ক্রোড়পত্র জন্মদিনে- বাবার পায়ের আওয়াজ : দ্বিতীয় সৈয়দ হক

ক্রোড়পত্র জন্মদিনে

বাবার পায়ের আওয়াজ

দ্বিতীয় সৈয়দ হক

 

গত এক মাস ধরে যত বাংলা নাটক দেখেছি, তা বোধ হয় আমার বিগত দুই যুগেও দেখা হয় নাই। তার কারণও আছে। জীবনের অধিকাংশ সময়ই আমার কাটে লন্ডনে; সেখানে প্রায় ত্রিশ বছর বসবাস করার পর বলা যায় এক ধরনের বিলাতি-বাঙালি হয়ে অনায়াসে দিন কাটাচ্ছিলাম। তবুও, আমার বাবা সৈয়দ শামসুল হক  যে সেই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের একজন অন্যতম নাট্যকার হতে চলছেন, সে-কথা আমার জানা ছিল। এর কারণ, আমি তাঁর প্রতিটি মঞ্চ-নাটক সরাসরি চোখে না দেখলেও, তাঁর সাথে প্রায়ই সেগুলো নিয়ে কথা হতো। এটি ছিল আমাদের এক ধরনের রুটিন, বলা যায়। বাবা বছরে দুবার আসতেন লন্ডনে আমার সাথে দেখা করতে। প্রথমদিন প্লেন থেকে নেমে খুব হাল্কা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। পরদিন সকালে দেখতাম তিনি ভোরে উঠে গেছেন, ছিম-ছাম হয়ে এক কাপ চা ও দুটো বিস্কুট নিয়ে বসে আছেন খাবার টেবিলে এবং আমি, ঘুমে জড়ানো চোখে, তাঁকে জিজ্ঞেস করতাম, ‘বাবা, তুমি এখন কী লিখছ?’। প্রতিবার আমাদের দুজনার মধ্যে এই একই কথা। আমার জানা মতে বাবাকে খুব কম মানুষে নিয়মিত তাঁর কাজ নিয়ে সরাসরি এভাবে প্রশ্ন করত, অথবা এমনও হতে পারে যে, আমার এই ধারণা হয়, কারণ তাঁকে আমি লন্ডনে একা পেতাম বলে।

কিন্তু যা-ই হোক, আমি নিজেও একজন সৃজনশীল মানুষ হয়ে বুঝি যে যারা সৃষ্টি করেন, তাঁরা পছন্দ করেন তাঁদের কাজ নিয়ে পরিকল্পনার আলাপ করতে। অন্যের সাথে নিজের কাজের কথা বলে যেন এক ধরনের ফোকাস এসে যায় তাঁদের নিজেদের মনে। কিন্তু যে জিজ্ঞাসা করে, সে একান্ত আপনজন না হলে এসব কথা খুলে বলা যায় না। সেই একান্ত আপনের স¤পর্ক ছিল বাবা আর আমার মধ্যে। তাই, তাঁর শেষ জীবনের দিকে বিশেষ করে নাটকগুলো নিয়ে অনেক কথা হয় আমাদের মধ্যে। এক সময় যখন তিনি চিন্তা করেন, তিনি স¤পূর্ণ নাটকের ছক কেটে দেন আমার সামনে সেখানে তাঁর কী চিন্তাধারা কাজ করছে, কেন তিনি করছেন, কীভাবে করতে চাইছেন, সবই খোলামেলাভাবে আমার সাথে আলাপ করলেন। এমন একটি মানুষের মনের কথা হাতেনাতে শোনার সৌভাগ্য একটি সৌভাগ্য বটে। আমার বয়স যখন চল্লিশের কাছাকাছি, শুধুমাত্র তখন আমি সাহস পেলাম ঈর্ষার মতো একটি নাটক পড়তে। লন্ডনে আমার বাড়িতে শুরু হলো তখন বাবার সাথে দীর্ঘদিন ধরে আলাপ এই নাটকটি নিয়ে। এক সময়, বাবা বলেন, তাঁর বিশ্বাস এই নাটকটি দুশো বছর পরেও করা হবে। একটি শিল্পীর নিজের কাজের ওপর এভাবে ভরসা থাকা কম কথা নয়। বাবা বড় নির্ভয় ছিলেন তাঁর কাজের স¤পর্কে। কিন্তু বাবার জীবনের সবচাইতে বিখ্যাত যেসব নাটক তিনি দিয়ে গেছেন আমাদের, তখন কিন্তু আমি একদমই শিশু। কিন্তু তাই বলে যে, সেগুলোকে আমি আমার মতো করে উপলব্ধি করি নাই, সেটিও বলা ঠিক হবে না। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় যখন লেখেন, তখন আমার বয়স ছয়। বলাবাহুল্য যে, সেই বয়সে আমার নাটকটির কিছুই বোঝার কথা নয়; কিন্তু আমি সেটিকে ‘ঢ়ধ’ি-এর আওয়াজ, অর্থাৎ থাবার আওয়াজ বলে মনে করেছিলাম। সে-সময় আমি খুব জীবজন্তু, পশুপাখি নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, তাই হয়তবা একটি জন্তুর থাবার আওয়াজ হয়ত সেকারণেই মনে এসেছিল। একদিক থেকে কিন্তু ধারণাটি খুব একটি ভুল ছিল না, যদি আমরা নাটকটিকে সেভাবে পড়ে দেখি। এবং, আমি বলব, বাবা পায়ের আওয়াজ নিয়ে যে কাজ করেছেন, তিনি কিন্তু তারও আগে খেলারাম খেলে যা নিয়েও করেছেন। অর্থাৎ, একটি অ্যান্টি-হিরোকে দাঁড় করিয়েছেন মূল চরিত্রে। অনেক ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে এর কারণে, কিন্তু আমার ব্যক্তিগত ধারণা যে, মানুষ সে-সময় প্রস্তুত ছিল না এমন সব ধরনের চরিত্রকে মঞ্চের সামনে নিয়ে আসা। সেদিক থেকে বাবা ছিলেন দার্শনিক। যেসব ঘটনা আমরা এখনকার যুগে মেনে নিই স্বাভাবিক বলে, তখনকার দিনে অনেকে তাঁকে নিন্দা করেছে এবং দুর্নাম করেছে।

পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় লিখে বাবা নাকি বলেছিলেন যে, এমন একটি কাজের জন্যেই তিনি অপেক্ষায় ছিলেন। কথাটি বুঝতে গেলে জানতে হয় যে, বাবা কিন্তু কখনও নিজেকে ‘সব্যসাচী’ লেখক হিসাবে দেখতেন না। তাঁর মূল পরিচয়, নিজের কাছে, ছিল প্রথমত কবি হিসেবে, এবং তারপর নাট্যকার হিসেবে। এবং সেই কবিতা এবং নাটক যখন একত্র হয়ে কাব্যনাট্যে পরিণত হয়, তখন আমরা বুঝতেই পারি যে, এটি ছিল তাঁর কাছে মনের কথা প্রকাশ করার সর্বোত্তম পদ্ধতি। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় থেকে প্রেরণা পেয়ে, দর্শকের কাছ থেকে উৎসাহ পেয়ে, তিনি নেমে যান বাকি কাজগুলো করার পথে, যেমন নূরলদিনের সারাজীবন এবং ঈর্ষা ও অন্যান্য নাটক যেগুলো বাংলা থিয়েটারে রয়ে গেছে কিছু অবিতর্কিত মাইলস্টোন হিসাবে। কাব্যনাট্য লেখার সময় বাবাকে যেভাবে উৎসাহী ও নিবিষ্ট হতে দেখেছি, তাঁর আর কোনো কাজে তেমনভাবে দেখি নাই। ঢাকা শহরের নাট্যকর্মীরা আমার কাছে পরিবারের মানুষের মতো হয়ে যায় ছোটকাল থেকে সেই কারণেই। এবং তাঁরা এখনও তাই রয়েছে, বরং আগের চাইতেও বেশি। কেননা, বাবার নাটক দেখতে বসলে তো আমি আর কোনো রাজাকারকে দেখি না, দেখি না কোনো প্রেমে ব্যর্থ শিল্পীকে, আমি দেখি না নূরলদিন। যা দেখি, যা শুনি, শুধু মনে হয় এটি আমার বাবার কথা, তাঁর কথা অন্যের কণ্ঠে বেজে ওঠে মনে। ভাবি তিনি একদিন এসব কথা লিখেছিলেন, যেগুলো রয়ে গেছে আমাদের মাঝে। ভাবি যে তিনি আর নাই, কিন্তু তাঁর কথা আছে, তাঁর পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় যে এভাবে আমি এখনও পাই।

বাবা চলে যাবার পর থেকে তাঁকে নিয়ে লিখতে হয়েছে, বলতে হয়েছে, আলোচনা করতে হয়েছে বহু জায়গায়, বহুবার। একটি ছেলে হিসাবে বাবাকে হারাবার শোক এখনও ঠিকমতো করতে পারি নাই। প্রচুর দায়িত্ব রেখে গেছেন তিনি আমাদের ওপরে, বিশেষ করে আমার। একসময় হয়তবা দুঃখপ্রকাশ করতে পারব, কিন্তু সেই দুঃখও যে আমার ব্যক্তিগত নয়। আমি জানি বাবার পরিবার, বাবার আপনজন, আমাকে ছাড়িয়ে অনেক বড়, বিশাল একটি পরিবার। দুঃখ তাঁদেরও। কেউ হারিয়েছেন বন্ধু, কেউ হারিয়েছেন শিক্ষক, কেউবা হারিয়েছেন তাঁদের ভাই। সেই কথা চিন্তা করে লিখে যাই বাবাকে নিয়ে। আমি জানি তিনি এটিই আশা করতেন আমার কাছ থেকে। মারা যাবার কদিন আগেই তাঁকে কথা দিয়েছি যে আগামী বছরের মধ্যে আমি তাঁর ঈর্ষা নাটকটির ইংরেজি অনুবাদ করে ফেলব। তাই, সেভাবে শোক করার সময় যে আমার একদম হাতে নাই। ঈর্ষা নিয়ে বসেছি, আবারও শুনতে পাই বাবার গলা, আবারও ভাবি তাঁর কথা। নাটকটি নিখুঁতভাবে পড়ছি, দেখছি, ডিরেক্টর, নায়িকা, নায়কদের সাথে আলাপ করছি, কেননা, এটিকে সঠিকভাবে রূপান্তর করতে গেলে যে বাবার মনের ভেতরে ঢুকে সেটিকে বুঝতে হবে। এভাবেই আমি তাঁকে বাঁচিয়ে রাখব আমার মনে, এবং, সেই সাথে নিজেকেও। এমন একটি অপার শিল্পীর কাজ অনুবাদ করতে বসায়, বিশেষ করে একটি ছেলের পক্ষে, অসীম সাহসের প্রয়োজন হয়।

নিরহঙ্কার, নম্রতার সাথে এগোতে হয়। কিন্তু বাবা দিয়ে গেছেন সেই সাহস। তিনি বলে গেছেন জীবনে সব সময়, বিশেষ করে কাজের ক্ষেত্রে, নিজের ওপর ভরসা রাখতে।  তাই, সেই সাহস নিয়ে আমি নেমেছি বিশ্বের কাছে বাবার পরিচয় দিতে, এবং সেই একই সাহস আমি বলব তিনি দিয়ে গেছেন তাঁর বৃহত্তর পরিবারের সকলকে। তিনি দেখিয়ে গিয়েছেন আমাদের কী সম্ভব এবং তিনি চাইছেন যে আমরাও তাঁর মতো কাজে নির্ভয় হয়ে এগিয়ে যাই। এভাবে কামনা করি যে, তাঁকে স্মরণ করবেন, অসংশয়ে কাজ করে যাবেন এবং মনে রাখবেন যে, একটু কল্পনা করলেই, তাঁর পায়ের আওয়াজ এখনও আমাদের মাঝে পাওয়া যায়।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares