মুক্তিযুদ্ধের গল্প – যুদ্ধ ও ক্ষুধা : তপন দেবনাথ

মুক্তিযুদ্ধের গল্প

যুদ্ধ ও ক্ষুধা

তপন দেবনাথ

 

উত্তাল মার্চ। ১৯৭১এর সেই ভয়াল মার্চ। অগ্নিঝরা সেই মার্চ মাস জুড়ে বাংলাদেশে এমন সব ঘটনা ঘটে যে অন্য যে কোনো মাস থেকে মার্চ মাসটি আলাদা বৈশিষ্ট্যে মহিমাম্বিত। মার্চ মাসের নাম এলেই বাঙালি জাতি শিহরিত হয়।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ জাতীয় অধিবেশন আহ্বান করেন। বাঙালি জাতি এবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এবার তাদের বৈষম্যের চির-অবসান হবে। হৃদয় উজার করে তারা আওয়ামী লীগকে ভোট প্রদান করে। এবার আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করবে। তাদের মোটা ভাত, মোটা কাপড়ের সংস্থান হবে। ২২/২৩ বছর ধরে জমে থাকা পুঞ্জীভূত ক্ষোভের অবসান হবে। কোনো অধিকার ছাড়াই ওরা আমাদের দাস বানিয়ে রেখেছিল। আমরা ভৃত্য, ওরা প্রভুÑ এই ছিল ওদের আচরণ। বিশাল আত্মসম্মানের অধিকারী বাঙালিরা ১৯৭০ সনের ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে নিজেদের আত্মমর্যাদা নিয়ে নিজেদের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিল।

১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দুপুর একটার দিকে ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার পরই ঢাকার চেহারা বদলে যেতে থাকে। চিরচেনা ঢাকা যেন অচেনা নগরীতে পরিণত হয়। লোকজন রাস্তায় নেমে আসে। এই দিন থেকেই বাঙালিরা ধারণা করতে থাকে যে এবার সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটবে। ইয়াহিয়া খানের এই ন্যাক্কারজনক ঘোষণার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়।

অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির তৎপরতাÑ এ দুটি বিষয় পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে কর্মরত এবং পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত বাঙালি সদস্যরা খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। আন্দোলন জোরদার হওয়ার পটভূমিতে এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ-তৎপরতার মুখে সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যরা উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েন। তারা দেশের আসন্ন বিপদ সম্পর্কে আঁচ করতে পারেন। তাঁরা অনুভব করতে থাকেন যে এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য তাদের প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।

এই সংকটময় এবং আসন্ন বিপদসংকুল সময়ে তারা আওয়ামী লীগ থেকে কোনো নির্দেশ বা সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেসামরিক প্রশাসন, সাধারণ জনগণকে বিভিন্ন আদেশ-নির্দেশ দেন, যা সবাই মেনে চলছিল। মূলত আওয়ামী লীগ তখন সরকার গঠন না করলেও, বঙ্গবন্ধু সরকার প্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান না হলেও, তার হুকুমেই দেশ চলছিল।

দেশের এই সংকটময় অবস্থার মধ্যে বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চ ভাষণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু কী বলেন তা শোনার জন্য দেশের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতিকে একটা দিকনির্দেশনা দেয়। দেশের মানুষ তাঁর পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।

১৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। তখনও বাংলার জনগণ আশার আলো দেখতে থাকে। এবার একটা সমাধান হবে। এরপর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ জাতীয় অধিবেশন বসার ঘোষণা দেন। অরাজক এ পরিস্থিতিতে কিছুটা হলেও আশার আলো দেখা দেয়। মানুষজন ভাবতে থাকে যে, জাতীয় অধিবেশনে বসতে পারলে একটা সমাধান বের হয়ে আসবে।

পাকিস্তানের আচরণ এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ছলচাতুরী বাংলার জনগণের খুব ভালো করেই জানা ছিল।  ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে দেশের সংগ্রামী জনতা বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তানের পতাকা না উড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। ১৫ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যে আলোচনা চলতে থাকে। সে আলোচনায় দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি না দেখে দেশের মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তাঁদের মধ্যে কী আলোচনা হচ্ছিল দেশের জনগণ সেটা বিশদ জানতে পারেনি। আজ পর্যন্তও সে আলোচনার কোনো ফলাফল প্রকাশিত হয়নি। তবে আলোচনা চলাকালীনও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য এবং অস্ত্র আমদানি করা হচ্ছিল। ধারণা করা যেতে পারে যে ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে ধু¤্রজালে রেখেছিলেন।

২৫ মার্চ সকাল থেকেই সেনানিবাসের অভ্যন্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। ট্যাংক, কামান ইত্যাদি ভারী অস্ত্রগুলো প্রস্তুত করছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। বিকেল বেলা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তাঁর বিরাট গাড়িবহর নিয়ে সেনানিবাসে গেলেন। সন্ধ্যায় চা-চক্রের পর তিনি আবার তার বিরাট গাড়িবহর নিয়ে প্রেসিডেন্ট ভবনে অবস্থান করছেন। গত ১৫ দিনের আলোচনায় কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলেও ষোল দিনের দিন তো হতে পারে, বা তার পরের দিনÑএই ছিল বাঙালিদের ধারণা।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সামরিক কর্মকর্তাদের দ্বারা প্রচ-ভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তারা প্রেসিডেন্টকে বোঝায় যে সেনাবাহিনী খুব সহজেই এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। রাজনৈতিকভাবে প্রেসিডেন্টকে কারো কাছে নতি স্বীকার করার দরকার নেই। পাষ- ইয়াহিয়া খান সেনাবাহিনীর প্রস্তাব লুফে নেন। সন্ধ্যার পর গোপনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করেন।

২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে তাঁর ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। সে রাতেই সেনাবাহিনী অতর্কিতভাবে বাঙালি জাতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং অগণিত মানুষকে হত্যা করে। সে রাতে ঠিক কতজন লোককে হত্যা করা হয়েছিল তার সঠিক পরিসংখ্যান জানা না গেলেও সে হত্যাকা- ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা হিসেবে বিবেচিত। সে রাতে যাদেরকে  হত্যা করা হয়েছিল তারা কেউ রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল না, তবে কেন তাঁদেরকে এমন নির্বিচারে হত্যা করা হল? স্মর্তব্য যে ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডেকেছিলেন, সে রাতেই তিনি পালিয়ে পাকিস্তান চলে যান এবং ২৫ মার্চ রাতেই বাংলাদেশে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম গণহত্যা চালানো হয়। যদি এখানেই থেমে যাওয়া যেত তাহলেও কথা ছিল না।

২৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান রেডিও ও টেলিভিশনে এক ভাষণেএই গণহত্যার জন্য বঙ্গবন্ধুকে দায়ী করেন। পরিহাস আর কাকে বলে? সে সময় বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি ছিলেন। এমন কি তাঁর অবস্থানও স্পষ্ট ছিল না, তাঁকে কোথায় রাখা হয়েছে। বাঙালি জাতিকে নিয়ে ইয়াহিয়া খানের প্রেতাত্মা জুলফিকার আলী ভূট্রো যে পরিহাস করেন পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ২৬ মার্চ ভূট্রো ঢাকা ত্যাগ করেন এবং নারকীয় হত্যাকা-ের জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে অভিনন্দন জানান। তিনি আরও বলেন, ‘থ্যাংকস গড, পাকিস্তান হ্যাজ বিন সেভ্ড্।’

 

দুই

উইং কমান্ডার মুক্তিবাহিনী হামিদুল্লাহ খানের নেতৃত্বে ১১ অক্টোবর ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম তীরে অবস্থিত চিলমারি বন্দর আক্রমণ করেন। এটি ছিল পাকিস্তানিদের শক্তিশালী একটি ঘাঁটি। মুক্তিবাহিনীর তীব্র আক্রমণে শাক্তিশালী পাকিস্তানি বাহিনীর পতন ঘটে। তীব্র যুদ্ধের পর বহু যুদ্ধবন্দি, প্রচুর গোলা ও অস্ত্রসহ মুক্তিবাহিনীর দলটি ১৩ অক্টোবর রৌমারি ফিরে আসে।  ঐ যুদ্ধে পাকিস্তানি সৈন্যদের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়ে। জীবিত সৈন্যরা মুক্তিবাহিনীর কাছে বন্দি হয়।

‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ১১ নং সেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন উইং কমান্ডার (অব.) হামিদুল্লাহ খান। এই সেক্টরটির প্রথম অধিনায়ক ছিলেন লে. কর্নেল আবু তাহের। ১৫ নভেম্বর কামালপুর যুদ্ধে তিনি আহত হলে হামিদুল্লাহ খান সেক্টরটির সামরিক অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যুদ্ধে চিলমারি, কামালপুরসহ বেশ কয়েকটি স্মরণীয় অপারেশন এই সেক্টরে সংঘটিত হয়। এসব যুদ্ধে কর্নেল তাহেরের সহযোগী ছিলেন হামিদুল্লাহ খান। মোট ৮টি সাবসেক্টরে বিভক্ত ১১ নং সেক্টরের ভৌগলিক সীমানা ছিল তখনকার কিশোরগঞ্জ মহকুমা বাদে সমগ্র ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলা এবং নগরবাড়ি, আরিচা থেকে ফুলবাড়ি বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত যমুনা নদী ও তীরাঞ্চল।

চিলমারি বন্দর দখলের পর মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ভীষণভাবে বেড়ে যায়। কেননা শক্তিশালী পাকিস্তানি বাহিনীকে ধরাশায়ী করা কম কথা ছিল না। অস্ত্রের চাইতে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের মনের জোর ছিল বেশি। এদেশকে শত্রুমুক্ত করতেই হবে। হয় যুদ্ধে জয় করে দেশকে স্বাধীন করা নতুবা মরে যাওয়া- এর মাঝামাঝি অন্য কিছু নেই। দেশের মুক্তিকামী মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের অকুণ্ঠ সমর্থন যুগিয়েছে যেটা মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বৃদ্ধি ও যুদ্ধ  জয়ে সহায়তা করেছে। মুক্তিযুদ্ধটি আসলে তখন জনযুদ্ধের রূপ লাভ করে।

হামিদুল্লাহ খান একদল মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে চিলমারি খাদ্য গুদামের দিকে অগ্রসর হন। উদ্দেশ্য খাদ্য গুদাম জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া। সে সময় সে অঞ্চলে মঙ্গা চলছিল। অনাহারে মানুষজন মারা যাচ্ছিল। খাদ্যাভাবের ভয়াবহতা যুদ্ধের ভয়াবহতার চেয়ে কম নয়। যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের পরেও বেঁচে থাকার স¤া¢বনা থাকে, কিন্তু ক্রমাগত অনাহারে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে না। অনাহারে কয়েকদিনের মধ্যেই মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়। খাদ্য গুদামে প্রচুর খাদ্য থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানিরা অনাহারী লোকদের কোনো প্রকার সাহায্য করছে না। বাঙালিদের মৃত্যুই যেন তাদের কাম্য। না, আর একটি মানুষকে অনাহারে মরতে দেওয়া হবে না। বীরদর্পে হামিদুল্লাহ খান তাঁর বাহিনী নিয়ে খাদ্য গুদামের দিকে এগিয়ে গেলেন।

খাদ্য গুদাম খুলে দেওয়া হলো। মুহূর্তে খবর ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। শত শত মানুষ ছুটে এলো খাদ্য গুদামে। যে যেভাবে পারছে ধান, চাল, গমের বস্তা নিয়ে যাচ্ছে। অনাহারে লোকগুলো কংকালসার হয়ে গেছে। তারপরেও এই বড় বস্তাগুলো তারা টেনে নিয়ে যাচ্ছেÑ যে যেভাবে পারছে। গায়ের শেষ শক্তিটুকু ব্যয় করতেও তাদের কার্পণ্য নেই। যেখানে অনাহারে তারা মারা যাচ্ছে সেখানে খাদ্য গুদাম থেকে তারা বস্তায় বস্তায় খাদ্য নিতে পারবে এটা তাদের কল্পনায়ও ছিল না। তখনও চারিদিকে থেমে থেমে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। মুক্তিবাহিনী চিলমারিতে পাকিস্তানিদের পরাজিত করলেও দেশ তো এখনও স্বাধীন হয়নি। যুদ্ধ এখনও চলছে।

অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছেন হামিদুল্লাহ খান। অনেকটা নির্লিপ্ত তিনি। কংকালসার লোকগুলো কীভাবে খাদ্যসামগ্রীর বস্তাগুলো নিচ্ছে সেটাই  তিনি দেখছেন। এদের কাছে এখন যুদ্ধের ভয়াবহতার চাইতে খাদ্য সংগ্রহটাই আসল। যে কোনো সময় একটি গুলি যে কারও জীবন বিপন্ন করে দিতে পারে কিন্তু সে দিকে কারও কোনো প্রকার ভ্রুক্ষেপ নেই।

মুক্তিযোদ্ধাগণ তাকিয়ে আছেন হামিদুল্লাহ খানের দিকে। তাঁরা জানেন না তাদের পরিবার এখন কোথায় আছে, কেমন আছে। তারাও এখন খাদ্যাভাব আছে কিনা কে জানে। মুক্তিযোদ্ধাগণ সশস্ত্র পাহারা দিচ্ছে। খাদ্য গুদাম খালি না হওয়া পর্যন্ত তারা এখানে অবস্থান করবে। তারা শপথ নিয়েছে এদেশকে স্বাধীন করতেই হবে। এদেশের মানুষের ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

খাদ্য গুদাম খুলে দেওয়া হয়েছে, এ কথা শুনে শমিরন বেওয়া তার নাতিকে কোলে করে চলে গেলেন চিলমারি খাদ্য গুদামে। নাতিকে গুদামের দেয়ালের সাথে বসিয়ে রেখে সে একটি চালের বস্তা নিয়ে টানাটানি শুরু করেছে। শমিরনের বয়স ৬০ বছর পার হয়ে গেছে। খাদ্যাভাব তার বয়স আরও যেন দশ বছর বাড়িয়ে দিয়েছে। সে বস্তাটিকে নাড়াতেই পারছে না। দেয়ালের পাশে বসে নাতি তার উচ্চস্বরে কাঁদছে। সে দিকেও তার খেয়াল নেই। পাশ ফিরতেই শমিরন দেখেন অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছেন হামিদুল্লাহ খান। কোনো রকম ভূমিকা না করেই শমিরন বললেনÑ‘বস্তাটা হামার বাড়িত নিয়া আসবু?’

বৃদ্ধার কথা শুনে অবাক হলেন হামিদুল্লাহ খান। বাচ্চাটি দেয়ালের সাথে পিঠ হেলান দিয়ে সজোরে কাঁদছে। যে কোনো সময় একটি গোলা বা কামানের আঘাত তার ছোট দেহটি বিদীর্ণ করে দিতে পারে। বৃদ্ধা নিজেও নিরাপদ নন। যে-কোনো সময় তিনিও বিপদের সম্মুখীন হতে পারেনÑ এর মধ্যেই তিনি বস্তাটি নেওয়ার চেষ্টা করছেন। চারিদিকে তাকালেন হামিদুল্লাহ খান, এমন কাউকে দেখছেন যে বস্তাটি বৃদ্ধার বাড়িতে পৌঁছে দিতে পারে। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে থেকে কাউকে তিনি বলতে পারেন না। সেটা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বৃদ্ধার কাছে এগিয়ে গেলেন তিনি। শমিরন বেওয়া চোখ বড় করে হামিদুল্লাহ খানের দিকে একবার তাকিয়ে বস্তাটি শক্ত করে আগলে ধরল। বৃদ্ধার সন্দেহ হয়েছিল হামিদুল্লাহ খান বস্তাটি নিতে তাকে বাধা দেন কিনা।

যুদ্ধের ভয়বহতা ও শঙ্কার চেয়েও ক্ষুধার জ্বালা যে কত বড় তা উপলব্ধি করলেন হামিদুল্লাহ খান। আবার চারিদিকে তাকালেন তিনি। এমন কাউকেই দেখছেন না যাকে দিয়ে বস্তাটি বৃদ্ধার বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে পারেন। তখনই তার উপলব্ধি হলোÑ এদেশকে স্বাধীন করতেই হবে। মানুষের ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। গুদামে খাদ্য মজুত থাকবে আর বাংলার মানুষ না খেয়ে মরবেÑ তা আর হতে দেওয়া হবে না। থেমে থেমে তখনও গুলির শব্দ আসছে। হামিদুল্লাহ খান কান খাড়া করছেন। সঙ্গীদের অবস্থান এবং তাঁদের পজিশন পরখ করছেন। বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেনÑ‘এই বস্তাটি কি আপনি নিতে পারবেন? চারিদিকে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। যে-কোনো সময় বিপদ হতে পারে।’ বস্তাটি আরও শক্ত করে ধরে শমিরন বেওয়া বললেনÑ‘এ বস্তা মোক নিবাই লাগবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares