নাটক- মর্ষকাম থিয়েটার আর্ট ইউনিটের প্রযোজনা : অপূর্ব কুণ্ডু

নাটক

মর্ষকাম

থিয়েটার আর্ট ইউনিটের প্রযোজনা

অপূর্ব কুণ্ডু

জা র্মান চলচ্চিত্র রান রোলা রান কমবেশি বাংলাদেশের দর্শকদের অনেকেরই দেখা। অফিসের অর্থ হঠাৎ করে হারিয়ে ফেলায় এক প্রেমিক যুবকের চাকরিও যাবে আবার কারাগারেও যেতে হবে। এমনই মুহূর্তে হারানো অর্থের ঘাটতি পুষিয়ে দিতে এগিয়ে আসে প্রেমিক যুবকটির প্রেয়সী যুবতী রোলা। নিজের জীবন বাজি রেখে কখনও কর্পোরেট বাবার কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে, কখনও জুয়ার টেবিলে নিজেকে বন্ধক রেখে অথবা ব্যাংক ডাকাতি করে অর্থাৎ মোট তিনভাবে টাকা সংগ্রহ করে রোলা তার প্রেমিককে বাঁচাতে। রোলার এই বারংবার ঝুঁকি এবং আত্মত্যাগ মূলত প্রেমিক মানুষটিকে সুরক্ষা দিতে। অপরদিকে মি. এক্স নামে সা¤্রাজ্যবাদের প্রতিভূ তিন তিনটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাধীন সরকারের কাঁধে ভর করে। উদ্দেশ্য, স্বাধীন রাষ্ট্রকে সা¤্রাজ্যবাদের দাবানলে গ্রাস করে নিজেদের স্বার্থ বৃদ্ধি করে চলা এবং সফলভাবে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলির অস্তিত্ব বিলীন করে দেওয়া। সা¤্রাজ্যবাদী শক্তির চাপে আত্মনিগ্রহে বাধ্য হওয়া রাষ্ট্রের মর্মস্পর্শী নাটক মর্ষকাম। ঢাকার মঞ্চে নাট্যদল থিয়েটার আর্ট ইউনিট প্রযোজিত, বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাট্যজন এস এম সোলায়মান ও অভিনেত্রী রোকেয়া রফিক বেবী-তনয়া আনিকা মাহিন একা রচিত, রোকেয়া রফিক বেবী নির্দেশিত, দলের ১৯তম প্রযোজনা নাটক মর্ষকাম-এর উদ্বোধনী মঞ্চায়ন হলো গত ১ নভেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায়।

জগতের নাট্যশালায় যত মানুষ তত চরিত্র। কিন্তু মর্ষকাম নাটকে একই দ্বান্দ্বিকতা নিয়ে তিন ভূখ-ের তিন অণু নাটক মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নাটক। নাটকীয়তায় ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু চরিত্ররা সব একই অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট, অর্থমন্ত্রী, সচিব, জেনারেল  ও মিস্টার এক্স। মিস্টার এক্স কখনও একটি দেশের রানিং সরকারকে টিকে থাকতে বল প্রয়োগ করাকে উৎসাহিত করে যদিও ঐ রানিং সরকারের বিদ্রোহীদের আবার নিজেরাই আশ্রয় প্রশ্রয়  প্রশিক্ষণ দেয়। মিস্টার এক্স আবার কখনও একটি দেশে প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটিয়ে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখায়, মিত্রবাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করে সুরক্ষার দেওয়াল গড়ায় কিন্তু বিনিময়ে বন্দরে ঘাঁটি গড়ে নেয়। মিস্টার এক্স আবার  কখনও তেলের খনিকে আয়ত্ত করতে ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্রর মধ্যে যুদ্ধ বাঁধায়। ফলে দিন শেষে মিস্টার এক্সদের জয় হয় আর টালমাটালে টলে যাওয়া ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলির অভ্যন্তরে লাশের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হয় । আর সেখানেই শেষ হয় আনিকা মাহিন একা’র নাটক মর্ষকাম।

মর্ষকাম নাটকে নাট্যকার আনিকা মাহিন একা’র পররাষ্ট্রনীতিজ্ঞান যথেষ্ট, টুইস্ট সংলাপ রচনায় বলিষ্ঠ, ভিন্ন কিছু করার পরিশ্রম করতে নমনীয় তবুও কথা থাকে। ১৯৮৫ সালেই এস এম সোলায়মান ও ম. সাইফুল আলম চৌধুরীর রূপান্তরে জার্মান নাট্যকার জুলিয়াস হে রচিত হর্স রূপান্তরিত হয়ে জামিল আহমেদের নির্দেশনায় মঞ্চে এল ঘোড়া এল শহরে। ঘোড়ারূপী মধ্যপ্রাচ্য সাম্রাজাবাদ আর পঙ্খীরাজ রূপী আমেরিকান সা¤্রাজ্যবাদ বাংলা ভূখণ্ডে কি করতে পারে সে সবই তো জানা। তবে মর্ষকাম কেন? বাংলার পরিবর্তে অন্য ভূখ-ে বলে? অবশ্য আনিকা মাহিন একা’র নতুন একটা ইন্টারপ্রিটেশান ছিল তার রচিত নাটকে কিন্তু সেটা মঞ্চে আসেনি। তা হলো মিস্টার এক্সদেরও পতন হবে একদিন ভাবনা। যে কারণে নাট্যকার গানের কথায় সমাপ্তিক্ষণে লিখছেন :

তুমি বলতেই পারো আমি তরুণ

বলতেই পারো জানি না আমি কিছু

কিন্তু তবু একটা কথা জানি, যদিও তোমার থেকে নবীন আমি।

স্বয়ং যিশুও ক্ষমা করবে না তোমার পাপকে …

খুব শীঘ্রই মৃত্যু হবে তোমার

সেই ফিকে দুপুরে তোমার শবযাত্রায় শামিল হবো আমি।

 

২০১৬-তে দাঁড়িয়ে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কখন কি করতে বসে ভাবনার সমাধান টানতে পারছে না, যখন বড় বড় মনোবিদ, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকেও প্রেসিডেন্ট হয়ে প্রমাণ দিতে হচ্ছে তিনি জন্মসূত্রে আমেরিকান, পুতিনের হিমশীতল চাহনি যখন থমকে দিচ্ছে অগ্রবর্তী আগ্রাসন, তখন বোঝা যায় মিস্টার এক্সদের আয়ু ফুরাল। নাট্যকারের দর্শন এই না যে, মিস্টার এক্সদের আধিপত্যকে দেখিয়ে হত্যার মিছিলকে দেখিয়ে চলা (প্রযোজনা বিবেচ্য) বরং মৃত্যুর মিছিলে মিস্টার এক্সরাও হবে শামিল অতএব এখনও সময় থাকতে শুধরাওÑ এটাই একা’র দর্শন। কিন্তু সময়টা যেহেতু নির্দেশকদেরÑ ফলে তারা নাট্যকারদের নাটক রাখবেন না (অবশ্য ম্যাকাব্রে অপেক্ষা মর্ষকাম নাটকে নির্দেশক রোকেয়া রফিক বেবী প্রায় ৯০ শতাংশ পাণ্ডুলিপি অক্ষুণ্ন রেখেছেন), অভিনেতা- অভিনেত্রীদের মঞ্চে মুহূর্তের বেশি দাঁড়াতেই দেবেন না, নাটকের নির্দেশনা দিতে এসে যাদুর সফল প্রদর্শনী করে যাবেন। ফলে আর্জেন্টিনার মতো হয়ে পঁচাশি মিনিট পায়ে বল রাখলাম কিন্তু গোল দিলাম না তাই হারলাম বলে সান্ত¦না খুঁজে নেওয়াই শ্রেয়। নাট্যকার আনিকা মাহিন একাকে বুঝতে হবে, নাটকের নামকরণ মর্ষকাম লিখে দর্শকদের যতটা মানসিক দৌড় করালেন, পুরো প্রযোজনা শেষেও আত্মনিগ্রহ নাকি আত্মপীড়ন অথবা বাধ্যকরণ- কি যে বুঝালেন তা বোঝা গেল না, তাতেই স্পষ্ট শুধু নিজেকে ভাবলে চলে না, অপরকে নিয়েও ভাবতে হয়। একজন নাট্যকার পাথরের মতো শক্ত বিষয়কে তরমুজের মতো নরম করে পরিবেশন করেন, যেভাবে এসএম সোলায়মান মঞ্চস্থ করেছিলেন কোর্টমার্শাল কিংবা ইংগিত অথবা এই দেশে এই বেশে। নির্দেশক যদি নাট্যকারকে না দেখেন, নাট্যকার যদি অভিনেতা- অভিনেত্রীদের না দেখেন, অভিনেতা- অভিনেত্রী-কলাকুশলী সকলে মিলে যদি দর্শকদের না দেখেন তবে নিশ্চয়ই একদিন যোগ্য মানুষ যোগ্য রঙ্গমঞ্চে জায়গা করে নেবে আর তখন অনেকের মতো এগিয়ে থেকেও পিছিয়ে পড়া মানুষদের সান্ত¡নায় এগিয়ে আসবেন এস এম সোলায়মান তাঁর মরমীয় সাধনায় :

সেই তারাটিকে খুঁজে খুঁজে ফেরা

সেই তো আমার খোঁজা

কোনো একদিন পৃথিবীও হবে সুন্দরতম

শুধু একটি মানুষ একা।

 

একা না বরং একদল বলিষ্ঠ অভিনয় শিল্পী আর কলাকুশলী নিয়ে মঞ্চনির্দেশনায় নির্দেশক রোকেয়া রফিক বেবী। তবে দুঃখের কথা, যাদের মাথায় চুল কম তাদের পকেটে যেমন সব সময় চিরুনি থাকে ঠিক তেমনই পরিণত বয়সে কিছু মানুষের আত্মবিস্মৃতি হয়। অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন যদি অভিনয় ছেড়ে এখন ক্লান্তিকর পরিচালনায় আসেন তবে সেক্ষেত্রে আত্মবিস্মৃতির সাদৃশ্য মিলবে। রোকেয়া রফিক বেবী ঢাকার মঞ্চে বলিষ্ঠ অভিনেত্রী এবং সেই ভাবেই তার বিকাশ-প্রকাশ। তিনি কেন নির্দেশনার চাপ সামলাতে যাবেন অভিনয়নির্দেশনা অপেক্ষা টেকনিক্যাল নির্দেশনাকে প্রাধান্য দিয়ে! দিন শেষে মোহাম্মদ বারী রূপী প্রেসিডেন্টের আত্মানুশোচনা, চন্দন রেজা রূপী ক্লাউনের হাহাকার দশা, সুজন রেজাউল রুপী সচিব ২-এর ব্যাঙ্গময়তা, সেলিম মাহবুব রূপী মিস্টার এক্স ২-এর রোনাল্ড ট্রাম্পের অনুকরণীয়তা। অন্যদিকে বাংলা কথায় গান লিখে বিশ্বায়নের সুর বসাতে যেয়ে অত্যাধিক ইন্সট্রুমেন্টের বাড়াবাড়ি অপরদিকে মঞ্চে কোরিওগ্রাফির লাফালাফির যাঁতাকলে পড়ে গানের কথাই মার খায় অথচ এই নাটকের গানের কথা নাটকের সংলাপের মতোই অর্থবহ। লাইট-সেট-কস্টিউমের নান্দনিক আয়োজনের তলে নাটকের চাপা পড়া দশায় দর্শকদের নাভিঃশ্বাস উঠবার দশা। প্রচ- আকাক্সক্ষা নিয়ে আগত দর্শক সুবচনের প্রণয় যমুনার ঢেউয়ের তোড়ে বিধ্বস্ত হয়ে আশায় বুক বেঁধেছিল থিয়েটার আর্ট  ইউনিটকে আঁকড়ে ধরে।

দর্শক গোলাপজান রূপী রোকেয়া রফিক বেবীকে দেখে বুঝেছিল বাস্তু হারাবার যন্ত্রণা কত নির্মম, মর্ষকাম দেখে বুঝল চক্রান্তে আমরা সবাই শবযাত্রী। কিন্তু দর্শকরা তো চায় থিয়েটার শেষপর্যন্ত বাঁচার কথা বলবে, প্রেরণার কথা বলবে, সম্মুখে আলো জ্বেলে পথ দেখাবে, আশাকে জাগিয়ে রাখবে। এই আশা জাগিয়ে রাখার দায় থিয়েটার তথা নির্দেশক রোকেয়া রফিক বেবীর, নাট্যকার আনিকা মাহিন একা’র, দল থিয়েটার আর্ট ইউনিটের।

তবে দর্শকদের শেষ পর্যন্ত আশ্রয়, প্রধানতম অবলম্বন এসএম সোলায়মানের কাছে দ্বারস্থ হওয়া, তাঁর রচিত সংলাপ স্বগতোক্তি করা ছাড়া দর্শকদের এই মুহূর্তে বিকল্প কোনো  উপায় নাই :

আমি কারে কই, মনের কথাডা কার কছে খুুইল্যা কই !

বেবাকই যদি খোয়াব তয় আশার জায়গাডা কই! বিশ্বাসের

ভিত্তিডা কই। আর আশাই যদি না থাকলো তাইলে বাঁইচ্যা আছি

কিসের জন্য। এই রকম ধুইক্যা ধুইক্যা মরতে তো আমার মন

চায় না। এই সাধের মানবজীবনের প্রতি আমার তো বিতৃষ্ণা আসে না।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares