ক্রোড়পত্র জন্মদিনে- সৈয়দ শামসুল হক স্মরণ : স্বপন নাথ

ক্রোড়পত্র জন্মদিনে

সৈয়দ শামসুল হক স্মরণ

স্বপন নাথ

সব্যসাচি লেখক কবি সৈয়দ শামসুল হক মারা গেছেন এ বছর ২৭ সেপ্টেম্বর। এর আগে বেশ কিছুদিন থেকে অসুস্থ ছিলেন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বিভিন্ন দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীতে অনেক লেখাই প্রকাশিত হয়েছে। কালি ও কলম  সৈয়দ শামসুল হক স্মরণ সংখ্যা (ত্রয়োদশ বর্ষ, অগ্রহায়ণ, ১৪২৩) ও বাংলা একাডেমি থেকে পরানের গহিন ভিতরে সৈয়দ শামসুল হক (অক্টোবর ২০১৬) এবং শব্দঘর (অক্টোবর ২০১৬) প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়াও তাঁর জীবদ্দশায় প্রস্তুতিপর্বে ছিল মাসিক শব্দঘর সাহিত্য পত্রিকা। শব্দঘর একটি বিশেষ কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সৈয়দ শামসুল হক অসুস্থ অবস্থায় এটি প্রস্তুত হওয়ায় সম্পাদক মোহিত কামাল ওই সংখ্যার প্রচ্ছদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সৈয়দ হককে দেখাতে পেরেছিলেন। এ ছাড়াও  শরৎ সংখ্যায় (সেপ্টেম্বর ২০১৬) প্রকাশিত হয়েছিল সৈয়দ হকের গুচ্ছকবিতা। লন্ডনের সড়কে বসে থাকা তাঁর একটি কাব্যিক ছবিও ছাপা হয়েছিল। ওই সংখ্যাটি সম্পাদক তুলে দিতে পেরেছিলেন কবির হাতে। এটি গ্রহীতা ও দাতা দু-জনের কাছেই আনন্দের। কীভাবে শব্দঘরের সম্পাদক বুঝে নিয়েছিলেন যে, সৈয়দ হক আর বেশিদিন বাঁচবেন না। তিনি আগামবার্তা কীভাবে পেলেনÑ এটাই আমাদের কাছে বিস্ময়কর। কবির অসুস্থতা শুনেই শব্দঘর সম্পাদক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন সৈয়দ শামসুল হক ও তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে বিশেষ সংখ্যা বের করবেন। যেটুকু জানি, লেখা আহ্বান করা হলো, পেয়েও গেলেন খুব দ্রুত। কীভাবে এটা সম্ভব হলোÑ এর উত্তর হলো যে, সম্পাদক  ও এই সংখ্যার লেখকরা, হাসান আজিজুল হক থেকে শুরু করে সবাই খুব আন্তরিক ছিলেন সৈয়দ শামসুল হকের প্রতি। যদিও শব্দঘর-এর এ সংখ্যার প্রকাশকাল অক্টোবর মাসে কিন্তু তা বাজারে এসেছে সেপ্টেম্বরের শেষেই। অতি দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ায় শব্দঘর এ সংখ্যাটি অনেকেই পাননি বলে জানিয়েছেন। কারণ এর প্রস্তুতি, বাজারে আসা ও লেখকের অপ্রত্যাশিত মৃত্যু প্রায় একসঙ্গে ঘটে। মৃত্যুর সাথে সাথেই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে পত্রিকার প্রকাশনা, অনেককেই অবাক করে দেয়। ফলে, পাঠকের আবেগ অনুভূতির আলাদা একটি টান দখল করে নেয় সংখ্যাটি।

এ সংখ্যায় ৮টি প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথা, সৈয়দ হককে নিবেদিত ৫টি কবিতা ছাপা হয়েছে। মোহিত কামাল একটু আবেগমথিত সম্পাদকীয়ও লিখেন। সম্পাদকীয়তে অল্পকথায় লেখক সৈয়দ শামসুল হককে সহজে তিনি উপস্থাপন করতে সক্ষম হন। উল্লেখ্য সম্পাদক শব্দঘর শরৎ সংখ্যা হাতে নিয়েই কবিকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি অক্টোবর সংখ্যায় সম্পাদকীয়তে লিখেছেন, ‘…দেখলাম কবির মাথায় স্বর্ণপালকখচিত কাব্যমুকুট। আরও দেখলাম বাংলা সাহিত্যের বিকীর্ণ আলোর ঢেউ। কালের গর্ভে এই ঢেউ কি কখনও হারিয়ে যেতে পারে? অনন্তকালকে কি হাতের মুঠোয় বন্দি করোনি, কবি? জীবন কি সামান্যই? চিরকালের অমরত্বের ¯্রােতে ভাসমান বৃহৎ নৌকার বৈঠা কি আঁকড়ে ধরেনি তোমার পঙ্ক্তিমালা? অক্ষর¯্রােত কি চোখ-রাঙিয়ে দিচ্ছে না ক্যান্সার কোষের দানবীয় রণডংকাকে? অমরত্বের সোনার মুকুট কি মাথায় ধারণ করোনি, কবি?’

শব্দঘরে প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথা লিখেছেন হাসান আজিজুল হক, রামেন্দু মজুমদার, লুৎফর রহমান রিটন, জাকির তালুকদার, টোকন ঠাকুর, সৈকত হাবিব, নাজনীন হক মিমি ও পিয়াস মজিদ। কবিতা লিখেছেন মুহম্মদ নুরুল হুদা, তারিক সুজাত, মধুমিতা চক্রবর্তী, সাজ্জাদ কবীর ও সাদিকুর রহমান পরাগ।

হাসান আজিজুল হক আমাদের সৈয়দ শামসুল হক শিরোনামায় লিখেছেন, ‘আমাদের সাহিত্যের ধূসর পটে যে কয়েকটি নক্ষত্র দীপ্তি বিলিয়ে যাচ্ছেন তাঁদের সংখ্যা সত্যিই বেশি নয়। এ রকম একটি নক্ষত্র সৈয়দ শামসুল হক।’ প্রসংগত, তিনি সৈয়দ হকের গদ্যের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কারণ, সবাই তাঁকে কবি বলে জানে। কিন্তু সৈয়দ হক যে কত সুন্দর গদ্য লিখেন, এ সম্পর্কে হাসান আজিজুল হক কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।

জাকির তালুকদার নিজে একজন কথাশিল্পী। যেকোনো শিল্পীর আলাদা বৈশিষ্ট্যই তাঁকে অন্য থেকে আলাদা করে রাখে। সৈয়দ হক কেন ভিন্নধারার লেখকÑ এ প্রসংগে তিনি আলোচনা করেছেন ‘আমারে যেদিন তুমি ডাক দিলা নিজের ভাষায়’ প্রবন্ধে। তবে, খুব বিস্তৃত করেননি। তাঁর সুপারিশ হলোÑ সৈয়দ হক যে নিজের সংস্কৃতি-ঐতিহ্যকে নবায়ন করেছেন তা আবার ভেবে দেখা প্রয়োজন রয়েছে। শুধু তো উপন্যাস, কবিতায় নয়। কাব্যনাটক, উপন্যাস, গল্পে বাঙালির নিজের ভাষাকে সৈয়দ হক আবার প্রাণ দিয়েছেন বলা যায়। এ-অর্থে জাকির সৈয়দ হককে তুলনা করেছেন বিভূতিভূষণের সাথে। এখানে বিভূতির সাথে তাঁর প্রতিতুলনার হয়তো একটি জায়গা থাকতেই পারে। কিন্তু আমার মনে হয় সৈয়দ হকের নিজস্ব একটি ভূগোল নির্মিত হয়েছে, যেখানে তিনি খুবই একাÑ আলাদা, স্বতন্ত্রম-িত। এ লেখায় জাকির তালুকদার চমৎকার একটি মন্তব্য করেছেন সামগ্রিক বিবেচনায়, ‘চিন্তার জগতে এক সংস্কৃতির ওপর অন্য একটি সংস্কৃতির আধিপত্যের ব্যাপারটি অনেক সূক্ষè, কিন্তু তার পরিণতি প্রচ- ভয়াবহ। তার কারণ এটিকে সচরাচর অনুভব করা যায় না। যতদিন কোনো নিয়ন্ত্রণ বা আধিপত্যের ব্যাপারে মানুষের সচেতনতা থাকে, ততদিন পর্যন্ত এটিকে প্রতিহত করার বোধ কাজ করে।’

টোকন ঠাকুর, সৈকত হাবীব, নাজনীন হক মিমি ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে সৈয়দ হকের বিভিন্ন সৃষ্টি নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তাঁর লেখার বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তি সৈয়দ হককে তুলে ধরার প্রচেষ্টা রয়েছে। অর্থাৎ, তাঁর লেখার কথা প্রসংগে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় উঠে এসেছে। এতে বোঝা যায় যে, অনুজদের ওপর তিনি একটি বলয় তৈরিতে সক্ষম হয়েছিলেন।

সৈয়দ হকের কবিতা সম্পর্কে পিয়াস মজিদ একটি সাধারণ আলোচনা করেছেন, যা লেখকের কবিতা পাঠে পাঠককে সাহায্য করতে পারে। তবে তাঁরা সকলেই একটি মিলিত স্বরেই মন্তব্য করতে প্রয়াসী। সৈয়দ হক লেখালেখিতে সবসময়ই নতুনকে আহ্বান করেছেন। নতুনদের স্থান করে দিতে চেয়েছেন। আমার ব্যক্তিগত বোধের সাথে মিমির একটি মন্তব্য প্রায়ই মিলে যায়। সৈয়দ শামসুল হকের বিস্ময়কর মেধা ও প্রতিভা নিয়ে আমি নিজেও ভাবি। সৈয়দ হক বাঙালি সমাজে আর আসবে কি না সন্দেহ। এর আগেও কখনও ছিল না। মিমি লিখেছেন, ‘তাঁর নূরলদিনের সারাজীবন, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় কিংবা অসাধারণ কবিতাসমূহ পড়তে পড়তে মনে হয়েছে তাঁর মতো শক্তিশালী লেখক বোধ হয় আমাদের মাঝে এখন খুব কমই আছেন।’ আমি ব্যক্তিগতভাবে এ কথাটি সমর্থন না করে পারি না।

সৈয়দ হক নিজে বিদেশি সাহিত্যে বা বিদেশের মাটিতে অনেক ঘুরেছেন। কিন্তু পরানের গহিন ভিতরে যে বাংলা, তা তাঁর করোটির ভেতরে সারাক্ষণ ছিল। তাঁর অস্তিত্বে খেলা করেছে তাঁর স্বনির্মিত সে-ই জলেশ^রীর মাঠ, জল, নদী আর ধানখেত। চিরায়ত ইতিহাসের ভগ্নস্তূপ। ঢেকে দেওয়া ইতিহাসের ভেতর থেকে তিনি তুলে এনেছেন বাঙালির গৌরবজনক উপাদানসমূহ। কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা সেভাবেই কবিতায় সৈয়দ হকের বৈশিষ্ট্যকে উল্লেখ করেন। ‘তুমি সেই ভুসুকু, তুমি সেই কাহ্ন, তুমি সেই বাউল বাঙালির হাঁটা পথ/ এই ধানকাউনের দেশে তুমি নতুন কবির বুকে কবিতার নতুন শপথ।/ আলোর ডানায় চড়ে উড়াল আঁকার আগে বলো, বার বার বলো,/ আমি বাঙালি, আমি মানুষ. আমি কবি : চলো, পরানের গহিন ভিতরে চলো।’

সৈয়দ হকের নানামুখি মূল্যায়নে সমৃদ্ধ প্রকাশনা কালি ও কলম সৈয়দ শামসুল হক স্মরণ সংখ্যা। কালি ও কলম সৈয়দ শামসুল হক স্মরণ সংখ্যা আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায় ঋদ্ধ। এখানে লেখকের বিভিন্ন দিক উন্মোচনের প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। কেউ চলে যাওয়ার সাথে সাথে তাঁর বিভিন্ন কর্ম নিয়ে এত দ্রুত একটি অনন্য সংকলন প্রকাশ, সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। এ সংখ্যায় সংকলিত হয়েছে ৩০টি প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথা, নিবেদিত কবিতা ৯টি। এছাড়া সংযোজিত হয়েছে সৈয়দ হকের অপ্রকাশিত গল্প ও কবিতা এবং অনুবাদ কবিতা। সৈয়দ শামসুল হকের রচিত উপন্যাস, গল্প, কবিতা, কাব্যনাটক, মঞ্চনাটক, সংগীত, চিত্রনাট্য, গদ্য এবং তাঁর সমাজ ও রাজনীতিবোধ ইত্যাদি প্রসংগে লিখেছেন, স্মৃতিচারণ করেছেন অনেকেই। তাঁরা হলেন : সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, তরুণ সান্যাল, সেলিনা হোসেন, আতাউর রহমান, ফেরদৌসী মজুমদার, রফিকুন নবী, মামুনুর রশীদ, রামেন্দু মজুমদার, মফিদুল হক, অনিরুদ্ধ বিশ^াস, আবিদ আনোয়ার,  আবুল মোমেন, মহীবুল আজিজ, রবিশংকর বল, আহমেদ মাওলা, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, আহমাদ মাযহার, জাকির তালুকদার, মোস্তফা তারিকুল আহসান, মনি হায়দার, সুরঞ্জন মিদ্দে, হরিশংকর জলদাস, ইসমাইল সাদী, রিয়া চক্রবর্তী, শহীদ ইকবাল, পিয়াস মজিদ, আমিনুর রহমান সুলতান, মোমিন মেহিদী এবং দ্বিতীয় সৈয়দ হক।

নিবেদিত কবিতা লিখেছেন শঙ্খ ঘোষ, আসাদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান, হাফিজ রশিদ খান, বিশ^জিৎ ম-ল, জলধি হালদার, আনন্দময়ী মজুমদার, জোবায়ের মিলন ও মাজেদুল হক।

স্মৃতিকথা ও প্রবন্ধগুলোতে সৈয়দ হকের ব্যক্তিগত জীবন, তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতা, সৃষ্টিশীলতার বৈচিত্র্য, মননশীলতা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় আলোচনা করেছেন লেখকগণ। বিষয় হিসেবে প্রতিটি লেখাই প্রয়োজনীয়। কিছু মন্তব্য এখানে উপস্থাপন করা যেতে পারে। লেখালেখি যে একটি আলাদা বিষয়, যেখানে চর্চার প্রয়োজন সব সময়ই। লেখার সাথে পাঠাভ্যাসের একটি নিবিড় সম্পর্ক থাকা অবশ্যই প্রয়োজনÑ এ বিষয়টি সৈয়দ হক তাঁর মুক্তগদ্যের তিনটি গ্রন্থে তিনি আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। আনিসুজ্জামান তাঁর মূল্যায়নে তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত কিন্তু অপরিহার্য বিষয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে থাকে, এ-বিষয়ে তাঁর মধ্যে একটা সচেতনতার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু প্রমিত ভাষার ব্যবহারে তিনি ছিলেন খুবই সতর্ক। সেই সতর্কতা তরুণ লেখকরা করুক, এই কামনায় তিনি লিখেছিলেন মার্জিনে মন্তব্য, হৃৎকলমের টানে, কথা সামান্যই। এসব লেখা সাহিত্যযশোলিপ্সু প্রত্যেক বাঙালির অবশ্যপাঠ্য।’

সৈয়ম শামসুল হকের লেখকসত্তা ও মানসভূমি গঠনের পূর্বাপর বোঝার জন্য আবুল মোমেনের ‘সৈয়দ শামসুল হক : নায়ের ভিতর থিকা ডাক দ্যায় আমারে ভুবন’ লেখাটি খুব জরুরি বলে মনে করি। এ বিষয়ে তাঁর প্রাসংগিক বক্তব্য আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারি। উদ্ধৃতি দীর্ঘ হলেও এখানে উল্লেখযোগ্য, ‘বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে এমনই এক ভূখ-, যার হাত থেকে কোনো সংবেদনশীল মানুষ নিস্তার পায় না। একটা দেশের হাজার বছরের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং দরিদ্র-অসহায় জনগোষ্ঠীর বিপুল ত্যাগে নির্মিত রাজনৈতিক ইতিহাস চোখের সামনে ছোঁ মেরে তুলে নেবে কেউ, দেশ ও মানুষকে রিক্ত সর্বস্বান্ত করে দেবে, তার সত্তা ও আত্মা জব্দ করে ফেলবে, তাকে সাংস্কৃতিক উদ্বাস্তুতে রূপান্তরিত করবেÑ এ সর্বনাশ চোখের সামনে ঘটতে থাকবে আর কেউ নিশ্চেষ্ট বসে থাকবে, আপন সৃজনকর্মে বুঁদ হয়ে, তা কি সম্ভব?… তাঁর কল্পনায় ‘জলেশ^রীতলা’র গাঁ-গেরাম, জলাশয়, বনবাদাড়, মানুষজন সবার সঙ্গে, সবাইকে নিয়ে থাকবনে। এ এক দুরুহ জাদুকরী জীবনÑ দূরত্ব ও নৈকট্য, পশ্চিমা যাপন ও নিতান্ত গেঁয়ো বাঙালির জীবন, পশ্চিমের আধুনিকতর ভাবনা ও চিরায়ত বাঙালি জীবনের ভাবমার্গ এবং সর্বোপরি খর্বক্লিষ্ট আত্মক-ুয়নে মত্ত সমকালীন সমাজে তিনি. পশ্চিমের ভাবজগৎকে জানা সৈয়দ হক, দৃঢ়ভাবে তাঁর অবস্থানে অটল থাকলেন এবং পক্ষপাত প্রকাশ করে গেলেন জোরালো কণ্ঠে। তাই হয়তো তাঁর মনে হয় ‘নায়ের ভিতর থিকা ডাক দ্যায় আমারে ভুবন’।’

মফিদুল হক মূল্যায়ন করেছেন সৈয়দ শামসুল হকের সৃজন প্রতিভার বিস্তার নিয়ে। নিজের জন্মমাটি, ঐতিহ্য প্রাকৃতিক পরিবেশ একজন সৃজনশীল মানুষকে অসম্ভব প্রভাবিত করে। সৈয়দ হকের বেলায় তা আরও বেশি সত্য। তিনি যেন সে-ই প্রকৃতির সন্তান, যেখানে তাঁর পূর্ব পুরুষের ভিটেমাটি, তাঁর উৎসভূমি। আমার মনে হয়েছে, ফেলে আসা গ্রামের প্রকৃতি নিয়ে তাঁর ভেতরে একটা হাহাকার ছিল। কারণ, প্রতিদিন নগরজীবনে ভোর দেখার সুযোগ নেই। তিনি নাগরিক জীবনে আসার পর, ওখানে ভোরের কুয়াশা বা মেঘ দেখার সুযোগ হারিয়েছেন। আবার ফিরে গেলে আবার নাগরিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। ফলে, পরানের গহিনে একটা কান্না থেকেই যায়। মফিদুল হক তাঁর লেখার উপান্তে বলেছেন, ‘ফিরে এসেছেন তিনি বাংলায়, মেট্রোপলিস থেকে ফিরলেন বিশটি গ্রামসমষ্টি নিয়ে গড়ে-ওঠা শহর-কুড়িগ্রামে, বাংলারই নিবিড় আশ্রমে। নগরীকে তিনি জানালেন বিদায়, শেষশয্যা পাতলেন কুড়িগ্রামে, জীবনচক্রে কী অসাধারণভাবেই-না সমাপন করলেন তিনি, রয়ে গেলেন বাংলার মাটি, জল, হাওয়া ও চোখের পাতার সঙ্গে মিশে, পেছনে পড়ে রইল গোটা পৃথিবী, কবিতার মানবভুবন, যা ছিল তাঁর মানসভুবন।’

নাটক মঞ্চায়নে আতাউর রহমান একজন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব ও সৈয়দ হকের সহযোদ্ধা। পরস্পর পরিপূরকও বটে। কাব্যনাটক মঞ্চায়নে আতাউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি তাঁর স্মৃতিচারণে সৈয়দ হকের শুধু নাটক নিয়ে কথা বলেননি, বলেছেন তাঁর মেধাস্তর প্রসংগে। বিশেষত পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় যে কেবল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক নয়, এর শেকড় প্রোথিত রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাসের গভীরে। রহমান বলেছেন, ‘সৃজনগুণে এই নাটক বিশে^র সেরা নাটকগুলোর অন্যতম হিসেবে গণ্য হতে পারে।’

আবিদ আনোয়ার সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা সম্পর্কে চমৎকার মূল্যায়ন করেছেন তাঁর প্রবন্ধে। আমরা মনে করি  সৈয়দ হকের কবিতা পাঠের সাথে এ প্রবন্ধটি পাঠ করা প্রয়োজন। এর বাইরে অন্য কবির কবিতা পাঠেও এ লেখাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কবিতার মৌল বিষয়ে তিনি এখানে কিছু কথা বলেছেন। এখানে সৈয়দ শামসুল হকের কবিতার চিত্র, চিত্রকল্প, উপমা ও শব্দ নির্মাণ  প্রসংগে সংক্ষেপে অথচ চমৎকার আলোচনা করেছেন।

তাঁর কবিতা মূল্যায়নে মহীবুল আজিজ সৈয়দ হকের কবিতার মৌল প্রসংগ বিবেচনা করেছেন। সমগ্রবিশ^বোধকে একই সমতলে স্থাপন করার কৃতিত্ব একমাত্র তাঁরই। তিনি একটি জলেশ^রীর বিন্দুতে এনে নিজের মতো করে নিলেন গোটা বিশ^কে। মহীবুল এ বিষয়কেই স্পষ্ট করেছেন। সৈয়দ হক অসামান্য কবিতা রচনা করেছেন, যেগুলোতে এ বাংলারই ঐতিহ্যের বিনির্মাণ লক্ষণীয়। বিদেশি সাহিত্যর অনুবাদেও একই বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। যেগুলোকে আর অপর কোনো সাহিত্য মনে হয় না। মহীবুল আজিজ বলেছেন, ‘শব্দ তাঁর চকচকে নখের আয়নায়, উপমা তাঁর চারপাশে বিরাজিত আর তিনি তো এক চেতন স্যাকরাÑ যা-ই হাতে নেন, হয়ে ওঠে অলংকার। সারা পৃথিবীর কাব্যজিজ্ঞাসা তাঁর চেতনাজুড়ে সক্রিয়। বিশ^কবিতার অনুবাদে তাঁর সেই কৃতিত্ব হাজিরÑ গ্রিসের ধ্রপদী বাণী কি ফারসি হাফিজের হৃদয়োৎসার সব-ই তাঁর সহজ সৃজনানন্দের শৈলী। জীবনের নানা কর্মকা-, প্রকৃতি, স্বদেশ, প্রেম, ইতিহাস, রাজনীতি, বহির্বিশ^, লোকজীবন কোনোকিছুই তাঁর মনোযোগের বাইরে ছিল না। এক সর্বগ্রাসী সৃজনান্বেষায় মশগুল তাঁর সাহিত্যকর্ম।’

শামসুজ্জামান খানের সম্পাদনায় বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে পরানের গহিন ভিতরে সৈয়দ শামসুল হক। এটি একটি সমৃদ্ধ সম্পাদনা ও প্রকাশনা, তা বলাই বাহুল্য। এতে নিবেদিত কবিতা লিখেছেন শঙ্খ ঘোষ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবুবকর সিদ্দিক, রবিউল হুসাইন, আসাদ চৌধুরী, মুহম্মদ নূরুল হুদা, মুহাম্মদ সামাদ, কামাল চৌধুরী, তারিক সুজাত, টোকন ঠাকুর ও লামিয়া সৈয়দ হক।

প্রবন্ধ-নিবন্ধ-স্মৃতিকথায় লিখেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, পবিত্র সরকার, হাসান আজিজুল হক, শামসুজ্জামান খান, আনোয়ারা সৈয়দ হক, রামেন্দু মজুমদার, আতাউর রহমান, আবুল হাসনাত, আসাদুজ্জামান নূর, রুবী রহমান, সেলিনা হোসেন, মফিদুল হক, মাসুদুজ্জামান, ইমদাদুল হক মিলন, সাজ্জাদ শরিফ, জাকির তালুকদার, দ্বিতীয় সৈয়দ হক, পিয়াস মজিদ, আশরাফ জুয়েল, বিদিতা সৈয়দ হক ও গিনা আমব্রিন খান। এর সাথে সংযোজিত রয়েছে সৈয়দ শামসুল হকের লেখা অপ্রকাশিত কয়েকটি কবিতা, ছোটগল্প, নাটক, আত্মজীবনীর অংশবিশেষ, আলাপচারিতা, নির্বাচিত প্রবন্ধ নিবন্ধ ও বক্তৃতা, রোগশয্যায় রচিত পঙক্তিমালা এবং তাঁর অঙ্কিত চিত্রমালা ও স্থাপত্যকর্ম।

এ সম্পাদনায় সৈয়দ শামসুল হকের সব প্রান্তকেই স্পর্শ করতে চেষ্টা করা হয়েছে। কারণ ব্যাখ্যায় শামসুজ্জামান খান জানাচ্ছেন, ‘লেখক সৈয়দ শামসুল হকের মতো শিল্পী সৈয়দ হকও বিপুল ও বিচিত্রপ্রজ। আমরা তাঁর প্রায় চারশত জলরঙের কাজ, বিশটি তৈলচিত্র, এক্রেলিক পাঁচশত এবং কালিকলমে দু’শ চিত্রকর্মের সন্ধান পাই। তাঁর সৃজিত কাঠের ভাস্কর্য সংখ্যা দশের অধিক। আমাদের এই সংকলনের অন্যতম সংযোজন শিল্পী শামসুল হকের কিছু চিত্রকাজ ও ভাস্কর্যের প্রতিলিপি, যা এখানেই প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হচ্ছে। সৈয়দ হকের বিভন্নধর্মী রচনা থেকে বেশকিছু নির্বাচিত অংশও একই সঙ্গে আগ্রহী পাঠকের প্রতি নিবেদিত হলো, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে রোগশয্যায় রচিত কবির ষোলোটি অপ্রকাশিত কবিতা। সৈয়দ শামসুল হক বেঁচে থাকবেন বাঙালির পরানের গহিন ভেতরেÑএই আমাদের স্থিরবিশ^াস।’

এ আলোকেই বাংলা একাডেমি শ্রদ্ধা জানিয়েছে লেখক সৈয়দ শামসুল হককে। কবি কামাল চৌধুরী ‘ঘাসের নিচে শুয়ে আছেন সৈয়দ হক’ কবিতায় যেমন বলেছেন, ‘বহুপ্রজ তীক্ষè তরবারির মত সচল কলম/ এখন পাড়ি দিচ্ছে স্তব্ধ জলেশ^রী/ এখন পরানের গহীন ভিতরে রুমাল উড়িয়ে কবিতা পড়ছে না জলেশ^রীর জাদুকর’।

সৈয়দ হক যা সৃষ্টি করেছেন, তাতে তাঁর মত্যু হয়নি, কখনও হবে না বলা যায়। কারণ, তাঁর সৃষ্টি তাঁকে অমর করে দিয়েছে। এজন্য হয়ত পবিত্র সরকার বলেছেন, ‘যে প্রাণ জন্মায় জন্মের সঙ্গেই সে মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। কেউ আগে তার হাতে ধরা দেয়, কেউ পরে। কিন্তু হক ভাইয়ের মতো মানুষের জীবনে মৃত্যুর অহংকার করার মতো কিছু থাকে না। তাঁর নূরলদীনের কথাতেই বলা যায়, ‘হামার মরণ হয়, জীবনের মরণ যে নাই।’…কিন্তু তাঁর সৃষ্টির মধ্যে নিহিত তাঁর অনন্ত জীবন শতাব্দীর পর শতাব্দী পার হয়ে স্পন্দিত হতেই থাকবে।’

আমরা সাধারণ পাঠক হিসেবে টের পাই তিনি অন্য গোত্রের লেখক। অগ্রজদের অনুসরণ করেই শুধু লিখেননি, লিখেছেন নিজের উপলব্ধিতে। ফলে, তাঁর রচনার মধ্যে একটা আভিজাত্য ছিল ব্যতিক্রম। সবাই এটুকু স্বীকার করে নিয়েছেন। স্বীয় উপলব্ধি, বোধ বিবেচনায় লিখেন বলেই তাঁর ভাষা, বাক্য বলার ভঙ্গি বিচ্যুত হয়েছে চলমান ভাষা থেকে। নিজের অঞ্চলের ভাষা যেভাবে ব্যবহার করেছেন অনায়াসে, তা হয়ে উঠেছে অসামান্য শৈলীর উদাহরণ। শুধু ভাষা নিয়েই তাঁর নিরীক্ষা কালোত্তীর্ণ হয়ে আছে। তিনি ভাবতেন ও ভাষা সৃষ্টি করেতেন। প্রসংগত, বলা অন্যায় হবে না যে, তাঁর কবিতা, উপন্যাস গল্প নিয়ে এখন পর্যন্ত আলোচনা লক্ষ করা যায়। কিন্তু তাঁর ভাষা নিয়ে বা মুক্তগদ্য সম্পর্কে তেমন লেখা চোখে পড়েনি। হাসান আজিজুল হক বলেছেন, ‘আমি তাঁর সঙ্গে যতবার কথা বলেছি, একটি বা দুটি নতুন কথা, যা আগে আর কারো কাছে শুনিনি, তা তাঁর কাছে শুনতে পেরেছি। আমরা জানি, বাংলা ভাষা তাঁর হাতে কেমন সুগঠিত হয়েছে, স্বচ্ছ ও সুপরিণত হয়েছিল। …শব্দ ও ধ্বনির অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা তিনি আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন।’

তাঁর এ বিষয়কে সম্পাদক হিসেবে গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন আবুল হাসনাত, ‘তাঁর সৃজন ভুবন নিয়ে কিছু কথা’ প্রবন্ধে। এক সময় দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকী তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হত। ওই সময়পর্বেই ধারাবাহিকভাবে সৈয়দ শামসুল হকের কলাম হৃৎকলমের টানে, গল্পের কলকব্জা, জলেশ^রীর তিনপত্রী, কথা সামান্যই প্রকাশিত হয়েছে। আমরা সেসময় তাঁর  লেখা মুগ্ধতায় পাঠ করতাম। এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতাম পরবর্তী সংখ্যা পড়ার জন্য। মূলত, এ কলামগুলো থেকেই সাহিত্য বিষয়ে দীক্ষা নিয়েছি। সাহিত্য সন্দর্শন বা কোষ জাতীয় গ্রন্থগুলো যেমন আজও আমাদের টানে না। আবুল হাসনাত স্মরণ করেছেন সে-দিনগুলোর কথাÑ ‘সৃজনশীলতা ও নব্য ভাবনা উদ্রেকে এই কলামসমূহ তাঁর বিশাল সৃজনভুবনে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। সংবাদ পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী যখন একনাগাড়ে দীর্ঘ তিরিশ বছর সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করি, কত না লেখা দিয়েছেন তিনি এ পত্রিকার সাময়িকী ও বিশেষ সংখ্যায়। এ রচনাসমূহে সমৃদ্ধ হয়েছে পত্রিকা। তাঁর লেখার গুণগত মান ঈর্ষণীয়। গদ্য বা পদ্য যা-ই লিখুন না কেন তাঁর রচনায় ঔজ্জ্বল্যে, বিষয়ে এবং সমকালীন সংকট ছুঁয়ে যাওয়ার অভিমুখিনতায় তা হয়ে উঠত বিস্ময়করভাবে সুখকর এবং নব্যভাবনার বিচ্ছুরণে সমৃদ্ধ, স্বাতন্ত্র্য চিন্তা ও চেতনার ভুবনকে করেছে প্রসারিত।’

জাকির তালুকদারও তাঁর এ স্বতন্ত্র ও অলোকসামান্য সৃজনশক্তিকে সনাক্ত করেছেন। সৈয়দ হকের স্বাতন্ত্র্য যে ভাষার কারুকর্মে প্রমাণিত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি সবসময়ই ভাষা নিয়ে নিরীক্ষা করেছেন, নতুন চয়ন বাছাই করে তিনি লেখাকে সৈয়দ হকের রচনা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। জাকির তালুকদারের (সৈয়দ শামসুল হকের কথাসাহিত্য : শক্তিকেন্দ্রের সন্ধানে) মন্তব্য হলো, ‘সৈয়দ শামসুল হকের রচনা থেকে আমরা নতুনভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি, বাংলাভাষার শক্তি কত প্রবল ও ঐশ^র্যবান! আমাদের এই বাংলাভাষাকে সৈয়দ হক নতুন নতুন রূপ দিয়েছেন। কতভাবেই না তিনি ব্যবহার করেছেন বাংলাভাষাকে! কখনো নিপাট-নিটোল সাজানো-গোছানো রূপ দিয়েছেন, কখনো দিয়েছেন আঞ্চলিক ভাষার তীব্রতর পরিচয়, কখনো দিয়েছেন কাঁচের মতো ধারালো আকাট মুখের ভাষার প্রায়োগিক রূপ।’

প্রতি ব্যক্তি-মানুষের সীমানা আছে, আছে স্বাতন্ত্র্যেরও সীমানা। পাঠক হিসেবে আমাদের মনে হয় এত বিশাল বিস্তৃতি তাঁর চিন্তার ও লেখার, কোথাও সীমানা নেই। তাঁর রচনার এ বিশাল আয়োজনে মফিদুল হক লিখেছেন ঠিকই ‘সর্বত্র তাঁর সৃষ্টিছাপ, কোন্খানে রাখি প্রণাম’।

মাসুদুজ্জামান সৈয়দ হকের কবিতার বিষয়বৈচিত্র্য, বিষয়, উপাদান ও অনুষঙ্গ ইত্যাদি আলোচনা করেছেন। তিনি প্রতিটি শব্দ ও বুননে নতুন এক কাব্যভুবন তৈরিতে সমর্থ হয়েছেন, তা বলাই বাহুল্য। বিশেষত লোকজ উপাদান ব্যবহারে অসামান্য দ্যুতি ছড়িয়েছেন কাব্যে। মাসুদুজ্জামানের মন্তব্য পর্যবেক্ষণযোগ্য, ‘বাংলা কবিতার ধারায়, বিশেষ করে বাংলাদেশের কবিতায় তিনি দেশাত্মবোধসম্পন্ন সহৃদয়-সংবেদী কবি আগামী দিনগুলোতেও যে সমাদৃত হবেন, সেকথা বলা যায় নিঃসন্দেহে।’

ইমদাদুল হক মিলন ‘আমার হক ভাই’ শিরোনামে সৈয়দ শামসুল হকের জ্ঞান-মেধার পরিচয় তুলে ধরেছেন খুব সংক্ষেপে। সৈয়দ হক তাঁর সমকাল ও বিশ^সাহিত্যের উজ্জ্বল বাঁক পরিবর্তনের সংগী ছিলেন। তিনি সব সময় সেগুলোর খোঁজ-খবর রাখতেন, পাঠাভ্যাসও ছিল ঈর্ষণীয়। মিলন এ প্রসংগে একটি ঘটনার অবতারণা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘‘সল বেলো নিয়ে হক ভাইয়ের অসাধারণ একটা কা- আছে। এই আমেরিকান ঔপন্যাসিক যে বছর নোবেল প্রাইজ পেলেন সে বছরের কথা। হক ভাই কলকাতা গেছেন।… সেই আড্ডায় একসময় তিনি হক ভাইকে একটু শ্লেষ ও অবজ্ঞা মেশানো গলায় বললেন, এই যে হক সাহেব, এ বছর সাহিত্যে যিনি নোবেল পেলেন, সল বেলো, তাঁর নাম শুনেছেন? হক ভাই সন্দীপনের দিকে তাকালেন। শুনুন সন্দীপন বাবু, আপনি যখন হাফপ্যান্ট পরেন, তখন সল বেলোর একটি উপন্যাস আমি বাংলায় অনুবাদ করেছি। হ্যান্ডারসন দ্যা রেইন কিং। বাংলায় বইটির নাম দিয়েছি শ্রাবণ রাজা। সন্দীপন বোধ হয় তাঁর জীবনে এত বড় চপেটাঘাত আর কখনো খাননি।’’

আনোয়ারা সৈয়দ হক স্বপ্নের ফেরিওয়ালা শিরোনামে সৈয়দ শামসুল হকের ব্যক্তিজীবন, দর্শন ও লেখার ক্ষমতা নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা সৈয়দ হককে বুঝে নিতে সহায়ক হতে পারে। দাম্পত্যজীবন কেটেছে যে মানুষের সাথে, তাঁকে তিনি অনেক কাছে থেকে দেখেছেন। ব্যক্তিজীবনের সম্পর্ক একইসংগে তাঁর লেখকসত্তা নিয়ে তাঁর বোঝাপড়া তিনি তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন। এ প্রসংগে তিনি খেলারাম খেলে যা উপন্যাসের সমালোচনাসূচক বক্তব্য বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। আনোয়ারা স্পষ্টই জানিয়ে দেন, এ পর্যন্ত যা বলা হয়েছে এ উপন্যাস নিয়ে, তাতে পাঠকরা সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেননি। ‘খেলারাম উপন্যাসটিকে এ পর্যন্ত যাঁরা সমালোচনা করেছেন তার ভেতরে কিছু ঘাটতি আমি নিজে লেখক হিসেবে অনুভব করে উঠি-আর সেটি হচ্ছে বাবর চরিত্রটির অসফল মূল্যায়ন।… এই ভয়াবহ জীবনদর্শন যে-মানুষটির, নিজের অস্তিত্বের প্রশ্নে যে মানুষ সর্বদাই ক্ষতবিক্ষত, যে ভালো করে জানে এ-জীবনে কিছুই স্থায়ী নয়, কী ভালো বা কী মন্দ, সবই সমান…।’

সৈয়দ হক ব্যক্তি-মানুষ ও লেখক কেমন ছিলেন এ বিষয়ে তাঁর মন্তব্য আমাদের আরও বেশি আকৃষ্ট ও আপ্লুত করে। পাঠক হিসেবে আমাদের সাধারণ ধারণার সাথে তা মিলে যায় সহজেই। আনোয়ার সৈয়দ হকের পর্যবেক্ষণ হলো, ‘সৈয়দ শামসুল হক নামের একজন পরিশ্রমী মানুষের সাথে ছিল আমার বসবাস। এই মানুষটি শুধু পরিশ্রমী নয়, সেই সাথে প্রতিভাবানও! কারণ শুধু পরিশ্রমে একজন মানুষ হয়তো জীবনে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সৃজনীপ্রতিভা না থাকলে সাহিত্যজগতে নিজের মেধার ছাপ ফেলা যায় না।’

সৈয়দ শামসুল হক ও আনোয়ারা সৈয়দ হক লেখক-দম্পতি হিসেবে সুখী ছিলেন। জ্ঞানচর্চায় তাঁরা পরস্পরের বোঝাপড়ার মানুষ। তাঁরা অনুপ্রাণিত করেছেন পরস্পর। আনোয়ারার লেখায় আবেগ রয়েছে, কিন্তু যুক্তির নিরিখে একজন লেখক-সঙ্গীকে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের দু’জনের জীবন কি এরকম ছিলো? জানিনে। কারণ, তাঁর সুস্থ জীবনের প্রায় শেষ পর্যন্তই প্রতিটি ভোরই আমাদের শুরু হতো ঝগড়া দিয়ে এবং শেষ হতো রাতের বেলা চানাচুরের বয়েম দু’জনের মাঝখানে কোলের ভেতরে রেখে বিছানায় শুয়ে শুয়ে রেডিও ভূমির গান শুনে শুনে…’

এ লেখায় যেসব লেখার উল্লেখ করা হলো না, সেগুলো অবশ্যই সুখপাঠ্য। সবকিছুর সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় উল্লেখ করা গেল না। সৈয়দ শামসুল হকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে এ তিনটি সংকলন : শব্দঘর, কালি ও কলম এবং পরানের গহিন ভিতরে সৈয়দ শামসুল হক প্রকাশিত হয়েছে খুব স্বল্প সময়ে। যারা প্রকাশনা ও সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁরা অবশ্যই সাধারণ পাঠকের স্বীকৃতি পাবার যোগ্যতার চেয়ে অনন্য কাজ সম্পাদন করেছেন। অন্যদিকে সৈয়দ হকের সাহিত্য পাঠ ও গবেষণায় বা বাংলাদেশের সাহিত্য গবেষণায় যাঁরা মনোযোগী হবেন, তাঁরা উপকৃত হবেন। বলা বাহুল্য যে, সৈয়দ শামসুল হক সৃজনশক্তিতে লেখক হিসেবে চিরায়ত স্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। একইসাথে এসব সংকলনও স্থান করে নিল সাহিত্যের ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares