মুক্তিযুদ্ধের গল্প – অগ্নিস্নান : মোজাম্মেল হক নিয়োগী

মুক্তিযুদ্ধের গল্প

অগ্নিস্নান

মোজাম্মেল হক নিয়োগী

মাজন সাবরে খুব বেজার দেহা যাইতাছে যে?

শাবান আলি পাটের মহাজনকে প্রশ্নটি করে উত্তর শোনার জন্য উৎসুক চোখে তাকালেও মহাজন কোনো কথা বলেনি। শাবান আলিকে পাটের দাম দিয়ে মহাজন কয়ালকে ডেকে বলল, আইজ সব কেনাবেচা বন্দ র্ক। গুদামে তালা লাগা।

কয়ালের মনও খারাপ। সে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর গুদামের দরজার একটি পাট বন্ধ করতে করতে বলল, এই মিয়ারা, আইজ ফাট কিনা অইতো না। অন্য মাজনের কাছে যাওহাইন।

এ বছর শাবান আলি আজই প্রথম বাজারে পাট নিয়ে আসে, ভালো দামে বিক্রি করাতে চোখেমুখে একফালি আনন্দরেখা পরিস্ফুট হলেও মহাজনের এমন ভার মুখ দেখে দুর্ভাবনার আড়ালে সেই আনন্দরেখাটি মিলিয়ে যায়। বাজারে ভিড় কম, এখনও সব হাটুরে বাজারে এসে পৌঁছায়নি, বিশেষ করে, রাত-ফেরা মানুষগুলোর কারোই মুখ শাবান আলির চোখে পড়েনি। ক্লিষ্ট শাবান আলি তরকারির মহাল দিয়ে রঘুনাথের চায়ের দোকানে বসে। পাট বিক্রির গরম চকচকে নোট হাতে, আজ দুটি জিলেপি না খেলেই যে নয়, অনেকদিন চা খাওয়াও হয় না, কপালপোড়া রোদ মাড়িয়ে এসে একটু বিশ্রামও নিতে হয়Ñ এসব ভাবতে ভাবতেই শাবান আলি মনমরা রঘুনাথকে বলল, দাদা একপোয়া জিলাপি দেও দেহি। গরম দেইক্যা দিয়ো।

জিলাপি গরমই ছিল। সে জিলাপি খায় আর ভাবে হাসিখুশি রঘুদাকে এমন মনমরা দেহা যাইতাছে ক্যারে? ব্যাফার কী? মুহূর্তের মধ্যেই সে ভাবনাটি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আয়াশ করে জিলাপি খায়, তারপর চা-পান খেয়ে এক শলা রমনা সিগারেট জ্বালিয়ে বাজার-সওদা করতে কাপড়ের মহালে গিয়ে ঢোকে।

একচালা দোকানের দুটি সারি কাপড়ের মহাল, মাঝখান দিয়ে ক্রেতাদের চলার জন্য সরু পথ। অনেক পুরনো একটি মেহগনি গাছের ছায়ায় জায়গাটি ছায়াশীতল, বর্ষাকালে থাকে স্যাঁতসেঁতে। ফসলের মৌসুমে কাপড়ের মহালে বেশ ভিড় থাকলেও আজ এখনও ভিড় জমেনি। শাবান আলি হাঁটতে হাঁটতে খায়রুল ইসলামের দোকানের চাটাইয়ে গিয়ে বসে। খায়রুল ইসলামেরও মুখ ভার, জিজ্ঞেস করল, কাফর নিবা নি?

হ ভাইছাব। একটা কাফর দেহাওহাইন।

কী রঙের?

কলাফাত রঙের দেহাওহাইন।

খায়রুল ইসলাম কয়েকটি শাড়ি চাটাইয়ের ওপর রাখে। শাবান আলি দাম-দর ঠিক করতে করতে একফাঁকে জিজ্ঞেস করে, আইজ বাজারের সব বেফারির মন বেজার ক্যারে?

কিছুক্ষণ ঝিম ধরে থেকে খায়রুল ইসলাম বলল, বাজার কমিটি বেপারিরারে ডাইক্যা কইলো, দিনকাল ভালা না। মিলিটারি আইবো। বেইল থাকতেই দোহান বন্দ কইর‌্যা বাড়িত যাওন লাগব। হাইঞ্জা অওনের আগেই দোহান বন্দো করণের লাইগ্যা কইল। মন বেজার থাকবো না তো কী?

পাকবাহিনীর আগমনের কথা শুনে শাবান আলির আত্মায় ধারাল সেল বিঁধে। কিছুক্ষণ নীরব হয়ে কী যেন ভাবে, তারপর দামদর করে শাড়িটি নিয়ে অন্য মহালে গিয়ে দ্রুত বাজার করে বাড়ির দিকে রওনা হয়। বাড়ি যেতে যেতে কিছুটা রাত হয়।

বাজারের ব্যাগটা ঘরের মেঝেতে রাখতে রাখতে শাবান আলি বলল, মিলিটারি আইবো। আর রক্ষা নাই।

কুপিবাতি নিয়ে পাশে দাঁড়ায় হাজেরা। সে বলল, কেলা কইছে?

শাবান আলি বলল, বাজারে কথাডা চাউর অইছে। ব্যাহেই কইতাছে।

আধিহাতা পাঞ্জাবির পকেট থেকে মোয়া বের করে দবিরের হাতে তুলে দেয় শাবান আলি। দুই বছরের দবির হাসতে হাসতে মোয়া হাতে নিয়ে বাবার কোলে ওঠে। ছেলেটা এখনও কথা বলতে শিখেনি। মেয়ে দুটি অন্যঘর থেকে এসে বাবার পাশে দাঁড়ায়। শাবান আলি হাসতে হাসতে অন্য পকেট থেকে দুজনের হাতে আরও দুটি মোয়া দিলে হাজেরা বেগম বলল, আমার লাইগ্যা কী আনলা, কথাটা শেষ করেই হাসে হাজেরা। শাবান আলি মুচকি হেসে বলল, তোমার লাইগ্যা তো সবই আনলাম। বাজারসদাই সবই তো তোমার। হাসিটা এখানেই থামে না, বাঁ-হাতের একটা পুটলি বের করে হাজেরার হাতে দিয়ে বলে, নেও, আরও আছে। আজকে শাবান আলি কাপড়লতা আনবে তা সবারই জানা ছিল, মোয়া হাতে নিয়েই কাপড় দেখার জন্যও সবাই হাত বাড়ায়। বছরে দুইবার ওরা নতুন কাপড় পায়Ñ একবার পাট বিক্রি করে আরেকবার আমন ধান বিক্রি করে।

হাজেরা এক হাতে শাড়ি আর অন্যহাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে রসুইঘরে যেতে যেতে বড় মেয়ে পায়রাকে ডেকে বলল, এই ছেড়ি, তর বাপেরে খড়মডি বাইর কইরা দে, আর ক তাড়াতাড়ি ওজু কইর‌্যা আইতো।

খড়ম নিয়ে বের হয়ে গোয়ালঘরে গিয়ে শাবান আলি গরুর চারি দেখে, চারির খড়ঘাস নেড়েচেড়ে দেয়। একটি গাভি আর দুটি বলদ শুয়ে শুয়ে আরামে জাবর কাটে। শাবান আলি গরুগুলোর দিকে এক পলক তাকিয়ে ভাঙা কুলা দিয়ে ধোঁয়ায় বাতাস করে। মুহূর্তেই গোয়ালঘর ধোঁয়ায় ভরে যায়। পাশের ভাঙা ডোলা থেকে কয়েক মুঠ তুষ ধোঁয়ার পাঁজায় রেখে পা দিয়ে চাপ দেয়, কুলা দিয়ে দুই ঝাপটা বাতাস দিয়ে ঝাঁপ আটকিয়ে পুকুরঘাটে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে বাড়িটির দিকে তাকায় শাবান আলি। ধবধবে জোছনায় টিনের চাল চকচক করে। গেল চৈত্রমাসেই চারচালা টিনের ঘরটি তৈরি করেছে, চকচকে চালের দিকে তাকিয়ে শাবান আলি এক প্রকার আত্মশ্লাঘা অনুভব করে, তা করারই কথাÑ বাপদাদা যা পারেনি শাবান আলি তা করেছে। যখন মাঠে কাজে যায় তখন দূর থেকে বাড়িটি দেখে। অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তিকে মানুষ এভাবেই দেখে আত্মতৃপ্তি অনুভব করে। আজ তার মনে পড়ে বাবার কথা। নদীভাঙনে ঘরবাড়ি তলিয়ে গেলে এই গ্রামে এসে আশ্রয় নিয়েছিল একজনের বাড়িতে। গ্রামের মানুষেরা তাই ওদের ‘বাউআইল্যা’ ডাকত। এই শব্দে কত অপমান, ঘৃণা, লজ্জা আর অবহেলা তা শাবান আলি ছোট বেলা থেকেই অনুভব করে নিজের বাড়ি করার স্বপ্ন দেখত। তখন তাদের একটা ভিটাও ছিল না। বাবা মানুষের বাড়িতে বছরবান্ধা গোমস্তা থাকত, স্ত্রী, তিন কন্যা, আর শাবান আলি এই পাঁচজনের সংসার চালিয়ে এক টুকরো ভিটার জমিও কেনা সম্ভব হয়নি। তাই এই গ্রামের উদ্বাস্তু যাকে গ্রামের মানুষেরা ‘বাউআইল্যা’ বলে ডাকত। শাবান আলিও ছোটবেলায় বছরবান্ধা গোমস্তা থাকত, পরিশ্রম করে একটা ভিটে কিনতে পেরেছে। আর ভিটে কেনার পর সে গ্রামের রাজনীতির কবলে পড়ে। ওয়ারিশদাররা হাজির হয় জমির দাবি নিয়ে। তাদের আরও বাড়তি টাকা দিয়ে সে ভিটেটা নিজের করে পায়। দিনের পর দিন হাড়ভাঙা খাটনি খেটে কিছু জমি বন্ধক রাখে। তারপর থেকেই সে জীবনের গতি পায়। কিছু সঞ্চয় করে টিনর একটি ঘর বেঁধেছে, পুকুর দিয়েছে, কিছু জুতজমি করেছে, বন্ধকি জমিও আছে, খান্দানি পরিবারে বিয়ে করেছেÑ ভাত-কাপড়ের অভাব নেই, সুখ যেন তার শরীর উপচে পড়ে। অনেকক্ষণ বাড়িটির দিকে তাকিয়ে এক প্রকার সুখ অনুভব করে সে ঘরে যায়।

কুপির টলমলে আলো থেকে লকলকে শিষ বের হয়ে ধোঁয়া ছড়িয়ে উপরে বাতাসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। দুই মেয়ের পর ছেলে, দবিরের প্রতি বিশেষ আদর মা-বাবার, দবিরও কড়ায়-গ-ায় আদায় করে। হাজেরা ছেলেকে বলে, তাড়াতাড়ি খা, কেরাছিন তেলের যে দাম বাড়ছে, বাত্তি বেশিক্ষণ জ্বালানি যাইতো না।

দবির মায়ের কথায় কান দেয় না। শাবান আলিও ছেলেকে মাছের কাঁটা বেছে দিয়ে খাওয়ায়, নিজেও খায়।

দবির বাবার বুকে মাথা রেখে ঘুমায়, আজকেও ঘুমিয়েছে।

মেঘলা আকাশ, ভোরের ফিকে সূর্যালোক ছড়িয়ে পড়েছে কেবল, এই সময় গ্রামের মানুষেরাও মাঠেঘাটে কাজে নেমে পড়ে। গত দুদিন বৃষ্টি হয়েছে, সড়কের ঢালুর ক্ষেতে হালের জো হয়েছে কিনা দেখার জন্য শাবান আলিও ঘর থেকে বের হয়ে ধীরে-সুস্থে এগিয়ে যাওয়ার সময় তার চোখে পড়ে ভাঙাচোরা মেঠোপথ দিয়ে মানুষের কয়েকটি দল গাট্টিবুচকা নিয়ে পুব দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে অনীলের পরিবারের সবাইকে দেখে একটু থেমে শাবান আলি ভাবে, ঘটনা কী? শাবান আলি অনিলের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, ও অনিল দা, তোমরা বেহেই কই যাও?

অনীলের মুখ ভারাক্রান্ত, করুণ চোখে শাবান আলির দিকে তাকিয়ে জড়ানো অনুচ্চস্বরে বলল, ওপারে যাই ভাই। মিলিটারি আইলে তো বাড়িঘর আর জীবন সবই যাইব। জীবনডা অন্তত বাঁচাই। কথা শেষ করেই পরিবারের অন্যদের তাড়া দিয়ে বলল, তাড়াতাড়ি আসো। হাঁটা ছাড়া উপায় নাই। মেলা দূরের পথ।

শাবান আলি চিন্তা করে ওপার কত দূর? মনে মনে দূরত্ব কল্পনা করে, হয়তো সত্তর আশি মাইলের কম না। এত পথ পায়ে হেঁটে যাবে ভাবতেই তার শরীর হিম হয়ে আসে। পরক্ষণেই মনে হয়, মৃত্যুর ভয়ের কাছে এই দূরের পথ কিছুই নয়।

অনীলের পরিবারের পরই মাখনের পরিবার ধীর পদবিক্ষেপে এগিয়ে আসতে দেখে শাবান আলি, তারপর গোচরে আসে হালিম মাস্টারের পরিবার। হালিম মাস্টারকে দেখে শাবান আলি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকে, তারপর জিজ্ঞেস করে, আফনে কই যান?

এ-রকম জিজ্ঞেস করার পিছনে কারণ ছিল; তার ধারণা ছিল, পাকবাহিনী শুধু হিন্দুদেরই হত্যা করে, তাদের বাড়িঘর পোড়ায়, মুসলমানদের নয়। তাহলে হালিম মাস্টার কেন ওপারে যায়?

হানাদাররা, বুঝলে, হালিম মাস্টার বলল, গ্রামকে গ্রাম পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে। গ্রামে থাকা আর নিরাপদ নয়। ভারতেই যাচ্ছি।

পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরতার কথা শাবান আলির কানে আগেও এসেছে। ওরা কোনো গ্রামে ঢুকলে গ্রাম পুড়িয়ে ছারখার করে, মানুষকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে, কখনও হত্যা করে আবার উল্লাসও করে, মেয়েদের ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে, তাদের যৌনদাসি বানায়, ক্যাম্পে মেয়েরা অনাহারে, অনিদ্্রায়, অসুস্থতায়, নির্যাতনের নিষ্ঠুর যন্ত্রণায় মারা যায়। হালিম মাস্টারের দুই মেয়ের ইজ্জত বাঁচানোই এখন বড় দায় হয়ে পড়েছে।

শাবান আলি, হালিম মাস্টার ডেকে বলল, তুমি কি ওপারে যাইবা, নাকি দেশেই থাকবা?

কিংকর্তব্যবিমূঢ় শাবান আলি উত্তর দেয়, কি যে করি!

আমি আগেই যাচ্ছি। কখন মিলিটারি আসবে আর তখন তাদের দেখে পালাব তা কি করে হয়? সোমত্ত মেয়েদের জন্যই বড় চিন্তা। না-হয়, দেশেই থাকতাম, দেশ ছেড়ে যাওয়া যে কত বেদনার তা বুঝতে পারবে যদি দেশ ছাড়ার কথা ভাবো। জড়ানো কণ্ঠের কথাটি শেষ করে হালিম মাস্টার এগিয়ে যায়।

শাবান আলি সামনের দিকে তাকায়, দিগন্তে অলস বনবনানীর ঢেউতোলা সবুজরেখায় সূর্যের আলো আছড়ে পড়ে, ফসলের মাঠের পরেই বিশাল বিলের বর্ষার কালচে পানিতে কচুরিপানার আনাগোনা, ধবল বকেরা দূর থেকে শিষ ধরে উড়ে এসে বিলের কিনারে বসে, হিজল গাছের ডালে দুটি মাছরাঙা বসে লক্ষ্যভেদহীন তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শিকারের সন্ধানে, ভোরের এমন কোলাহলের মধ্যেও শাবান আলি অনুভব করে তার চারপাশে অনুচ্চারিত নীরবতা, জমাটবাঁধা কষ্টের স্তব্ধতা। বুকের গভীরে অনুভব করতে গ্রামের স্বজনদের ওপারে যাওয়ার বিচ্ছেদ বেদনার দহন। সরু সড়কটিতে যাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে তারা সকলই পরমাত্মীয়ের আত্মীয়, সুখে-দুঃখে, আনন্দে-বেদনায় জীবনের সঙ্গে জীবনের নিবিড় ঘনিষ্ঠতা ছিন্ন করে জীবন বাঁচানোর তাগিদে গ্রাম ছেড়ে পরবাসী হচ্ছে, ‘বাউআইল্যা’ হচ্ছে। তারা কোথায় যাবে, কী করবে, কী খাবে, কোথায় ঘুমাবে ইত্যাদি নানাবিধ প্রশ্নজালে আটকে যাচ্ছে শাবান আলি আর ভোরের সতেজ আলো-বাতাস ক্রমান্বয়ে ধূসর থেকে ধূসর হয়ে আসে, প্রসারিত মাঠের নির্মল সবুজের সমারোহ মাঝরা পোকায় খাওয়া ধানের পাতার মতো বিবর্ণ ফ্যাকাসে হয়ে আসে, যে উদ্যম নিয়ে মাঠে এসেছিল সে উদ্যমে ভাঁটা পড়ে, ক্রমে শরীর ও মনে নিস্পৃহতা ভর করলে সে নিঃশব্দে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। পা চলে না, যেন অবশ পায়ে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটে।

গত দুদিন বৃষ্টি হওয়াতে লাঙলের জো থাকা সত্ত্বেও শাবান আলির বাড়ি ফিরে আসায় হাজেরা উদ্বিগ্ন হয়ে গোয়ালঘরের দিকে তাকিয়ে অনুচ্চ ভাষায় বলল, মানুষডার কুনো অসুকবিসুক করছে নি? অবেলায় ফিইর‌্যা আইছে ক্যারে? গোয়ালঘরের দিকেই তাকিয়েই চুলায় একটি লাকড়ি ঠেলে দিয়ে, বুকে ঝুঁলে থাকা স্তন্যপানরত দবিরকে হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল, ওই দেখ তর বাপ আইছে। দেখ ছে, যা, ফিইর‌্যা আইছে ক্যারে?

হাজেরার এমন ভাবাটা স্বাভাবিক। বিয়ের পর থেকে কোনোদিন দেখে নাই দুপুরের আগে বাড়িতে, এমন কাজপাগল মানুষটা, যে কাজ দিয়েই বাড়ি করেছে, পুকুর করেছে, মাঠে জমি কিনেছে। আজ কেন ফিরে এল?

দবির মায়ের কথার তেমন কোনো কিছু না বুঝে রসুইঘরের দরজায় পাছা লেপ্টে বসে গোয়ালঘরের দিকে তাকিয়ে থাকে। শাবান আলি বাড়ির ভিতরে না ঢুকে পাড়ামুখি হয়।

পাড়ায় ঘোরে শাবান আলি। বিভিন্ন বাড়ির গোয়াল ঘরের দাওয়ায় বসে তামাক খায়। আলাপ করে মানুষজন ভারতে চলে যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, পাক-মিলিটারি কখন আসতে পারে ইত্যাদি যুদ্ধের নানাপ্রসঙ্গে কথা বলে দেখতে দেখতেই রোদ চড়ে। দুপুরে গড়িয়ে বিকেলের দিকে হেলে। অসীম প্রসারিত নীলিম শূন্যতায় ভাসমান রোদ, গাছের শাখায় শাখায় পাখিদের কলকাকলি, ঘুঘুর সবিরাম কুরুৎ করুর কু, বিলে মৃদুবাতাসে দোলায়িত কলমিফুল, বকগুলোর অলস চলাফেরা, জেলেদের মাছধরার মহড়াÑ শাবান আলির দৃষ্টি পড়ে সেদিকে। হঠাৎ একটি কোলাহল শোনা যায়, মানুষের চিৎকার, চেঁচামেচি। বাঁচাও। পালাও। পালাও।

শাবান আলির অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। গ্রামের মানুষেরা যে যেখানে আছে সেখান থেকেই সামনের দিকে দৌড়াতে শুরু করেছে। কেউ কেউ বিলে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কেউ কেউ ওপারে যাওয়ার জন্য ধীর গতিতে সাপের মতো শরীর ডুবিয়ে সাঁতরে যাচ্ছে।

শাবান আলি এক দৌড়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। হতভম্ব হয়ে গোয়ালঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, বউ, ও বউ, তাড়াতাড়ি বাড়িত্তো বাইর অও। ফোলাফান লইয়া দৌড় দেও। মিলিটারি আইয়া ফড়ছে। তাড়াতাড়ি ফলাও। আমি গরুডি লইয়া যাইতাছি। তুমি ফোলাফান লইয়া বাইর অও।

শাবান আলি তিনটি গরুর দড়ি ধরে টানতে টানতে এগিয়ে যায় বিলের দিকে। বিলে গরু নামিয়ে দিয়ে কোথাও সাঁতরে, কোথাও বুকপানি মাড়িয়ে এগিয়ে যায়। শত শত মানুষ কখনও হেঁটে কখনও সাঁতরে বিল পাড়ি দিচ্ছে। সবার চোখে-মুখে মৃত্যুর আতঙ্ক, হাহাকার। হায়, কী অইবো গো? কেয়ামত আইছে গো, কেয়ামত।

গ্রামের মানুষেরা জানে পাকিস্তানিরা সাঁতার জানে না, তাই বিলের ওপারে যেতে পারলে অন্তত জানে বাঁচা যাবে। সে ভাবনায় সবল মানুষেরা গরুবাছুর নিয়ে ওপারে গিয়ে পৌঁছায়। গ্রামের নারীরা আর শিশুরা বিলের উত্তর পাড় ধরে হেঁটে, দৌড়ে পালাতে শুরু করে। সবার মুখে আর্তনাদ আর হাহাকারের অনুচ্চ রব।

কিছুক্ষণ পরেই গাছগাছালিতে ঢাকা গাঢ় সবুজের বুক চিরে তেলিহাটি গ্রামের পেটের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে আগুনের আভা। বৃষ্টির মতো গুলি। বিলের ওপারে দাঁড়িয়ে গ্রামের মানুষেরা দেখছে, আর বলছে, অমুকের বাড়ি গেল, আহা! তমুকের বড় ঘরটা গেল, আহারে, আহা! কেউ কেউ রোদন জুড়ে দেয়।

টিনের চালা পুড়ছে। কড়াৎ কড়াৎ গুলির শব্দ। ঘরের শুকনো বাঁশের খুঁটি ফাটছে ফটাশ, ফটাশ। আতঙ্কে, কষ্টে মানুষ বিলের পাড় থেকে আর্তনাদ করছে। কেউ কেউ আরও দূরে পালানোর জন্য দৌড়াতে শুরু করেছে। নারী-পুরুষ, শিশু, যুবক-যুবতী সবার প্রাণ যেন হাতে নিয়ে দৌড়াচ্ছে।

আকাশে একটি জেট বিমান উড়ে গেল। একজন আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছিল, ওই যে জাজ যায়।

পাশের একজন ধমক দিয়ে বলল, আঙুল দেয়া দেহাইস না। গুলি মারবো।

সবুজে ঢাকা গ্রামটির পেট চিরে আগুনের কু-ুলি ভেসে ওঠেছে। লাল টকটকে আগুনের মাথায় কালো ধোঁয়ার কু-ুলি অবাধ গতিতে আকাশমুখি। ঠাস ঠাস শব্দে কানে তালামারা অবস্থা। একঘর থেকে আরেক ঘরে, এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই।

হঠাৎ শাবান আলির বাড়িতে আগুন দেখে দুচোখ চেপে ধরে সে মাটিতে বসে পড়ে। গরুগুলো অসহায় চোখে তাকিয়ে থেকে ঘাসের চাতালে মুখ লাগায়। ভাসমান সাদা-কালো ধোঁয়ায় একটি গ্রাম থেকে আরেকটি গ্রাম ঝাপসা দেখায়। শাবান আলির বাড়িটি প্রথমে কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়, তারপর কালো ভেদ করে লাল টকটকে আগুনের তাফাল আকাশের দিকে মুখ তোলে সাপের মতো হিস্ হিস্ করে। এর মাঝে যখন গুলির শব্দ শোনা যায় তখন বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর বুকে কাঁপন ওঠে। শরীর আস্তে আস্তে অবশ হয়ে আসে। মাটিতে ঘাসের আড়ালে শুয়ে পড়ে কেউ কেউ দোয়া-দরূদ পড়ে, কেউ কেউ ভগবানকে ডাকে।

শাবান আলি বাড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে স্থির দৃষ্টিতে। গত চৈত্রমাসে বাঁধা ঘরটির ‘খাপকুরু’ যখন দগ্ধ হতে দেখে তখন যেন শাবান আলির পাঁজরের হাড় পোড়ে। শাবান আলি আর্তনাদ করে বলে, আহ, আল্লাহ গো আমার ঘরটা বাছাও।

তার চোখ থেকে দরদরিয়ে পানি পড়ে গাল বেয়ে নিচে নামে।

অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে দাউ দাউ করা আগুন স্তিমিত হয়ে আসে। গাছগাছালিতে ছাওয়া গ্রামটি কালো ছাই হয়ে কঙ্কালের মতো দেখায়।

ঘণ্টাখানেক পর গুলি ছুড়তে ছুড়তে পাকবাহিনী গ্রাম ছাড়ে। ওরা চলে গেলেও সবাই ভীত, ভাবে, যদি ঘাপটি মেরে ওরা ওঁৎ পেতে থাকতে পারে। আরও কিছুক্ষণ পর বিলপাড়ে ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষেরা সমবেত হতে শুরু করে। ওরা হতভম্ব, দিশেহারা, বাকরুদ্ধ। চেনা মানুষগুলো অচেনা।

একজন বলল, ওরা চলে গেছে গো মিয়ারা, আস্তে আস্তে চলো যাই। হায় হায় গো, কী সাড়ে সব্বোনাশটা হইছে গো। আইয়ো মিয়ারা আমার লগে।

পথকে সংক্ষিপ্ত করতে ওরা বিলের পানি ভেঙেই রওনা হয়। আগুনে পোড়া গ্রামটিকে রাতের শ্মশানের মতো দেখায়। গ্রামের মেয়েরা কে কোথায় আছে কে জানে। এতক্ষণ হতবিহ্বল মানুষগুলো শুধু আগুনের লেলিহান শিখাই দেখেছিল, আপনজনের কথাও মনে পড়েনি। এখন তাদের কথাও ভাবনায় এসে ঢোকে। শাবান আলিও ভাবে, হাজেরা কই আছে, কই আছে পোলাপান।

বিলপাড়ে সমবেত মানুষগুলো গ্রামে ফিরে এসে ভস্মীভূত নিজ নিজ বাড়িঘরের দিকে তাকিয়ে থেকে ডুকরে কাঁদে। কেউ কেউ ছাইভস্ম হাতে নিয়ে দেখছে। এমন শাবান আলিও বাড়ির ভিতর ঢুকে তার ঘরটির দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে।

আর অকস্মাৎই তার চোখে পড়ে একটি দগ্ধ শিশু।

শাবান আলি গগণ-বিদারী আর্তনাদে ফেটে পড়ে, আমার দবির, হায়…।

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares