ক্রোড়পত্র জন্মদিনে- ঐক্য ও বৈচিত্র্যময় স্মৃতিসমাহার : মুহিত হাসান

ক্রোড়পত্র জন্মদিনে

ঐক্য ও বৈচিত্র্যময় স্মৃতিসমাহার

মুহিত হাসান

 

কথাসাহিত্যিক হিসেবে রাবেয়া খাতুনের প্রতিষ্ঠাকাল এক সন্ধিক্ষণই নিঃসন্দেহেÑ বিশ শতকের পঞ্চাশের দশক। যখন কিনা দেশভাগের পর আড়মোড়া ভেঙে একটি নতুন জাতি জেগে উঠছেÑ ভাষার প্রশ্নে, জাতীয়তার প্রশ্নে তাঁদের রীতিমতো করে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে হচ্ছে। সেই যুগপৎ বিরুদ্ধ-সময় ও উর্বরা-সময়েরই জাতিকা তিনি। এমন পটভূমিতে যে কথাশিল্পীর বিস্তৃত ও প্রস্ফুটিত হওয়া, তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণও তাই আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৈকি! প্রাবন্ধিক-গবেষক আহমাদ মাযহারের সম্পাদনায় রাবেয়া খাতুনের স্মৃতিচারণমূলক রচনার সংকলন স্মৃতিসংগ্রহ-এর প্রকাশকে তাই একটি জরুরি উদ্যোগ বলেই বিবেচনা করতে হয়। এই সংকলনে তাঁর একাত্তরের নয় মাস, স্বপ্নের শহর ঢাকা, জীবন ও সাহিত্য, পাবনা মানসিক হাসপাতাল, স্মৃতির জ্যোতির্ময় আলোয় যাঁদের দেখেছি ও  চোখের জলে পড়লো মনেÑ এই ছয়টি পূর্ব প্রকাশিত গ্রন্থ একত্রিত হয়েছে।

বইয়ের শুরুতেই এর সম্পাদক আহমাদ মাযহারের একটি নাতিদীর্ঘ ভূমিকা রয়েছে। উক্ত ছয়টি বইয়ের বিষয়-সার ও বৈশিষ্ট্যগুচ্ছের বিবরণ দেওয়ার পাশাপাশি রাবেয়া খাতুনের সাহিত্যিক-জীবনের সংগ্রাম সম্পর্কে তিনি এখানে যে মন্তব্য করেছেন তা প্রণিধানযোগ্য ও সুচিন্তিত। গ্রন্থ-পরিচয় অংশটিও সুলিখিত।

আলোচ্য সংকলনভুক্ত প্রথম বই একাত্তরের নয় মাস। কোনো অধ্যায়বিন্যাস নেই। টানাগদ্যে মুক্তিযুদ্ধের রুদ্ধশ্বাস সময়ের স্মৃতিচারণ। গদ্য নির্মাণের এই বিশেষ ভঙ্গিটা কি লেখিকা ইচ্ছে করেই বেছে নিয়েছিলেন যাতে সময়ের উত্তাপটা ধরা পড়ে সার্থকভাবে? যাহোক, রাবেয়া খাতুনের একাত্তর-স্মৃতির শুরুটা ১৬ মার্চ, ১৯৭১ তারিখ থেকে। সেদিন লেখক সংগ্রাম-শিবিরের বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দিতে আরও অনেক শিল্পী-সাহিত্যিকের সাথে হাজির হয়েছিলেন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। মিছিলের তপ্তধ্বনি ও উদীপ্ত শপথের বর্ণনা যেন রীতিমতো জীবন্ত হয়ে ভেসে ওঠে পাঠকের চোখের সামনে। ১৬ তারিখের পর লেখকেরা মিলিত হন আরেকটি সভায়। সেখানে পরের সভার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা আর হয়নি কখনও, কারণ তার পরেই পঁচিশে মার্চের সেই কালো রাত ঘনিয়ে আসে ঢাকার বুকে। সেই কৃষ্ণক্ষণের বিবরণ পেরিয়ে লেখিকা জানান ঢাকা ছেড়ে প্রাণের ভয়ে মানুষের পলায়ন ও হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়াবহ লুণ্ঠন-হত্যাযজ্ঞের কালান্তক বিবরণ। ¯্রফে বিশ্বাসের বশে ঢাকায় থেকে যাওয়া তাঁর সাহিত্য-সুহৃদ কবি মেহেরুন্নেসার সপরিবারে বিহারিদের হাতে নিহত হবার বিবরণ পড়লে মনকে শান্ত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। দেশভাগের সময় পশ্চিমবাংলা থেকে পূর্ববঙ্গে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন মেহেরুন্নেসা, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ভেবেছিলেন যে, অবাঙালি বিহারিরাও তাঁদের মতো রিফিউজি, ফলে তারা কোনো ক্ষতি করবে, এমনটা হবার নয়। সেই বিশ্বাসের দাম তাঁকে দিয়ে হয়েছিল জীবন দিয়েই। রাবেয়া খাতুন পরে ঢাকা ছাড়েন আগস্টের বারো তারিখে। ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয়ের পর যখন আবার তিনি ঢাকায়, তখন আবার বুদ্ধিজীবী-হত্যার অমোচনীয় রক্তাক্ত ঘটনা তাঁকে বেদনার্ত করে তোলে। সব মিলিয়ে একাত্তরের সময়ের অবরুদ্ধ ঢাকা ও সংগ্রামরত বাংলাদেশের সাধারণ জনতার অভিজ্ঞতা জানবার জন্য একাত্তরের নয়মাস অপরিহার্য একটি রচনা বলেই মূল্যায়িত হতে পারে।

স্বপ্নের শহর ঢাকা মূলত লেখিকার শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যে দেখা ঢাকা শহরের চালচিত্রের সমাহার। বাবার চাকরিসূত্রে গ্রাম থেকে সপরিবারে তাঁদের ঢাকা শহরে বসবাস শুরু, এক ‘কুট্টি’ মহল্লায় ছিল তাঁদের ভাড়াবাড়ি। কিন্তু সেখানকার আদি ঢাকাইয়ারা তাঁদের গণ্য করতেন নিছক ‘বাঙাল’ বলে। বাইরে থেকে আসা বাঙালিরা ঢাকাইয়া স্থানীয়জনদের রোজগারে ভাগ বসাবেÑএমনটা ভেবে তারা বিরক্ত হতো, তবে চাকরিজীবীদের নিয়ে তেমনটা ভাবা হতো না। সেকালের ঢাকায় নারীদের পড়াশোনার প্রক্রিয়ার বিবরণ বেশ বিস্তারিতভাবে দিয়েছেন রাবেয়া খাতুন, যা কিনা মনে হয় ইতিহাস রচনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও বৈকি। তখনকার গ্রামোফোন শোনা কি সিনেমা দেখা নিয়ে সাধারণ মধ্যবিত্তের আকুলতার কাহিনিও চমকপ্রদ বৈকি। তবে তখনকার ঢাকার সব আখ্যানই ছিল না উজ্জ¦ল, ১৯৪১ সালে ঘনিয়ে আসে দাঙ্গার কালো ছায়াও। দাঙ্গার সময় বাংলাবাজার ও ইসলামপুরের বইয়ের দোকানের পুড়ে যাবার একটি ঘটনার বিবরণও পাই এখানে, সেটি যেমন মর্মস্পর্শী তেমনি কষ্টদায়কও, এর উদ্ধৃতি তাই দিচ্ছি কিছুটা :

‘সেবারে কত যে বই পোড়ানো হয়েছিল খানিকটা বোঝা গেছিল দাঙ্গা থামার পর। বংশাল থেকে যে রাস্তাটি নয়াবাজারের সঙ্গে যুক্ত, সেটা তখন খুবই সংকীর্ণ। দুপাশে জলা। মাঝে মাটির সাঁকোর মতো চিলতে জমি। জমির দুধারে থকথকে কাদা। কর্পোরেশনের তিন দিকে ঘের দেওয়া গরুর গাড়ি করে বস্তা বস্তা আধপোড়া বই এনে ফেলা হচ্ছিল। পথের দুপাশে জমা বই-এর পাহাড়।…’

এর পরই আবার আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা, রেঙ্গুনে বোমা পড়ছে, সেই আঁচ এসে পড়ছে পূর্ববাংলার ঢাকা শহরেও। যুদ্ধের পর দুর্ভিক্ষ। শহরে খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যায় ছয়শ গুণ, অতএব ‘প্রতিটি ঘরে ঘরে যে তখন কত অভিনব রান্নার ধরন। এক মুঠো চালের সঙ্গে চিকন করে কাটা গোল অথবা মিষ্টি আলুর ভেজাল। কখনও আধ মুঠো চালের সাথে কচু, বেগুন, যাবতীয় সবজি এবং মসলা ফেলে ঘাঁটার মতো একটা বিদঘুটে স¦াদের পদার্থ। কখনও মিঠে কুমড়ো সিদ্ধ।…’ দাঙ্গা, যুদ্ধ, মন¦ন্তর পেরিয়ে একসময় আসে দেশভাগের দগদগে ক্ষণ। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট তৈরি হলো স্বতন্ত্র রাষ্ট্র পাকিস্তান। ঢাকা শহরে তখন অন্যরকম আমেজ। কিন্তু এর মাঝে এক নগরে ঘটে যাওয়া এক অন্যরকম ‘সাংঘাতিক’ কা-ের খবর আসে লেখিকার কানে :

‘ভিক্টোরিয়া পার্কের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে বিশাল পানির ট্যাংক। একটি লোক পাইপ বেয়ে ওপরে উঠে সমানে চিৎকার করছে, সে পাকিস্তান দেখার জন্য অত উঁচুতে উঠেছে। কই, পাকিস্তান তো দেখা যাচ্ছে না! এদিক-ওদিক লাফালাফি করতে গিয়ে লোকটা ফাঁপা পাইপের ভেতর পড়ে যায়।’

‘স্বপ্নের শহর ঢাকা’ অধ্যায়ের শেষার্ধে পাই বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত আন্দোলনমুখর দিনগুলোর কথা। সেই সময়ের তরুণী রাবেয়া খাতুন বাংলা ভাষার জন্য লড়াইরত ছাত্রদের ওপর শাসকের অত্যাচার নেমে আসা দেখে হতাশ না হয়ে নিজের ডায়েরিতে লিখেছিলেন ‘এরও অবসান আছে। আছে প্রতিবিধান।’ তাঁর এই আশা পরে যে সত্যে রূপান্তরিত হয়েছিল, তা তো বলাই বাহুল্য।

জীবন ও সাহিত্য বইটি কিছুটা অন্য ধাঁচের। হয়তো এর আপাত শুষ্ক-প্রচলিত ধারার শিরোনামটি পাঠককে বিভ্রান্তও করতে পারে প্রথমদিকে। কিন্তু উক্ত গ্রন্থ আদতে রাবেয়া খাতুনের লেখক জীবনের এক ব্যতিক্রমী আলেখ্য। তাঁর উপন্যাস লেখার শুরুটা কীভাবে হলো, সেই আখ্যান দিয়ে এর আরম্ভ। কিন্তু শুধু এরই মধ্যে তিনি সীমাবদ্ধ থাকেননি, নিপুণ লেখনীতে পঞ্চাশের দশকের ঢাকার সাহিত্যজগৎ ও পত্রিকা-প্রকাশনার পরিম-লের সাথেও পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন এখানে। নিজের একেকটি সাহিত্যকর্ম নির্মাণের সময়কার নেপথ্য-কাহিনি যেমন তিনি সবিস্তারে জানিয়েছেন, তেমনি সেসব লেখা প্রকাশের পর সুধীজন ও সাধারণ পাঠকদের যেসব মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া তিনি জানতে পেরেছিলেন তাও লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন।

স্মৃতির জ্যোতির্ময় আলোয় যাঁদের দেখেছি মোটমাট ষোলটি স্কেচধর্মী ব্যক্তিবিষয়ক লেখার সংকলন। কথাশিল্পী আশাপূর্ণা দেবী, কবি সুফিয়া কামাল, চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান, কথাসাহিত্যিক গৌরকিশোর ঘোষÑএরকম কয়েকজন গুণী শিল্পী-সাহিত্যিককে নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত স্মৃতিমালা এখানে অকপটভাবে মেলে ধরেছেন লেখিকা। যাঁদের নিয়ে তাঁর কথকতা, তাঁদের রচনাবলি নিয়ে নিজস্ব মন্তব্যও তিনি এই লেখাগুলোয় ব্যক্ত করেছেন সাবলীলতার সঙ্গে। মূল্যবান স্মৃতির সাথে আন্তরিক বিশ্লেষণ তাই তাঁর দেখার মধ্যে কোনোরকমের বিরোধ ছাড়াই মিলেমিশে থাকে। একই ধারার আরেকটি সংকলন, চোখের জলে পড়ল মনে। নিজের মা, বাবা, জ্যাঠা ও নিজের বড় বোনকে নিয়ে চারটি গদ্যের সংকলন। নিজের আপনজনদের নিয়ে লিখবার সময়ও লেখিকাকে আশ্চর্য নির্মোহ মনে হয়, আবার তাই বলে নেহাত সাদা চোখে আবেগ  বা স্মৃতির উত্তাপকে জলাঞ্জলি দিয়ে লিখেছেন, তাও বলা যাবে না। সততা ও হৃদয়বৃত্তির এক চমৎকার মেলবন্ধন ঘটেছে এই স্মৃতিচারণ চতুষ্টয়ে।

আলোচ্য সংকলনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী অংশ নিঃসন্দেহে পাবনা মানসিক হাসপাতাল। পাবনার মানসিক হাসপাতাল বিষয়ে একটি টিভি অনুষ্ঠান নির্মাণের জন্য একদল সাংবাদিক যাচ্ছিলেন সেখানে, লেখিকাও তাঁদের সাথে তখন যোগ দেন। ফলে সেই অনুষ্ঠানটি নির্মাণের সময় নিজের চোখে হাসপাতালটির খুঁটিনাটি দেখার সুযোগও জুটে যায়। একটি মানসিক হাসপাতালের দৈনন্দিনের চিত্র, যা কিনা কখনওই খুব একটা সুলভ নয়, তা পাঠকেরা এখানে পাবেন দারুণ বিস্তারিতভাবে। আর লেখিকা সেখানে ভর্তি হওয়া রোগীদের সাথে যেসব সহৃদয় আলাপচারিতা এখানে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, তা পাঠ করাও আর এক ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা বটে!

সব মিলিয়ে রাবেয়া খাতুনের এই বিপুলাকার গ্রন্থ স্মৃতিসংগ্রহ পাঠান্তে একজন লেখকের ব্যক্তিগত বেড়ে ওঠা ও প্রতিষ্ঠালাভের পটভূমি পাঠকদের সামনে যেমন উন্মোচিত হয়, তেমনি তাঁর জীবনের বহুবিচিত্র উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতার অংশভাগও জেনে নেওয়া সম্ভবপর হয় বৈকি! রাবেয়া খাতুনের লেখকজীবন সম্পর্কে যাঁরা জানতে চান তাঁদের জন্য তো বটেই, পঞ্চাশ-ষাট-সত্তরের দশকের ঢাকার সাহিত্যজগতের বহুবিচিত্র চালচিত্র নিয়ে যাঁরা গবেষণা করছেন বা নিছক কৌতূহলীÑ তাঁদের জন্যও বইটি অবশ্যপাঠ্য বলে বিবেচিত হতেই পারে। আগামী সাতাশে ডিসেম্বর রাবেয়া খাতুন একাশি বছর পূর্ণ করে বিরাশিতে পা দিচ্ছেন। তাঁর কলম আরও বেশ ক বছর সচল থাকুক, সেই প্রত্যাশা আমাদের।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares