মুক্তিযুদ্ধের গল্প- একটি অভাবিত মৃত্যু : ইকবাল হাসান

মুক্তিযুদ্ধের গল্প

একটি অভাবিত মৃত্যু

ইকবাল হাসান

বাইরে কনকনে শীতের রাত।

আর এই রাতে লঞ্চ থেকে নেমে সে কোথায় যাবে? যদি পরিচিত কারও দেখা না পায়, যদি ঘাটে নিদেনপক্ষে একটি নৌকাও অপেক্ষা না করে তার জন্যে! করার কথাও নয়, নিশ্চয়ই অপেক্ষার ক্লান্তি নিয়ে ফিরে গেছে। এত  দেরি করে ফেলেছে বেতাগি-বরগুনা লাইনের লঞ্চ। এমন হবার কথা নয়, তবু হল, নলছিটি ছেড়ে কিছুদূর যেতে না যেতেই এক বিকট চিৎকার তুলে বসে গেল ইঞ্জিন। তারপর ঘণ্টা তিনেক নদীর জলে ভেসে থাকা।

এক সময় কেবিন থেকে বেরিয়ে সে দেখে বাইরে অন্ধকার, সন্ধ্যার ফ্যাকাশে আঁচল সরিয়ে দিয়ে নেমেছে রাত, রাতের আকাশে অজস্র তারার ভিড়। তখন হামিদা বানুর সতর্কীকরণের কথা মনে পড়লে হতাশা এবং অনিশ্চিত রাতের ভাবনা কিঞ্চিত আতঙ্কিত অস্থির করে তোলে তাকে।

ঠিক এ সময় বারকয়েক ভটভট শব্দ তুলে লঞ্চটি পুনরায় চলতে শুরু করলে সে দেখে, ধীরে ধীরে সরে যাওয়া দু’পাশের স্থির গ্রাম ও একটি রাতকানা পাখির অন্ধকার দু’ভাগ করে মাথার উপর দিয়ে শব্দহীন উড়ে যাবার দৃশ্য।

হামিদা বানু, তার স্ত্রী, স্মার্ট, প্রতিটি ভবিষ্যৎ যেন পরিষ্কার আগাম দেখতে পায়; বেরুনোর সময় বলে, গ্রামে না গেলে হয় না? ওখানে তো কেউ নেই, কিছু নেই এখন। বিষখালি সব খেয়ে ফেলেছে সেই কবে।

শামিম চুপ করে থাকে, জবাব দেয় না। হামিদা বানু বলে, বাবার কবর কি তুমি এখন আর খুঁজে পাবে? এত বছর পর? প্রায় অচেনা ওই গ্রামে গিয়ে কী দেখবে তুমি? নদী ভাঙন? বাঁশঝাড়, সুপারি বাগান? গ্রামের সিন-সিনারি নিরন্ন মানুষের ভাঙাচোরা মুখ ? কিছুই অবশিষ্ট  নেই আজ…

‘অই কিছু না থাকার দৃশ্যই দেখতে চাই, আবার কবে না কবে আসা হয়,’ হামিদা বানুকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে শামিম বেরিয়ে গেলে সে ওই যাত্রাপথে একটি নিষ্ফলা রাত্রির ছবি ভেসে উঠতে দেখে।  পেছনে তাকায় না শামিম, অতএব হামিদা বানুর ঠোঁটে ভেসে ওঠা স্মিত হাসির রেখাটি দেখা হয় না তার।

সাকিন বদলে গেছে। ফলে দীর্ঘকাল গ্রামে আসা হয় না, কিন্তু এই না-আসার মধ্যেই কি লুপ্ত হয়ে যায় গ্রাম? অচেনা হয়ে যায় নদী, মাটি আর জলের ঘ্রাণ, পেঁচার ডাক, বাদুরের উড়ে যাওয়া, পুকুরের সিঁড়ি, কাতল ও রুইয়ের উত্থান? না থাক বাঁশঝাড়, সুপারি বাগান, না থাক বাদাম গাছের নিচে বাবার কবর, বাদুরতলা নামটি তো তার হৃদয় থেকে মুছে যায়নি আজও। শামিম জানে, কাছাকাছি গেলে তবে সে ঠিকই ওই জলের ঘ্রাণ আর অনতিদূরের ঘন বৃক্ষরাজির অতল অন্ধকার থেকে একটু একটু করে জেগে উঠতে দেখবে তার গ্রামের কঙ্কাল।

এই যেমন এখন, এই যাত্রাপথে, গ্রামের কথা মনে করতেই তারাবাতি ও একটি কুকুরের কথা স্মরণ হয় তার।

বাদুরতলা গ্রামে কুকুরের লেজে তারাবাতি সবাই ওই প্রথম দেখে, স্বাধীনের দিন। অইদিন দিবাগত রাতে ডরকোলার সোহরাব মাস্টারের বাড়ির উঠানে ‘জয়বাংলা’র খাওন চলাকালে একটি নেড়ি কুকুরকে লেজে তারাবাতির ঝিকিমিকি নিয়ে ছুটে যেতে দেখা যায়। পুরো গ্রাম তখন মৌ মৌ করছে মুক্তির আনন্দ আর ভুনা খিঁচুড়ির ঘ্রাণে, আর তারাবাতিÑ মাঝপথে নিভে যাওয়া কুকুরের লেজে ঐ তারাবাতি দেখে ‘পোলাপান বড় শয়তান’Ñ কারও কারও এই মন্তব্যের ভেতর কুকুরটি সোহরাব মাস্টারের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়।

দৃশ্যটি মনে করে হেসে ফেলে শামিম।

 

লঞ্চ থেকে নেমেই সে টের পায় নিথর জনমানবহীন চারদিক। স্টেশনে নেমে আসা যাত্রী সে একা। ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাওয়া লঞ্চের শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দধ্বনির অস্তিত্ব পর্যন্ত নেই; না পাখির ডাক, না বাতাসের, না নদীর জলের শব্দ! শুধু অতি দূরে নদীর ওপারে বনজঙ্গলের ভেতর ক্ষীণকায় একটি আলোর আভা চোখে পড়ে তার। মল্লিকের হাটের দোকানপাটে কোনো সাড়াশব্দ নেই মানুষের, সব আলো নিভে গেছে। এ কোন্ বিরান ভূমিতে এসে দাঁড়িয়েছে সে?

হাটের দোকানের একটি ছাপরার নিচে এসে দাঁড়ায় শামিম। চারদিক খোলা থাকায় হু হু করে বইছে উত্তরের বাতাস। আর এই বাতাসের  ভেতর কু-ুলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে থাকা একটি কুকুর মধ্যরাতে তার রাজ্যে অনাহুত অতিথির আগমনে জেগে ওঠে এবং অসম্ভব বিরক্তির চোখে একবার তাকিয়ে বারদুই কুঁইকুঁই করে পুনরায় ঘুমিয়ে পড়ে। একটি ঘুমন্ত প্রাণীর পাশে পুনরায় একা হয়ে যায় শামিম। সহসা তার চোখ পড়ে খালের মুখে বাঁধা নৌকাটির দিকে। সে এগিয়ে যায়, গিয়ে দেখে, ভেতরে ছইয়ের নিচে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে একটি মানুষ। আশ্চর্য ধীরকণ্ঠে ডাকে শামিম আর তাতেই ঘুমের গুহা থেকে যেন জেগে ওঠে মানুষটা। ‘নাও আইজ আর যাইবো না।’

এ কথা শোনার পরও শামিম নৌকায় উঠে বসে আর তখনই কাশি শুরু হয়ে যায় মানুষটার- রাতের নিস্তব্ধতা টুকরো টুকরো করে গগনবিদারী কাশির শব্দ ছড়িয়ে পড়ে নদীর জল ও জ্যোৎস্নার ভেতর। কী তার করণীয় সহসা বুঝে উঠতে না পেরে পিঠে হাত রাখে লোকটার। গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। পরপর দুবার বমি হয় তার- রক্তবমি। শামিম  দেখে, কাশির শব্দে ঘুম থেকে জেগে উঠে কুকুরটি এখন খালের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

‘যদি বাঁচি তয় কাইল যামু রাজাপুর। ডাক্তারের কাছে’-বলে জল ও জ্যোৎস্নার দিকে তাকিয়ে হাঁপাতে থাকে লোকটা।

বাবার কথা মনে পড়ে শামিমের। কাশির অসুখ ছিল বাবারও। অন্ধকারে আকাশে নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, সুপারি বাগানের ভেতর  একা একা হাঁটতেন- সেই বাবাকে পাওয়া গেল এই বিষখালি নদীর পাড়ে একাত্তরের মাঝামাঝি এক ভোরবেলা। বুক তার এফোঁড়-ওফোঁড়, রক্ত আর জল-কাদায় একাকার। শামিমের মনে পড়ে….শরীর থেকে রক্ত, জল, কাদা ধুয়ে-মুছে সাদা কাফন পরে নিলেন বাবা, তারপর কবর খোঁড়ার অপেক্ষায় টিনের চালের দিকে মুখ রেখে ছোট পায়ার খাটে স্থির শুয়ে থাকলেন। অপেক্ষা বড়ো বাজে ব্যাপার। বিরক্তিকর, মৃত মানুষের জন্যেও।…কিন্তু কবরের পানি তো আর শেষ অইতাছে নাÑ এই কথা যেন বাবাও শুনতে পাচ্ছেন, অতএব যেন তিনি সিমেন্টের শীতল মেঝের উপর শুয়ে থাকাই মনে করলেন যুক্তিযুক্ত।

কবর খোঁড়ার পর  দেখা গেল তলদেশ থেকে পানি উঠছে শুধু। এমনিতে দু’দিন বৃষ্টি ছিল খুব, কিন্তু এখন তো বৃষ্টি নেই, তাহলে এত পানি আসে কোত্থেকে?

কবরের তলদেশ থেকে পানি উঠছে তো উঠছেই! গোরখোদক দু’জন বালতি ভরে ভরে সেই পানি ঢেলে দিচ্ছে পুকুরে দিকে। কবরের পানি কখনও আঁকাবাঁকা কখনো সোজা হয়ে নেমে গিয়ে মিশে যাচ্ছে পুকুরে। আর সেই দৃশ্য, সেই পানি ওঠার দৃশ্য দেখার জন্য নানা দিক থেকে ছুটে আসে মানুষ, ‘আল্লার কী অসীম কুদরত’, ‘মল্লিকবাড়ির বাদাম গাছের নিচে আবে-যমযমের কুয়া পাওয়া গেছে’-তবে পানি দেখে এই ভ্রম অচিরেই কেটে যায় তাদের এবং কবরের কাছে ছুটে আসা মানুষেরা সেই কাদা মিশ্রিত ঘোলা পানি সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকে।

এক সময় বৃদ্ধ আফসার উদ্দিন ‘মৃতের রুহু কষ্ট পাইতাছে’, ‘তোমাগো কি চোখ-কান নাই’-বলে সবাইকে সরিয়ে দিয়ে কবরে কয়েক বস্তা বালু ঢালার পরামর্শ দিলে কাজ হয়, কিছুক্ষণের মধ্যেই পানি বন্ধ হয়ে গেলে বাবা কবরের অভ্যন্তরে অনন্তকালের জন্যে শুয়ে পড়েন।

শামিমের চোখ ভেসে যায়, সে নদী ও জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া অস্পষ্ট পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করার চেষ্টা করে বাবার কবরটি এখন কোথায়? কিছুই স্পষ্ট হয় না, সবকিছু বরং অস্পষ্ট, ধোঁয়াটে। চোখ ভেসে যায় শামিমের…

চাঁদ মধ্যরাতে আকাশের মাঝখানটা দখল করলে খালের পানিতে সরাসরি প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। তার সামনে দু’হাঁটুর মাঝখানে মাথা গুঁজে বসে থাকা নির্জীব মানুষটির কথা এতক্ষণ ভুলে ছিল সে, হঠাৎ দু’হাঁটুর আড়াল থেকে মাথা তুলে খালের ভেতর ফুটে থাকা চাঁদের দিকে তাকাতে দেখে শামিম। তখন প্রশ্নটা করে তাকে, ‘সংসারে আর কে কে আছে আপনার’ আর এই প্রশ্নে যেন পালিয়ে যেতে চাইল, ‘কেউ নাই বাজান, কেউ নাই’, তারপর দু’হাঁটুর মাঝখানে মুখ গুঁজে কেঁদে উঠল সে। তখন তার এই কান্নার সঙ্গে বুকভাঙা কাশির শব্দ রাত্রির নৈঃশব্দ্যের ভেতর আর্তনাদের মতো শোনায়। সে তখন তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। পারে না। বুকের ভেতর থেকে ঘড়ঘড় শব্দ ওঠে, পুনরায় রক্তবমি শুরু হয় তার। আর এর ভেতর, শামিম শুনতে পায় বিড়বিড় করে সে বলছে…পোলাডা আইজ বাঁইচা থাকলে শেখ মুজিবরের মতো বুকের পাটা অইত…সরোয়ার্দির মাঠে অই ডাক যহন হুনলো পোলাডারে  আর ঘরে রাহনই গেল না…একদিন ভোররাইতে মুলিবাঁশের বেড়া ঠেইলা ঘরে ঢুইকা বাপজান কইলো ওপাড়ে যাইতাছি, আইজই, আমারে আটকাইতে পারবা না…হেই মুক্তি আইলো, স্বাধীন আইলো, আমার বাপজান তো আর ফিইরা আইলো না…।

চোখের পানি আর পিচুটি দিয়ে দৃষ্টির সামনে ঝাপসা এক দেয়াল তুলে চাঁদের আলোর নিচে নৌকার পাটাতনের উপর শুয়ে পড়ে সে।

শামিমের তখনও জানা হয় না যে, এই শীতঘুম থেকে আর কোনোদিনও জেগে উঠবে না মানুষটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares