ক্রোড়পত্র জন্মদিনে- কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন : সমাজ-রূপান্তরের চিহ্ন : আহমাদ মাযহার

ক্রোড়পত্র জন্মদিনে

কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন :

সমাজ-রূপান্তরের চিহ্ন

আহমাদ মাযহার

 

কথাসাহিত্যচর্চার জন্য থাকতে হয় জীবনকে খুঁটিয়ে দেখবার কৌতূহলী চোখ; একজন কথাসাহিত্যিক কেবল জীবনের অনুপুঙ্খকেই তাঁর অন্তরের চোখ দিয়ে দেখেন না, ভালোও বাসেন একে। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের মহাসড়কে গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে যাঁদের যাত্রা শুরু তাঁদের যে স্বল্পসংখ্যকের মধ্যে এই দুই গুণের যথার্থ সমাহার ঘটেছিল তাঁদের মধ্যে রাবেয়া খাতুন অন্যতম। এই অনুভব আমার অনেক পরের অর্জন হলেও তাঁর লেখার সঙ্গে পরিচয় বাড়িতে নিয়মিত আসা ঈদসংখ্যা বেগম পত্রিকার সূত্রে, ছোটবেলাতেই। দশ-এগারো বছর বয়সেই পেয়ে গিয়েছিলাম রাবেয়া খাতুনের লেখা কোনো গল্প। এতদিনে তার নাম মনে না থাকলেও নামটি সম্ভ্রম জাগিয়েছিল মনে এ-কথা মনে আছে। আরেকটু পরে পড়েছি তাঁর লেখা ছোটদের উপন্যাস সুমন ও মিঠুর গল্প (১৯৭৮); বেরিয়েছিল শিশু একাডেমী থেকে প্রকাশিত শিশু পত্রিকার ঈদসংখ্যায়; বেশ দাগ কেটেছিল মনে। অনেক পরে, পরিণত বয়সে যখন আবার পড়েছি তখন মনে হয়েছে ছোটদের জন্য লেখা ওই রচনাটি একইসঙ্গে পরিণত মনেরও সামগ্রী। আমাদের সমাজে অন্তঃশীল যে ভাব¯্রােত বিরাজ করে তাকে যে রাবেয়া খাতুন গভীরভাবে অনুভব করেন তা ঐ বইয়ের বিশ বছরেরও বেশি সময় পরের পুনর্পাঠে গভীরভাবে অনুভব করেছিলাম। শুরু করেছিলেন সেই পঞ্চাশের দশকে যা এখনও চলমান। একটু গুছিয়ে বলতে গেলে হয়তো বলা যায় যে, দীর্ঘকাল ধরে চর্চিত রাবেয়া খাতুনের কথাসাহিত্যে আমাদের সমাজের পরিবর্তনগুলো চিহ্নিত হয়। এ-কথা তাঁর পরিণতজনদের জন্য রচিত কথাসাহিত্যে যেমন তেমনই ছোটদের উপযোগী রচনার বেলাতেও প্রযোজ্য।

 

সাতচল্লিশের দেশভাগ পরবর্তী সময়ে বাংলাসাহিত্যের নতুন একটা কেন্দ্র গড়ে উঠতে শুরু করেছিল ঢাকায়। আগে বাংলাসাহিত্যের কেন্দ্র ছিল অখ- বাংলার রাজধানী কলকাতা। ঢাকা শুধু কেন্দ্রই হলো না, এখানকার বাংলাসাহিত্যে জেগে উঠতে শুরু করল নতুন ঔৎসুক্যপূর্ণ জীবনবোধ। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত যে মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজ স্পষ্ট রূপ লাভ করতে শুরু করেছিল তাদের আত্মঘোষণার ভাষা পাওয়ার শুরু সাতচল্লিশ-পরবর্তী ঢাকা শহরে। এখানে জন্ম নেয়া রাবেয়া খাতুনের মতো লেখকদের পাশাপাশি কলকাতা থেকে এসেও যোগ দিলেন কেউ কেউ। কথাটাকে একটু বদলে হয়তো বলা যেতে পারতো তিনি ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যজগতের প্রথম যুগের নারী লেখক। তিনি যে এখান থেকে উদ্ভূত নারী লেখক তা উল্লেখ না করার গূঢ় কারণ আছে। এমনটি উল্লিখিত হলে হয়তো ধরে নেয়া হয় যে নারীর লেখায় খানিকটা ঘাটতি থাকলেও সেটাকে ধর্তব্যের মধ্যে নেয়ার দরকার নেই। রাবেয়া খাতুন নারী হলেও তাঁকে ঐ রকম ছাড় দিয়ে বিবেচনা করার দরকার পড়ে না। কারণ শুরু থেকেই তিনি কলম ধরেছিলেন শক্ত হাতে। বরং এ-কথা বলা যায় যে, নারী হয়ে জন্মেছিলেন বলে নারীপুরুষের সম্মিলিত যে জীবনকে সমগ্র অর্থে মানবজীবন বলা হয়ে থাকে তার অনুভবে বাড়তি সুবিধা তিনি অর্জন করতে পেরেছিলেন।

কথাটাকে একটু পরিষ্কার করে নেয়া দরকার। আমাদের সমাজ এগিয়ে চলেছে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। রাবেয়া খাতুন যখন লিখতে শুরু করলেন, প্রবেশ করলেন কর্মজীবনে সে-সময়ে জীবনের স্বাভাবিক নিয়মেই বুঝে নিতে সক্ষম হলেন এই দৃষ্টিভঙ্গিকে। কারণ পুরুষের সঙ্গে তিনি সমান তালে চলেছেন, ভেবেছেন সাহিত্য নিয়ে। সাহিত্যিক আড্ডায় মেতে উঠেছেন তাঁর সমকালের সেরা লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গেÑ যাঁদের অধিকাংশই ছিলেন পুরুষ। কিন্তু নারী ছিলেন বলে ব্যক্তিক যে সংকটের মধ্য দিয়ে তাঁকে পার হতে হতো তাতে জীবনকে আরও বৃহত্তরভাবে তিনি অনুভব করতে শিখেছিলেন। কিন্তু আলাদাভাবে অনুভব করলেও তাঁর কাছে তা কেবল সংকীর্ণ অর্থে নারীর সংকট হয়ে ওঠে না, তিনি একে দেখলেন সামগ্রিকভাবে মানবিক বিপর্যয়ের একটা দিক হিসেবে। এ-কারণেই রাবেয়া খাতুনকে বৃহত্তর জীবনাভিজ্ঞতার অভাবে ভাবালু জীবনবোধসম্পন্ন নারী লেখকদের দলে কিংবা নারীবাদীদের খ-িত সারিতে ফেলে দেয়া যায় না।

 

রাবেয়া খাতুন বাংলাদেশের অতিপ্রজ কথাসাহিত্যিকদের অন্যতম। তাঁর সমকালের খুব বেশিসংখ্যক লেখক সাহিত্যচর্চায় এত দীর্ঘকাল এমনভাবে নিবিষ্ট থাকতে পারেননি। তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমসাময়িক লেখকদের নামগুলোর দিকে যদি তাকাই তাহলে খানিকটা অনুভব করতে পারব তাঁর শক্তি ও সীমানা। ব্যক্তিগতভাবে আহসান হাবীব, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আবদুল গাফফার চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, জহির রায়হান, জাহানারা ইমাম, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, আতোয়ার রহমান, মিরজা আবদুল হাই, রিজিয়া রহমান প্রমুখ লেখকদের সঙ্গে তিনি ছিলেন ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এইসব খ্যাতিমান লেখকদের সঙ্গে সর্বদা সমানতালে চলেছে তাঁর কলম। এই দীর্ঘ সময় পরিসরে রাবেয়া খাতুনের কলমে কখনও বিরতি পড়েনি।

কথাসাহিত্যিক হিসাবে তাঁর মধ্যে রয়েছে বিচিত্র মাত্রা। ষাটের কাছাকাছি সংখ্যক উপন্যাসের রচয়িতা তিনি। এ-যাবৎকাল পর্যন্ত সংকলিত ছোটগল্পও চারশ ছাড়িয়েছে অনেক আগেই, ছোটদের জন্য লেখা গল্প-উপন্যাসও বেশ কয়েকটি। রাবেয়া খাতুনকে যদি বাংলাদেশের ভ্রমণসাহিত্যের প্রধানতম লেখক বলা হয় তাহলেও হয়তো বেশি বলা হবে না। কর্মজীবনে যে-সব মানুষের সান্নিধ্যে এসেছেন, যাঁরা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছেন বিভিন্ন সময় স্মৃতিকথার মধ্য দিয়ে তাঁদের ব্যক্তিত্বকে পাঠকের কাছে হাজির করেছেন গভীর মমতায়, আন্তরিক শ্রদ্ধায় ও মুক্ত প্রাণে। তাঁর এসব রচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের সমাজ রূপান্তরের রূপই ধরা পড়েছে।

 

গ্রামসমাজ ও নাগরিকসমাজের সমান্তরাল পরিবর্তমানতা চিহ্নিত হয়েছে তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস মধুমতীতে (১৯৬৩)। উন্মোচিত হয়েছে ক্ষয়িষ্ণু তাঁতি সম্প্রদায়ের জীবন-সংকটের সঙ্গে নাগরিক উঠতি মধ্যবিত্ত জীবনের জিজ্ঞাসা। কথাসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর শুরু এমন একটা সময়ে যখন ঢাকা অঞ্চলের মানুষ অবস্থান করছিল আধুনিকতা ও গ্রামীণতার সন্ধিক্ষণে। সে-কারণেই আধুনিকতার প্রশ্নে রাবেয়া খাতুনের কথাসাহিত্য আমাদের সাহিত্যের জন্য গুরুত্ব পাবার অধিকারী। ঢাকাকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত সমাজের সঙ্গে তিনি গ্রামজীবনের শিথিল সম্বন্ধকে ধরে রেখেছেন উপন্যাস ও ছোটগল্পের আধারে। সে-সময় পুরনো ঢাকা কাঠামোগত দিক থেকে নগর হয়ে উঠলেও গাঢ় হয়ে ওঠেনি তার যথার্থ নাগরিক জীবন। তবে এখানকার জীবনযাত্রার সঙ্গে গ্রামের জীবনযাত্রার ছিল বিস্তর পার্থক্য। সে-কালের ঘটমান সমাজমানসে অন্তঃশীল ছিল যে চেতনা-প্রবাহ তার অনেক অন্তরঙ্গ ছবি উঠে এসেছে তাঁর উপন্যাসে ও গল্পে। পুরনো ঢাকার সেই স্বাতন্ত্র্যকে রাবেয়া খাতুন স্বচ্ছভাবে তুলে আনতে পেরেছিলেন রাজাবাগ (১৯৬৭), বায়ান্নো গলির একগলি (১৯৮৪) কিংবা সাহেব বাজার (১৯৬৯) প্রভৃতি উপন্যাসে। মুক্তিযুদ্ধ তাঁর সংবেদনশীলতাকে বারবার নাড়া দেয় বলেই ফিরে ফিরে তাঁর গল্প-উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ উপজীব্য হয়। নয় মাসের অবরুদ্ধ দিনগুলোর দিনলিপিও একদিকে হয়ে ওঠে সহৃদয়সংবেদ্য সাহিত্য, অন্যদিকে প্রামাণ্য দলিল। মুক্তিযুদ্ধকালের পরিস্থিতি বাংলাদেশের মানুষের জীবনবোধকে কিভাবে বিবর্তিত করেছে তার পরিচয়ও খুঁজে পাই আমরা তাঁর কথাসাহিত্যে!

 

আধুনিক চিকিৎসা-শাস্ত্র অধ্যয়নের ইতিহাস বেশি পুরনো নয়। প্রাকৃতিকতায় নির্ভরশীল হেকিম-কবিরাজদেরই কদর ছিল সমাজে। রাবেয়া খাতুনের মোহর আলিরাই সেই ধারার শেষের প্রজন্ম। মোহর আলি (১৯৮৫) উপন্যাসে সমাজের অপসৃয়মাণ সে জীবন বোধকে ধরে রাখা হয়েছে। আবার সাম্প্রতিক জীবনধারাকেও তিনি ধারণ করেন সজীবতায়। দূরে বৃষ্টি (২০০৩), ঠিকানা বি এইচ টাওয়ার (২০০৫), কুয়াশায় ঢাকা নগর বধূ (২০০৩), রমনা পার্কের পাঁচ বন্ধু (২০০৩) ইত্যাদি উপন্যাসে বিশ্বায়ন কবলিত নগরজীবনের সংকট ও স্বপ্নকে বা স্বপ্নভঙ্গকে ধারণ করেছেন। এখানেও মূর্ত হয়েছে রূপান্তরচিহ্নিত জীবন।

যে-প্রত্যাশা বিশ শতকের চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকের বাঙালি মুসলমান সমাজকে উজ্জীবিত করেছিল তার পতন থেকেই ঘটেছিল বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের সূচনা। গণতন্ত্রের প্রত্যাশায়, অধিকার অর্জনের আকাক্সক্ষায় আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে উপনীত হয়েছিলাম আমরা। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পেয়েছিলাম বাংলাদেশ রাষ্ট্র। কিন্তু যে ধর্মকেন্দ্রিক চেতনা পাকিস্তানকে ধ্বংস করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করেছিল তা ছদ্মবেশে রয়েই গেল। এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ এখনও চলছে। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ কথাটির মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধকেই বহাল রাখার কথা বলা হয়। রাবেয়া খাতুন এই চেতনায় উজ্জীবিত লেখক বলেই প্রথম বধ্যভূমি (২০০৪) উপন্যাস লেখেন ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে, ফেরারী সূর্য (১৯৭৫), ঘাতক রাত্রি (১৯৯৯), হিরণ দাহ (১৯৯৫), বাগানের নাম মালনিছড়া (১৯৯৫) বা হানিফের ঘোড়া (১৯৯৫) লেখেন মুক্তিযুদ্ধের শ্বাসরুদ্ধকর দিনগুলো নিয়ে।

 

মধুমতীকে ঠিক বিশুদ্ধ গ্রামীণ উপন্যাস বলা যায় না। উঠতি মধ্যবিত্ত মনের রোমান্টিক চেতনাও এতে ক্রিয়াশীল ছিল। তুলনায় বরং পল্লিজীবনের বিবর্তনকথা তিনি বলেছেন ই ভাদর মাহ ভাদর (১৯৮৮) উপন্যাসে। যখন বাংলাদেশে চলচ্চিত্রেরও সূচনা ঘটেনি সেই সময়ে তাঁর স্বামী প্রয়াত ফজলুল হক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সিনেমা নামে চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা। পরে তিনি নিজে চলচ্চিত্রকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। স্বামীর সঙ্গে সিনেমা পত্রিকায় কর্মসূত্রে এবং নিজের উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ লাভের সূত্রে তিনি চলচ্চিত্র-জগতেরও মানুষ। সেই সুবাদে এই জগতের মানুষদের সম্পর্কে অনেক কাছে থেকে জেনেছেন। ফলে তিনি লিখে ফেলতে পারেন রঙ্গিন কাচের জানলা (২০০১) বা কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি (২০০৪) উপন্যাস। আসলে রুপালি পর্দার জীবনের অন্তরালে তিনি মধ্যবিত্ত জীবনের ব্যক্তিক সংকটকেই উন্মোচন করেন এবং ঔপন্যাসিক হিসেবে নিজের জীবন-উপলব্ধিকে প্রকাশ করেন।

প্রায় ষাট বছর ধরে লেখা তাঁর ছোটগল্পগুলোকে যথার্থ নান্দনিক মাত্রা বিচারের মাধ্যমে নির্বাচন করা হলে হয়তো তাঁর মধ্যে আরো শক্তিমান একজন গল্পকারকে শনাক্ত করা সম্ভব। সমালোচনা সাহিত্যের দীনতায় রাবেয়া খাতুনদের মতো লেখকদের সৃষ্টিশীলতার গতিপ্রকৃতিকে অনুসরণ করে দেখা হয়নি। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ছোটগল্পের সংকলন মাত্র সাতটি। আমার এগারোটি গল্প (১৯৮৩), মধ্যরাতে সাত মাইল (১৯৯৬),  মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী (১৯৯৬), মুক্তিযুদ্ধের গল্প (১৯৯৮), লাল চিঠি (২০০৩), প্রেম কিংবা পরশপাথর (২০০৪), তোমার কাছে যাব বলে (২০০৪)। এই সাতটি সংকলন ও এর বাইরে পড়ে থাকা গল্পসহ তাঁর ছোটগল্পের চারটি সংগ্রহ  গল্পসমগ্র ১ (২০০৫), গল্পসমগ্র ২ (২০০৬), গল্পসমগ্র ৩ (২০০৭), গল্পসমগ্র ৪ (২০০৮) ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে তাঁর সংকলিত গল্পসংখ্যা প্রায় অর্ধ সহ¯্র!

ছোটগল্পেও তাঁর অন্বিষ্ট উপন্যাসের মতোই আধুনিক জীবন। মুক্তিযুদ্ধ ফিরে আসে বারবার। পাঠকের উপলব্ধিতে পৌঁছে দেন নিজের সমাজ-সময়- পরিপার্শ্বকে, উপন্যাসের মতো তাঁর ছোটগল্পেও নারীজীবনের সংকট ও দ্রোহকে দেখেন গভীরভাবে। ছোটগল্পেও তাঁর সত্তা সামগ্রিক অর্থে মানবিকতার সন্ধানী। গল্পকথনে তিনি কখনও প্রগল্ভ নন, বরং সংহত ও নির্মোহ। ফলে গল্পের দর্শন পাঠকমনকে সংবেদনশীল করে তোলে। তাঁর ভাষা অনায়াসগতি, সহজ ও নির্ভার। নয় অকারণ কাব্যিয়ানা কিংবা ভঙ্গিময়তায় ভারাক্রান্ত। তাঁর গদ্যভঙ্গি সরল, কিন্তু তরল নয় মোটেও ।

 

গৃহকোণবাসী বাঙালি মুসলমান সমাজে তীর্থযাত্রা বলতে ছিল বিত্তশালীদের হজ। কিন্তু সে যাত্রারও সমৃদ্ধ ভ্রমণকাহিনি নেই তেমন একটা। বিশ শতকের মধ্যভাগে উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশযাত্রার সূত্রে দেশভ্রমণ করলেও তাঁদের হাতে ভ্রমণসাহিত্য গড়ে উঠতে পারেনি। ব্যতিক্রমী রাবেয়া খাতুন ভ্রমণ শুধু ভালোই বাসেন না, ভালোবাসেন তার আনন্দ ও উপলব্ধিকে পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে। ভ্রমণসাহিত্য রচনাকে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচনা করেছেন বলে তাঁর এই আঙ্গিকের বইও অনেকগুলো। হে বিদেশী ভোর (১৯৯০), মোহময়ী ব্যাংকক (১৯৯১), টেমস থেকে নায়েগ্রা (১৯৯৩), কুমারী মাটির দেশে (১৯৯৪), হিমালয় থেকে আরব সাগরে (১৯৯৯), কিছুদিনের কানাডা (২০০০), চেরি ফোটার দিনে জাপানে (২০০১), কুমারী মাটির দেশ অস্ট্রেলিয়ায় (২০০৪), মমি উপত্যকা এবং অন্যান্য আলোকিত নগর (২০০৫), ভূস্বর্গ সুইজারল্যান্ড (২০০৬), আবার আমেরিকায় (২০০৬), পুবের ভূস্বর্গ সোয়াত (২০০৭), চমক নগরী হংকং (২০০৭), আলেকজান্ডারের দেশ এবং অন্যান্য (২০০৮), একদা এক রূপকথার রাজ্যে (২০০৯), স্বপ্নের শহর রোম ও ফ্লোরেন্স (২০১০), প্রবাসের দিনলিপি (২০১০), অপূর্ব নিসর্গ নগরী ওমান (২০১১), তবু জার্মানী (২০১১), ভিয়েতনাম ও হিরাম কক্সের দেশে (২০১২), দারুচিনি দ্বীপে (২০১২) তাঁর ভ্রমণসাহিত্য। এসবের মধ্য দিয়েও আমরা পাই গ্রাম ও ঘটমান নগরের দ্বান্দ্বিক জীবন-রূপান্তরের রূপকে! ভ্রমণে তিনি কেবল দেখেন না, তাঁর অনুসন্ধিৎসু মন সক্রিয় ও জাগ্রত থাকে। ভ্রমণপিপাসু মানুষ হিসেবে তাঁর দেখবার স্বতন্ত্র ভঙ্গিও রয়েছে। প্রবাসজীবনের স্বদেশকেও খুঁজে নেন তিনি তাঁর ভ্রমণসাহিত্যে।

সরাসরি পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী না লিখলেও আত্মজৈবনিক স্মৃতিমূলক রচনা লিখেছেন। একাত্তরের নয়মাস-এ (১৯৯০) লিখেছেন একাত্তরের শ্বাসরুদ্ধকর দিনগুলোর কথা। স্মৃতিকথায় নিজের কথা নয়, নিজের হয়ে ওঠায় যে-সব মানুষের প্রভাব ও ভূমিকা রয়েছে তাঁদের কথা বলেছেন। স্বপ্নের শহর ঢাকা (১৯৯৪), স্মৃতির জ্যোতির্ময় আলোয় যাঁদের দেখেছি (২০০৫), চোখের জলে পড়ল মনে (২০০৮) বইয়ে নিজের ব্যক্তিজীবন নয়, পরিবারের ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের উজ্জ্বল যে-সব ব্যক্তির সান্নিধ্য পেয়েছিলেন তাঁদের মমতাময় ছবি পাওয়া যায়। একই সঙ্গে নিজের অনুপ্রেরণার সূত্রগুলোকে চিহ্নিতও করে দিয়েছেন এসব রচনায়।

একাত্তরের রুদ্ধশাস দিনগুলোর স্মৃতিকথা একাত্তরের নয়মাস দিয়ে স্মৃতির পথম ঝাঁপি খুলেছিলেন রাবেয়া খাতুন; এরপরের উন্মোচন সুদূর কিশোরীবেলায় পুরনো ঢাকায় বাসকালের স্মৃতিকথা স্বপ্নের শহর ঢাকা। পরের বই সরাসরি নিজের সাহিত্যচর্চা সম্পর্কিত আত্মজীবনীমূলক বই জীবন ও সাহিত্য। বাংলাভাষার কয়েকজন সাহিত্যিকের সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিগত জানাশোনা-সূত্রে পরবর্তী স্মৃতিমালা স্মৃতির জ্যোতির্ময় আলোয় যাঁদের দেখেছি। এখানে লিখেছেন আহসান হাবীব, সুফিয়া কামাল, মিরজা আবদুল হাই, জহির রায়হান, গৌরকিশোর ঘোষ, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, হাসান হাফিজুর রহমান, আশাপূর্ণা দেবী, জাহানারা ইমাম, সমরেশ বসু, জোবেদা খানম, খান আতাউর রহমান, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা ও মুক্তিযোদ্ধা কবি মেহেরুন্নেসাকে নিয়ে। তার পরের বই পরিবারের প্রয়াত নিকটাত্মীয়দের স্মৃতিকথা চোখের জলে পড়ল মনে; তবে এই সংকলনে পারিবারিক আত্মীয়দের বাইরের মানুষদের মধ্যে কেবল আছেন কবি শামসুর রাহমান। বর্তমান সংগ্রহে এই রচনাটির স্থান হয়েছে স্মৃতির জ্যোতির্ময় আলোয় যাঁদের দেখেছি পর্বে। আরও লিখেছেন পাবনা মানসিক হাসপাতাল নামে ভিন্নধর্মী আরেক স্মৃতিকথা। এ নিছক পাবনা মানসিক হাসপাতাল পরিদর্শনের স্মৃতি নয়, সেখান থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির ভাষ্য!

 

১০

রাবেয়া খাতুন তাঁর গল্প-উপন্যাসে বাংলার মুসলিম সমাজজীবনের অন্তঃশীল অভিজ্ঞতার বয়ান রচনা করেন। আর এইসব স্মৃতিমূলক রচনায় তুলে ধরেন সুদীর্ঘ সাহিত্যিক সংগ্রামের স্বেদচিহ্ন; একই সঙ্গে বাক্সময় করেন সমাজমানসে অন্তঃশীল জাগরণ-আকাক্সক্ষাকেও। বিরাজমান ঔপনিবেশিক শাসনকাঠমো, ধর্মীয় আচারনিষ্ঠতার প্রাবল্য এবং চিন্তার অনড়তার মধ্যে একজন স্বাপ্নিক মানুষ হিসেবে কিভাবে তিনি বেড়ে উঠেছেন তার পরিচয় এই স্মৃতিকথাগুলোর মধ্যে পাওয়া যায়। পাওয়া যায় তাঁর সমকালের যে বিশিষ্ট সাহিত্যিক বলয়ে তিনি বেড়ে উঠেছেন তারও গভীরতর পরিচয়। দেশমাতৃকার টানে আকস্মিকভাবে স্বামী চারসন্তানসহ তাঁকে একাকী ফেলে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলে ব্যক্তিজীবনে ও পারিবারিক জীবনে যে বিপর্যয় নেমে আসে সমগ্র বাংলাদেশের রুদ্ধশ্বাস পটভূমিতে তার বিবরণ আছে স্মৃতিকথায়। তিনি যেমন কথাসাহিত্যিক তেমনি ভ্রামণিকও। পাবনা মানসিক হাসপাতাল পরিদর্শনের উদ্দেশে যাওয়া তাই একই সঙ্গে হয়ে-ওঠে সাংবাদিকতা, ভ্রামণিকতা, সমাজ- পর্যবেক্ষণ ও সর্বোপরি একটি স্মৃতিকথার উপজীব্য। পাঠকমাত্রেই অনুভব করবেন, রাবেয়া খাতুনের স্মৃতিমূলক রচনাগুলো যুগপৎ নিজের অভিজ্ঞতার বয়ান ও অনুভূতির রূপায়ণ! অথচ আবেগের উচ্ছ্বাস নেই এতে; গদ্যরীতি নির্মোহ ও সংযত। একজন যথার্থ কথাসাহিত্যিকেরই যা সংগত স্বভাববৈশিষ্ট্য।

 

১১

আপনাআপনি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালির চিরকালের লোক-সংস্কৃতির সম্পদকে রাবেয়া খাতুনের সহজাত প্রতিভা নিয়েছে আত্মস্থ করে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার ও জসীমউদদীন নির্দেশিত পথে চলা রাবেয়া খাতুনের শিশুসাহিত্যের মাধুর্যের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। কথকতার সৌন্দর্যকে তিনি যেমন রূপকধর্মী গদ্যে হাজির করতে পারেন তেমনি নিপুণতায় বাক্সময় করতে পারেন আধুনিক নগরজীবনের প্রতিসরমানস শিশুমনস্তত্ত্বকেও। তিনি অ্যাডভেঞ্চার কাহিনিরও লেখক, ছোটদের জন্য লেখা প্রথম বই দুঃসাহসিক অভিযান (১৯৬৭) যার নিদর্শন। নগরজীবনের পটভূমিকায় লেখা ছোটদের উপন্যাস সুমন ও মিঠুর গল্প তো আধুনিক ক্ল্যাসিকই হয়ে উঠেছে। ছোটদের জন্য লেখা একাত্তরের নিশান (১৯৯২) উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ সরাসরি উপস্থিত রয়েছে। ইতিহাসের ঘটনা মানুষের মধ্যে জীবনবোধের রূপান্তর ঘটায় তার পরিচয় রয়েছে ছোটদের জন্য লেখা তাঁর তীতুমীরের বাঁশের কেল্লা (১৯৮১) উপন্যাসে।

 

১২

জীবনের অভিজ্ঞতায় ক্রমশ সমৃদ্ধিমান নিরন্তর সক্রিয় ও সৃষ্টিশীল বলে এখনও তাঁকে রূপান্তরমাণ বলা চলে। জীবন থেকে পাওয়া প্রজ্ঞার আলো তাঁকে পথ দেখিয়ে চলেছে নিরন্তর। অশীতিপর বয়সেও তিনি সক্রিয়। দীর্ঘ দীর্ঘজীবন হোক তাঁর; বিবর্তমান জীবনের শিল্পসৃষ্টিতে তাঁর কলম থাকুক সর্বদা সচলÑ এই আমাদের কামনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares