মুক্তিযুদ্ধের গল্প – একটি সিনেগল্পের চিত্রনাট্য : জাকির তালুকদার

মুক্তিযুদ্ধের গল্প

একটি সিনেগল্পের চিত্রনাট্য

জাকির তালুকদার

আঘুন মাসে ধান কাটার পরে ইঁদুরও নাকি সাত বিয়ে করে। তমিজ শেখের পারমানেন্ট আঘুন মাস। কিন্তু তার একটাই বউ। তল্লাটের কেউ বলতে পারবে না কোনোদিন তমিজ শেখ সামান্যতমও লুচ্চামি করেছে। পাড়ার বউ-ঝি তো বটেই, তার ধানখোলার চালঝাড়ুনি মেয়েরাও পর্যন্ত তমিজ শেখের কাছে নিরাপদ। আসলে নারী নয়, মদ-জুয়া কিংবা অন্য কোনো কিছু নয়, তমিজ শেখের নেশা হচ্ছে টাকা। টাকা এবং সম্পত্তি। টাকা বানানো আর সম্পত্তি বাড়ানো। তমিজ শেখের সিন্দুকভর্তি টাকা, জমিভর্তি ফসল, মালভর্তি গুদাম, ছেলেমেয়েতে ভর্তি ঘর-সংসার। তার কোনো কষ্ট নেই। ছিল একটা দুঃখ। চীনের দুঃখ হোয়াংহো নদী; তমিজ শেখের দুঃখ ছিল বড়ছেলে আবদুর রশিদ।

আবদুর রশিদ উঠতি বয়সে বাম একটা পার্টিতে ঢুকেছিল। বাপকে বলত বুর্জোয়া। মজুতদার। গরিবের রক্তচোষা। রেশন-মালের চোরাকারবারি। বলত বাপের মুখের ওপরেই। তর্কের খাতিরে নাহয় মানা গেল যে তমিজ শেখের সম্বন্ধে এই সবগুলি কথাই সত্যি। তাই বলে লোক ডেকে মিটিং করে এসব কথা বলে বেড়াবে! সে-ও নিজের ঔরসে পয়দা ছেলে হয়ে!

আবদুর রশিদের দলের ছেলেরা একবার তমিজ শেখকে ধরিয়ে দিয়েছিল মালসমেত। আর্মির হাতে। সরকার তখন নিজের দলের ক্যাডারদের দাপটে নিজেরাই অস্থির হয়ে আর্মি নামিয়েছিল। আর্মি ক্যাম্পে তুলে নিয়ে পেঁদিয়েছিল তমিজ শেখকে। ছেলে বিন্দুমাত্র দুঃখিত হয়নি। অন্তত বাইরে দেখে তাই মনে হতো। কিছুদিন পরে আর্মি বাপকে ছেড়ে ধরল ছেলেকে। তার সাথে নাকি আন্ডারগ্রাউন্ড দলের যোগসূত্র আছে। তমিজ শেখ ছেলের কষ্টে কেঁদে বুক ভাসিয়েছিল। হাজার হলেও বাপের মন! ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করেছিল সেই-ই। উকিল ধরে, এমপি ধরে, মন্ত্রী ধরে, আর্মি-অফিসারদের পায়ে ধরে। বাপের এই নিঃশর্ত ভালোবাসা বৃথা যায়নি। শেখ আবদুর রশিদ বাপকে এখন আর বুর্জোয়া-টুর্জোয়া বলে না। বাপের বেশিরভাগ কাজ এখন সে নিজেই দেখাশোনা করে। বাপ যা যা করত, সবকিছুই এখন আবদুর রশিদ করে। বরং কিছু বেশি-বেশিই করে। ছেলের সুমতি হয়েছে। তবু কিছুটা দুঃখ তমিজ শেখের রয়ে গেছে আবদুর রশিদকে কেন্দ্র করে। আবদুর রশিদের ঘরে ছেলে-পুলে হয় না। ছেলেকে একাধিক বিয়ে করিয়ে দেখেছে। লাভ হয়নি। কোনো বউয়ের পেটেই সন্তান আনতে পারেনি আবদুর রশিদ। পরে ডাক্তারি পরীক্ষায় দেখা গেছে, আবদুর রশিদের শুক্রথলি বীজশূন্য।

শহরের বাস টার্মিনালের পশ্চিমে গোরস্থান, পুবদিকে বড় রাস্তা। রাস্তার পুবে ভবানীগঞ্জ। আগে এখানে খারাপ পাড়া ছিল। এখন মক্তব আর মসজিদ হচ্ছে। ওয়াজ মহফিলের আয়োজন করা হয় মাঝে মাঝে। ওয়াজ মহফিলে আসা মানুষ কেউ কেউ তাজ্জব হয়ে ভাবে, মাত্র ক’দিন আগে এই জায়গা ছিল জাহান্নামের সদর দরোজা, আর এখন এখানে এলে বেহেস্তের বাগিচার সুবাস ভেসে আসে। আল্লার কী কুদরত! শুধু একজনের উদ্যোগ নেওয়া। তাতেই এই আমূল পরিবর্তন। সানোয়ার মোল্লা উদ্যোগ নিয়েছিল। ব্যস। শুক্রবার জুম্মার পরে মুসল্লিরা তার নেতৃত্বে নারায়ে তকবির আল্লাহু আকবর বলে প্রায় চোখের নিমেষে খারাপ পাড়া মিশিয়ে দিল মাটিতে। ছ্যাঁচার বেড়া দেওয়া ঘরগুলি হয়ে গেল ধূলিসাৎ আর বেধড়ক ধোলাই খেয়ে পাড়ার গতরবেচা মেয়েগুলো যে যেদিকে পারল পালিয়ে বাঁচল।

বাঁধ কেটে দিলে বানের জল অন্য কোনো জায়গা না পেলে ঘরেই এসে ঢোকে। ‘পাড়া’ উচ্ছেদের পরে যে যে অন্য শহর বা গঞ্জের ‘পাড়ায়’ জায়গা পেয়েছে, তারা পাড়ি জমিয়েছে সেখানে। বাকিরা এই শহরেই রয়ে গেছে। বিভিন্ন মহল্লার অরক্ষিত বারান্দা আর এনিমি প্রোপার্টির বেওয়ারিশ ভিটেগুলোয় এখন ওদের গুচ্ছ গুচ্ছ ঘরকন্না। আগে ছিল দূরে। এখন ভদ্দরলোকদের উঠোনলাগোয়া অবস্থান তাদের। ভদ্দরলোকদের এখন দারুণ সুবিধা। লোকলজ্জার ভয়ে আগে খারাপ পাড়া মাড়ানোর সাহস পাওয়া যেত না। এখন সে সমস্যা নেই। দরজা একটু ফাঁক করে ইশারা দেওয়াই যথেষ্ট।

তমিজ শেখের বউ তার স্বামীকে নিয়ে কোনোদিন মেয়েঘটিত দুশ্চিন্তায় ভোগেনি। এখন ছেলেদের পাহারা দিতে দিতে তার দিনের বিশ্রাম আর রাতের ঘুম হারাম।

 

Ñআপনি কি নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করেন?

Ñহ্যাঁ করি। অবশ্যই করি।

Ñআমাদের ধর্ম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, একথা মানেন?

Ñমানি।

Ñতা হলে দেশে আমাদের ধর্ম শাসনব্যবস্থা কায়েম হোক তা চান?

Ñ (আমতা আমতা) চাই।

Ñতাহলে আপনি কেন আমাদের কাফেলায় শরিক হচ্ছেন না? কেন আমাদের সংগঠনে যোগ দিচ্ছেন না?

Ñনা, তা সম্ভব নয়।

Ñকী সম্ভব নয়?

Ñআপনাদের দলে যোগ দিতে পারব না।

Ñকেন?

Ñআপনাদের দলে যোগ দিলে আমি হয়ে যাব রাজাকার। এতবড় গালি আমি ভাই সহ্য করতে পারব না।

Ñকেন রাজাকার হবেন?

Ñকেন হবো জানেন না! আপনারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। পাক-হানাদারদের ঘৃণ্য দোসর হিসেবে কাজ করেছেন।

Ñতাতে কী হয়েছে?

Ñকী হয়েছে মানে! আপনাদের তো এদেশে থাকতে দেওয়াই উচিত নয়। কারণ এই দেশের স্বাধীনতা আপনারা চাননি।

Ñআমরা স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিলাম না।

Ñমিথ্যা কথা। সারা পৃথিবীর মানুষ জানে আপনাদের অপকর্মের কাহিনি। আপনার ধর্ম কায়েম করতে চান অথচ মিথ্যে কথা বলেন। আপনাদের জিভে আটকায় না?

Ñক্ষেপছেন কেন? আমরা শুধু চেয়েছিলাম পাকিস্তান যেন না ভাঙে।

Ñতাই বলে নির্লজ্জ দালালি! খুন, নারীধর্ষণ, বুদ্ধিজীবী হত্যা! এসব আপনাদের ধর্ম সমর্থন করে?

Ñওসব অভিযোগ সত্যি নয়। তাছাড়া যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে একটু-আধটু বাড়াবাড়ি হয়েই থাকে।

Ñএকটু বাড়াবাড়ি মানে তিরিশ লক্ষ মানুষ খুন? দুই লক্ষ নারী ধর্ষণ?

Ñআরে বলছি তো, আমরা শুধু চেয়েছিলাম পাকিস্তান যেন না ভাঙে।

Ñক্যান, পাকিস্তান কি বেহেস্তের বাগান থেকে নেমে এসেছিল? শোষণ, বঞ্চনা আর বৈষম্য ছাড়া বাঙালিরা আর পেয়েছিলটা কী? মুক্তিযুদ্ধ না করে, পাকিস্তান না ভেঙে বাঙালিরা কি পাকিস্তানিদের পা ধোয়া পানি খেয়ে চলত?

Ñআহা আমরা তো বৈষম্যের কথা অস্বীকার করছি না। বৈষম্য ছিল।

Ñতাহলে আবার ভাঙার বিপক্ষে থাকলেন কেন?

Ñবৈষম্য থাকলেই দেশ ভাঙতে হবে?

Ñঅবশ্যই ভাঙতে হবে।

Ñআপনার এই কথাটা কিন্তু ঠিক না। বৈষম্য থাকলেই দেশ ভাঙতে হবে, এটা কোনো কথা হলো? তাহলে বলেন, এখন এই স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের উত্তরবঙ্গ তো অনেক বৈষম্যের শিকার। সবদিকে পিছিয়ে আছে উত্তরবঙ্গ। তাহলে কি আপনি বলতে চান যে উত্তরবঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে আর একটা আলাদা দেশ হোক?

বাদানুবাদ আর শোনেনি তমিজ শেখ। তবে তার খুব পছন্দ হয়েছে জামায়াতের লোকটার অপযুক্তিটা। এ তো দেখি এক দারুণ হাতিয়ার! প্রয়োগ করতে জানলে তার সিনেমা হলকে ঠিকই রক্ষা করা যাবে। তার নিজের অনেকগুলি ব্যবসা থাকলেও সিনেমা হলের ব্যবসাটার প্রতি কেন যেন একটু বেশি দুর্বলতা তমিজ শেখের। বিশেষ করে শহরের একবারে বুকের মধ্যে এই রকম উঁচু একটা রাজকীয় স্থাপনা তার নিজের, এই ভাবনাটাই তার বুকটাকে ফুলিয়ে রাখে সারাক্ষণ।

শহরের প্রধান সড়ক যথেষ্ট চওড়া। এই সড়কের কথা উঠলেই বুড়োরা আয়ুব খানের নাম মনে এনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ফিল্ড মার্শাল আয়ুব খানের কীর্তি এই রাস্তা। কান্মে বিড়ি মুহ্মে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান। আহা কী সব দিন ছিল!

কিন্তু এই সড়কই এখন তমিজ শেখের মাথার ব্যথা।

সড়কের দুই ধারে সুপার মার্কেট, নাপিতের দোকান, ওষুধের দোকান, রেস্টুরেন্ট, পার্ক এবং তমিজ শেখের সিনেমা হল। সিনেমা হলের নিয়ন সাইন সবার মাথা ছাড়িয়ে। এখন হল দেখাশোনা করে আবদুর রশিদ। সৌখিন ছেলে। নানারকম ডেকোরেশন করেছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে। কিন্তু সব যে এখন যায় যায়!

কিছুদিন থেকে ইঞ্জিনিয়ার-ঠিকাদার-ওভারসিয়ার আর সাদা চামড়ার বিদেশি লোকের আনাগোনা। যন্ত্র বসিয়ে মাপ-জোখ। বিভিন্ন কিসিমের গাড়ি আর যন্ত্র আসে, রাস্তার মাপ-জোখ চলে, আর শহরজুড়ে রকমারি গুজব পাখা মেলে।

সেই গুজব এখন সুস্পষ্ট চেহারা পেয়েছে। জানা গেছে, সত্যি সত্যিই আয়ুব খানের রাস্তা নাকি গতর বাড়িয়ে ডবল করা হবে। এই রাস্তা হবে এশিয়ান হাইওয়ে। পত্রিকাতেও লেখা বেরিয়েছে। খাঁটি খবর।

রাস্তা এত চওড়া হবে কী করে?

দুইধারের দোকান-পাট? অফিস-আদালত? বসতবাড়ি-গুদাম?

সব ভাঙা হবে।

ভাঙা হবে?

হ্যাঁ। দেশের উন্নতির প্রয়োজনে শুধু দুইধারের দালান-কোঠা কেন, লাগলে পুরো শহর ভেঙে ফেলতে হবে।

মনের মধ্যে তমিজ শেখের আবার অশান্তি। তার সাধের সিনেমা হল! এখন নাহয় ফিল্মি ব্যবসার রমরমা নাই। কিন্তু এমন একটা ভবন। এখানে কোনো সুপার মার্কেট বানালেও কোটি কোটি টাকার লেনদেন। এই বিল্ডিং ভাঙা পড়বে। না! তমিজ শেখের জীবন থাকতে না!

সিনেমা হল আর টাউন পার্ক পাশাপাশি। আসলে নামেই শুধু পার্ক। আগে তো সারাদিন টমটমের ঘোড়া নাদি ছড়িয়ে ঘাস খেয়ে বেড়াত। এখন টমটমও প্রায় উঠে গেছে শহর থেকে। পার্কে এখন বেওয়ারিশ কিছু লোকের ঝুপড়ি উঠেছে। বাকি জায়গা জুড়ে রাজ্যের জঞ্জাল। কেউ নেই দেখার। দু’একটা ঘাসফুল-গাঁদাফুল এমনি এমনি ফোটে। আর গাছ বলতে রয়েছে শটি, ধনচে লতা আর বেতের ঝোঁপ।

হঠাৎ সড়কের লাগোয়া পার্কের খানিকটা জায়গা সাফ-সুতরো হয়ে গেল। সেই সঙ্গে একটা বাঁশের টঙ। একেবারে রাতারাতি।

তারপর থেকে পাঞ্জেগানা জামাত। দিনে-রাতে পাঁচবার আজান। আবাদ হয়ে গেল ঘোড়ার নাদিতে ঢাকা পরিত্যক্ত টাউন পার্ক। খুঁটির মাথায় সাইনবোর্ড ঝুললÑ‘কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ’। দানবাক্স।

অসুখ তো মানুষমাত্রেরই হয়। কিন্তু তমিজ শেখের অসুখ যতটা বোঝা যায়, তার পথ্যির বহর দেখা যায় তারচেয়ে ঢের বেশি। ছেলেমেয়ে-আত্মীয়স্বজন-কর্মচারী মিলিয়ে তার অসুখের ঘর পরিণত হয় মানুষের মিলনমেলায়। এর মধ্যেই একফাঁকে আবদুর রশিদকে একা ডেকে কাছে নিয়ে তমিজ শেখ ফিসফিস করে বলেÑ হায়াত-মউত আল্লার হাতে। আমি বাঁচি কী মরি ঠিক নাই। কিন্তু সিনেমা হলখান নিরাপদ কর‌্যা গেনু বাপ। এশিয়ান হাইওয়ে হোক আর আমেরিকান হাইওয়ে হোক, কুনো শালার সাধ্যি নাই সিনেমা হল ভাঙে!

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares