মুক্তিযুদ্ধের গল্প- মধ্য দুপুরের নৃত্যনাট্য : দিলওয়ার হাসান

মুক্তিযুদ্ধের গল্প

মধ্য দুপুরের নৃত্যনাট্য

দিলওয়ার হাসান

 

এ-বছর আমাদের অঞ্চলে প্রবল বর্ষণ হওয়ায় গেরিলা ওয়ারফেয়ারে বিস্তর সুবিধে হচ্ছে। পাক আর্মিরা জল কাদা, খাল বিল আর নদ-নদীকে খুব ভয় পায়, যদিও সাঁতারে কম্পলসারি ট্রেনিং তাদের আছে; কিন্তু থ্রি-নট-থ্রির গুলি দিয়ে লঞ্চের খোল ছিদ্র করে দেওয়ার পর লঞ্চ ডুবে গেলে ওরা আর উঠতে পারে না।

গত তিন-চার দিন ধরে ঝুম বৃষ্টি, কোথাও বেরুনো যাচ্ছে না। স্বর্ণকমলপুর শহর থেকে দুমাইল দূরে পুটিমারা গ্রামের একটা বাড়িতে পচেগলে মরছি আমরা পাঁচজন। আমি, আহসান, সুনীল, রহমত, আর আমির। সিগ্রেটের অভাবে সবাই এখন বিড়িখোরে পরিণত হয়েছি। মাঝেমধ্যে লোকাল বাজারে বিড়িও পাওয়া যায় না। তখন রিস্ক নিয়ে শহর থেকে আনাতে হয়Ñ তামাকের এমনই নেশা।

আমরা আশ্রয় নিয়েছি খুবই দরিদ্র এক বর্গা চাষির বাড়িতে। সে ছেলেপুলে নিয়ে একটা ছনের ঘরে থাকে, আমরা থাকি আরেকটাতে। গেলবার শুকনো মৌসুমে ছাইতে পারেনি বলে চাল দিয়ে পানি পরে। ঘরে কোনো তক্তপোষটোশ নেই, খেজুরের পাটির ওপর ছেঁড়া কাঁথা বিছিয়ে শুয়ে থাকি।

এ-বাড়িটা গ্রামের একেবারে শেষ মাথায় জংলা একটা এলাকায়। ঘরবাড়ি দূরে দূরে। বাড়িটা নানানজাতের গাছ পালায় ছাওয়া বলে দিনের বেলাতেও অন্ধকার। সন্ধ্যা হলেই বাড়ির আশপাশে শেয়াল ডাকতে থাকে। গত তিন-চার দিন সানকিতে করে ভাত খাচ্ছি, কখনও উঠানে ফলানো ডাটার চচ্চড়ি কিংবা ডাটা শাক দিয়ে। সঙ্গে কাঁচামরিচ ও পেঁয়াজ থাকায় স্বাদটা মন্দ লাগে না।

সারাদিন দরজা জানালা বন্ধ করে নিচুস্বরে আলাপ করি আমরা। আমাদের অবস্থানের কথা এ-বাড়ির লোক ছাড়া কাক-পক্ষীও জানে না। সঙ্গে আমাদের তেমন কোনো আর্মস্ অ্যামুনেশন নেই। প্রত্যেকের কাছে একটা করে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল আর কিছু গুলি। এ-গুলো দিয়ে বড় কোনো অপারেশন করা যায় না। গেরিলা কায়দায় চোরাগোপ্তা হামলা করা যায় শুধু। আমাদের স্বপ্নের বিপ্লবী চে গুয়েভারার গেরিলা ওয়ারফেয়ার বইটা তখন বেরিয়েছে। গত বছরই আমার হাতে  এসেছে। ও বইয়ের সূচিপত্রসহ আমার মুখস্থÑ এসেন্স  অব গেরিলা ওয়ারফেয়ার, গেরিলা স্ট্র্যাটেজি, গেরিলা ট্যাকটিস, ওয়ারফেয়ার অন ফেভারেবল গ্রাউন্ড, সাবারবান ওয়ারফেয়ার, গেরিলা ফাইটার : সোসাল রিফর্ম , সাপ্লাই, সিভিল অর্গানাইজেশন, রোল অব দ্য ওম্যান, মেডিক্যাল প্রবলেমস, স্যাবোটাজ, প্রপাগান্ডা, ইন্টিলিজেন্স…। ওখানে আছে গেরিলাস আর আর্মড ভ্যানগার্ড অব দ্য ফাইটিং পিপল। একখানা বেদবাক্য পাওয়া যায়Ñঅ্যান অ্যাটাক শুড বি ক্যারিড আউট ইন সাচ অ্যা ওয়ে টু গিভ গ্যারান্টি অব ভিক্টরি…।

স্যাবোটাজ, রেইডস, পেটি ওয়ারফেয়ার, হিট আন্ড রান ইত্যাদি তখন আমাদের মুখে মুখে। হলে কী হবে, আমাদের সবার তো ট্রেনিংই নেই। এ বাবদে প্রধান ভরসা দেশপ্রেম আর বুকের পাটা। অস্ত্রশস্ত্রও নেই তেমন। আমাদের সহযোদ্ধা আহসানের খুব আফসোস এ-নিয়ে। একদিন বলছিল, ‘কী দিয়ে যুদ্ধ করব আমরা? ভিয়েতনামের দিকে দেখ, ৬৫-তেই তাদের হাতে চীনে তৈরি একে ৪৭ এসে গেছে। ওদের হাতে আছে ভারি, মাঝারি ও হাল্কা মেশিনগান এগুলো দিয়ে তারা হেলিকপ্টার ভূপাতিত করে। মর্টার, ল্যান্ডমাইন, গ্রেনডেরও কমতি নেই। অথচ আমাদের বেলায় দেখ পাকিস্তানের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে আছে চীন।

একটা জিনিস ওদের খুব হেল্প করে- বুবি ট্র্যাপ যা দিয়ে ওরা শত্রুর মুভমেন্ট বাধাগ্রস্ত করে, তাদের হকচকিয়ে দেয়, কখনও কখনও তাদের প্রলুব্ধ করে, বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দেয়। শুনে আশ্চর্য হবে বুবি ট্র্যাপ হিসেবে ওরা সাপ ও বন্য জন্তুজানোয়ার ব্যবহার করে। অবশ্য ভিয়েতনামে বিস্তর বনজঙ্গল আছে। খুবই ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটা। বাঁশের লাঠি, গাছের ডাল এমনকি খড়কুটোও ব্যবহার করা হয় বুবি ট্রাপের জন্য।

ঝুম বৃষ্টির চতুর্থ দিন সাইকেল ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে একটা ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ পেলাম। আমাদের বন্ধু ও সহযোদ্ধা সুখেন ভৌমিককে পাক আর্মিরা ধরে নিয়ে অকথ্য নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে। স্বর্ণকমলপুর থেকে চার  মাইল দূরে মানতারা হাইওয়ে কন্ট্রোল ক্যাম্পের সামনে একটা গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে তার লাশ। শুনে আমরা শোক বিহ্বল ও দিশেহারা।

পরের দিন সকালে বৃষ্টি একটুখানি কমলে মানতারা রওয়ানা হলাম। এলাকাটা রেকি করা দরকার। সুখেনের লাশ উদ্ধার করে সৎকারও করতে হবে, যদিও সেটি সহজ কাজ নয়।

ক্ষেতের আলপথ দিয়ে সড়কে এসে উঠতে আধা ঘণ্টা লাগল। এ-পথে আর্মির গাড়ি মুভমেন্ট করে বলে দেখেশুনে চলতে হচ্ছে। গাড়ি দেখলেই সাইকেল ঢালে নামিয়ে দিতে হবে। পনের মিনিট চলার পরও কোনো আর্মির গাড়ি নজরে এল না। সাইকেল  স্লো চালাতে লাগলাম। দূর থেকে দেখতে পেলাম গলার সঙ্গে রশিতে ঝুলানো সুখেনের লাশ, গায়ে কোনো কাপড় নেই। মনে হলো সাইকেল থেকে পড়ে যাব। চোখ ফিরিয়ে নিলাম। ক্যাম্পটা করা হয়েছে একটা প্রাইমারি স্কুলের ভেতর। বালির বস্তার প্রতিবন্ধকের ভেতরে বসে মেশিন গান নিয়ে পাহারা দিচ্ছে এক সৈন্য। চারদিক শুনশান।

আশপাশের বাড়িঘরগুলোতে লোকজন নেই। একটু দূরে যেতে এক বৃদ্ধকে পাওয়া গেল। হাতে তেলের বোতল। সাইকেল থামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘চাচা মিয়া এই ক্যাম্পে কয়জন আছে?’ প্রথমে ইতস্তত করল। তখন নিজের পরিচয় দিতে হলো। বৃদ্ধ জানাল, চার-পাঁচজনকে সব সময় দেখা যায়। গাড়ি নিয়ে টহল দিতে বের হয়। তারা সারাক্ষণ মেয়ে মানুষ আর মুরগি খোঁজে। মেয়ে মানুষ এই তল্লাটে একটাও নেই। মুরগি যা ছিল সব ধরে নিয়ে গেছে ওরা। কয়েকজনের সঙ্গে আলাপে জানা গেল তারা সকালে বেরিয়ে দুপুরে ফেরে, বিকেলে বেরিয়ে ফেরে অনেক রাতে। মাথায় সারাক্ষণ ঘুরে বেড়াচ্ছে কখন হামলা করলে সুবিধে, কীভাবে হামলা চালালে বেশি বেনিফিট পাওয়া যাবে।

সকালে খাওয়া হয়নি কিছু। মাথাটা ঘুরছিল। সামনে ছোট একটা বাজার আছে; কিন্তু যাওয়াটা রিস্কি। রাজাকাররা সেখানে বসে আড্ডা দেয়। তাদের খপ্পরে পড়লে রক্ষে নেই। বাজারের পথ এড়িয়ে আলপথ ধরে রওয়ানা হলাম।

সুখেনের কথা মনে পড়ছিল খুব। পুখুরিয়া বাসস্ট্যান্ডে ধরা পড়ে। ঘিওর থেকে আসছিল। একজন রাজাকার ওকে চিনে ফেলে। হাইওয়ে পার হয়ে কাঁচা রাস্তায় নামছিল সুতালড়ির মুক্তাঞ্চলে যাবে বলে। হেঁটে যেতে ঘণ্টা তিনেক লাগত।

সুখেন স্বর্ণকমলপুর ডিগ্রি কলেজের বি.এ. প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিল। রোজ বাসে করে ক্লাস করতে আসত। আমার এক ক্লাস নিচে পড়লেও একই ছাত্র সংগঠনের সদস্য ছিলাম আমরা। স্ট্যাডি সার্কেলে আমার গ্রুপে ছিল। ফলে ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায় আমার। ভালো ছাত্র ছিল। গরিব কৃষকের সন্তান। অনেকগুলো ভাই-বোন। সুখেন সবার বড়। এপ্রিলের মাঝামাঝি আমাদের সঙ্গে জয়েন করে। মেলাঘর ট্রেনিং ক্যাম্পে ওকে পাই। আমার পরে সীমান্ত পাড়ি দেয়। ও গিয়েছিল সাচ্চু ভাইদের সঙ্গে ঢাকা হয়ে। ওখানে আমরা কে ফোর্সের খালেদ মোশারফ আর ক্যাপ্টেন এটি এম হায়দারকে পেয়েছিলাম।

মেলাঘর জায়গাটা ছিল পাহাড় আর জঙ্গল ঘেরা। আমরা যখন ছিলাম ভীষণ গরম পড়েছিল। শীতের সময় নাকি খুব ঠান্ডা পড়ে। আমাদের সীমান্ত থেকে মাইলছয়েক হবে। ওখানে একটা চমৎকার লেক আছে। নাম রুদ্র সাগর। আমরা একদিন দেখতে গিয়েছিলাম। চোখ জুড়িয়ে যায়। সুখেন খুব মজা পেয়েছিল। লেকের উত্তর-পূর্ব পারে পুরনো আমলের বিশাল প্রাসাদ। প্রাসাদ নয় যেন দুর্গ। নামটাও চমৎকার- নীড়মহল। ত্রিপুরার মহারাজা বীর-বিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুর অতবড় বাড়িটা বানিয়েছিলেন। আমি আর সুখেন আগরতলা শহরেও যেতে চেয়েছিলাম, অনুমতি পাইনি। মেলাঘর ক্যাম্পের বেশির ভাগ প্রশিক্ষণার্থীই ছিল ঢাকা অঞ্চলের। ওখানকার জীবন ছিল খুবই কঠিন। দুই শিফটে ট্রেনিং হতো। খাবারদাবারের অবস্থাও ভালো ছিল না। পানির অভাব ছিল। অসুখ বিসুখে চিকিৎসাও তেমন পাওয়া যেত না। বাড়ির কথা মনে করে ওই বয়সেও সুখেন কাঁদত। আমি ওকে সান্ত্বনা দিতাম। ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতাম। সেই সহজ সরল শান্ত ছেলেটা এখন মৃতাবস্থায় গাছের ডালে ঝুলছে। ওর হত্যার বদলা আমাদের নিতেই হবে। কিন্তু কেমন করে ভেবে পাচ্ছিলাম না।।

দুপুরের পরে পুটিমারায় ফিরে এলাম। পুইশাক দিয়ে ভাত খাচ্ছিল ওরা। বসে গেলাম ওদের সঙ্গে; কিন্তু গলা দিয়ে ভাত নামছিল না।

‘তা আহসান কী করা যায় এখন ? একটা বুদ্ধিটুদ্ধি দাও।’

‘আমি আর কী বুদ্ধি দিমু, তুমিই যা হয় একটা কিছু কর। হাইকমান্ডের জন্যে বইসা থাকলে চলব না।’

‘তা ঠিক। তাহলে একটা নৃত্যনাট্য লিখে ফেলি। জায়গাটা রেকি করে এসে মনে হচ্ছে আইডিয়াটা কাজে লাগবে।’

‘কী কও এইসব, নৃত্যনাট্য মানে ? নকশিকাঁথার মাঠ, মায়ার খেলা, শ্যামা, চিত্রাঙ্গদা এই সব?

বললাম, ‘এগুলোর মতোই অনেকটা তবে এত পালিশ করা জিনিস না, ক্রুড। রমরমা, রগরগাও বলতে পার। অবশ্য নারী কুশীলব লাগবে অন্তত পাঁচজন…।’

‘কেন পুরুষ চরিত্র নাই ? থাকলে আমারে দিও একটা।’

‘একটাই মাত্র আছে, সে না হয় তোমাকেই দেব। কিন্তু ওই পাঁচজনের কী হবে? তোমাদের ওই চামেলিদের কি খবর? কিছু মনে করো না, যে-কোনো কারণেই হোক তোমার সঙ্গে ভালো খাতির। ওরা কি আছে পাড়ায় না পালিয়েছে? থাকলেও এর মধ্যে আসবে কিনা কে জানে? প্রাণের ভয় সবারই আছে।’

আহসান বলল, ‘চামেলি আর কবরীরে আমি কইতে পারুম, বাকি তিনজনের কী হইবো? তাছাড়া নাট্যের কিছুই তো আমি জানি না।’

‘সেটা তোমাকে বোঝান যাবে। কিন্তু আর্টিস্ট তো আমার লাগবে, না হলে নৃত্যনাট্য হবে কী করে?’

‘যাইয়া দেখুন যায়,…’

‘খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে। হাতে মোটেই সময় নাই। সুখেনের লাশ পচতে শুরু করেছে। খাওয়া শেষ করেই বের হও।’

আহসান চলে গেলে বিষয়টা নিয়ে সবার সঙ্গে আলাপ করলাম। আইডিয়া ভালো তবে খুব অ্যাকুইরেটলি ইমপ্লিমেন্ট করতে না পারলে সমূহবিপদ বলে মত প্রকাশ করল সবাই। সুনীল বলল, ‘হাইকমান্ডের অনুমতি ছাড়া এ কাজ ঠিক হইবো না।’

বললাম, ‘মুক্তাঞ্চল থেকে অর্ডার আনতে আনতে সুখেনের লাশ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। গেরিলারা অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে পারে।’

আহসান ফিরে এসে বলল, ‘তোমার ওই নৃত্যনাট্যে অংশ নিতে ওরা রাজি। পাঁচজনই পাওয়া যাইব। তবে খেতে না পেয়ে ওদের অবস্থা একদম কাহিল। কোনো রুজি রোজগার তো নাই। যত শিগগির সম্ভব অগোর খাইয়াতে হইব। বাচনের আশা ওরা প্রায় ছাইড়া দিছে। দিনতিনেক আগে আর্মিরা পাড়া থেকে দশ-বারোজন মেয়েকে তুলে নিয়ে গেছে। ওরা পাশের খালে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে দূরে চলে গিয়ে প্রাণ বাঁচায়। যাবার মতো জায়গা না-থাকায় পাড়াতেই থাইকা গেছে আর প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর প্রহর গুনতাছে,…’

মেয়েগুলোর জন্য খুব খারাপ লাগছে। সুনীলকে বললাম, ‘তাড়াতাড়ি স্বর্ণকমলপুরে যাও। চিঠি একখান লিখে দিচ্ছি। সানোয়ার চৌধুরীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে ওদের দাও- মাছ-গোছ খেয়ে ওরা তরতাজা হোক যাতে ঠিকঠাক মতো নাচতে পারে।’

নৃত্যনাট্য- মানতারা ক্যাম্পে বিচ্ছু অ্যাটাক

পাত্রপাত্রীগণ : হারমোনিয়াম বাদক-আহসান আহমেদ

প্রধান নর্তকী : মিস চামেলি বেগম

সহচরীগণ : মিস চম্পারানি দাস,

মিস আকলিমা খাতুন ও মিস রোমানা আক্তার

পরিচালক : আনিসুর রহমান

সময় : দুপুরের মধ্যভাগ

একটা পাঞ্জাবি গানের কলি ভাজতে ভাজতে কুশীলবদের মঞ্চে প্রবেশ (ক্যাম্পের সম্মুখস্থ খোলা জায়গা)। অগ্রভাগে গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে আহসান আহমেদ, তার পেছনে নর্তকীর দল। চামেলিরা আজ দারুণ সেজেছে। তাদের ডানাকাটা পরির মতো লাগছে।

প্রহরী পথ আগলে দাঁড়াল। চামেলি বিলোল দৃষ্টি হেনে বলল, ‘নাচ আওর গানা নেহি পছন্দ হ্যায়?’ তার বুক থেকে শাড়ির আঁচল একটুখানি নেমে গেল। সেদিকে তাকিয়ে প্রহরী ঠোঁট চাটল। তার অনুমতির তোয়াক্কা না করে দলটি এগিয়ে গেল। প্রহরী আটকাল না। জোরে জোরে হারমোনিয়াম বেজে উঠল। চামেলি গাইতে লাগলÑউজ দেখো নান্নো সিতো কে তেরেমেরি ইক জিনরি,… তার গান শেষ হতেই আহসান প্রত্যুত্তরের ভঙ্গিমায় গেয়ে উঠলÑ জারা সামনে, জারা সামনেতে চলোকে তেরে মেরে ইক জিছরি,…

ধীরে ধীরে গানের তাল ও লয় বাড়তে লাগল। চামেলির সাথে সাথে সখিরাও নাচতে লাগল। গানের লাইন দুটো হারমোনিয়ামে দ্রুতলয়ে বাজতে থাকে- তার সঙ্গে নাচ চলে। এক সময় উদ্দাম হয়ে ওঠে নাচ। নর্তকীদের বুকের আঁচল খুলে গিয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। চামেলির শাড়ি ততক্ষণে হাঁটুর উপরে উঠে গেছে। দুহাতে শাড়ি তুলে ধরে নাচছে সে। সখিরা চামেলিকে অনুসরণ করে। হারমোনিয়ামে বেজে চলে- উজ দেখো নান্নো সিতো কে তেরে মেরি ইক জিছরি,… একটা লাইন বারবার বাজতে থাকে। ক্যাম্প থেকে চার সৈন্য বেরিয়ে আসে। সম্ভবত খাবারের আয়োজন করছিল। উদ্দাম নাচ দেখে থ বনে যায়। তাদের চোখ নর্তকীদের সাদা পায়ের দিকে। নাচ তাদের প্রাণে দোলা লাগায়। সেই দোলা এক সময় শরীরে চালান হয়। শিস বাজিয়ে তারাও নাচতে থাকে। মাঝখানে আহসান আর চামেলি, তাকে ঘিরে চার সখি। ঘূর্ণির মতো নেচে চলেছে, যেন লাটিম ঘুরছে বো বো করে। নর্তকীদের কেশবাস আলথালু। সেদিকে নজর নেই তাদের। ধীরে ধীরে নাচের গতি স্তিমিত হয়ে আসে। যেন ক্লান্ত পরিরা মাটিতে লুটিয়ে পড়বে।

আহসান বৃত্ত থেকে বেরিয়ে একপা দুপা করে পেছনে হাঁটতে-হাঁটতে মঞ্চের বাইরে চলে আসে। সৈন্যদের চোখ মেয়েগুলোর উপর। কামনার আগুনে টগবগ করে ফুটছিল তারা। নর্তকীরা তখন অর্ধনগ্ন। সারিবদ্ধ হয়ে সৈনিকদের কুর্নিশ করে। একজন এগিয়ে এসে চামেলির হাত ধরে। হ্যাচকা টান দিয়ে বুকের সাথে মিশিয়ে ফেলে। আবেগ থর থর গলায় বলতে থাকে,‘পিয়ারি এইসব নাচ ফাচে মন ভরিবে না, চল তোমার দেহের সুধা পান করিব।’ সঙ্গে সঙ্গে আরও তিনজন সৈন্য এগিয়ে আসে, ঈষৎ টলটলায়মান যেন নেশা করেছে। কোথায় গেল তাদের অস্ত্রশস্ত্র, গুলি বন্দুক কে জানে?

নৃত্যনাট্যের নেপথ্যে কর্মীরা এগিয়ে আসে। একেবারে সামনে আমি, আমার পেছনে সুনীল, আহসান, রহমত আর আমির। খট খট খটÑ আমাদের রাইফেলে গুলি লোড হয়। মেয়েগুলোকে বিছানায় নিয়ে  ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে সৈন্যরা। আমাদের দেখে মেয়েরা ছিটকে বেরিয়ে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সৈন্যদের বুকে রাইফেলের নল ঠেকিয়ে ফায়ার করি। স্তব্ধ দুপুর, সহসা আড়মোড় ভেঙে জেগে ওঠে। পাশের ঝোঁপের পাখিরা ঝটপট উড়াল দেয়, আবার শিকারিরা এল নাকি? নিজেদের বিছানাতে কাতরাতে থাকে পাঁচ সৈনিক। একটু পরই তাদের শরীর নিথর। রকেটের গতিতে লাশগুলো টেনে এনে উঠানে জড়ো করি। ওদের গাড়িতে রাখা পেট্রলের ক্যান থেকে পেট্রল ঢেলে ম্যাচের কাঠি ধরিয়ে দিই।

সুখেনের লাশটার চোখ খোলা। আমাদের কা- দেখে হাসছে। শহরের মড়া পোড়ানোর এক্সপার্ট।

হরিনারায়ণ ঘোষকে খবর দেওয়া ছিল। সে তার দলবল নিয়ে ছো মেরে লাশটা নামিয়ে মুহূর্তের মধ্যে উধাও হলো।

দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। ওদের আর্মসগুলো তুলে নিয়ে দ্রুত সরে পড়ি। রাস্তা পার হয়ে জমির আলপথে নেমে যাই।

আহসান বলল, ‘দোস্ত আমাদের এই অপরেশন যে-কোনো ট্রাডিশনাল বুবি ট্র্যúকে হার মানিয়েছে। সাবাশ চামেলির দল।’ আমরা এগিয়ে যাই। চরাচরে বিকেল নামছে। মুক্তাঞ্চলে পৌছুঁতে পৌছুঁতে আমাদের রাত হয়ে যাবে।

 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares