে চিঠি পাঠান এবং নিজের কবিতা পাঠাতে বলেন। গুণ বলেন, যে পত্রিকা মাইকেলের কবিতা ছাপে না আমার কবিতা ছাপবে? তাই ঐ পত্রিকার সাথে সব স¤পর্ক ছিন্ন করলাম। ‘তখন মঞ্চের সামনে দর্শকদের মাঝে হাসির রোল পড়ে। বিপ্রদাশ বড়–য়ার ‘শিশু’ পত্রিকার অফিসে ঐ স¤পাদকের সামনে পড়েছিলেন গুণ। তখন সম্মান বাঁচাতে বিপ্রদাশ বড়–য়াকে না জানাতে অনুরোধ করেন। ১৯৬১ সালে নেত্রকোণার ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকায় কবিতা ছাপা হয়। ১৯৬২-তে ম্যাট্রিক পাসের পরে তিনি আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হন। সেখানে ইংরেজি কবিতা জমা দেবার সুযোগ আসলে দ্বিতীয়বার মাইকেল মধুসূদনের কথা ভাবেন। দর্শককে হাসাতে তিনি যোগ করেনÑ ‘মাইকেল আমাকে বললেন, লেখো।’ ‘ঋঁঃঁৎব’ নামে একটি কবিতা জমা দেন এবং সেটি প্রকাশিত ও প্রশংসিত হয়। জুয়া খেলার কারণে এবং জুয়ার প্রবর্তক ছিলেন তাই হোস্টেল থেকে বের করে দেয়া হয় তাঁকে। ১৯৬৫ সালে সাপ্তাহিক জনতা পত্রিকায় একুশে ফেব্রুয়ারিতে ‘নজরুল স্মরণে’ নামে একটা কবিতা ছাপা হয়। বলতে বলতে সময় স্বল্পতার কারণে কবি শামীম রেজা নির্মলেন্দু গুণকে থামিয়ে দেন। কবি উপসংহার টানেন ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-র কথা স্মরণ করে। নামকরণে ‘অসমাপ্ত’ শব্দটিকে যথার্থ মনে করেন কারণ আত্মজীবনী ‘অসমাপ্ত’-ই হয়। নিজের কথাও তাই ‘অসমাপ্ত’ তাঁর। নির্মলেন্দু গুণের অসামান্য রসবোধে উপস্থিত দর্শক বিনোদিত হয়। সময় স্বল্পতা শেষ পর্যন্ত দর্শকমনে অতৃপ্তি এনেছে।

৪.

‘নারী’ প্রথমত পরিচিতি আর ‘নারীত্ব’ তার বৈশিষ্ট্য। যেমনটি বলতে গেলে মানুষ আগে তারপর মনুষ্যত্ব। এরকম ¯পর্শকাতর একটি বিষয় ‘নারী ও নারীত্ব’ নিয়ে ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’-এর দ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠিত হলো উন্মুক্ত আলোচনা। বাংলা একাডেমির কে কে  টি স্টেজ-এ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন উদিসা ইসলাম। অন্যান্য আলোচক ছিলেন লেখিকা নাসিমা আনিস, সঙ্গীতা ব্যানার্জী, পাপড়ি রহমান এবং সাদিয়া মাহজাবিন ইমাম। উদিসা ইসলাম বেশ আয়োজন করে কথা না বলে স্বাধীনভাবে কথা বলতে দেন আলোচকদের। তিনি নারীর অনেক পরিচিতির ফাঁকে সুনির্দিষ্ট একটা দিককে উদ্দেশ্য করে বলেন ‘নগর ও গ্রামের নারীর পার্থক্য বা নিজস্বতা কী, নগরের নারীর স্বরে আমরা আধুনিক নারীকে দেখতে চাই কিনা।’ সাদিয়া মাহজাবিন ইমাম বলেন-‘নারী ও নারীত্বের তফাতটাকে আমি বড় করেই দেখি। একটাতে আছে পরিচয় আর একটা ইগোর বিষয়। শহর বা গ্রাম নারী যেখানেই থাক নারী সৃজনশীল। গ্রামের নারী যখন ফসলের বীজের যতœ নেয় তখন ফসল ফলানো কৃষকের পাশাপাশি তারও অবদান থাকে। ফসল ফলানো যদি সৃজনশীলতা হয় তবে নারী সেখানে সৃজনশীল।’ সাদিয়া মূলত নারীত্বকে সৃজনশীল সত্তার মাধ্যমে দেখেন। পাপড়ি রহমান ‘নারীত্ব’-কে লাইফস্টাইলের দিক থেকে ব্যাখ্যা করেন। নারী যেভাবে পোশাক পরে তাতে সৌন্দর্য থাকে, যেভাবে কথা বলে তাতে সৌন্দর্য থাকে, নারী ঘরে-বাইরে সংগ্রাম করে সেখানে আলাদা তাৎপর্য আছে এবং এগুলো তাঁর মতে ‘নারীত্ব’। উদিসা ইসলাম নগর ও গ্রামীণ নারীর বিভাজন নিয়ে জানতে চাইলে পাপড়ি রহমান যুৎসই ব্যাখ্যা দেনÑ নগরের নারীর আধুনিক সুযোগ-সুবিধা অনেক। কর্মজীবী নারীকে এখানে চাপে থাকতে হয়। নিজে চাকরি করা, ঘরের কাজ, ছেলেমেয়ের দেখাশোনা করা এসব সামলাতে হয়। গ্রামের নারীর সুযোগ-সুবিধা বেশি থাকে না তবুও তারা কাজ করে নিরন্তর। গ্রামের নারীকে গ্রামীণ রাজনীতির শিকার হতে হয়। মোটাদাগে উভয়ই যোদ্ধা। ‘পুরুষের সাথে নারীর যোগাযোগ যখন লেখার মাধ্যমে হয়Ñ পুরুষ নারীকে কতটুকু তুলে আনতে পারে এ বিষয়ে জানতে চান উদিসা ইসলাম। পাপড়ি রহমান সরাসরি বলেনÑ পুরুষ নারীকে আর্টিফিসিয়াল করে তুলে ধরে। নারীই নারীকে তুলে ধরতে পারে। ‘সঙ্গীতা ব্যানার্জী পাপড়ি রহমানকে খ-ন করেন-‘শ্রেষ্ঠ রচনাগুলোতে পুরুষ লেখকেরা নারীকে ভালোভাবেই এঁকেছে।’ নাসিমা আনিসের বক্তব্য এক্ষেত্রে শক্তিশালীÑ মহৎ লেখকরা পারেন নারীকে ফুটিয়ে তুলতে। ‘শরৎ সাহিত্যে তিনি নারীর অসাধারণ উপস্থাপনের কথা বলেন। বলতে বলতে লেখিকা নাসরিন জাহানের উদাহরণ দেন যিনি একসময় নারীদের পাতায় লিখতেন না পুরুষতান্ত্রিক চাপের কারণে। সাদিয়া মাহজাবিন ইমাম নারী-পুরুষ দূরত্বকে স্বীকার করেই বলেন, পুরুষ নারীকে ক্ষেত্রবিশেষে তুলে ধরতে পারে। নাসিমা আনিস নারীকে দেখার চোখ থেকে নিজের কাজের কথা বলেন। তিনি হিজড়া সম্প্রদায়কে নিয়ে তাঁর  মাহিনীর থান উপন্যাসের সাথে পরিচিত করান। মূলস্রোতের সাথে তাদের জীবনযাপনের অধিকার বা সরকারি পুনর্বাসন জরুরি মনে করেন। উদিসা ইসলামের সূক্ষ্ম একটা জায়গা ছিল লেখকসত্তা ও নারীসত্তার মেলবন্ধন খোঁজা। সঙ্গীতা ব্যানার্জী পুরুষের শক্তির বিপরীতে নারীর সংগ্রাম তুলে ধরেন। নারী লিখলে তার দেখার চোখে মনুষ্যত্ব থাকে কিনা সেটাই নারীসত্তাকে বড় করে। মা হওয়া বা জৈবিক বিষয় পূরণ করা নারীকে পিছিয়ে দেয়। তিনি আরও একশোবার জন্মালে নারী হয়েই জন্মাতে চান। নারী ও নারীত্বের পরিধি নিয়ে আলোচনাটি মিশ্র ছিল। মতবিরোধ থাকলেও নারী ও নারীত্ব যে আলাদাভাবে বিকশিত হয় এক্ষেত্রে সবার অবস্থান ঠিক ছিল। তবে নারীর সীমাবদ্ধতা নিয়ে কেউ বলেননি।

একজন বেগম রোকেয়া লেখা ও প্রতিষ্ঠানের সেবার মাধ্যমে সমাজ- সংস্কারে যে অবদান রেখেছেন সেভাবে নারী থেকে নারীত্বের বিকাশকে ইতিহাসে মিশে যাবার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসেনি। সব মিলিয়ে নারী ও নারীত্বের পরিধিতে জরুরি কিছু বিষয়ে আলো ফেলা হয়নি।

৫.

সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রের রূপায়ণে বাংলাদেশকে তুলে ধরার অগ্রণী ভূমিকায় যে চলচ্চিত্রগুলো অবদান রেখেছে তার মধ্যে অন্যতম সূর্যদীঘল বাড়ি। ঢাকা লিট ফেস্ট-এর শেষ দিনে দেশের চলচ্চিত্রে মাইলফলক গড়া এ চলচ্চিত্রের গল্প শোনালেন এর দুজন নির্মাতার একজন মসিহউদ্দিন শাকের। চলচ্চিত্রটির অন্য একজন নির্মাতা ছিলেন শেখ নিয়ামত আলী। সূর্যদীঘল বাড়ি চলচ্চিত্রের পর্দার আড়ালের গল্পে বেরিয়ে আসে নির্মাতার স্বপ্ন ও বাস্তবতার চমৎকার মেলবন্ধন। মসিহউদ্দিন শাকের ধারাবাহিকভাবে বলতে থাকেন তাঁর কথা। শাকের বলেন-‘আমার কাল্পনিক প্রস্তুতি ছিল চলচ্চিত্রে আসার।’ তাঁর চলচ্চিত্রের প্রতি আসক্তি ছিল। প্রচুর দেখতেন। গল্পের বই যখন পড়তেন তার ভেতর রূপালী পর্দার একটা আভাস পেতেন। ১৯৫৭ সালে তাঁর এক আত্মীয় পথের পাঁচালী উপন্যাসটা তাঁকে পড়তে দেন। উপন্যাসটি পড়ে তিনি চলচ্চিত্র করার স্বপ্ন দেখেন কিন্তু পরে জানতে পারেন সত্যজিৎ রায় তাঁর দুই বছর আগে ১৯৫৫-তে চলচ্চিত্র করেছেন এবং বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছে। পরে তিনি সূর্যদীঘল বাড়ি  উপন্যাসটি হাতে পান। তখন এ উপন্যাসকে চলচ্চিত্র করার কথা ভাবেন। তখন উত্তম-সূচিত্রার চলচ্চিত্র দেখার নেশা ছিল কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের অপুর সংসার দেখার পর তাঁর মনে হয়েছিল-‘চলচ্চিত্রের ভাষা এমনই হওয়া উচিত।’ সেসময় আমাদের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট একজন কিংবদন্তি মো. খসরুর সাথে পরিচয় হয়। তাঁর মাধ্যমে তৎকালীন ‘পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটি’-তে যোগ দেন। সেখানে দেশ-বিদেশের নানা চলচ্চিত্র দেখার সুবাদে তিনি ধারণা পান বিস্তৃতভাবে। প্রাচীন মানুষ গুহার দেয়ালে যেভাবে শিকারের ছবি আঁকত বা লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি যেভাবে ছবি আঁকেন সেগুলোর মধ্যে ‘ঢ়বৎংরংঃবহপব ড়ভ ারংরড়হ’ আছে। এর মাধ্যমে চলমানতা কাজ করে। এভাবে চলমান অনেক ছবি জোড়া দিয়ে হয় ‘চলচ্চিত্র’। পড়াশোনা বা জানাশোনার চর্চার সময়টাতেই মসিহউদ্দিন শাকের সূর্যদীঘল বাড়ি-র চিত্রনাট্য তৈরি করেন। লেখক আবু ইসহাককে চিঠি দেন অনুমতির জন্য। জানা যায় সত্যজিৎ রায় প্রথমে আগ্রহী হন এ-চলচ্চিত্রটি নির্মাণের জন্য। পরে বাংলাদেশের পরিবেশগত সার্বিক অবস্থা স¤পর্কে তাঁর জানাশোনার ঘাটতি আছে বলে নির্মাণ করতে চাননি। মূলত সেটি তাঁর বিনয় ছিল। এরপর আবু ইসহাক অনুমতি দেন মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলীকে। প্রথম নায়িকা নির্বাচিত হন শর্মিলী আহমেদ। তাঁর স্বামীর শর্মিলীকে খোলামেলা অভিনয়ে অভিযোগের কারণে নতুন নায়িকা নিতে হয়েছিল। তাঁর চলচ্চিত্রের গল্প শোনাতে শোনাতে বর্তমান সময়ের চলচ্চিত্রের জন্য পরামর্শ দিতে ভোলেননি মসিহউদ্দিন শাকের। আজকের চলচ্চিত্রে লড়াইয়ের ধরন পাল্টে গেছে। পয়সা আছে কিন্তু সঠিক ব্যবহার নেই, বলেন তিনি। গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রস্তাবনা দেনÑ যারা ভালো চলচ্চিত্র করতে চায় তাদেরকে নিয়মিত সরকারিভাবে প্রযোজনা করা হোক। চলচ্চিত্রকে জাতীয়করণের সময় এসেছে। মুভমেন্ট করে হলেও করা উচিত। মসিহউদ্দিন শাকের-এর কথাবার্তায় সূর্যদীঘল বাড়ি চলচ্চিত্রের গল্প একটি স্বতন্ত্র ভাষা হিশেবে সংগ্রামী জীবনকে তুলে ধরেছে। যে সংগ্রামটি চলচ্চিত্রে দেখানোর যেমন বিষয় তেমনি পর্দার আড়ালেরও বিষয়।

 

৬.

যত্রতত্র বাজারি অনুবাদে ভরে যাচ্ছে বইয়ের মার্কেট। পাঠক স্বস্তি পাচ্ছে না। ভালো অনুবাদ কেমন হতে হবে বা সৎ অনুবাদ কী এ-ধরনের বিষয় নিয়ে ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’-এর শেষ দিনে হয়ে গেল ‘অনুবাদে পূর্ব-পশ্চিম’ নামে জরুরি একটি আলোচনা। শামসাদ মোর্তজার সঞ্চালনায় আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাসুদ আহমেদ এবং গল্পকার ও প্রাবন্ধিক হামীম কামরুল হক। অনুবাদের মতো জরুরি বিষয়টি বিশ্বসাহিত্যের সাথে স¤পর্ক স্থাপনের সেতুবন্ধ। সেক্ষেত্রে অনুবাদকে বিশ্বস্ত হতে হবে। মূলের প্রতি সুবিচার করে অনুবাদ করতে হবে। শামসাদ মোর্তজার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ ছিলÑ‘অনুবাদ কি শুধুই ভাষান্তর নাকি সংস্কৃতির যোগ আছে?’ হামীম কামরুল হক বলেছেন গোড়া থেকেÑ ‘তিন হাত ঘুরে অনুবাদ করা হয়। লেখকের নিজের ভাষা, ইংরেজি ভাষা তারপর বাংলা। এজন্য লেখকের সংস্কৃতি জানাটা অবশ্যই সর্বপ্রথম লক্ষ্য থাকতে হবে। মানবেন্দ্র ব্যানার্জী যেভাবে পরিশ্রমী ছিলেন সেটা যেমন প্রশংসনীয় পাশাপাশি তরুণ কুমার ঘটক নামে একজন মূল ¯প্যানিশ থেকে অনুবাদ করেছেন। রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী লাতিন আমেরিকার অনুবাদে ¯¬্যাং বাদ রেখে করেছেন কারণ তাঁর কাছে মনে হয়েছে ঐ ¯¬্যাং-টির যথার্থ শব্দ বাংলায় পাননি। সর্বোপরি অনুবাদ যখন কেউ করবে সেটার প্রতি ভালোবাসা থাকতে হবে। শামসাদ জানতে চানÑ ‘সততার জায়গা থেকে অনুবাদ হচ্ছে কিনা। ঘরের বৌ কিন্তু সবসময় লক্ষ্মী তাই যতেœর হয়। অন্যেরটা আলাদা। হামীম কামরুল প্রমথ চৌধুরীর কথা স্মরণ করে বলেনÑ ‘তাঁর কাছে অনুবাদের অর্থ ছিল পরের জিনিসকে নিজের করে নেয়া। তাই পরেরটাকে ভালোবাসতে হবে নিজের মতো করেই। আইজ্যাক সিঙ্গার নিজের মাতৃভাষায় অনুবাদ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। শামসাদ মোর্তজা পিওর ল্যাংগুয়েজ জানা অনুবাদের জন্য দরকারি কিনা জানতে চান কারণ অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তু অনুভব করতে হয়। হামীম কামরুল মোহিতলাল মজুমদারের অস্কার ওয়াইল্ডের রচনা অনুবাদ করার কথা বলেন। মোহিতলাল বড় বাক্যকে ছোট ছোট করে অনুবাদ করেছেন। সততা থেকেই অনুবাদ করতে হবে। কোন রচনা অনুবাদ করা উচিত বা কোন দশটি গল্প অনুবাদ করলে বাংলাদেশকে প্রেজেন্ট করা যায় এ-ধরনের সিলেকশন জরুরি। কিন্তু ‘সিলেকশন পলিটিক্স’ বলে একটা বিষয় আছে অনুবাদেÑ সেটার জন্য অনুবাদ ভালো হচ্ছে না বলে মনে করেন সঞ্চালক। মাসুদ আহমেদ ক্রমাগত উদাহরণ টেনে ব্যাখ্যা করেছেন। অখ্যাত এক অনুবাদক রবীন্দ্রনাথের ‘সুভা’ অনুবাদ করে ইংল্যান্ডে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদ এর  জেছনা ও জননীর গল্প অনুবাদ করেছেন এক ব্রিটিশ অনুবাদক। অবশ্যই ভালো রচনা কোনটি সেটি আগে সিলেকশন করতে হবে। বিশ্ব যদি গ্লোবাল ভিলেজ হয় তবে অনুবাদই তার একমাত্র উপাদানÑ সব ভাষা-সংস্কৃতিকে জানার এবং অবশ্যই ভালো লেখার ভালো অনুবাদ। মাসুদ আহমেদের অল্প কথায় অনেক কথা উঠে আসে। সঞ্চালক অনুবাদের সততা কিভাবে রক্ষা করতে হয়  সেসূত্রে নিয়ম বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের কিছু শর্তাবলি বলেনÑ খুব ধীরগতিতে করতে হবে, কবিতা হলে কবিতার স্বর ঠিক থাকতে হবে, রিদম থাকতে হবে। আলোচকরা সরকারিভাবে অনুবাদচর্চায় পৃষ্ঠপোষকতার কথা জোর দিয়ে বলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বিশেষ করে ইংরেজি শিক্ষকদের ভূমিকা রাখতে হবে বলে একমত হন সবাই। অনুবাদকে ভালোবেসে সৎ অনুবাদ হলে পরবর্তী প্রজন্ম বিপুল সম্ভবানায় অনুবাদশিল্পে ক্যারিয়ার গড়তে পারবেন এ আশাবাদও ব্যক্ত করেন তারা

৭.

কি বললে কি হবে বা কি বলা দরকারি নতুবা কি বলব না এই ভারসাম্য রেখে বাক স্বাধীনতাকে ব্যবহার করতে হবে। ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’-এর শেষদিনে ‘রুদ্ধস্বর : বলতে কেন মানা’ শিরোনামে আলোচনাপর্ব অনুষ্ঠিত হয় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে। একুশে টিভির নিয়মিত টক শো সঞ্চালক হারুন উর রশীদ ছিলেন। অতিথি ছিলেন যমুনা টিভির ক্রাইম রিপোর্টার প্রভাষ আমিন, পেন বাংলাদেশের প্রধান সৈয়দা আইরিন জামান, ঢাবির নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রাশেদা রওনক খান এবং ব্লগার আরিফ জেবতিক। সংবিধানে বলতে মানা নেই কিন্তু কতটুকু বলা উচিত তার সীমানা ঠিক করা আছে। হারুন উর রশীদ সংবিধান থেকেই শুরু করেন। প্রভাষ আমিন যোগ করেনÑ ‘দেশ সংবিধান অনুযায়ী স¤পূর্ণভাবে চলে না। চললে দেশটা স্বর্গ হত। আমি বলতে পারি তবে খেয়াল করতে হবে আমার বক্তব্য কাউকে আহত করছে কিনা।’ আরিফ জেবতিক সংবিধানের ৫৭ ধারার কথা বলেন। কথার মাধ্যমে কাউকে উস্কানি দিলে আইনে সাজা আছে। রাষ্ট্র বলার ক্ষেত্রে সেন্সরশিপ করে দিয়েছে। সৈয়দা আইরিন জামান ভার্চুয়াল জগৎকে দোষারোপ করেন। একজনের ফেসবুক স্ট্যাটাসে অন্যজন কৌশলে কিছু বলে লোকজনকে ক্ষেপিয়ে দিলে যার একাউন্ট সে কিছু জানেই না এটাও ঘটছে। নাসিরনগরের ঘটনা ভার্চুয়ালি ছড়িয়েছে । রাশেদা রওনক খান বিকল্প প্রতিবাদের কথা বলেন। যেখানে কথা না বলে কাজের মাধ্যমে প্রতিবাদ করা যায়। গৃহকর্মী যেমন কথা না বলে জিনিসপত্র নষ্ট করে বুঝিয়ে দেয় তার রাগ সেরকম। তাঁর ভাষায়Ñ কলম হাতে না থাকলেও প্রতিবাদ করা যায়। বডি ল্যাংগুয়েজ হতে পারে বড় প্রতিবাদ। সাঁওতালরা যেমন ত্রাণ গ্রহণ না করে তাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে। হারুন উর রশীদ রসিকতা করে বলেন, ‘বলা এত দরকার কেন?’ আরিফ জেবতিক সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেন-‘আজকের থেকে উন্নত সমাজ পরবর্তী প্রজন্মকে দিতে বলাটা দরকার। ‘প্রভাষ আমিন ঘরে-বাইরে এক নীতি চান। বাইরে বলার স্বাধীনতা থাকবে আর ঘরে ৫৭ ধারা চলবে তা হবে না। আইরিন জামান তার  ‘পেন বাংলাদেশ’-এর কার্যক্রমের কথা জানান। ধর্ম নিয়ে রাষ্ট্রের বক্তব্যে উপস্থাপক ‘আধ্যত্মিক রাষ্ট্র’ হয়ে যাচ্ছে বলে রসিকতা করেন। ভোটের জন্য ক্ষমতাসীনদের চালাকির সমালোচনা করা হয়। উপস্থিত দর্শক প্রশ্নোত্তর-পর্বে সাংবাদিকতার সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা সরকারের সমালোচনার সুযোগ নিয়ে নিজেদের দায় এড়ানোর অভিযোগ তোলেন। এমনকি ব্লগার ইস্যুতে ব্লগারদের আলোচিত হবার আয়োজন করে ভিসা পাবার লোভকে তুলে ধরেন কেউ কেউ। আলোচকরা টেকনিক্যালি সব প্রশ্নের জবাব দেন। বাক-স্বাধীনতায় সবাই বলতে চায় তবে ভারসাম্য রেখে বলতে হবে যাতে ঢালাও না হয়।

 

৮.

মুক্তিযুদ্ধ নয় মাসে শেষ হলেও যুদ্ধটা এখনও চলছে মানসিকভাবে। সেই সংগ্রামের রেশ আজও দেশে নানাভাবে ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায়। নয় মাসে শেষ হওয়া মুক্তিযুদ্ধ আমরা বুঝতে পারিনি বলেই কি আজও তার পরীক্ষা দিতে হচ্ছে! এ ধরনের সূক্ষ্ম কথাবার্তার আয়োজনে ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’-এর শেষদিনে ‘যুদ্ধ শেষের যুদ্ধ’ শিরোনামের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উপস্থাপনা করেছেন নবনীতা চৌধুরী। অতিথি আলোচক ছিলেন ফারুক ওয়াসিফ, আহসান আকবর, আকিমুন রহমান ও মাহবুব আজিজ। নবনীতা শুরু করেন-‘যুদ্ধটা চলছে কিনা এখনও?’ ফারুক ওয়াসিফের বক্তব্য-‘৪৬-এর দাঙ্গা, ৪৭-এর দেশভাগ, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ সব স্মৃতি তাড়া করে একালে এসেও। আজকের নাসিরনগর, রোহিঙ্গা দমন সবই যুদ্ধের মধ্যে পড়ে। প্যারালালি চলছে যুদ্ধটা।’ আহসান আকবরের কথায় আসেÑ‘যুদ্ধটা দিন দিন বড় হচ্ছে। ব্লগার হত্যা, হলি বেকারির জঙ্গি হামলা, নাসিরনগর, সাঁওতাল আক্রমণ এসব বড় যুদ্ধকে মনে করাচ্ছে। ‘নবনীতা প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে নারীবাদী দৃষ্টিতে যুদ্ধটা কেমন জানতে চান আকিমুন রহমানের কাছে।তিনি শুধু নারীবাদী যুদ্ধ নিয়ে বলতে রাজি না তাই সার্বিক অবস্থা তুলে ধরতে চলে যান দেশব্যাপী পরিবার, অফিসপাড়ার দিকে। পরিবারে শিশুরা জাতীয় সংগীত জানে না। অফিসে কলিগরা বাংলা না পারাকে ফ্যাশন মনে করে। ইংরেজি যে খুব ভালো জানে তাও না, যতটুকু জানে সেটাই স¤পত্তি মনে করে। যুদ্ধটা যে মননগত সেটাই বড় করে দেখেন তিনি। মাহবুব আজিজ মোটাদাগে নিজের মতো করে ইতিহাস ব্যাখ্যার পর একটা বড় দিকে যানÑ ‘ধনী ও দরিদ্র দুটো ধর্ম আছে বাকিগুলো সব বানানো।’ এ পয়েন্টে এসে নবনীতা প্রশ্নটা বড় করেনÑ ‘সচেতন মানুষও শ্রেণিবিভাজন করে কিনা বা ধর্ম পালনের জায়গায় শ্রেণিমুক্ত কিনা। ‘ফারুক ওয়াসিফ বলেনÑ ‘ঘটনা ঘটে কিন্তু লেবেল দিয়ে দেয়া হয়। সাঁওতাল, বাঁশখালি, নাসিরনগর সবখানে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। সবারই শাস্তি দরকার কারণ হত্যা হয়েছে কিন্তু আমরা ভিন্ন ভিন্ন নামে সংজ্ঞায়ন করছি। হেজেমনি চলছে। রাষ্ট্র তো ক্রসফায়ার দিয়ে বলে দিচ্ছে যুদ্ধ এভাবে করতে হয়। ‘মাহবুব আজিজ ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে সংবিধানের দ্বান্দ্বিক অবস্থান তুলে ধরেন। নবনীতা নতুন বিষয় নিয়ে বলেনÑ ‘লেখকরা যে আদর্শ সমাজের কথা বলেন, সেটি প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাতে বাধা আছে কিনা।’ আকিমুন রহমান একবাক্যে প্রথমে মেনে নেনÑ ‘আছে। তারপর ব্যাখ্যাও দেন যুৎসইÑ গ্রামের মানুষের সংগ্রাম পত্রিকায় যেভাবে আসে সাহিত্যে এখন আসে না। কাঁচামরিচের দাম প্রগতিশীলরা জানে না, প্রান্তিকরা জানে। লেখকরা আধিপত্যবাদী মানসিকতার কিনা নবনীতা চৌধুরী এমন শক্ত প্রশ্নে ফারুক ওয়াসিফ ‘সেকুলারিজম’-কে ‘মানবকেন্দ্রিক’ বলতে চান। তিনি মনে করেন বুদ্ধিজীবীরা নিজের মতো আলোকিত মানুষ ভাবে নিজেকে কিন্তু প্রান্তিক মানুষের সাথে তার যোগাযোগ থাকে না। শেষের দিকে ‘বাঙালি মুসলমান’-এর আইডেনটিটি নিয়ে তর্ক হয় মঞ্চে। যে সমাধান আহমদ ছফা দিয়েছেন সেটি নতুন করে উত্থাপন আনকোরা লেগেছে। উপস্থাপিকা আশাবাদী হতে চেয়েছেন শেষ পর্যন্ত। ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’ বাংলা একাডেমিতে হওয়ায় বা বড় কোনো কর্পোরেট জায়গায় না হওয়ায় সিভিল সোসাইটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে বলে মনে করেন আলোচকরা। টিভি টক শো থেকে বেরিয়ে একটি গঠনমূলক আলোচনায় দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে মানসিকভাবে চলতে থাকা যুদ্ধই প্রধান বাস্তবতা প্রমাণিত হয়েছে। ঢাকা লিট ফেস্ট-এর গুরুত্ব এখানেই এ আয়োজনটি বৈশ্বিক সাহিত্য ও সমকাল নিয়ে খোঁজখবরের একটা বড় সুযোগ করে দিয়েছে। আগামী দিনেও এ যাত্রা অব্যাহত থাকুক। তৈরি হোক দেশীয় সাহিত্য- সংস্কৃতির সাথে বৈশ্বিক মেলবন্ধন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares