সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

কাবুলের বিবলিওটেক ও ইতিহাসবেত্তা – মঈনুস সুলতান

September 20th, 2016 11:14 pm
কাবুলের বিবলিওটেক ও ইতিহাসবেত্তা  – মঈনুস সুলতান

ভ্রমণ

কাবুলের বিবলিওটেক ও ইতিহাসবেত্তা

মঈনুস সুলতান

 

ব্রিফকেইসে কাগজপত্র গুছিয়ে পেশাদার ধড়াচূড়া পরে উজিরে আকবর এলাকায় আমেরিকান ডেমোক্র্যাটস্দের উইকয়েন্ড মিটিংয়ে যাওয়ার জন্য সিরিয়াসলি প্রস্তুতি নিই। কিন্তু গাড়িতে ওঠার মুখে পাসতুন নিরাপত্তা রক্ষী স্যাটেলাইট ফোনে আসা ম্যাসেজটি আমাকে দেখায়। একটু আগে মাসুদ সার্কোল থেকে এয়ারপোর্টের দিকে যাওয়ার পথে আক্রান্ত হয়েছে ইতালিয়ান ফৌজদের একটি কনভয়। সুইসাইড বম্বাররা গাড়ি বোঝাই এক্সপ্লোসিভ্ নিয়ে কনভয়ের পয়লা পেট্রোল-কারে ধাক্কা লাগালে তার ইমপ্যাক্টে তাবৎ কিছু বিস্ফোরিত হয়ে পুড়ে খাক হয়ে গেছে একাধিক মিলিটারি ভিহেক্ল। সুতরাং আজকের উজিরে আকবর এলাকায় যাওয়ার এখানেই ইতি। আমাদের সিকিউরিটি কোঅর্ডিনেটার পল রাড সমস্ত কিছু ক্লিয়ার না হওয়া অব্দি ওদিকের তাবৎ যাতায়াত বাতিল করেছেন। আমার সামনে আজ উইকয়েন্ডের সম্পূর্ণ বেকার একটি দিন। নিশ্চল আর্মার্ড কারের সিটে বসে উইন্ডশিল্ডের বুলেট প্রুফ কাচ দিয়ে খানিক দূরের পাহাড়ের দিকে খাজুল হয়ে তাকিয়ে থাকি।

Printকাবুল শহরের ওল্ডসিটির পশ্চিম প্রান্তের এ-পর্বতের নাম শের-দরওয়াজা। তার মাঝ বরাবর মাছের মেরুদ-ের মতোই আড়াআড়ি কাদামাটির হাজার বছরের পুরানো দেয়াল। পাথুরে এ পর্বতের চূড়া একাধিক, তার কোনো কোনোটি মিসরি পিরামিডের মতো ত্রিভূজাকৃতির। এ পাহাড় জনহীন নয় কিন্তু, এর খাড়া ঢালে বাস করছে কম-সে-কম হাজার খানেক আফগান। তাদের ঘর-দুয়ার মূলত রোদে পোড়া বাদামি ইটের। দূর থেকে তাকালে মনে হয় শের-দরয়াজার গায়ে লেপ্টে আছে কবুতরের বাসা উপযোগী চারকোণা বাক্সের মতো সব চবুতরা।

Printপাহাড়ে ওঠার চক্কর লাগানো সড়কের আধাআধি একচিলতে সমতল-ওখানে তোপে-চাসত্ বা কামানের পাহাড় বলে একটি ছোট ক্বদের পাথরের কেল্লা। তার বুরুজ থেকে পরিষ্কার দেখা যায় নিচে মোগল জামানার স্মৃতিময় উদ্যান বাগে-বাবুর। শের-দরওয়াজায় আমার যাওয়ার প্রয়োজন আছে এবং আজ হাতে সময় অঢেল, সুতরাং সিকিউরিটি কোঅর্ডিনেটার পল রাডকে ওখানে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে ম্যাসেজ্ পাঠাই।

শের-দরওয়াজায় যাওয়ার আইডিয়া মাথায় আসে গেল শুক্রবারে। কাজবাজ ছিল না তাই চলে আসি কাবুলের শহ্রে-নাও এলাকায়। পথের পাশে বেজায় বড় বিলবোর্ডের মতো সুবিশাল একটি চিত্র আমাকে রীতিমতো তাজ্জব করে। ছবি থেকে দুটি চোখে নির্নিমেষে তাকিয়ে দেখছে নির্জন সড়ক ধরে হেঁটে যাওয়া বোর্কাহীন এক নারীকে। পাশেই নোনাধরা ঝুরঝুরে এক ইমারতের দরোজায় ফরাসি ভাষায় লেখা ‘বিব্লিওটেক’ শব্দটি পড়তে পেরে বুঝতে পারি দালানটি কাবুল শহরের একমাত্র লাইব্রেরি, তো ওখানে একদফা ঢু’মারতে কোশেশ করি। বিস্তর সালামাত করে বন্দুকওয়ালা চৌকিদারকে বারকয়েক সালাম দিয়ে বালির বস্তার আবডালে গারদের মতো লোহার আস্ত সব রড বসানো দরোজা দিয়ে ঢুকতে গিয়ে- কেতাবখানা নয় রীতিমতো ফাটকে ঢোকার অনুভূতি হয়।

না, বইপত্র তেমন কিছু নেই, তাই পাঠকরাও কেউ এখানে আসার প্রয়োজন বোধ করেননি। আমিইবা আসলাম কেন? মহাতাজ্জুব হয়ে সামনে কেতাবাদি রাখার রাম সাইজের একটি শেল্ফ দেখি, তাতে মুক্তা ফলানো ঝিনুকের টুকরা বসিয়ে করা নাজুক কারুকাজ- মাশাল্লা চেয়ে দেখার মতো। তবে বইপুস্তকের পরিবর্তে ওখানে সারি দিয়ে রাখা অনেকগুলো রোদে শুকনা খড়খড়ে কদু। আমার চালশে হয়েছে বছর দশেক, চোখের ভুলবাল কিছু হলো কিনা তা যাচাই করতে গিয়ে বাইফোকাল চশমা খুলে আস্তিন দিয়ে তা মোছে আবার ভালো করে তাকাই, তারপর হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখি। না এগুলো স্বাদের লাউ নয়, এ দিয়ে সারিন্দা বানানোর কোনো সম্ভাবনা নেই,একেবারে সাদাসাপটা আউসে-কদু, তবে রঙেরূপে ঈষৎ বাহারে বলে দূর থেকে দেখলে এদের মোল্লা দোপেয়াজার পাগড়ির মতো দেখায়। মহা মতান্তরে পড়ে ভাবি- কেতাবখানায় স্টাডি করার আগে কাবুলে কি কদুর খাট্টা খাওয়ার রেওয়াজ আছে?

আমি করিডোর ধরে পা টিপে টিপে আগ বাড়ি। কামরাটির সারা ফ্লোর জুড়ে খুব অগোছালো হালতে ছড়ানো অজ¯্র বই। মনে হয় কোনো ‘কাতিলে কেতাব’ বা ‘পুস্তক-ঘাতকের’ শিরে আছর হয়েছিল বেজায় খবিস কোনো খন্নাসের, আর সে বইগুলো আছড়েপাছড়ে ছুড়ে ফেলেছে সর্বত্র। মেঝেতে বেফানা হয়ে পড়ে থাকা পুস্তকাদির মাঝখানে বসে এক জেনানা গভীর মনযোগের সাথে অধ্যয়ন করে চলেছেন। আমি তাঁর ধ্যানে কোনো কিসিমের ডিসটার্ব না করে আলগোছে আরও কয়েকটি পুঁথিপুস্তকহীন শেল্ফ পাড়ি দিয়ে চলে আসি লাইব্রেরির পেছনবাগে। জানালাগুলো বন্ধ, তার উপর বিজলি বাতি না থাকায় এদিকে আলি বাবার চল্লিশ দস্যুর গুহার মতো মিশমিশে অন্ধকার। আমি তো শখের গোয়েন্দা নই যে কোর্তার জেবে হামেশা পেন্সিল টর্চ রাখবো। মনে মনে ভাবি, ভবিষ্যতে আবার যদি এখানে আসি তবে অতি অবশ্যই কেরোসিনের হারিকেন নিয়ে আসতে হবে।

ততক্ষণে চোখে অন্ধকার সয়ে এসেছে। এখানে পাওয়া যায় বেশ কিছু বইপুস্তক, তবে তা মনে হয় ফরাসি ভাষায় লেখা। ফরাসি পড়তে পারলে তো কাবুল না এসে প্যারিসেই যেতাম। একটি ছবিওয়ালা বই পেয়ে খুশি হই, এ-ধরনের বই হিব্রু ভাষায় লেখা হলেও অসুবিধা কিছু নেই। সাদাকালো ক্যামেরায় তোলা শের-দরওয়াজা পর্বতের বেশ কিছু ছবির সাথে তোপে চাসত্ বা কামান পাহাড়ের ক’টি ফটোগ্রাফ। আমি ডিজিট্যালে একটি ছবি কপি করতে চাই। দরকার খানিক আলোর, তাই একটি জানালা ক্যাচক্যাচ করে ওপেন্ করি। সাথে সাথে সারা কক্ষ ভরে যায় বাকবাকুম বাক্ ধ্বনিতে। খেয়াল করে দেখি বইয়ের শেল্ফের কোণায় কানায় বেশ ক’টি কাজলা কবুতরের বাসা। মনে হয় কৈতরগুলো ডিমে তা দিচ্ছে। আমি ফ্লাশ ঝলকাতেই তারা বাসা ছেড়ে বাকবাকিয়ে চক্রাকারে উড়ে মহাধুন্দুমার বাঁধিয়ে দেয়। দু’টি কবুতর এগ্রেসিভ হয়ে আমার দিকে তেড়ে আসে। এ্যয়সা বেতমিজ কিসিমের কৈতর আমি ইহজিন্দেগিতে কখনও দেখিনি।

Printঠিক তখনই শেল্ফের আড়াল থেকে ডান্ডা হাতে বেরিয়ে আসেন লাইব্রেরিয়ান। আমি খিড়কি খুলে লম্ফ দিয়ে পালাবো কিনা ভাবছি, ঠিক তখনই খেয়াল হয় যে- তার হাতের অস্ত্রটি ডান্ডা নয়, তা ফাটা বাঁশে তৈরি একটি লাঠি বিশেষ, তা থেকে ঝুলছে পুরানো পত্রিকা। লাইব্রেরিয়ান উচ্চতায় আমার চেয়ে হাত খানেক লম্বা, তাঁর জবরদস্ত চেহারার সাথে মানানসই হ্যান্ডোলবার মোচ্ দেখে মনে হয় এক সময় তিনি জহির শাহের আর্মিতে নির্ঘাৎ সুবেদার ছিলেন। আমাকে দেখে যেন আসমান থেকে পড়েন তিনি, তার চোখমুখের এক্সপ্রেশনে বিস্ময়টুকু একেবারেই ঢাকা পড়ে না। থতমত খেতে খেতে খানিক সামলে নিয়ে তিনি ধমকে উঠেন,‘এখানে এসেছো কেন?  এ, কার পারমিশনে বইপত্রে হাত দিয়েছো?’ কাবুলিওয়ালারা সম্ভবত এখানে লাউ কিংবা পায়রার আন্ডা কিনতে আসে, সুতরাং তিনি আমাকে বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতে দেখে স্পষ্টত তাজ্জব হয়েছেন, কিন্তু তাঁকে তো ম্যানেজ করতে হবে, তাই মিন মিন করে ছবির বইটি দেখিয়ে বলি, ‘হুজুর, শের-দরওয়াজা মাউন্টের ইতিহাস জানার জন্য বইতে একটু হাত দিয়েছি,  বোবাখশিদ…সরি।’ তিনি আমার হাত থেকে খপ্ করে ছবির বইটি কেড়ে নিয়ে শেল্ফে রেখে জানতে চান-আমার ওয়ার্ক পারমিট কোথায়? ওয়ার্ক পারমিটতো চাকরি করতে লাগে, বইপুস্তক ঘাঁটতে তো ওয়ার্কপারমিট লাগার কথা না। কিন্তু এ সব প্রসঙ্গ তুলে ভেজাল না বাড়িয়ে ওয়ালেট থেকে ওয়ার্কপারমিট ও ছবিওয়ালা আইডি কার্ড বের করে তাঁকে দেখাই। এসব দেখামাত্রই ওঝার হাতে জড়ি দেখে কুঁকড়ে যাওয়া সাপের মতো সহসা কাঁচুমাঁচু হয়ে তিনি বলেন,‘জনাবে আলি যে ওস্তাদে পাহানতুন বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার তা আগে বলেননি কেন?’ বলে তিনি মোসাফার জন্য হাত বাড়িয়ে দেন। এতক্ষণ আমাকে সম্ভবত কৈতরের আন্ডা-চোরা ভেবে খানিক সুবেদারি হেকড়ি তিনি দেখিয়েছেন বটে। সে যাই হোক্। আমি তাঁর সাথে হাত মেলাই। তিনি এবার খুব সমঝদারের সাথে বলেন, ‘শের-দরওয়াজা মাউন্টেন সম্পর্কে যিনি সব চেয়ে বেশি জানেন তাঁর সাথে এখনই জনাবের যোগাযোগ করিয়ে দিচ্ছি।’ বলেই গুঁফো লাইব্রেরিয়ান মোবাইল ফোনে কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কালের মশহুর তওয়ারিখ শেনাজ বা ঐতিহাসিক মির গোলাম ইসহাক বাবরি-কে টেলিফোন করেন।

বাবরি সাহেবের বাস খোদ শের-দরওয়াজা মাউন্টেনের একটি মহল্লায়। তিনি আংরেজি ও উর্দ দুই ভাষাতেই সমান পারদর্শি। তৎক্ষণাৎ শের-দরওয়াজা পাহাড়, কামানের কেল্লা ও বাগে-বাবুর উদ্যানের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করার জন্য তিনি আমাকে দাওয়াত দেন।

নিশ্চল আর্মাড্ কারে বসে শের-দরওয়াজা পাহাড়ের ঢালে বাবরি সাহেবের বাড়িতে এক চক্কর যাওয়ার কথা ভাবি। একটু পর পল রাড টেলিফোন করেন। কপাল আমার ভালোই বলতে হবে। ওখানে যাওয়ার জন্য সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায়। কলব্যাক করে পল বলেন, ‘মনে হচ্ছে এক্সপ্লোসনে জনাচারেক ইতালিয়ান সৈনিক মারা গেছে। সারা কাবুলে কোয়ালিশন ফোর্সরা এখন সার্চ করবে, উইচহান্ট চালাবে। আজ আর কিছু ঘটবে বলে মনে হয় না, সুতরাং এক চক্কর পাহাড়ের দিকে যেতে সিকিউরিটির দিক থেকে অসুবিধা তেমন কিছু নেই।’ মশকরা করে পল আরও বলেন, পাহাড়ে যদি আতকা লেংগুড় বাও করে পলায়নরত কোন তালেবানের সাথে মোলাকাত হয় তাহলে আমি তাকে যেন অবশ্য রিং করি। আমি জবাবে বলি, ‘বাপ বাপ করে পালাচ্ছে এ রকম কোন তালেবের দেখা পেলে আমি অবশ্যই তোমার জন্য তাদের অটোগ্রাফ নেবো। ইউ আর কুল পল, গড্ ব্লেস্ ইউ।’ সাথে সাথে বাবরি সাহেবকে মোবাইলে রিং করি। তিনি উৎসাহিত হয়ে বলেন, ‘বাদ ফজর থেকে পাহাড়ের দিকে চেয়ে একা বসে আছি। কথা বলার কেউ নেই। জনাব ওস্তাদে পাহানতুন বা বিশ^বিদ্যালয়ের মাস্টার মশাই আজ মেহেরবানি করে আমার গরিবালয়ে তসরিফ আনলে ইজ্জত তো আমারই বাড়বে।’

আমরা সদ্য নির্মিত ইসলামি স্থাপত্যের ইরানি মাদ্রাসা ও সবুজ গুম্বুজওয়ালা শিয়া মসজিদের পাশ দিয়ে গাড়ি ছোটাই। চিড়িয়াখানার পাশে আমাদের একটি চেকপয়েন্ট মোকাবেলা করতে হয়। আফগান সেপাইরা গাড়ির বুট্ চেক করে আইডি কার্ডে চোখ বুলিয়ে কেলাশনিকভের ইশারায় আমাদের আগ বাড়তে বলে। কাবুল রিভার অতিক্রম করতেই কমে আসে ট্রাফিকের জুট ঝামেলা। নদীর তীরে বিক্রি হচ্ছে গুচ্ছ গুচ্ছ বাঁশ, শুকনা খড়খড়ে নলখাগড়া ও কাঠের বাকলা। বাগে-বাবুরে ঢুকার গেইটের কাছে একটি ফুলে মোড়া ঘোড়ার গাড়িকে ঘিরে ঢোল ও সারিন্দা বাজিয়ে সরগরম হয়ে আছে হালকা জটলা। পাশে মরকুটে সব শীর্ণকায় ঘোড়ায় টানা ক’খানা গড়ি; তাতে  স্তূপ করে রাখা জালালাবাদের কমলা। পাইকারদের কেউ কেউ হুক্কা হাতে ধূমপান করতে করতে মশগুল হয়ে আছে দামদর মুলামুলিতে।

এখানে টানা সড়কের পাশে কাদামাটির দরদালানে সরগরম একটি মহল্লা। তার প্রান্ত থেকে চক্কর দেয়া বাঁকানো একটি সড়ক ধরে গাড়ি উঠে যেতে থাকে শের-দরওয়াজা পাহাড়ে। সড়ক সংকীর্ণ এবং খানাখন্দের আশপাশে ছড়ানো সব আওয়ারা বোল্ডারের জন্য ঝাঁকুনি হয় বিস্তর। তাতে মনে হয় যেন বসে আছি সামাল সামাল ঢেউয়ের ভেতর ডিঙি নৌকার পাটাতনে। মাঝে মাঝে উপর থেকে নেমে আসা অন্যান্য গাড়িকে পাস দিতে গিয়ে আমার যানবাহন সড়কের প্রান্তে পৌঁছলে নিচের শূন্যতার দিকে তাকিয়ে আমার বুক ধড়ফড় করে ওঠে। আমি কখনও চোখ বন্ধ করে আবার কখনও কেবলমাত্র দিগন্তের দিকে তাকিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করি। পাথের দুপাশে ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া সূর্যস্নাত ইটের ঘরদুয়ারে, এখানে ওখানে ছড়ানো দোকানপাটে, কবাবের গ্রীল, তন্দুরি ও হেকিমি দাওয়াখানায় মনে হয় বিরাট এক জনপদ যেন লেপ্টে আছে পাহাড়ের খাড়া ঢালে।

আমাদের পাশ দিয়ে চলে যায় পর পর ছ’টি রোগাভোগা গাধা। ভারবাহী এ জানোয়ারগুলো বয়ে নিয়ে যাচ্ছে জলে পূর্ণ জারিক্যান। তাদের পাশে পাশে কঞ্চি হাতে হাঁটে ছোট্ট সব ছেলেমেয়ে। তারা সকলে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে এক্সট্রা সব পানির প্লাস্টিকের ক্যান্ ও সোরাই। একটি ছোট্ট মেয়ের সোরাই থেকে পতপত করে উড়ে সুতা দিয়ে বাঁধা চারটি বেলুন।

Printগাড়ি একটি সার্প টার্ন নিয়ে পর পর দুটি নালা অতিক্রম করে আবর্জনার স্তূপের ভনভনানো মাছির নিচে মৃত বাচ্চা উটের পাশ কাটিয়ে বর্গাকৃতির অর্ধ সমতল স্কোয়ারে এসে জোরসে ব্রেক্ কষে। এখানে দাঁড়িয়ে আছে ক্যামোফ্লাজ্ জড়ানো ক’খানা ফাইটিং ভিহেক্ল। গাড়ির ছাদে মেশিনগানওয়ালা সৈনিকের দিকে তাকিয়ে আমার হালত্ খারাপ হয়ে যায়, রীতিমতো টেম্পারেচার ঊর্ধ্বগামী হওয়ার উপক্রম। এ ভেজালের মধ্যেও নার্ভাসনেস্কে কন্ট্রোল করে গলায় আন্তর্জাতিক সংস্থার আইডি কার্ড ঝুলিয়ে বেরিয়ে আসি গাড়ি থেকে। মনে হয় এখানে হাউস-টু-হাউস সার্চ বা খানাতল্লাসি হচ্ছে। ভাঙাচোরা কাদামাটির ঘরদুয়ারের বারান্দায়, উঠানে গোগোলস্ পরা সৈনিকরা কারবাইন তাক্ করে ওঁতপাতা চিতা বাঘের মতো সাবধানে একপা দুপা করে আগ বাড়ছে। আমার চোখের সামনে ক্ষয়িষ্ণু একটি পাথরের দেয়াল। তার ছায়ায় সারি বেঁধে বসে আছে পাগড়িপরা সব মহল্লার মানুষজন। তাদের চোখেমুখে যুগপৎ আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি স্পষ্ট। আমার দিকে হেলমেট হাতে পেইজ্-বয় কাটের মেহদি বর্ণের চুলওয়ালা একটি আমেরিকান মেয়ে এগিয়ে আসে। তার ভরাট স্তনযুগল বুলেটপ্রুফ ফ্ল্যাক্ জ্যাকেটে মোড়া। যুবতী আমেরিকান হাসি মুখে জানতে চায়,‘হাই, হাউ আর ইউ ডুয়িং টুডে?’ আমি জবাবে বলি,‘ ইটস্ এ ফাইন ডে, সো থট্ আই উড্ ভিজিট্ আ গর্জিয়াস্ মাউন্টেন।’ ফিক্ করে হেসে হালকা মেকাপ পরা মেয়েটি, ‘ওয়ান্ডারফুল আইডিয়া’ বলে হিপপকেট থেকে বের করে গোলাপি রসিদ-বুকের মতো একখানা বই। সে আরও কাছে চলে আসলে আমি তার মাসকারা পরা চোখের নিচে অনিদ্রার গাঢ় রেখা দেখতে পাই। তার চটুল হাবভাবে মনে হয় সে বুঝি থিয়েটারের টিকিট বিক্রি করতে চাচ্ছে। মেয়েটি আবার হেসে বলে,‘ ডু ইউ মাইন্ড ক্লিনিং ইয়োর কার এ্য বিট্,ইটস্ ভেরি ডাস্টি।’ মন্তব্য যে সঠিক এ ব্যাপারে আমি লজ্জিতভাবে তার সাথে একমত হই। গাড়ির গায়ে যেখানে বিদেশি সংস্থার লগো ও নাম আঁকা তা ঢেকে আছে কাবুলের পুরু ধুলায়। ‘লুক্, হোয়াট্ আই এম ডুয়িং’ বলে সে আরেক দফা ফিকফিকিয়ে হেসে আঙুল দিয়ে পুরু ধুলার উপর আঁকে পানপাতার মতো হৃদয়ের রেখাচিত্র। ‘দিস্ ইজ্ ইনডিড্ আ কুল স্কেচ্ ,ইউ মেইড্ মাই ডে,’ বলে আমি তাকে ধন্যবাদ জানালে সে রশিদ-বুক থেকে একটি গোলাপি পাতা ছিঁড়ে গাড়ির কাচে তা স্টিক্ করতে করতে বলে,‘ হ্যাভ্ এ নাইস্ মাউন্টেন রাইড্। স্টিকারটা কিন্তু খুলবে না। এটা থাকলে নামার পথে চেকপয়েন্টে আরেক দফা চেকআপের কোন প্রয়োজন পড়বে না।’

গাড়ি আবার বোল্ডারে বাড়ি খেতে খেতে পাহাড় ভেঙে উপরে ওঠে। পথের দু’পাশের ঘরবাড়ির ছাদ ও সামনের ঢালে প্রায় ঝুলন্ত চিলতে চিলতে সব সমতল আঙিনা থেকে মনে হয় ছেলেবুড়ো সবাই মজাছে ঘুড্ডি উড়াচ্ছে। ঘুড্ডিগুলোতে আঁকা নকশায় চৌখুপ্পি, ত্রিকোণা, জ্যমিতিক সব রেখাচিত্র; তাদের হাসিয়ায় ফার্সি ক্যালিওগ্রাফিতে আঁকা শের-শায়েরি। লাল নীল হলুদ রঙের বিচিত্র সমাহারে মনে হয় যেন স্ট্যাম্প এলবামে বেখেয়ালিভাবে ছড়িয়েছিটিয়ে স্টিক্ করা নানাদেশের রঙিন ডাকটিকিটের মতো ঘুড্ডিগুলো সেঁটে আছে পর্বতের গায়ে। গাড়ির পিছন পিছন নাটাই ও থোকা থোকা ঘুড্ডি হাতে বাতাসে পাগড়ির লেঙ্গুড় উড়িয়ে দৌড়ায় তিনটি ধুলিমাখা বালক। গাড়ি আরেক দফা বাঁক নিলে পাথের পাশে এক সারি আখরোটের শুকনা গাছ দেখে এ পাথুরের জমিনের উর্বরতার কথা ভেবে তাজ্জব হই। গাছগুলোতে ক্লিফ দিয়ে গাঁথা অনেকগুলো সদ্যধোলাই করা সফেদ কামিজ পারতুগ। মৃদু হাওয়ায় কামিজগুলো বাঁকা হয়ে উড়লে তাদের নামাজি জামাতের রুকু সেজদার মতো দেখায়। গাড়ি একটি নিরেট পাথুরে দেয়ালের সামনে থামে।

Printদেয়ালের গায়ে ঝুলে থাকা একসারি সিঁড়ি বেয়ে পাশতুন নিরাপত্তা রক্ষীর সাথে বাবরি সাহেবের বাড়ির দিকে আগুয়ান হই। তার কাদা-মাটি-পাথরের দালান রীতিমতো পর্বতের ঢাল কেটে খানিক সমতল করে তৈয়ার করা হয়েছে। আমরা বোল্ডারের খুঁটির উপর তক্তা বসানো সাঁকো বেয়ে তার বারান্দায়  এসে উঠি। ওখানে মলিন পাগড়িপরা একবুড়ো নফর ভেড়ার চর্বিতে বিচূর্ণ কাচের গুঁড়া দিয়ে ঘুড্ডির সুতায় আচ্ছাসে মাঞ্জা দিচ্চেন। আমাদের দেখতে পেয়ে তিনি হাতের কাজ ফেলে ওঠে দাঁড়িয়ে চিলিমচি দিয়ে আমার হাত ধোয়ান। তারপর মোসাফা করে ভেতরের কামরায় নিয়ে যান। বৈঠকখানায় জনাবে বাবরি জায়নামাজ বিছিয়ে চাশতের নামাজ পড়ছেন। আমি ফরাস ঢালা তোশকে তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসে তারিখ-শেনাজ বা ইতিহাসবেত্তা মহতারেম বাবরির জন্য ইন্তেজার করি। টাকায় জলছাপের মতো পাথুরে দেয়ালের ছায়ায় বসে থাকা বিভ্রান্ত মহল্লাবাসী ও সদালাপি আমেরিকান যুবতী সৈনিকের মুখ ভেসে যায়। কেন জানি খানিক উৎকণ্ঠা হয়। অস্বস্তি নিয়ে আমি বৈঠকখানার দেয়ালের দিকে তাকাই। ওখানে কাচভাঙা আলমারিতে রাখা অনেক কিতাবাদি; দু’পাশ থেকে রঙিন ডানার মতো ঝুলছে ফার্সি হরফের ইলাবরেট নকশাকরা দু’খানা ঘুড্ডি। তার পাশে দেয়ালে অযত্নে ঝুলানো অনেকগুলো ক্যালিওগ্রাফ। একটি হস্তলিপিতে হরফ দিয়ে আঁকা এক কিশতি যেন দাঁড় বেয়ে উড়ে যাচ্ছে আসমানি দরিয়ায়। সারা সকালের পুঞ্জিভূত উদ্বেগ বিক্ষুব্ধ তরঙ্গ হয়ে আছড়ে পড়ে আমার পাঁজরের তটে।

সালাম ফিরিয়ে তসবিতে বোছা দিয়ে মহতারেম বাবরি আমাকে জাপটে জড়িয়ে ধরেন। এ বয়সেও তাঁর তাকদ তনদুরস্তি খুবই জবরদস্ত। ডাটা গোছের এ তারিখে-শেনাজ আমাকে দু’হাতে নিষ্পিষ্ট করতে করতে বলেন, ‘খুশ বসেন, জিন্দা বসেন, সালামাত বসেন।’ তার দু’হাতের চাপে আমার দম বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে আমি মনে মনে বলি, ‘আল্লার ওয়াস্তে আলিঙ্গন থেকে রেহাই দেন।’ তিনি আমাকে পিট চাপড়াতে চাপড়াতে নিয়ে আসেন খোলা বারান্দায়। তাঁর দালানের বেলকনি যেন শূন্যের মাঝার হয়ে ঝুলে আছে। আমি সরাসরি দিগন্তের দিকে তাকাই। দূরের বরফ ছাওয়া মাউন্টেন রেঞ্জে ধোঁয়াশায় মোড়া হয়ে ভাসে তাজবেগ প্যালেস্। নিচু পায়ার কুরছিতে আমরা বসি। বসা মাত্রই চোখের সামনে থেকে মুছে যায় কাবুল সিটির দরদালানের ছাদ ও মিনারের আউটলাইন। আমি কিছুক্ষণ সামনের দিকে চেয়ে বসে থাকি। মৃদু হাওয়ায় যেন উড়ে আসে হু হু শূন্যতা। চোখের সামনের সীমাহীন দিগন্ত ও ভাসমান মেঘমালার দিকে চেয়ে চেয়ে মনে হয় যেন বসে আছি আসমানের ঝরোকায়।

আমি তশরিফ আনাতে কাহাতক্ খুশ হয়েছেন- এ বাবদে অত্যন্ত লম্বাচওড়া বক্তব্য দিয়ে তিনি জানতে চান, ‘আগায়ে সুলতান, সওয়াল সুমো চি আস্ত? অর্থাৎ তুমি কী জানতে চাও?’  আমি জবাবে বলি, ‘ওস্তাদে মাহতারেম, আমি শের দরওয়াজা পর্বতের ইতিহাস জানতে চাই।’ তিনি অধৈর্য্য হয়ে বলেন,  ‘১৫০৪ সালে ফারগানার মির্জা বাবুর কাবুল কব্জা করেন। তিনি আমার পূর্বপুরুষদের এ পাহাড় আবাদ করার হুকুম দেন। ১৫২৬ সালে বাবুর মির্জা পানিপথে লড়াই করতে গেলে আমাদের উপর দায়িত্ব দিয়ে যান শের দরওয়াজার হেফাজতের।’ বলেই তিনি উঠে গিয়ে বৈঠকখানার আলমারি থেকে নিয়ে আসেন নিয়ামত উল্লাহর ‘মাখজান-ই-আফগান’ বলে একখানা কিতাব। এ পুস্তকখানা হস্তলিখিত এবং তা আবে-রেশমের রুমাল দিয়ে মোড়া। তিনি কেতাব খুলতে খুলতে বলেন,‘ নিয়ামত উল্লাহর সাথে আমার পরিবারের রিসতাদারি খুব দূরের না। ১৬১২ সালে তিনি ফতেপুর সিক্রিতে আকবর শাহের শানে এ কেতাবখানা পেশ করেন। এ-বইতে শুধু কুহে শের-দরওয়াজা পাহাড়ই না বাবুর ও হুমাউন শাহী জামানার তাবৎ কিছু বিধৃত আছে।’ ওস্তাদ বাবরি রুমাল খুলে পা-ুলিপির হাসিয়ায় মিনিওতোরের তসবির আঁকা লুজ্ পৃষ্ঠাগুলো সিজিলমিছিল করতে গেলে আমাদের সামনের শূন্যতা ভরে ওঠে হেলিকপ্টারের ডানার শব্দে। তিনি ভ্রু কুঁচকে দিগন্তের দিকে তাকান। পরপর দু’টি আপাচি এটাক হেলিকপ্টারের পেছন পেছন উড়ে আসে দুই ডানার একটি ভারি চিনোহক হেলিকপ্টার। তাদের পাখার তীব্র তাড়নে দেখতে দেখতে চোখের সামনে সৃষ্টি হয় ছোটখাটো ঘূর্ণি ঝড়ের। গোটা পঞ্চাশেক ঘুড্ডি পড়িমড়ি করে কুণ্ডুলি পাকিয়ে উড়ে যায় ঝুল বারান্দার সামনে দিয়ে। দালানের কাচের জানালাগুলো বেজে উঠে ঝনঝন করে। ওস্তাদ বাবরি রুমাল দিয়ে মুড়ে পাণ্ডুলিপির পাতাগুলো সামলাতে সামলাতে কপালে হাত দিয়ে ‘লানত্ অয়ো চরকাবাল বা হেলিকপ্টার তোমাকে অভিশাপ’ বলে পাহাড়ের পর পর দু’টি পিরামিডাকৃতির চূড়ার দিকে তাকান। অত্যন্ত লো-ফ্লাইটে চূড়া দু’টির মাঝামাঝি গিরিপথে পরিষ্কার ছায়া ফেলে উড়ে যায় হেলিকপ্টারগুলো। তারপরও বাতাসের কুণ্ডুলায়িত প্রবাহ জারি থাকে বেশ কিছুক্ষণ।

চরকাবালের বাতাসে এলোমেলো হয়ে আসা পাণ্ডুলিপির পাতা গোছানো হতে না হতেই নফর সামনের জলচৌকিতে খাবারের ইন্তেজাম করেন। আলু ও পেঁয়াজপাতার পুর দেয়া বোলানি রুটি, বাদিয়াতে দহির চাট মাখানো মানতো, চাকতি চাকতি করে কাটা বেগুনের বঞ্জন বলে এক ধরনের কাবুলি ডেলিকেসি। সবশেষে তাম্বার বর্তনে করে পরিবেশিত হয় আগুনে ঝলসানো ভেড়ির একখানা আস্ত রান। তিনি আমাকে ‘দস্তে খুদ’ বলে নিজ হাতে ইচ্ছামতো দেদারছে খাওয়ার জন্য বারবার উৎসাহিত করে পাতে তুলে দেন পরিন্দে মছল্লম বলে আস্ত কবুতরের রোস্ট। আমি কাঁচুমাঁচু হয়ে বলতে চাই,‘ হুজুর আমি রাক্ষসের আওলাদ নই, নিতান্তই নিরামিষাশী বাঙালি, কেবলমাত্র বেগুনের বঞ্জন হলেই আমার কাজ চলে যায়।’ কিন্তু কে শোনে কার কথা। জনাবে বাবরি এগ্রেসিব হয়ে বলেন, ‘ওস্তাদ সুলতান, তুমি ইউনিভারসিটিতে মাস্টারি করো, এরকম লিকলিকে শীর্ণকায় হলে সাকরেদরা তোমাকে মান্য করবে?’ আমি বলতে চাই, ছাত্রদের সাথে তো হুজুর আমি মল্লযুদ্ধের পরিকল্পনা করছি না যে আমাকে গোশত্খেকো পাহলোয়ানের মতো হতে হবে? তিনি এবার শাহাদত আঙুল উঁচিয়ে খাস আংরেজিতে বলেন, ‘নো টক্ হোয়াইল ইউ আর ইটিং, নট্ এ সিঙ্গোল ওয়াডর্, পে এটেনসন টু ইয়োর ফুড্’, বলেই খঞ্জর জাতীয় চাক্কু দিয়ে কেটে আমার পাতে তুলে দেন হাড্ডিওয়ালা ভেড়ির মাংস। উমদা খানাপিনার পর সালুনের কট্টার মতো বাটিতে করে পরিবেশিত হয় সবুজ চা। একবাটি খাওয়ার পর তিনি আমার দিকে এগিয়ে দেন আরেক বাটি।

আমি এবার কাবুলে বাগে বাবুর বলে মোগল গার্ডেনের প্রেক্ষাপট জানতে চাই। তিনি আমার দিকে চায়ের তিসরা বাটি এগিয়ে দিলে আমি কুর্নিশি কায়দায় এবার মাপ চাই। তিনি তাতে মহাবিরক্ত হয়ে বলেন,‘চয় না খুরদা জং না না মেশা- অর্থাৎ চা না খেলে যুদ্ধ করবে কীভাবে? আরে এসব বাগ-বাগিচা তো অনেক পরের কথা। ইতিহাস বুঝতে হলে তো পয়লা জানা চাই জং বেজং-এর যুদ্ধবিগ্রহের বৃত্তান্ত।’ আমি এবার মরিয়া হয়ে বলি, ‘শের-দরওয়াজায় লড়াই বিড়াইয়ের সবকের সাথে হুজুর যদি মেহেরবানি করে বাগ বাগিচার বিষয়টা একটু খোলাসা করেন?’ আমি যেন তিনবারের ম্যাট্রিক ফেল করা সাকরেদ, এ রকম নজরে মাহতারেম বাবরি আমার দিকে চেয়ে বলেন, ‘ মোগল গার্ডেন সম্পর্কে জানতে হলে তো কাবুল কিংবা আগ্রায় তালাশ করলে হবে না। তোমাকে শুরু করতে হবে হিরাত থেকে।’ বলে উঠে বৈঠকখানা থেকে নিয়ে আসেন আরেকখানা হাতে লেখা কেতাব। এ গ্রন্থখানা হিরাতের দরবারে পেশ করেন তওয়ারিখ নওইস বা ইতিহাসের লিপিকার কাসেম ইবনে ইউসুফ আল নাসি ১৫১৫ সালে। এ কিতাবের নাম ‘ইরসাদ আল জিরাকা।’ জনাবে কাসেম ইবনে ইউসুফ পয়লা বারের মতো বাগিচার কনসেপ্টকে জ্যামিতিক রেখায় বর্গক্ষেত্রের বিভাজনে বিকাশ করার প্রক্রিয়াকে লিপিবদ্ধ করেন। মাহতারেম বাবরি জানান, ‘বাবর মির্জা তখনও বালে-হিসার কেল্লায় বসে শাসন করছেন কাবুল। তার ইরাদা একদিন ফৌজ নিয়ে ফিরে যাবেন সমরখন্দ ও বোখারায়। তৈমুরিয় জামানার এ শহর দুটি নাহক লড়াইয়ে তাঁর কাছ থেকে দখল নিয়েছেন উজবেক গোত্রপতি শায়বানি খান। হিরাতের তৈমুরি খানদানের সাথে বাবুরের পিতা ফারগানার ওমর শেখ মির্জার রিসতাদারী অনেক দিনের পুরানো। বাবুর তাদের দূত পাঠান ফৌজি সাহায্য চেয়ে। হিরাতের শাহ তৎক্ষণাৎ ফৌজ সরবরাহ না করলেও তাঁকে উপঢৌকন হিসাবে পাঠান তসবিরময় ইরসাদ আল জিরাকা কিতাবখানি। এ-গ্রন্থ থেকেই বাবর আইডিয়া পান জ্যামিতিক প্যাটার্নের মোগল গার্ডেনের।’

মোগল গার্ডেনের ল্যান্ডস্কেপিংয়ে স্পেস বিভাজনে ব্যবহার করা দু’টি কনসেপ্ট ‘চাহারবাগ’ ও ‘খিয়াবান’, আমি এ-বিষয়ে জানতে চেয়ে আরজ করলে মাহতারেম বাবরি আমার দিকে এয়সা কটমট করে তাকান যে- মনে হয় আমি এ লবজ্গুলো টেস্ট পরীক্ষায় টুকলিফাই করেছি। তিনি আমাকে উঠে বৈঠকখানায় যেতে হুকুম করেন। তারপর ফরাস বিছানো তোশক দেখিয়ে বলেন, ‘খানাপিনার পর তোমার প্রয়োজন নিদ্রার। এবার আরাম কর। আমি আছরের পর তোমাকে নিয়ে বেরুবো, তখন ইনশাল্লা সরেজমিনে দেখিয়ে দেবো তুমি যা জানতে চাও।