মুক্তিযুদ্ধের গল্প- গোলাপির গল্প : হুমায়ূন কবির

মুক্তিযুদ্ধের গল্প

গোলাপির গল্প

হুমায়ূন কবির

এক

(গল্পটা সাদামাটা। একজন আটপৌরে নারীর গল্প। অনটন আর টানাটানির সংসার। অসুস্থ স্বামী ঘরে। খুবই পরিচিত কাহিনি। তবে এই গল্পের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। গোলাপিদের বিয়ে হয়েছিল বাংলাদেশের জন্মলগ্নে। বছর ঘোরার আগেই শুরু হয় যুদ্ধ। যে যুদ্ধ জন্ম দিয়েছে একটি দেশের আর মৃত্য ঘটিয়েছে গোলাপিদের মতো বহু সংসারের। জন্মভুমির পুনর্জন্মের সেই উষালগ্ন থেকেই সন্তান-অক্ষম প্রায়-পঙ্গু স্বামীকে লালন করছে সে সন্তানের বাৎসল্যে। বাংলাদেশের বেড়ে ওঠার সাথে সাথে বয়স বেড়েছে গোলাপিদেরও। তার যুবা স্বামী ক্রমশ বুড়ো হয়ে উঠেছে বাড়ন্ত শিশুর মতো। স্বামীটিকে সামাল দিতে গোলাপির হিমসিম অবস্থা এখন। ভীষণ যন্ত্রণা দেয় আজকাল। ঘুম নেই চোখে। রাতভর দুঃস্বপ্ন দেখে আর থেকে থেকে চিৎকার। ডাক্তার বলেছেন এ শুধু দুঃস্বপ্ন নয়, বড়োই দুরারোগ্য রোগ। দুর্বোধ্য তার নাম, পিটিএসডি। ফি বছর ডিসেম্বরে বেড়ে যায় রোগ। এবারও তাই হয়েছে। কড়া অষুধেও কাজ হয় না তখন।)

 

দুই

গোলাপিরে! আমারে বাইন্দা রাখ ঘরে। ছিটকিনি লাগা। পায়ে শিকল দে। কইস আমি বদ্দ পাগল, মাইনষে জিগাইলে। অই রাজাকারের পুত রাজাকার সোনার সংসার আমার করছে ছারখার হারামি এহন দেহি গাড়ি চালায় আমার মনি রগ সরস হয়, গরম তেলের মতো রক্ত লাফায়। গোলাপিরে! তরে ধইরা নিছিল যেই শালা যদি রামদা খান হাতে পাই, কুবাইয়া করুম তারে ফালা ফালা। আমারে লেংরা করছে যেই বদর মনে হয় মাটির মইধ্যে পুইত্যা দেই তারে জ্যান্ত কবর। আমারে জরাইয়া ধর, গোলাপি! মাথা বুলাইয়া দে। ভুলাইয়া দে, সবকিছু ভুলাইয়া দে! রামদাটা সরাইয়া রাখ। এই স্বাধীন দেশে খুনি হইবার চাই না শেষে। পাগল আমি। মাথা ঠিক নাই। কহন কি অঘটন ঘটাই। কথা দিছিলাম রাখুম দুধেভাতে দোজখের আগুন মাখামু না হাতে। আইজ মাফ চাইলাম তর কাছে আমার আর কিইবা করনের আছে? গোলাপিরে! আমারে অষুদ দে।

 

তিন

খুব ভোরে সূর্য ওঠার পরপরই পুকুরে নামল গোলাপি। শীতের পুকুরজুড়ে কুয়াশার ধোঁয়ার মতো পানির ভাপ। ত্বরা করে স্নান সেরে চাদর গায়ে রোদে বসল গোলাপি। আয়েশ করে চুল শুকাল। আজ হলুদ রংয়ের শাড়িটা পরেছে সে। বছরে একবারই পরে এই শাড়ি। দাওয়ার ধার ঘেঁষে পিঁড়ির উপর বসে আছে গোলাপি। শীতের সকালের বাড়ন্ত রোদ্দুর পুকুরপারের শিরিষ গাছটা পাশ কাটিয়ে, উঠোন ছাড়িয়ে, গোলাপির হলুদ শাড়ি আর লম্বা চুল ছুঁয়ে, দাওয়ায় গিয়ে আছড়ে পড়েছে। আধখোলা খিড়কির ফাঁক দিয়ে দেখে ওপাশে গভীর ঘুমে অচেতন আবুল। অষুধে কাজ হয়েছে। চিকচিকে কাঁচা হলুদ রোদের বর্ষণ তার মুখে। কেমন উজ্জ্বল হয়ে আছে মুখ। উস্কোখুস্কো দাড়ি। কপালে চিক চিক ঘাম। আবুলের ঘুমন্ত চেহারায় এত মায়া! ঘরে ঢুকে আলতো করে মুছে দেয় তার কপাল। ঘুমাক। কত দিন ঘুমায়নি এমন।

 

চার

স্বপ্ন দেখতে চায় না আবুল। তার স্বপ্ন মানেই দুঃস্বপ্ন। কিন্তু অনেকদিন পর একটা অদ্ভুত সুন্দর স্বপ্ন দেখল আজ। কষ্টহীন স্বপ্ন। গোলাপির কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে সে। গোলাপিকে আরও বুড়ো লাগছে, যেন তার মায়ের বয়স। কানে আসছে গুনগুন করা ঘুমপাড়ানি গান। ঠিক যেমন করে মা গাইতেন। চোখ বুজে আসছে আবুলের। ঘুমের ভেতরেই ঘুম। স্বপ্নের ভেতরেই আরেকটা স্বপ্নের শুরু। হলুদ শাড়ি-পরা গোলাপি এসে দাঁড়াল যেন পাশে। আবদার করে ডাকল, অ্যাই, টিপটা একটু পরিয়ে দাও না। গোলাপি টিপ পরেনি কখনও। কিন্তু আবুলকে বলেছিল একদিন, টিপ পরার খুব শখ তার। উঠে দাঁড়াল আবুল। কি আশ্চর্য! পায়ের খোঁড়ানো ভাবটা নেই তার। যতœ করে টিপ লাগিয়ে দিল কপালে। সুন্দর লাল টিপ। দারুণ মানিয়েছে। গোলাপির চোখের দিকে চেয়ে থাকে অপলক। একটা লাজুক হাসি দিয়ে বাতাসে হাত বাড়াল গোলাপি। আর হলুদ পাখির মতো হঠাৎ ডানা মেলল আকাশে। আবুলের শরীরটাও হাল্কা হয়ে এসেছে। যেন এক্ষুনি আকাশে উড়বে সেও। গোলাপির পাশাপাশি। বাইরে তখন হই চই। বিজয় দিবসের আনন্দ মিছিল। আবুলের ঘুম ভেঙে গেল। আহা কি অপূর্ব সুন্দর স্বপ্ন ছিল। আরও একটু যদি ঘুমাতে দিতো ওরা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares