ক্রোড়পত্র জন্মদিনে- সৈয়দ শামসুল হকের ঈর্ষা প্রেম নারী শিল্পী : চন্দন আনোয়ার

ক্রোড়পত্র জন্মদিনে

সৈয়দ শামসুল হকের

ঈর্ষা প্রেম নারী শিল্পী

চন্দন আনোয়ার

 

শিল্প! শিল্পের ভেতর দিয়েই জীবনকে অনুভব করেছি; যা কিছু দেখেছি ও জেনেছি সবই শিল্পে অনুবাদ করে নিয়েছি; সেখানেই শেষ নয়, আমার পূর্ববর্তী ও সমসাময়িক কারও কারও অনুবাদেও আমি জীবনের স্বাদ উল্লসিত জিহবায় গ্রহণ করেছি।

শিল্পানুবাদের তথা সৃজনেরÑ শব্দে কথাকাহিনি কাব্য নাটক রচনার এই আনন্দটি আমার কাছে নারীসঙ্গের চেয়েও অনেক অধিক তৃপ্তিকর বলে দেখেছি। সম্ভবত এ কারণেই নারীদের সঙ্গে বরাবর আমি মিশতে পেরেছি এমন স্বাভাবিকতায় যেনবা তারা লিঙ্গরহিত। নারী-পুরুষ সম্পর্কের এই স্বাভাবিকতা যেহেতু বাঙালি কেন বিশ্বের প্রায় প্রতি পুরুষেরই পটে মোটে ‘স্বাভাবিক’ নয়, তাই আমার সহজতা দেখে সামাজিকবৃন্দ কতই না ভুল বুঝেছেন আমাকে, লোচ্চা লম্পট আখ্যা পর্যন্ত দিয়েছেন ও কাহিনির পর কাহিনি তাঁরা রচে গেছেন। গ্রন্থে বা সংবাদপত্রের কলামে এসব অনেকে বলেও রেখেছেন! এসব কাহিনি আমি মনোমুগ্ধকর বলেই দেখেছি ও স্মিতহাস্যে শুনে গেছি। ওই স্মিতহাস্যটিও দিব্যসর্বজ্ঞ সামাজিকের চোখে কাহিনির বস্তুসমর্থনকারী বলে মনে হয়েছে, ফলে গল্পরচনায় বিরাম আসেনি তাঁদের।

এখানে আমি বলে রাখি যে, নারীদের গভীর থেকে আমি তাদের না-নারী না-পুরুষ হিসেবেই দেখে আসছি কৈশোর থেকে। আমার কাছে তারা আসে না মোহিনীরূপে, কাম্য রূপে; আসে তারা ব্যক্তিরূপে যার প্রসারিত হাত থেকে আমি জগৎসুধা গ্রহণ করে চলেছি। একারণেই হয়তো আমার গল্প-উপন্যাসে আমি কখনই কোনো কুসুমকুমারী নারীর ছবি এঁকে উঠতে পারিনি।

[সৈয়দ শামসুল হক, প্রণীত জীবন]

 

পিতৃ-আজ্ঞার বিরুদ্ধে গিয়ে যশস্বী ডাক্তার হবার পরিবর্তে লেখক হবার অনিরুদ্ধ টান পরানের গহিন ভিতরে নিয়ে সৈয়দ শামসুল হক দীর্ঘ দীর্ঘ কাল জীবন থেকে অতিবাহিত করেন এবং লেখক হবার পথের কাঁটা বিধায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের উচ্চতর ডিগ্রিকে স্বজ্ঞানে হত্যা করে বড় বাজিকরের মতোই মহামূল্যবান জীবনটাকে বাজি রেখেছিলেন। ছকবাঁধা আটপৌরে জীবনের ধারণাকে এভাবে কলা দেখিয়ে যে শিল্পী নিজের মুক্ত স্বাধীন চিন্তার রুমাল উড়িয়ে সদম্ভে সাহিত্যের আঙ্গিনায় পা ফেলেন, সেই শিল্পী আর যাই হোক, সামাজিক মূল্যবোধের ছ্যাবলামি, ন্যাকামি বা ভাঁড়ামি, মধ্যবিত্তীয় ভ-ামি, প্রেম-পিরিতি-নারী-নারীর শরীর-যৌনতা নিয়ে প্রকাশ্যে শুদ্ধাচারের অভিনয়কে এবং অন্ধকারে হিং¯্র মাংসলোভী উন্মাদ জন্তুর মতো হয়ে ওঠার আরূঢ় ভ-ামিকে প্রশ্রয় দেবেন না। শিল্পের জন্য জীবনের সমস্ত লোভনীয় সুখ-ঐশ্বর্যের পথ ছেড়েছেন, তাই শিল্পীর দায় ও দাবির প্রশ্নে দীর্ঘ লেখক জীবনে কখনই আপস করেননি। খেলারাম খেলে যা, ঈর্ষা এবং আরও বেশ কিছু মহৎ সৃষ্টি সম্পর্কে উন্মুক্ত যৌনতার বাড়াবাড়ির যে অভিযোগ উঠেছিল একদা এবং এর প্রেক্ষিতে শিল্পীর ব্যক্তিজীবনকেও ছাড় দেয়নি নিন্দুকেরা, তারই সামান্য প্রত্যুত্তর তিনি দিয়েছেন প্রণীত জীবন-এ। তাঁর ভাষ্যে, ‘নিজের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে দেখার কঠিন নিরাসক্তি আমি অর্জন করেছি বাল্যেই;’। তাঁর কাছে লেখালেখি আর কিছুই নয়, জীবনকে নিংড়ে দেখা, জীবন-জগতের স্বরূপ উপলব্ধি করা এবং কলম-কালির শৈল্পিক আঁচড়ে উপলব্ধিগুলোকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

প্রেম, নারীর শরীর-সান্নিধ্য, যৌনতা, শিল্প, শিল্পী সবই বড় লেখকের স্বনির্মিত নিরাসক্তির চোখে দেখেছেন সৈয়দ হক তাঁর কাব্যনাটক ঈর্ষায়। ঈর্ষা দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়, কিন্তু সাধারণ মানুষ তো বটেই, মহৎ মানুষের জীবনেও ঈর্ষার অনুভূতি একটি অনিবার্য বাস্তবতা। বস্তুত, প্রাণিজগতের কোনো প্রাণিই ঈর্ষার বাইরে নয়। ঈর্ষা কখনও কখনও অস্তিত্ব ও বিকাশের প্রধান শক্তি; বিপরীতে, অশান্তি, বিরোধ-ধ্বংস, এমনকি খুন-বিনাশের মতো ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে ঈর্ষার কারণেই। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ঈর্ষা হয়তো দুটি ব্যক্তির জীবনকেই জটিল করে, সম্পর্ক নষ্ট করে কিন্তু জাতিতে জাতিতে বা রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে ঈর্ষা সামষ্টিক জনগোষ্ঠীর জীবনে ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনে। সৈয়দ শামসুল হক ঈর্ষার সম্পূর্ণ নতুন একটি রূপকে বিষয় হিসেবে নির্বাচন করেছেন। নাটকের জন্য ঈর্ষার নির্দিষ্ট রূপ চিহ্নিত করে ভূমিকায় লেখক জানিয়েছেন ‘ঈর্ষার অন্তত একটি রূপ আছে যা সর্বাংশে মানবিক এবং অপর প্রাণীদের ভেতরে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত, সেটা হলো ব্যক্তি নিজেই যখন নিজের প্রতি ঈর্ষান্বিত, ব্যক্তি যখন নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী। এ কথা অতিপ্রসংগ যে, প্রাণীজগতের একমাত্র মানুষই পারে তার নিজের ভেতরে একাধিক ব্যক্তিত্ব অনুভব করতে।’ চিহ্নিত এই ঈর্ষাকে শিল্পে রূপ দেবার জন্যে সব্যসাচী লেখক তাঁর লেখালেখির বহু ক্ষেত্রের মধ্যে কাব্যনাটককেই বেছে নিলেন সম্ভবত এই কারণে যে, আর কোনো মাধ্যমে ঈর্ষার কাক্সিক্ষত রূপ নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব ছিল না। মানুষের জীবনে ঈর্ষার স্বরূপ নিয়ে তীব্র জীবনপ্রেমী এই সব্যসাচী লেখকের দীর্ঘকালের গভীর উপলব্ধি ও পর্যবেক্ষণ আছে :

ঈর্ষা আমি দীর্ঘকাল অবলোকন করেছি, দীর্ঘদিন এর সঙ্গে ঘরবাস করেছি, জীবনের সকল প্রসঙ্গের ভেতরে প্রেম ও দেহ সংসর্গে স্থাপিত ঈর্ষাই আমার কাছে একমাত্র গ্রাহ্য হয়েছে। শিল্পে আমি ঈর্ষাকে যখন স্মরণ করি, অনিবার্যভাবে মনে পড়ে যায়, এবং আমার মতো অনেকেরই নিশ্চয়, শেক্সপীয়রের ‘অথেলো’Ñঈর্ষার নির্যাস নিয়ে এর চেয়ে অক্ষয় রচনা আমার জানা নেই। কিন্তু সেখানেও একদিন আমি আবিষ্কার করি যে, অথেলোর ঈর্ষা এমন ঈর্ষা নয় যা সম্পূর্ণ মানবিক, সৎ অর্থে ‘পশু’ শব্দটি ব্যবহার করে বলতে পারি পশুদের ভিতরেও মোটা দাগে অথেলো-র প্রায় অনুরূপ ঈর্ষা এবং পরিণামে হত্যা-সংঘটন দুর্লক্ষ্য নয়। অচিরেই আমার এই সিদ্ধান্তের সূত্র ধরে আমি অগ্রসর হই, এবং অনুসন্ধান করতে থাকি ঈর্ষার এমন কোনো রূপ যা কেবল মানবের ভিতরেই প্রকাশিত হওয়া সম্ভব।

[ঈর্ষা’র ভূমিকাংশ]

 

মাত্র সাতটি দীর্ঘ কাব্যময় সংলাপ এবং তিনটি অঙ্কনশিল্পীর চরিত্র দিয়ে নির্মিত সৈয়দ শামসুল হকের নিরীক্ষামূলক কাব্যনাটক ঈর্ষা। খ্যাতিমান প্রৌঢ় শিল্পী এবং তার ছাত্র যুবক শিল্পীর বাস্তব ও শৈল্পিক জীবনের দ্বন্দ্ব ও ঈর্ষার কারণ এক যুবতী অঙ্কনশিল্পী। প্রেম, শরীর, নারীত্ব, পৌরুষত্ব সবকিছুই শিল্পের দিকে ধাবমান। শিল্পী রক্তেমাংসের মানুষ, তাই জীবনের বাস্তব প্রয়োজনগুলোকে সে কখনই অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু প্রথা ও নিয়মের কোন সড়কেই তিনি হাঁটেন না, স্বনির্মিত একটি জীবনরীতিতে স্বাধীনভাবে বিচরণ করেন তিনি। তার প্রেম, তার শারীরিক চাহিদা, ক্রোধ-লোভ-ঈর্ষা সবকিছুই তার শিল্পের অনুগামী ও অনুগত। তাই শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, প্রথাগত কোনো বন্ধনকেই শিল্পী স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানান, ক্ষেত্রবিশেষে সংঘর্ষে লিপ্ত হন। দিনের পর দিন প্রৌঢ় শিল্পীর ন্যুড হয়ে, বস্ত্রহীন হয়ে, এমনকি ভালোবেসে এবং নারীত্ব সমর্পণ করে আখেরে যুবতী তার প্রেমিক যুবককেই বিয়ে করে এবং বিয়ের আসর থেকেই সংবাদ দেবার জন্যে ছুটে আসে প্রৌঢ়ের কাছে। এই বিয়েকে অস্বীকৃতি জানিয়ে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে প্রৌঢ় শিল্পী; এবং যুবতীর প্রতি তাঁর চলমান অধিকারে অনড়। যুবতীর দেওয়া উপহার এবং প্রেমের স্বীকৃতিচিহ্ন ফুলদানি ছুঁড়ে মারে তীব্র ক্রোধ-আক্রোশে এবং ঈর্ষায় :

[১] না, যাবে না, যেতে পারবে না, যেতে আমি তোমাকে দেব না।

এভাবে যেতে তুমি পারবে না। ‘আমি বিয়ে করেছি’Ñ

এ কথা বললেই সব শোনা, সব বলা শেষ হয়ে যায় না।

একবার এসে গেলে, একবার চৌকাঠ পেরুলে

আমাদের সমস্ত চৌকাঠ পাহাড় হয়ে বাধা দেয়।

[২]  না, উঠবে না। Ñযাবে না। চলে গেলেই কি সব চলে যায়?

মুছে যায় ক্যানভাস? মুছে যাবে তোমার সমস্ত ন্যুড?-

নগ্ন ঐ শরীরের সব রঙ?

[৩]  স্বামী বলব না, ইচ্ছে করে। আর কেউ স্বামী নয়,

আর কেউ স্বামী হতে পারে না তোমার;

আমি স্বীকার করি না, আমি করব না,

যতই বলো না কেন, ‘আমি বিয়ে করেছি আজকে’।

[৪]  বাহ, তবে স্পর্শের অধিকার নেই আর? আঙুল ফেরালে?

এত ঘৃণা? অসহ্য এতই? এতই দূরত্ব আজ?

 

এভাবেই চলে প্রৌঢ় শিল্পীর তীব্র বাক্যবাণ। তারই অবাধ্য ছাত্রের কাছে পরাজয় এবং যুবতীর প্রেম ও শরীর হারানোর মানবীয় আতঙ্কে প্রায় দিশেহারা প্রৌঢ়। যুবতীকে উদ্দেশ্যে করে তার অভিযোগ, ক্রোধ, ঈর্ষা, স্মৃতিচারণ ও প্রেমের স্বরূপ নির্ধারণ সবই রক্তমাংসের স্বাভাবিক একজন মানুষের, শিল্পীর নয়। বিয়ে নামক সামাজিক প্রথায় মুহর্তেই নিজের প্রেমিকা পর হয়ে পরপুরুষের অধীন হয়ে গেলে কোনো প্রেমিকই তা সহজে মেনে নেয় না। প্রৌঢ় শিল্পীও তাই করে। জিজ্ঞাসা আর প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে যুবতীকে। এতদিনের দৈহিক-মানসিক মিলন, এত স্বপ্ন, বিশ্বাস, ভরসা সবই কী তবে অর্থহীন, শুধুই মনে-দেহের সময়ের খেলা আর খেয়াল? ‘বিয়ে মানে সবকিছু ভুলে যাওয়াÑ/একটি দস্তখত কিংবা কলমার উচ্চারণে সবকিছু ভুলে যাওয়া? সব কিছু?’ সব ব্যর্থ প্রেমেই এই জিজ্ঞাসা উঠে আসে। শিল্পীর সমস্ত জিজ্ঞাসা শুধুই যুবতীকে ঘিরে তা নয়, আত্মজিজ্ঞাসাও বিপুল। শিল্পীর মনে যখন কোনো দৃশ্য, স্মৃতি বা নারীর প্রেম স্থায়ীভাবে ঠাঁই করে নেয়, তখনি শিল্পের ভাষায় তার অনুবাদ হয়। আর শিল্পীর অনুভূতিপ্রবণ মনে যে নারী একবার তার অস্তিত্বের চিহ্ন আঁকে, সেই নারী কখনই বিস্মৃত হয় না। “শেষ শয্যায় নীরব রীবন্দ্রনাথ, ব্যাকুল দুচোখে/শুধু কাকে যেন খুঁজতেন; কেউ কেউ এমনও বলেছে, মৃদুস্বরে শোনা গেছে/‘বৌঠান’ বলে তাঁর উচ্চারণ।Ñবৌঠান?Ñমানুষ কিভাবে কিসে কার কাছে বাঁধা পড়ে যায়Ñ কেউ জানে?” কোন কৈশোরে রবীন্দ্রনাথ বৌঠানকে ভালোবেসেছিলেন বলে যে প্রচলিত ধারণা আছে, তারই অপূর্ব শৈল্পিক উচ্চারণ এখানে পাই। মানুষের জীবনের এই দুর্জ্ঞেয় রহস্যের ফাঁদে পড়ে গেছে প্রৌঢ়শিল্পী। খাঁচার হরিণী দেখার মুহূর্তে ছাত্রী যুবতীকে তার চোখে ধরে এবং বড় শিল্পী হবার স্বপ্নে স্বেচ্ছায় যুবতী প্রৌঢ়ের কাছে এলে প্রথমেই ‘স্যার’ সম্বোধনে ঘোরতর আপত্তির মধ্যেই স্পষ্ট হয়, শিল্পীর চোখের সাথে আরও একটি চোখ এসে জুড়েছে; এ চোখ কামনার। জয়নুল আবেদীনের স্মৃতিসত্তায় ঠাঁই করে নেওয়া সুবজ ধানের ক্ষেত্রের লাল শাড়িপরা সেই নারী, যে নারীকে মৃত্যুর পূর্বেও বিয়ে করার সাধ জেগেছিল জয়নুলের মনে, সে নারীটির মতোই যুবতীকে লাল শাড়ি পরতে বলে এবং পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদীতে বেড়াতে গেলে প্রৌঢ় শিল্পীর মানুষসত্তা জেগে ওঠে; যুবতীর শরীর ও শাড়ির ডিপ ভারমিলন শিল্পীর দুচোখে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং সে রাতেই জীবনে প্রথম ন্যুড আঁকেন। অর্থাৎ প্রেমের প্রথম আবির্ভাবের প্রবল উত্তেজনা-দ্বিধা-দুর্ভেদ্য টান সক্রিয় হয়ে ওঠে প্রৌঢ় শিল্পীর মধ্যে :

সামান্য মানুষ আমি, চাই তাকে রক্তমাংসে

মেদ মজ্জায়, বস্ত্রহীন আলিংগনে, তরল আঁধারে চাই তাকে আমি

আমার শয্যায়, পাশে, রক্তের উত্তাপে চাই, চাই দেখতে

নৌকার গলুইয়ের চোখে।Ñ আমি তো তোমাকে জানি

শরীর কি ভয়াবহ মত্ততায় টান দেয় তোমার শরীর

দৃঢ় হয় স্তন, উত্তাল হয়ে ওঠে দেহ, পদ্মকাঁটা ফুটে ওঠে নিতম্বে তোমার।

না, মুখ ফিরিয়ে নিও না, তুমি তো নিজেও শিল্পী, তুমি জানো,

তুমিই তো জানবে, যে, স্তন, পিঠ, নিতম্ব বা যোনিকেশ

মানুষের উচ্চারণে রূপ তার যাই হোক, শিল্পীর কাছে, শিল্পের কাছে,

তুলিতে, ক্যানভাসে রঙে দেহহীন, শরীর বিযুক্ত বটে এসবÑকেবল

আকৃতি মাত্র, ব্যাস-ব্যাধ-তল নিয়ে এই সবই জীবিতের প্রেমের আকার।

প্রৌঢ় শিল্পীর আত্মজিজ্ঞাসার বৈপরীত্য সাংঘর্ষিক। একনিষ্ঠ প্রেমিকের মতোই যুবতীর প্রতি তার দাবি, অধিকারবোধ নিয়ে কথা বলে, অভিমান-অভিযোগের অন্ত নেই, ক্রোধ-ঈর্ষাও আছে; এবং প্রেমিকা কর্তৃক প্রতারিত বা প্রত্যাখ্যাত প্রেমিক পুরুষ যেমন ভয়ঙ্কর বিধ্বংসী, আত্মঘাতী ও প্রতিশোধ-উন্মত্ত হয়ে ওঠে, প্রৌঢ় শিল্পীর মধ্যেও তাই দেখি। ‘দুজনের মাঝখানে একজন যুবক আজ? প্রতিদ্বন্দ্বী একজন যুবকÑ আমারই একজন ছাত্র?/যাকে আমি নিজ হাতে ব্রাশ ধরে টান-টোন শিখিয়েছি?-/সে তোমাকে নগ্ন করে দেখেছে কি? এরই মধ্যে শোয়া হয়ে গেছে?’ যুবতীর স্বামীকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবার মধ্যেই প্রৌঢ়ের মধ্যে প্রকৃত প্রেমিকের সত্তা জেগে ওঠে। শিল্পকলা একাডেমির গ্যালারিতে তাঁর আঁকা যুবতীর নগ্ন শরীরের ন্যুড প্রদর্শনী করে যুবতীকে ঘায়েল করার বাসনাও জেগে ওঠে চকিতে। বিপরীতে, যুবতীর প্রেম নয়, শরীর-মাংসের প্রতি তার সম্পূর্ণ লোভ, দুর্বলতা। শরীরের সুখ-উত্তাপ বঞ্চিত হচ্ছে বলেই মুখের শিকার হারিয়ে ফেলা জন্তুর মতোই তীব্র ক্রোধে উন্মত্ত। যুবতীর শরীরের প্রতি অমোঘ টানকে অস্বীকার করেনি। প্রৌঢ়ের প্রথম সংলাপে শিল্পীসত্তার চেয়ে  জৈবিক সত্তাই শক্তিশালী।

বড় শিল্পী হবার বাসনা নিয়ে বড় শিল্পীর সান্নিধ্যে এসে তিস্তাপাড়ের যুবতী নারী জীবনের কঠিন এক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ায়। এক যুবককে ভালোবাসে, তবু কেন প্রৌঢ় শিল্পীর পাতা ফাঁদে পা ফেলেছে, শুধুই কি বড় শিল্পী হবে বলে নাকি ফ্রয়েডিয় মনোবিকলন তত্ত্বের প্রতিফলন ঘটে গেছে? প্রৌঢ়ের পৌরুষত্বের কাছে নাকি শিল্পের বাজিকর যশস্বী শিল্পীর সম্মোহনী শক্তির কাছে নিজেকে স্বেচ্ছায়  সমর্পণ করেছে যুবতী? যুবতী একাধিকবার নিজেকে নির্বোধ বালিকা বলে দাবি করে অর্থাৎ যুবতীর এই সমর্পণ বোধবুদ্ধি ও যুক্তির বাইরে। প্রৌঢ়ের ইচ্ছামতো লাল শাড়ি পরে কালীগঙ্গা নদীতে ভ্রমণ, নৌকায় বসে মাথার ভেতরে নদীর সিরিজ ছবি আঁকাআঁকি, নৌকার দুলুনির এক ফাঁকে নিজের অজান্তেই প্রৌঢ়ের অধিকারে চলে যায় শরীর, এতই মত্ত যে বুড়ো মাঝির উপস্থিতিতেও তোয়াক্কা নেইÑএকদিকে শরীর প্রৌঢ়ের অধিকারে, অন্যদিকে মাথার ভেতরে জলরঙে নদীর ছবি আঁকার ঘোর; ঘোর কেটে গেলে নিজের ঠোঁটে শিল্পীর আস্বাদ অনুভব এবং ফেরার পরে ব্রিবত বালিকার মতো লজ্জায় শিল্পী থেকে স্বেচ্ছায় দূরত্ব রচনার মধ্যে দিয়ে যুবতীর দ্বিধাজড়িত প্রণয়ের সূচনা ঘটে। বাস্তব কারণেই নবজাগ্রত এই প্রেমকে যুবতী আড়াল করেছে তার প্রেমিক যুবকের কাছে। একই মনে যুবক ও প্রৌঢ়ের প্রেম নিয়ে যুবতীর মনে দ্বিধা-ভয়কেও এক পর্যায়ে জয় করেছে। প্রেমের প্রথম আহ্বান ও প্রেমিক পুরুষের প্রথম স্পর্শের মতোই যুবতীকেও ভেতর-বাইরে উত্তাল করে তোলে। প্রৌঢ়ের শারীরিক আগ্রাসনকে এক পর্যায়ে স্বীকৃতি দিয়ে ফুলহীন ফুলদানি উপহার দেয় এই বলে, ‘আমি তো এসেছি।’ বস্তুত, যুবতীর এই যাওয়া এক অর্থে শিল্পের কাছেই যাওয়া। তাই, শিল্পীর ন্যুড আঁকার জন্যে নগ্নিকা হতে তার দ্বিধা নেই। শিল্পের প্রয়োজনেই শিল্পীর প্রৌঢ় শরীরে জ্বলে ওঠা কামনার আগুনে নিজেকে দগ্ধ করে যুবতী। প্রৌঢ় শিল্পীর মতো বড় শিল্পী হবার স্বপ্নই যুবতীকে এতদূর পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছে। প্রৌঢ়ের শিল্পের প্রতি প্রেমই যুবতীর প্রেম। বাস্তবে, প্রৌঢ় নিজেই শিল্পের অবমাননা করেছে। যুবতীর শিল্পপ্রেম ও শরীরকে গ্রহণ করেছে রক্তমাংসলোভী জান্তব মানুষের মতো, শিল্পীর মতো নয়। প্রেম নয়, যুবতীর শরীরই প্রৌঢ়ের একমাত্র লক্ষ্য :

[১]  আপনার হাহাকার ভালোবাসা হারানোর জন্য নয়

বরং তা শরীরের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবার শোকে।

[২]  যার অনিবার্য উপস্থিতি আমাদের শিল্পের অঙ্গনে,

আমাকেই আজ তবে একটানে পর্দা সরিয়ে তাকেই দেখাতে হবে তাঁর ক্যানভাসে কোন ছবি নেই, আছে শুধু অসুস্থ বমন।

[৩] প্রতিশোধ? প্রতিশোধ? প্রেম তবে প্রতিশোধে পরিণত হয়?

[৪] আমার হৃদয় নয়, আমার শরীর, শরীরে, শরীরে শুধু,    শরীরের ত্বকে

ত্বকের গভীরে নয়-মাংসের উত্থান-পতনে, মেদময় স্তনে ও নিতম্বে, আমার ত্রিভুজে সন্ধান করেছেন আপনারই শিল্প প্রতিভাকে।

দেশের খ্যাতিমান প্রৌঢ় শিল্পীর মিথ্যাচার ও প্রতারণা যুবতীকে নিদারুণভাবে স্বপ্নাহত ও সংক্ষুব্ধ করে এবং আদর্শিক সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ¯্রফে জান্তব মানুষের মতো যুবতীর শরীর-সংস্থানের প্রতি প্রৌঢ় শিল্পীর আকর্ষণ মূলত প্রেম, নারীত্ব ও শিল্পের চূড়ান্ত অবমাননা। নারীর মনের গহীনে ভাষা, আঁকা ছবি, স্বপ্ন-কল্পনা সন্ধান না করে শিল্পী রক্তমাংসের শরীরের আকার-আকৃতি নিয়ে মত্ত; এবং যুবতীর শরীরই তার শিল্পের বিষয়। যুবতীর ব্যক্তিগত প্রেম-বিশ্বাস, এমন কি শিল্পের প্রেম শেষপর্যন্ত মাংসলোভী এক প্রৌঢ়ের প্রতারণার শিকার হয়। প্রাথমিক এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হবার পরে বড় শিল্পীর নয়, মুখোশ পরিহিত এক প্রতারক শিল্পীর মুখোমুখি হয়ে চ্যালেঞ্জ ছোড়ে যুবতী: ‘যদি ইচ্ছে হয় করুন প্রদর্শনী আমার সিটিং থেকে আঁকা আপনার/ নগ্নিকা সিরিজ দিয়ে। যাবো আমি, আমার স্বামীও যাবে উদ্বোধনীর দিনে।/ এবং সে ছবিগুলো দেখে মানুষেরা নেবে, না আমাকে নয়, আপনাকে চিনে।’ বস্তুত, এখানেই যুবতী পূর্ণ মানুষ ও শিল্পী হয়ে ওঠে।

যুবতীর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবার মতো নৈতিক বা শৈল্পিক মনোবল অবশিষ্ট নেই প্রৌঢ়ের, তাই দুই হাতে মুখ ঢেকে নিজেকে আড়াল করে; কিন্তু আড়াল আর আড়াল থাকে না। এরইমধ্যে যুবতীর প্রেমিক এবং সদ্য স্বামী হওয়া যুবক এসে দাঁড়িয়েছে চৌকাঠে। যুবতীর শেষ তিনটি বাক্য যুবক শুনেছে। ফলে এবার লড়াই আর দ্বিপাক্ষীয় নয়Ñ ত্রিপাক্ষিক। ছাত্রÑশিক্ষক-প্রেমিকা-স্বামী-স্ত্রী জটিল এক সম্পর্কের জাল তৈরি হয়েছে তিনজনের মধ্যে। প্রৌঢ় শিল্পী ও যুবতীর প্রণয়যুদ্ধের মধ্যে যুবকের অবস্থান আর এক জটিল বিন্দুতে। একদিকে তারই শিক্ষাগুরু, অন্যদিকে দীর্ঘকালের প্রেমিকা এবং সদ্যবিবাহিতা স্ত্রীÑ একজনও দূরের কেউ নয়, জীবন-অস্তিত্বের অংশী। মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করার প্রোজ্জ্বলিত গৌরবের অধিকারী যুবক ব্যক্তিগত এই সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এতকাল ভালোবেসে এসেছে যাকে এবং বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে, সেই যুবতী আড়ালে প্রৌঢ় শিল্পীর দেহলিপ্সার খোরাক হয়েছে, দিনের পর দিন বস্ত্রহীন দেহ উপহার দিয়েছে শিল্পীকে। শুধুই কি দেহ, মন কী দেয় নি? ‘সমস্ত শরীর খুলে যার কাছে দাঁড়াতে পেরেছ,/ গোপন কি রাখতে পেরেছ মন তার কাছে থেকে?’

যুবক নিজে একজন শিল্পী, মুক্তিযোদ্ধা; তাই যুক্তি খুঁজেছে, কেন  সে এই প্রতারণার শিকার একং কেন জীবনের এই নির্মম বিপর্যয়? একদিন গ্রেনেড হাতে নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করেছে, কিন্তু ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের মুখে যুবকের কিছুই করার নেই। বিনা অপরাধে এই বিপর্যয় মেনে নিতেও অস্বীকৃতি জানায়। ইচ্ছে করলেই প্রৌঢ় শিল্পীর ক্যানভাস থেকে তার প্রেমিকার নগ্ন ছবিগুলো নামিয়ে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে নিশ্চিহ্ন করার বিধ্বংসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে যুবক। কিন্তু প্রৌঢ় শিল্পী তার শিক্ষক এবং যুবক নিজেও শিল্পী, তাই আঘাত করলে সেই আঘাত নিজের দিকেই ফিরে আসবে। শিক্ষক হয়ে ছাত্রের প্রেমিকার শরীর-মন দখলে নেবার জন্যে নৈতিকতার প্রশ্ন তোলা যায়; কিন্তু সেই প্রশ্নও দুর্বল হয়ে ওঠে, যদি প্রেমিকা প্রৌঢ়ের কাছে ধরা দেয় স্বেচ্ছায়। আবার, ‘আমার দুচোখে আমি তুমি ছাড়া কাউকে দেখিনি;/বাংলার সবটুকু শ্যামলতা নিয়ে আমার হৃদয়জুড়ে ছিলে তুমি। তোমাকেই মনে হতো বাংলাদেশ;’Ñএরকম বিশ্বাস আর প্রেমের জায়গায় যুবতীর এহেন প্রতারণা যুবকের কাছে বিস্ময় এবং মেনে নেয়া কঠিন :

তুমি শুনেছো আমার কথা ‘ভালোবাসি’;

আমি শুনেছি তোমার-নদীর ¯্রােতের মতো কণ্ঠস্বর, ‘ভালোবাসি।’-

হায়, ভালোবাসা; এই তবে ভালোবাসা?-এই হচ্ছে প্রেম?-

অখ্যাত শিল্পীর সঙ্গে স্কেচপ্যাড নিয়ে সারাদিন মাঠঘাট চষে,

বেলাশেষে তাড়াতাড়ি  হোস্টেলে ফেরার নামে বিখ্যাত শিল্পীর ঘরে প্রবেশ

এবং নগ্ন হয়ে সারারাত সেখানে কাটানো। এই তবে রীতি?-এই তুমি?-

আমার স্বপ্নেরা সঙ্গী এই তার আসল চেহারা?-এ কী শুধু খ্যাতির লালসা?

ক্যানভাসে অমর হয়ে থাকবার মোহ?Ñ নাকি, প্রেম?-তোমার আসল প্রেম

এখানেই তবে?-আমাকে যা দিয়েছিলে, অভিনয়?…

বিছানায় কতবার গিয়েছো এবং এমন কি আকর্ষণ যে সদ্য বিয়ে করা স্বামী

তাকে ফেলে আসতে হলো?-আজকেই?Ñ না,

এ আমার ঈর্ষা নয় তোমার গোপন এ প্রেমিকের জন্যে

শুধু সত্য জানার আগ্রহ, দেখার তুমুল সাধÑ মানুষ কিভাবে

একজন মানুষের সবটুকু নিয়ে কেমন মসৃন কণ্ঠে বলতে পারে, ‘সমস্ত দিয়েছি’।

যুবক একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্মে তার ত্যাগও বড়। মুক্তিযোদ্ধা হবার অপরাধেই তিন ভাইকে খুন হতে হয় রাজাকার ও পাকিস্তান আর্মির হাতে; দুই ভাবি ধর্ষিত হয়; ধর্ষিতা এক ভাবির আত্মহত্যা করে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির পিতার হত্যার মধ্য দিয়ে পরাজিত শক্তির পুনরুত্থানের পরে যুবতী বোন ধর্ষিত হয় ক্ষমতাসীন দুর্বৃত্তের দ্বারা। এত ত্যাগের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যেমন পুরনো শকুনের নখের মুঠোয়Ñ‘বাংলার চারদিকে এখন কান্নার শব্দ, বাগান গোরস্তান,/গাছে গাছে শকুনের পাল বসে আছে;’ ঠিক তেমনি তার শিক্ষক একই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তার হৃদয় জুড়ে থাকা স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশের মতোই তার স্বপ্নের প্রেমিকাকে লুট করে নিয়েছে প্রৌঢ় শিল্পী নিজের যশ ও ক্ষমতার জোরে। ‘জীবনের প্রতারণা শিল্পে ছায়া ফেলে’Ñ তাই প্রৌঢ় শিল্পীর প্রতারণাও শিল্পের জন্য অশুভ। এরপরেও প্রৌঢ় শিল্পীর প্রতি যুবকের ব্যক্তিগত কোন ঈর্ষা, ঘৃণা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা প্রতিহিংসা নেই। যুবকের ঈর্ষা তার প্যালেট-ব্রাশ-ক্যানভাসকে। এমনকি সরল হৃদয়ে প্রেমিকা ও স্ত্রীর প্রতি সমস্ত অধিকার ত্যাগেও তার কোন দ্বিধা নেই। কাবিননামা একখ- কাগজের দস্তখত মাত্র, সামাজিক স্বীকৃতির বাইরে ব্যক্তির সম্পর্কের কাছে কোন মূল্য নেই। প্রেমিকার প্রতি এবং শিক্ষক ও বড় শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই যুবকের এই মহৎ ত্যাগ। এই ত্যাগের মহিমায় যুবক তার শিক্ষকের চেয়ে বড় শিল্পী হয়ে ওঠে। নারী বা নারীর প্রেম যুবকের সাথে প্রতারণা করেছে কিন্তু শিল্পে এই প্রতারণার ঠাঁই নেই, যুবকের অবশিষ্ট জীবন কেটে যাবে শিল্পের আশ্রয়েই :

প্রেম যদি প্রতারণা করে তবে শিল্প দেবে আমাকে আশ্রয়।

আমার শিল্পের হাত কেড়ে নেয় আছে কার সাধ্য?

এই নারী আপনার।

যুবতীর প্রেমকে দুই শিল্পীপুরুষ প্রৌঢ় ও যুবক পরস্পরকে উপহার দিয়ে নিজেরা উদার হবার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। প্রৌঢ় শিল্পী প্রেমিক নয়, পিতার কন্যা সম্প্রদানের মতো যুবতীকে তার ছাত্রের হাতে তুলে দেয়, ‘সে তোমারই, সে আমার নয়’ বলে; একইভাবে, ‘এই নারী আপনার’ বলে প্রেমিক যুবক তার প্রেম শিক্ষক ও  অগ্রজ শিল্পীকে নিঃশর্তে উপহার দিয়ে মঞ্চ ত্যাগ করে। এই পরস্পরের উপহার বিনিময়কালে যুবতী দুই প্রেমিকের সম্মুখেই দ-ায়মান। কেউ আর যুবতীর প্রেম-শরীর কিছুই গ্রহণ করার অধিকার দাবি করে না অথবা দুজনেই অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। ফলে, যুবতী একা ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। যুবক মঞ্চ ত্যাগ করার সময় যুবতী চিৎকার দিয়েছিল, ছুটে গিয়ে ধরতেও চেয়েছিল কিন্তু মেঝের উপরে ছড়িয়ে থাকা ছবিগুলোয় হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। কিন্তু ঘর থেকে বেরিয়ে যুবকের পিছু  ছোটেনি। হোঁচট খেয়ে উঠে দাঁড়ানোর সময় প্রৌঢ় হাত বাড়ালে যুবতী প্রত্যাখ্যান করে, ‘নাÑআমি নিজেই দাঁড়াতে পারব আবার আমার পায়ের ওপর।/আমার লাগেনি। আর কিছুতেই কখনও আমার লাগবে না।’ আশৈশব লালিত শিল্পই যুবতীর পথ আটকিয়েছে। যুবতী এই চিরন্তন সত্যের মুখোমুখি, মানুষ মৌলিকভাবে একা, নিঃসঙ্গ; এবং তার লড়াইটাও একার লড়াই।

সঙ্গীহীন, প্রেমহীন, বন্ধুহীন এক অসীম একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতার মুখোমুখি যুবতী এবার তার প্রেমের প্রকৃত স্বরূপকে চিহ্নিত করতে পারে। প্রৌঢ় শিল্পীর প্রেম এবং যুবকের প্রেম—দুই প্রেম একই সঙ্গে যুবতীর জীবনে সত্য এবং এই দুই প্রেমই যুবতীর আরাধ্য। শিল্পের সংসারে যুবতীর প্রেম খ্যাতিমান প্রৌঢ় শিল্পী; আর সমাজ-সংসারে যুবতীর স্বামী ও প্রেম দুটিই যুবক। যুবতীর প্রত্যাশা ছিল, তার প্রেমের দুই সত্তার দুটিই প্রৌঢ় শিল্পী বা প্রেমিক যুবক জাগিয়ে রাখবে; কিন্তু তারা প্রত্যেকেই একটি করে সত্তাকে গ্রহণ করে। শিল্পের সংসারে প্রেমের ধর্মই হচ্ছে বহুত্বকে ঠাঁই করে দেওয়া। ‘ব্যক্তিগত প্রেম যদি এক পাত্রে ধরে যায় নিঃশেষ/অনিঃশেষ শিল্পের প্রেম বহু পাত্র পূর্ণ করেও।’

যুবক ও প্রৌঢ় শিল্পী দুজনেই জীবন সংসার আর শিল্পের সংসারকে গুলিয়ে ফেলেছে। তাই, যুবতীর প্রেমকে তারা গ্রহণ করতে পারেনি। প্রৌঢ় শিল্পী যুবতীর ভেতরে শিল্পবোধ জাগিয়ে তুলতে গিয়ে শরীর জাগিয়ে তুলেছে এবং শরীর-রক্তের খেলার সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। অর্থাৎ যুবতী ও শিল্পীর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে আলাদা হয়ে যায়। প্রৌঢ়ের প্রতি যুবতীর প্রেমের কোনো স্পষ্টতা নেই। যুবতীর এই দেহদান সম্পূর্ণ শিল্পের জন্য, প্রৌঢ়ের ভেতরের মহান শিল্পীর জন্য এবং বড় শিল্পী হবার লক্ষ্যে প্রৌঢ়ের প্রতিভা ও স্মৃতি গ্রহণের জন্য বিনিময় শোধ। অন্যদিকে, সামাজিক স্বীকৃতিপত্র কাবিননামায় দস্তখতের মধ্য দিয়ে যুবতীকে অধিকারে চায় যুবক। যুবকের এই প্রেমের প্রতিও যুবতীর সমর্থন আছে।

দুই প্রেমিক প্রতারণা করে বা অধিকার ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে যুবতী ভেতর-বাইরে চূড়ান্তভাবে নিঃসঙ্গ এবং একা হয়ে গেল। কিন্তু এই নিঃসঙ্গতা আবার যুবতীর জীবনানুভূতি ও শিল্পীসত্তার জন্যে শাপেবর হয়েছে। শিল্পের মৌলিক দাবিই হচ্ছে আমৃত্যু অনুসন্ধান, আমৃত্যু অতৃপ্তি, আমৃত্যু অপ্রাপ্তি। যুবতীর বাস্তব প্রেম এবং শিল্পপ্রেম দুটিই এখন বিরাট ক্যানভাসের অংশ। এখন যুবতীর লড়াই দুই প্রেমিকের প্রেম পুনরুদ্ধার করা। সংসার জীবনে যুবকের প্রেম এবং শিল্পের সংসারে প্রৌঢ়ের প্রেমকে অর্থাৎ নিজের জীবনে ও শিল্পে প্রেমকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে লড়াইয়ে নামতে হবে। শিল্পে ও জীবনে এই প্রেমকে অর্জন করতে হবে যুবতীকে; এবং অর্জিত প্রেমকে ধরে রাখার জন্যে প্রয়োজন হবে কঠিন তপস্যা :

আমাকেও এখন বেরিয়ে আজ নিঃস্বের অন্ধকারে খুঁজে নিতে হবে

সামান্য এ জীবনের অসামান্য দুটি অর্জন;

আমার স্বামীর প্রেমে সংসারের ব্যঞ্জনে লবণ,

আপনার প্রতি প্রেমে আমাদের শিল্পের ভুবন।

খাঁচায় হরিণ দেখার মুহূর্তে যুবতীকে মনে ধরা, যুবতীর প্রতি শারীরিক টান ও দখল, দীর্ঘদিন নগ্ন যুবতীকে সামনে বসিয়ে ন্যুড আঁকা এবং তারই ছাত্র যুবকের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা; যুবতীর প্রেম, বিয়ে ও স্বামীকে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন এবং শরীরের উপরে অধিকার ছাড়তে নারাজি; শেষে ছাত্র যুবকের মুখোমুখি হয়ে যুবতীর উপরে অধিকার ছেড়ে দেবার ঔদার্য্য প্রদর্শনের মধ্যেদিয়ে প্রৌঢ় শিল্পীর যে টানা লড়াই এবং সংঘাত তার সবটুকুই শেষপর্যন্ত তার নিজের সঙ্গে নিজের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। ব্যক্তিসত্তা ও শিল্পীসত্তার এই লড়াইয়ে প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে ঈর্ষা। এক সত্তা আর এক সত্তাকে ঈর্ষা করে অর্থাৎ এই রক্তমাংসের মানুষটি এখন নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী, ঈর্ষার পাত্র। ঈর্ষার বিষপান করে নীলকণ্ঠের মতোই নীল হয়ে যায়। চিত্রকরের হাতের রঙও একটিই এখন, ‘নীলÑঈর্ষার নীল’। প্রৌঢ়ের আত্ম-আবিষ্কার : শোক নয়, ক্রোধ নয়, নদী নয়, ছবি নয়,/আমার রক্তের ভেতর দিয়ে পাড় ভেঙে বয়ে যাচ্ছে ঈর্ষা কেবল।’ পেশাদার খেলোয়াড়ের মতো মানুষ বা শিল্পী কেউ কারও অধিকার তিলার্ধ ছাড়তে নারাজ, ‘দুজনেরই মুখের উপর দিয়ে এখন টসটস করে নামছে ঈর্ষার নীল।’

প্রৌঢ়ের আত্মদ্বন্দ্ব অত্যন্ত সংঘাতিক। জীবনের প্রত্যুষে কোনকালে রঙের মায়া চোখে ধরেছিল, সেই মায়ার পেছনে ছুটে জীবনের সর্বাংশ ব্যয় করে, কিন্তু সেই রঙ এখনও পায়নি কোন ছবিতে। প্যালেট বা ক্যানভাসে অবিরাম এঁকে গেছে যে বিমূর্ত ছবি, যার অর্থমূল্য বহু, তার কিছুই ছবি নয়, ‘ছায়া’ বা ‘উজ্জ্বল কল্পনা কঙ্কাল’ বৈ অন্য কিছু নয়। সারাজীবন অর্জিত প্রশংসা ও পুরস্কার, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি, বিপুল অর্থ, দেশ-বিদেশে ভ্রমণ, আচার্যের সম্মান সবই প্রৌঢ়ের কাছে অর্থহীন, ‘মিথ্যা প্রশংসার স্তূপ’। বস্তুত, এই প্রৌঢ় শিল্পী নিজেকে আবিষ্কার করে মানুষের মৌলিক একাকিত্বের জায়গা থেকে। তার সৃষ্ট সুবিস্তৃত শিল্পের জগতে মূলত ভয়াবহ একাকিত্বের সোনালি ফসল। এই ফসল জনমানুষের, তার নিজের জীবনের জন্য প্রায় মূল্যহীন। যে বাস্তব জীবন তিনি অতিবাহিত করছেন, যে নিঃসঙ্গতা তার অস্থিমজ্জায়, সেখানে শিল্পীর যশঃ-খ্যাতি-অর্জন সবই তীব্র শ্লেষের ও ঈর্ষার। এই ঈর্ষার লেলিহান আগুনে দগ্ধ প্রৌঢ় অর্জুনের ধনুর্বাণের মতো ঈর্ষার তির ছুঁড়ে মারে সমাজ-সংসার-যশঃ- অর্থবিত্ত-পুরস্কার-চাকরি সবকিছুর দিকে। প্রচলিত সবকিছুই ল-ভ- করে ফেলে। একদা ধনী সহপাঠিনীকে ভালোবেসেছিল, বাছাই করা তেলরঙের কিছু ছবি উপহারও দিয়েছিল, কিন্তু শিল্পীর ভালোবাসাকে মূল্য দেয়নি যুবতী, বিয়ে করে ধনাঢ্য এক যুবককে। এরপরে এক আমলার স্ত্রীর সান্নিধ্যে শারীরিক মেলামেশা, স্বামী রাষ্ট্রদূত হলে প্রাচীন সতী নারীর মতোই স্বামীর সঙ্গে বিদেশে সহগামী হওয়া; বেশ্যালয়ে বেশ্যার সান্নিধ্য, ছবিপ্রেমী নিঃসন্তান বিধবা এক নারীর সান্নিধ্য অর্থাৎ বিচিত্র নারী সান্নিধ্য ও প্রত্যাখ্যান প্রৌঢ়ের ভেতরের ঈর্ষার আগুনে ঘি ঢেলেছে। জীবনের অতীত পাপের প্রায়শ্চিত্ত এবং নারীদেহকে অপমানের প্রতিদানে একজন কুমারীর দেহকে রং-ক্যানভাসে স্থায়ী রূপ দেবার জন্যেই যুবতীর প্রতি প্রৌঢ় শিল্পীর চোখ পড়েছিল। অর্থাৎ সম্পূর্ণ শিল্পীর চোখেই যুবতীকে দেখেছিলেন এবং গ্রহণ করেছিলেন শিল্পী। আর এই জন্য জয়নুলের মানসকন্যার মতো লাল শাড়ি পরে নদী ভ্রমণের আমন্ত্রণ ছিল। এই সূত্রেই যুবক শিল্পীকে প্রৌঢ় বলেছেন, ‘একবার মিলিয়ে দ্যাখো যুবক, এ হাত তোমারই হাত।/ তোমারই হয়ে আমি এতকাল এই হাত বহন করেছি। এঁকেছি।/ তোমার সমস্ত প্রেম যার জন্যে তাকেই এঁকেছি।’ কিন্তু শিল্পী তো এক না, তার ভেতরে আর একটি জান্তব মানুষের বসবাস, তার চোখে যুবতী রক্তমাংসের মানুষ। ফলে যুবতীকে ঘিরে শিল্পী ও মানুষের লড়াই অনিবার্য হয়ে ওঠে। নিজের শরীরের রক্তের প্রমত্ত টানেই শেষপর্যন্ত যুবতীর শরীরের দিকে ধাবিত হয়। নৌকা ভ্রমণ থেকে এসেই জীবনে প্রথম ন্যুড আঁকেন বিমূর্ত ছবি আঁকার জন্য খ্যাতি পাওয়া শিল্পী। শিল্পী ও মানুষের মধ্যে এই লড়াই চলেছে নিরন্তর; ‘আমিই আমার প্রতিদ্বন্দ্বী, তোমাকে ভালোবেসে আমি একই সঙ্গে/জয়ী এবং পরাজিত, পূর্ণ এবং শূন্য, ধনী এবং নিঃস্ব।’ শিল্পী ও মানুষের এই লড়াই চলবে আমৃত্যু আজীবন; ঈর্ষা-ই এই লড়াইকে বাঁচিয়ে-জাগিয়ে রাখবে।

তুমি কি জানো তোমার ভেতরে যে এখন সে আমি এবং আমার?

তোমার নগ্নতার ওপর দিয়ে বহে যাচ্ছে যে নিশ্বাস সে আমার এবং আমার?

তুমি, তোমার রক্তমাংসের যে তুমি, আমি সেই তোমাকে চাই।

আমার ক্যানভাস হোক অমর, তোমার নদীতে আমি মরতে চাই।

শিল্পীর এই লড়াইয়ে যুবতীও থাকছে কিন্তু নির্বোধ বালিকা বা রক্তমাংসের বাসনাসর্বস্ব যুবতী হয়ে নয়, প্রৌঢ় শিল্পীর মতো প্রাজ্ঞ শিল্পী হয়ে, প্রৌঢ় শিল্পীর পরিপূর্ণ শিল্পীসত্তা হয়ে রঙ-ক্যানভাসে যুবতীর বিচরণ থাকবে। মঞ্চের পর্দা নেমে আসছে, প্রৌঢ়ের মাথা নুয়ে আসে মেঝেয়, চারদিক অন্ধকার করে সমস্ত আলো এসে পড়ে প্রৌঢ় শিল্পীর উপরে, দেখে যায়, প্রৌঢ়ের ‘কাঁধে হাত রেখে নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে যুবতী, কিন্তু এখন তার চুলে পাক ধরেছে। প্রৌঢ় তার দিকে মুখ তুলে তাকায় এবং তার হাতের উপরে হাত রাখে।’ প্রৌঢ়ের অতীত-বর্তমান জুড়ে অর্থাৎ তার দীর্ঘ শিল্পীজীবনে ছায়াসঙ্গী ছিল যুবতী ও তার প্রেম; এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। প্রৌঢ় শিল্পী দীর্ঘদিনের শ্রম-সাধনায় বিমূর্ত ছবির যে জগৎ নির্মাণ করেছেন এবং ভবিষ্যতে করবেন, সেখানে আছে এবং থাকবে যুবতী ও তার প্রেম।

শিল্পীর দ্বৈতসত্তার অপূর্ব শিল্পায়ন ‘ঈর্ষা’। এই ঈর্ষা শিল্পীর জীবনের অনস্বীকার্য নিয়তিও বটে। প্রৌঢ় শিল্পী এই নিয়তি দ্বারাই তাড়িত। প্রেম নয়, নারী নয়, নারী শরীর নয়. সম্মান বা অর্থবিত্ত নয়, এমনকি তার নিজের আঁকা ছবি কোনো কিছুই শিল্পীর মনে সন্তুষ্টি এনে দিতে পারে না। অতৃপ্তি-অপ্রাপ্তি-অসম্পূর্ণতা-অধরা রং-ছবির স্বপ্ন শিল্পীকে অস্থির করে রাখে। তাই শিল্পী বা মানুষ দুটি সত্তার একটি যদি যশস্বী হয় বা এগিয়ে যায় অন্যটি প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে, তখনি জন্ম নেয় আত্মঘাতী ঈর্ষার। ঈর্ষার এই রূপ প্রাণিজগতেরে অন্য কোনো প্রাণির মধ্যে নেই, কেবলমাত্র মানুষের মধ্যেই আছে, এবং বিশেষভাবে সৃজনশীল চিন্তা বা কর্মের মানুষের মধ্যে প্রবলভাবে সক্রিয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares