মুক্তিযুদ্ধের গল্প বিষয়ক প্রবন্ধ-   বাংলাদেশের ছোটগল্পে মুক্তিযুদ্ধের চালচিত্র :  তাশরিক-ই-হাবিব

মুক্তিযুদ্ধের গল্প বিষয়ক প্রবন্ধ

বাংলাদেশের ছোটগল্পে

মুক্তিযুদ্ধের চালচিত্র

তাশরিক-ই-হাবিব

 

নিঃসন্দেহে মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের আপামর জনতার সবচেয়ে প্রত্যাশিত আর আত্মত্যাগী অর্জন। মানবিক মর্যাদাবোধ, মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার অশেষ আকুতি,  বাঙালিত্বের প্রতি পূর্ণ সমর্থন আর সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্রের বাসিন্দা হবার দুর্নিবার প্রত্যয়ের চূড়ান্ত পটভূমি একাত্তরের ৯ মাসব্যাপী অগ্নিঝরা সংগ্রাম। পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে বিজয়ের যে দলিল বিশ্বের মানচিত্রে রক্তের অক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে, তা এ ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের স্বাধিকারের অভীপ্সা, দেশপ্রেমের সমুন্নত চেতনা, সংহতি আর অসাম্প্রদায়িক উদার মনোভাবনারই ফসল। মুক্তিযুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা আর কালিক বিনষ্টি, ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা আর স্বজন হারানোর হাহাকার, শত্রুকে পরাজিত করে বিজয়ের আনন্দে উল্লসিত হবার গর্বিত মুহূর্তসহ প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন অনুষঙ্গকে ধারণ করে বাংলাদেশের কথাসাহিত্য দিনদিন ঋদ্ধ হয়ে চলেছে। বিশেষত, ষাটের দশকের গল্পকাররা মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধোত্তর বৃত্তান্তকে ভিত্তি করে যে-সব গল্প লিখেছেন, সেই ধারার সম্প্রসারণ ঘটছে অজস্র বৈচিত্র্যে আর অনুষঙ্গে, উত্তরপ্রজন্মের গল্পকারদের লেখনীতে। ব্যক্তিক অভিজ্ঞতার নির্যাস আর নিজ দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ, স্বাদেশিকতা প্রভৃতি তাঁদের শিল্পীমানসে যে গভীর অভিঘাত সৃষ্টি করেছে, এর স্বাক্ষর রয়েছে এসব গল্পের বর্ণনায়, ভাববস্তু নির্বাচনে, কুশীলবদের আবেগ-সংবেদনা আর উপলব্ধিকে যথোপযুক্ত শব্দরাশির আশ্রয়ে নিবিড়ভাবে  বয়ানের আন্তর্গরজে। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবৃতি আর গল্পকারের বিবরণ প্রায়শ অভিন্ন ভূমিকায় থেকে পাঠককে মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তুঙ্গ ভাবলোকের দিকে ধাবিত করলেও কখনও কখনও পরোক্ষ বর্ণনায়, স্মৃতিচারণে এমনকি নেপথ্যে বিশেষ ভাবপরিম-ল সঞ্চারের আগ্রহও এক্ষেত্রে সহায়ক হাতিয়ার হিসেবে গল্পদেহে প্রযুক্ত হয়েছে। ফলে কল্পনা এবং বাস্তবের দোলাচল একাকার হয়ে পাঠকের মনোলোকে গড়ে ওঠে এক নতুন ভুবন, যেখানে বাস্তবে ঘটে যাওয়া ঘটনার সমান্তরালে তাকেই গড়ে নিতে হয় আরেক মনোবাস্তব পরিম-ল। এ লেখায় আমাদের পর্যবেক্ষণ নিবিষ্ট থাকবে ষাট থেকে আশি দশকের কয়েকজন প্রতিনিধিত্বশীল গল্পকারের গল্পে, যা পাঠের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের চালচিত্র সম্পর্কে আরেকবার সম্যক ধারণা গ্রহণে একালের পাঠকরা সচেষ্ট হতে পারেন।

শওকত ওসমান

শওকত ওসমানের ‘দুই ব্রিগেডিয়ার’ গল্পের নামেই রয়েছে প্রতিতুলনার ইঙ্গিত। দুজন মানুষের পেশাগত দায়বোধ আর এর পরিণতি সম্পর্কে সাপেক্ষ পর্যালোচনা এ গল্পের গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। ফায়ার সার্ভিসের অফিসার সয়ীদুর রহমান  ভুঁইয়া, যাকে বন্ধুরা ঠাট্টা করে ডাকে মিস্টার ব্রিগেডিয়ার, তার কর্মকুশলতায় পাটের গুদামের আগুন নিভিয়ে ফেলতে সমর্থ হয় দমকলবাহিনী। কিন্তু এটি নিছক দায়িত্ব নয়। বরং বিপন্ন পরিস্থিতিতে মানুষ এবং মালামাল সরিয়ে নেবার জন্য তার আন্তর্গরজ প্রকৃতপক্ষে অন্যের প্রতি পরোপকারী দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবিকতার পরিচয়বহ। যে-কোনো মুহূর্তে আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে মৃত্যুবরণের শঙ্কাকে অবলীলায় তাচ্ছিল্য করার অকুতোভয় মনোভাব তার চরিত্রের প্রাতিস্বিক দিক। বাবার কাছ থেকে শেখা মহানুভবতার দীক্ষাকে অন্তরে ধারণ করে বলেই তার পক্ষে পেশাগত বাধ্যবাধকতার চেয়ে বরাবর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সন্ত্রস্ত মানুষকে উদ্ধার আর তাদের বহু কষ্ট, শ্রম ও সময়ের সমন্বয়ে গড়ে তোলা মূল্যবান সম্পদ রক্ষার প্রচেষ্টা। কিন্তু এ গল্পের নাটকীয় বাঁক পরিবর্তন ঘটে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালোরাতে ঢাকার পলাশিতে পাক হানাদারদের তা-বে জনজীবন বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল। এহেন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতেও সে পেশাগত দায়িত্ব পালন অব্যাহত রেখেছিল। কিন্তু একপর্যায়ে পাক সেনাদের শেলের আঘাতে অন্যদের সঙ্গে সেও জখম অবস্থায় মৃত্যুবরণে বাধ্য হয়। মৃত্যুর আগে সে একবার জানতে চেয়েছিল, ব্রিগেডিয়ার আসলাম ও তার সঙ্গীরা কেন এভাবে বিভীষিকা সৃষ্টি করছে! বাঙালিদের ওপর পাক হানাদারদের কাপুরুষোচিত আক্রমণের পরিণতিতে যে সমীকরণ সৃষ্টি হয়েছিল, এতে আসলামের সমান্তরালে ভূঁইয়ার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির বিভিন্ন দিক পরিস্ফুট হয়। আদর্শ, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আর পরোপকার তার প্রাণদানকে স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে মহীয়ান করে তোলে। বিপরীতে আসলামের মতো নরপশুর বর্বরোচিত, ঘৃণ্য কর্মকা- আর লোলুপ মনোভঙ্গি মনুষ্যত্বেরই অবমাননা ঘটায়। এ দুই চরিত্রের প্রতিতুলনার মধ্য দিয়ে লেখক শুধু দুজন মানুষের ভাবমূর্তি ও অবস্থানকেই ফুটিয়ে তোলেননি। বরং বাঙালিদের স্বাধিকার অর্জনের আকাক্সক্ষা যে কতটা সুদৃঢ় এবং সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের বিনিময়ে অর্জিত, সেদিকেও পাঠককে ভাবিত হবার সুযোগ করে দিয়েছেন।

 

জহির রায়হান

জহির রায়হানের ‘সময়ের প্রয়োজনে’ গল্পে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন চালচিত্রের অনুপুঙ্খ বৃত্তান্ত। চালচ্চিত্রিক বিস্তীর্ণ ক্যানভাসে তদানীন্তন বাংলার গ্রাম-শহর- নগর-বন্দর অধ্যুষিত জনপদসমূহে পাক হানাদারদের জল-স্থল-অন্তরীক্ষব্যাপী সশস্ত্র অভিযানের ভয়াবহ তা-বে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির বিপন্নতাবোধের রুদ্ধশ্বাস বর্ণনা এ গল্পে উঠে এসেছে রেখাচিত্রধর্মী সাংবাদিক- প্রতিবেদনে। তবে এর সমান্তরালে লড়াকু বাঙালিদের প্রতিরোধী অবস্থানের ভাষ্যও এ গল্পে তাৎপর্যম-িত বয়ানে উপস্থিত। জনৈক সাংবাদিক মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করতে একটি ঘাঁটিতে গেলে ব্যস্ততার কারণে আলাপের সুযোগ না থাকায় এর ক্যাম্প কমান্ডার সঙ্গী এক মুক্তিযোদ্ধার নিজহাতে লেখা খাতা পড়তে দেয়, যেটির পাতায় পাতায় মুদ্রিত হয়েছে যুদ্ধসর্বস্ব বিভীষিকাময় পরিস্থিতিসমূহের অজস্র টুকরো টুকরো বৃত্তান্ত। পাক হানাদাররা বাঙালিদের ওপর যে আগ্রাসন চালিয়েছে, খুন-ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, অত্যাচার আর সন্ত্রাসের তা-বে জনজীবনকে ভস্মীভূত করেছে, এর অনিবার্য প্রতিক্রিয়ায় সেই মুক্তিযোদ্ধার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় যুক্ত হয়েছে শত্রুর প্রতি অকথ্য ঘৃণা, দুর্নিবার প্রতিশোধস্পৃহা আর জীবনকে তুচ্ছ করে বাঙালিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার অকুতোভয় স্পৃহা। তার চেতনায় অস্ত্র হাতে শত্রুসেনাকে ঘায়েল করা সেই মুহূর্তে আত্মরক্ষার তাগিদ বা স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি যতটা, এর চেয়েও বড় সত্য হলো, এ লড়াইয়ের কোনো বিকল্প তখন বাঙালি জাতির নেই। অর্থাৎ সময়ের অভিঘাতে পিছুহটে যাওয়া, ঘাবড়ে গিয়ে শত্রুর বশ্যতা স্বীকার অথবা কাপুরুষোচিতভাবে মৃত্যুবরণের পরিবর্তে পাক হানাদারদের মুখোমুখি হওয়াটা নিতান্তই সময়ের দাবি। এর ফল কী হবে, তা ভাববার মুহূর্তটুকুও সেই উত্তুঙ্গ পরিস্থিতিতে বাঙালিদের ছিল না। রুদ্ধশ্বাস জীবনে জয়-পরাজয়ের সমীকরণ থেকে সরে এসে শত্রুর মুখোমুখি হবার দুঃসাহসী প্রচেষ্টা সেই মুক্তিযোদ্ধার বীরত্ব আর পৌরুষের প্রতীকার্থে বাঙালিদের স্বাজাত্যবোধেরও ধারক।

 

সৈয়দ শামসুল হক

সৈয়দ শামসুল হকের ‘ভালো করে কিছুই দেখা যাচ্ছে না বলে’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধকালীন এবং মুক্তিযুদ্ধোত্তর কালপর্বের সমন্বিত কিছু ঘটনাংশ সাদৃশ্যপূর্ণ পরিসরে বাক্সময় হয়ে একটি কেন্দ্রীয় ভাবসত্যকেই মূর্তময় করে তুলেছে। সেটি হলো, বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যে বিপন্নতাবোধ, অস্তিত্বরক্ষার প্রচেষ্টা, শত্রুদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের সংগ্রামী মানসিকতাকে সম্মিলিতভাবে এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে চেতনালোকে আত্মস্থ করেছিল, সেই বৈরী প্রতিবেশ এবং বিনষ্টির চোরাবালি থেকে প্রকৃতপক্ষে তাদের উত্তরণ ঘটেনি। মুক্তিযুদ্ধের কাক্সিক্ষত স্বপ্ন ও প্রত্যাশার বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধর্মান্ধতা, বৈষয়িক সমৃদ্ধি, আধিপত্য বিস্তার প্রভৃতির মাধ্যমে ব্যক্তিগত উন্নতি সাধনই যে ক্ষমতালিপ্সুদের অভীষ্ট, তা এ গল্পে ইঙ্গিতে ভাষ্যরূপ পেয়েছে। তবে এর সমান্তরালে সাধারণ মানুষের আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিও এ গল্পে উপস্থিত। মান্দারবাড়িতে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আর দশজন সাধারণ যুবকের প্রতিনিধিতুল্য আকবর হোসেনকে অস্ত্র হাতে নিয়ে পাক হানাদারের দোসর শান্তি কমিটির পাঁচ সদস্যকে হত্যা করতে বাধ্য হতে হয়। এ ঘটনা গ্রামবাসীসহ মান্দারবাড়ির মসজিদের ইমামের অজানা ছিল না সেই দুজন মুক্তিযোদ্ধা আকস্মিকভাবেই এক রাতে অস্ত্রসহ মসজিদে এসেছিল, যদিও এর কারণ অনুধাবন করা ইমামের সাধ্যাতীত ছিল। তাদের এহেন কর্মকা-ের উত্তরাধিকার যে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও সদর্থে সঞ্চারিত হয়েছিল, এর দৃষ্টান্ত হিসেবেই যেন বহু বছর পর অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। বৃষ্টিমুখর একরাতে মসজিদে মুসল্লিদের সামনে তাদের আকস্মিক উপন্থিতির পরিণতিতে অনেকেই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে নামাজ আদায় না করেই প্রাণ হারানোর শঙ্কায় পালিয়েছিল। সেই বৃদ্ধ ইমাম এবার অবশ্য অস্ত্রসজ্জিত জনৈক যুবকদ্বয়ের পরিচয় চিহ্নিত করতে পারেনি। কিন্তু দুটি ঘটনার বিস্ময়কর সাদৃশ্য থেকে অনুমান করা চলে, ধর্মের দোহাই দিয়ে পারলৌকিক কল্যাণ সাধনে সচেষ্ট হওয়ার চেয়ে সাধারণ মানুষের স্বস্তিতে দুবেলা দুমুঠো খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির প্রতিই গল্পকারের আগ্রহ ইঙ্গিতবহ হয়ে ওঠে অস্ত্রধারী যুবকদ্বয়ের কর্মকা-ে।

 

শওকত আলী

শওকত আলীর ‘পুনর্বার বেয়নেট’ স্পষ্টতই নির্দিষ্ট ঘটনার পরম্পরাভিত্তিক গল্প, যা মুক্তিযুদ্ধকালীন বৃত্তান্তসমূহকে ধারণ করেছে প্রত্যাঘাতের ভাষ্যচিত্রে। পাক হানাদারদের আক্রমণের প্রত্যুত্তরে বাঙালি তরুণেরা যে চোরাগোপ্তা হামলায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল, এর প্রতিনিধিত্বমূলক কিছু ঘটনার সমাবেশ পাঠকের মনোলোকে সঞ্চার করে সেই বিক্ষুব্ধ কালপর্বে উদ্ভূত আপাত অর্থহীনতাকে। মুক্তিযুদ্ধের পরিণাম সম্পর্কে কোনো ধারণা গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত যে অনিশ্চিত সময়ের ঘেরাটোপে বাঙালিদেরে উদ্ভ্রান্ত সময় অতিবাহিত করতে হয়েছে শৃঙ্খলিত অবস্থায়, এর বিশ্বস্ত শব্দচিত্র এ গল্প। এ গল্পের নামহীন কেন্দ্রীয় চরিত্র বয়সে তরুণ, পরিবারের বড় সন্তান। সে মুক্তিবাহিনীর সদস্য হয়ে ওঠে পারিপার্শ্বিক প্রতিবেশের অভিঘাতে। হানাদারদের বেয়নেটের আঘাতে বাবা-মায়ের নির্মম হত্যাকা- দেখার বাধ্যবাধকতা এবং বেঁচে থাকার জন্য মরিয়া হয়ে আত্মগোপনের পরিণতিতে তার মধ্যেও প্রতিশোধস্পৃহা প্রবল হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে বেলায়েত ও বিশ্বাসের সঙ্গে যোগসাজসে সে বাবা-মায়ের হত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে সক্ষম হয় এবং একই কায়দায় বেয়নেট দিয়ে সুবাদারকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পাক হানাদারদের অতর্কিত আক্রমণে বিভ্রান্ত হয়েও পিছু হটে যাওয়া বাঙালিরা যে ঐক্যবদ্ধভাবে, ধৈর্য ধরে শত্রুকে কুপোকাত করতে সমর্থ, এরই দৃষ্টান্ত এ গল্প। হানাদারদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া আর আক্রমণ- পলায়ন-পাল্টা আক্রমণের চূড়ান্ত পরিণতি এ গল্পে অনুল্লেখিত থাকলেও প্রত্যাঘাতের দুঃসাহসী মনোভঙ্গি যে তাদের পরিবর্তিত জীবনভাবনারই দৃষ্টান্ত, তা গল্পটিতে তাৎপর্যবহ আবেদন সৃষ্টিতে সমর্থ।

 

 

হাসান আজিজুল হক

হাসান আজিজুল হকের ‘ভূষণের একদিন’ গল্পে বিবৃত একদিনের বৃত্তান্ত নিছক তার অপমৃত্যুর বৃত্তান্তই নয়, এমনটি যে মুক্তিযুদ্ধকালীন নয় মাসব্যাপী বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে হরহামেশাই ঘটে চলেছিল, এ রূঢ় সত্যের প্রতিফলনও বটে। গল্পটির পটভূমি খুলনার গ্রামাঞ্চল এবং কেন্দ্রীয় চরিত্র ভূষণ পঞ্চাশ বছর বয়সী এক দরিদ্র চাষী, যার সম্বল বলতে ভিটেবাড়িসংলগ্ন স্বল্পজমি। কখনও চাষাবাদ, কখনও অন্যের বাড়িতে কামলাগিরি বা অন্য কাজ করে যৎসামান্য উপার্জনে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে ভরণপোষণে তাকে প্রায়শই অনাহারে-অর্ধাহারে কালযাপন করতে হয়। মাত্র এক দিনের মধ্যদুপুরের খ-াংশের পরিসরে বাড়ি থেকে নৌকা বেয়ে হাটে উপস্থিত হওয়ার পরই সেখানে পাক সেনাদের সশস্ত্র তা-বে ছেলে হরিদাসসহ তার মৃত্যুবরণের নৃশংস বিবরণে যুক্ত রয়েছে এদেশের নিরীহ জনতার প্রতি তাদের অমানবিক, বর্বর দৃষ্টিভঙ্গির উলঙ্গ প্রকাশ। বাঙালি নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ, পিতা-পুত্র কেউই নরপশুদের কাছে মানুষ হিসেবে বিবেচিত হয়নি। এ গল্পে গ্রামসমূহের আক্রান্ত বাসিন্দাদের প্রতিবাদী অবস্থান ও দুর্বিনীত মনোভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ অনুপস্থিত। গল্পকার পাকবাহিনীর নৈরাজ্যে এতদঞ্চলের জনপদে ধ্বংস ও মৃত্যুমুখর বিমূঢ় পরিস্থিতির অনুপুঙ্খ রূপায়ণে নিবিষ্ট।

বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়েই স্ফূরণ ঘটেছে তিমির হননকারী চেতনার। অশ্রু ও রক্ত¯্রােতের অতি উচ্চকিত তীব্র নিনাদ ও রঙয়ের চিত্র এঁকে চলেছেন আমাদের কথাশিল্পীরা। তবুও নিশ্চয় আরও আরও মৌলিক কথকতা সমুখে বলবার রয়েছে, আমরা সেই মহত্তম শিল্পীর জন্য হৃদয় পেতে অপেক্ষমাণ। ইতিমধ্যেই যারা সে-দায় শোধ করেছেন অনেকখানি তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য একজন রিজিয়া রহমান। ‘জামালপুরের চিঠি’ গল্পে তিনি এঁকেছেন এক জ্বলন্তÑআত্মা ‘হাকিমের দাদি’কে। এই অশীতি প্রায় বৃদ্ধা তাঁর একমাত্র-জীবন সম্বল ১৪ বছরের নাতিকে দিয়ে দেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য। আর ঘরগেরস্থিহীন হতদরিদ্র এ-বাড়ি ও-বাড়ি খেয়ে এই বৃদ্ধা সারারাত নামাজ পড়েন ও প্রার্থনা করেন মুক্তিসেনাদের বিজয়ের জন্য। কেননা জিতলেই সে ও তার নাতি ভাত খেতে পারবে আর কাপড় পাবে। বলাবাহুল্য এই অবিস্মরণীয় আত্মচেতনাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল চাবিকাঠি।

 

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’ গল্পের ইমামুদ্দিন ও নাজির আলি চরিত্রদ্বয়ের মাধ্যমে লেখক মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকার চরিত্রদ্বয়ের প্রতিতুলনা করেছেন। ইমামুদ্দিন চরিত্রের মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার অসীম সাহস ও দেশপ্রেম, মানুষের কল্যাণে আত্মদান, ত্যাগের মহিমাকে প্রকাশ করেছেন। বাংলাবাজারের ছাপাখানায় কর্মরত ইমামউদ্দিন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আড়াই মাস পর জগন্নাথ কলেজের ছাত্রদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে যায়। সে প্রতিজ্ঞা করেছিল, তার বন্ধু লালমিয়ার মহাজন ও রাজাকার নাজির আলিকে হত্যা করবে। ইমামুদ্দিনের মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী তার ছেলে শয়ে-শয়ে পাকিস্তানি সৈন্য নির্মূল করেছে, তার গ্রেনেড হামলায় মিলিটারি বাহিনী বিধ্বস্ত হয়েছে। রথখোলায় ইলেকট্রিক ট্রান্সফর্মার ধ্বংস করার একপর্যায়ে রাজাকার নাজির আলিকে সে দয়া করে প্রাণভিক্ষা দিলেও শত্রুপক্ষের মিলিটারির গুলিতে তাকে অবশেষে শহীদ হতে হয়। অন্যদিকে ইমামুদ্দিনের কাছে প্রাণ ফিরে পেয়েও নাজির আলি পাক হানাদারদের দিয়ে  তার পরিবারকে ধ্বংসের চেষ্টা চালায়। ইমামুদ্দিনের পিতা, ভাই, স্ত্রীকে মিলিটারিরা ধরে নেয়, তার দাদিকে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধের শেষপর্যায়ে সে ‘মিলিটারির গাড়িতে ঘুরে ঘুরে ইউনিভার্সিটি, মেডিক্যাল কলেজের সব জুয়েল জুয়েল মানুষকে তুলে রায়ের বাজার নিয়ে গিয়ে তাদের জবাই করেছে নিজের হাতে’ (পৃ. ৩৬৫-৩৬৬)। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নাজির আলি সৌদি আরব থেকে ধার্মিকের আলখাল্লায় নিজেকে আবৃত করে দেশে ফেরে। ধর্মের নামে নিজের বৈষয়িক উন্নতি ঘটাতে মসজিদে মসজিদে ওয়াজ মাহফিলের পাশাপাশি  বায়তুল মোকাররমে সোনার গয়নার দোকান করে। শুধু তাই নয়, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ও  হোটেলের ব্যবসা করে সে পুরো মহল্লাই কিনে নেয়ার মতলব আঁটে। দিনে দিনে তার অনুসারী উল্টো পায়ের পাতাওয়ালাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তবে শেষ পর্যন্ত সে ও তার অনুসারীরা যে ধর্মকে অবলম্বন করেও পরাজিত হবে, এর ইঙ্গিত লেখক দিয়েছেন তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি ও ইমামুদ্দিনের ছেলে  বুলেটের  প্রস্রাবের ধারায় তাদের  সিক্ত করার প্রতীকী স্বপ্নদৃশ্যের মাধ্যমে।

সেলিনা হোসেন

সেলিনা হোসেনের ‘আমিনা ও মদিনার গল্প’-তে মুক্তিযুদ্ধকালীন বিপর্যস্ত সময়ে নারীর প্রতি পাক সেনাবাহিনীর সহিংসতার উগ্র চিত্ররাশি উন্মোচিত হয়েছে বিশ্বস্ত লেখনীতে। স্বাভাবিকভাবেই, যুদ্ধ চলাকালীন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি অসহায় বোধ করে। এ গল্পেও সেই বাস্তবতার নির্মোহ প্রতিফলন ঘটেছে। মুয়াজ্জিন আল-আমিন শিক্ষা, বুদ্ধি-বিবেচনা ও রুচিবোধ অনুযায়ী নিজেকে গড়ে তুলতে পারেনি। কারণ সংস্কারাচ্ছন্ন বাঙালি মুসলমান সমাজের ধর্মপরায়ণতাবশত বাবা তাকে জোর করেই মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে ইসলামি শিক্ষায় দীক্ষিত করেছিল। ফলে সেও পেশা হিসেবে মসজিদে মুয়াজ্জিনগিরিকেই বেছে নিতে বাধ্য হয়। সে এবং তার স্ত্রী জোহরা বরাবর সচেতন ছিল মেয়েদের ধর্মীয় শিক্ষাদানে। এর ফলে তারা ভদ্র, বিনীত ও অনুগত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আকস্মিকভাবে তিন পাক সেনার দ্বারা অপহৃত এবং দিনের পর দিন ধর্ষিত হতে হতে তাদের মনোলোকে তথাকথিত ধর্মীয় আদর্শ ও শিক্ষা সম্পর্কে প্রশ্ন জেগে ওঠে। একই ধর্মের অনুসারী হয়েও ভিন্ন ভাষা এবং ঐতিহ্য, সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কটি কীরূপ হওয়া উচিত, এ জিজ্ঞাসা বারবার মনে জাগলেও এর প্রত্যুত্তর দুই বোন পায়নি। বাংকারে দশ জন পাক নরপশুর দ্বারা দিনের পর দিন ধর্ষিত হতে হতে তারা আলব্ধ পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক অনুশাসন আর তথাকথিত ধর্মীয় বিধানের প্রতি আরোপিত অন্ধ সমর্থনের নিদারুণ সীমাবদ্ধতা আবিষ্কার করে। নারী হিসেবে তাদের ভূমিকা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সর্বদাই যে হুকুম মেনে চলা এবং পুরুষের অধীনস্থ থাকার বাধ্যবাধকতাকে সমর্থন জানায়, এ ভয়াবহ সত্যের রূপায়ণ গল্পে বিবৃত হয়েছে; যদিও গল্পকার এর পক্ষপাতি নন। সেকারণেই গল্পের পরিণতিতে দুই বোনের প্রত্যাশা আর বাস্তবতা সমীকৃত হয়ে যায় জনৈক মুক্তিযোদ্ধার সহায়তায় মুক্তি অর্জনের একান্ত কামনায়। পুরুষের ওপর নির্ভরতা এবং নিজস্ব অভিমত, পছন্দ, এমনকি সিদ্ধান্তকে তার অনুগামী করে চলতে ধর্ম ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ শেখালেও এর ফল যে কতটা ভয়াবহ হয়ে ওঠে নারীর জন্য, আমিনা ও মদিনা এর উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।

 

কায়েস আহমেদ

কায়েস আহমেদের ‘নচিকেতাগণ’ গল্পে যমের দুয়ারে অকাতরে প্রাণদানের পৌরাণিক আবহের সম্প্রসারণে বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধকালীন রুদ্ধশ্বাস দিনযাপন এবং পাক হানাদারদের দ্বারা নির্যাতিত হওয়ার বৃত্তান্ত বিশ্বস্ত ভাষ্যরূপে উন্নীত। গল্পকথকের ছোটভাই দীপু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গোপনে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়ার খবর জেনে পাকসদস্যরা তাকে অপহরণের পর অন্যদের সঙ্গে একটি সংকীর্ণ বাথরুমে আটকে রাখে। সেখানে অসহনীয় দমবন্ধ করা নারকীয় পরিবেশে টানা পাঁচদিন ধরে মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে সঙ্গীদের মতো গল্পকথকও হাঁপিয়ে ওঠে। এ গল্পে এমন কোনো সম্ভাবনার ইঙ্গিত নেই, যেখানে শৃঙ্খলিত বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধভাবে বা একক প্রচেষ্টায় শত্রুর মোকাবেলা করতে, কব্জা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে। বরং  মুক্তিবাহিনীর খোঁজ পেতে অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের প্রতিদিন বিশেষ স্থানে নিয়ে গিয়ে শারীরিক নির্যাতন করাই ছিল নরপশুদের কাজ। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের বিভিন্ন বিভীষিকাময় পরিস্থিতির প্রতিনিধি হিসেবে এ গল্পে এসব প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে বাঙালিদের স্বাধীনতার আকুতি বাস্তবায়নগত প্রতিদানের সম্যক দৃষ্টান্ত হিসেবে।

 

হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদের ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধের চালচিত্র প্রত্যক্ষভাবে অনুপস্থিত থাকলেও নেপথ্যে এর জোরালো ভূমিকা সক্রিয়। বৃদ্ধ আবদুল জলিল দুই শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পিতা হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের কাছে ন্যায্য প্রতিদান দাবি করে সুবিধা আদায়ে অসম্মত। ছেলেদের জীবনদানের বিনিময়ে সে বৈষয়িক উন্নতি তথা বাড়ি, গাড়ি, নগদ অর্থ বা জমির মালিকানা গ্রহণের বিষয়টিকে কখনওই সমর্থন করে না। কিন্তু পাক হানাদারদের নয় মাসের কাপুরুষোচিত, ন্যাক্কারজনক অভিযানে এদেশের ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মদানের প্রতিকারের জন্য সে সচেষ্ট। একারণেই পাড়া, মহল্লা এমনকি দূর-দূরান্তের চেনা-অচেনা মানুষ, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনের নিকট থেকে সে স্বাক্ষর সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক আদালতে পিটিশন দাখিল করে এর সুরাহার জন্য। তার এ উদ্যোগকে অনেকেই স্বাগত জানিয়ে এতে স্বাক্ষর করলেও আইন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর বাস্তবায়নে কাউকেই সচেষ্ট হতে দেখা যায় না। এমনকি তার প্রতিবেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও এ ব্যাপারে অনাগ্রহী । বৃদ্ধের একমাত্র নাতনি দাদুর মৃত্যুর পর সেই পিটিশনটি নিজের কাছে রাখলেও তার প্রত্যাশা যে নিতান্তই অলীক স্বপ্ন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একসময় তাকেও এ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হবে। এটিই স্বাধীন দেশের অবক্ষয়িত সমাজের প্রকৃত বাস্তবতা।

শাহরিয়ার কবির

শাহরিয়ার কবিরের ‘একাত্তরের যীশু’ গল্পে খ্রিস্টান ধর্মান্তরিত আদিবাসী সাঁওতাল বৃদ্ধ ডেসমনের দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তরবঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকালীন সংকট এবং পাকহানাদারদের সঙ্গে বাঙালি তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বৈরথের চালচিত্র ফুটে উঠেছে। গির্জার পাদ্রি ফাদার নিকোলাসের কাছে বারো বছরের বালক ডেসমন  দীক্ষাগ্রহণের পর থেকে গির্জার পরিচর্যা ও ঘণ্টাবাদকের দায়িত্ব পালনে আজীবন নিষ্ঠাবান ছিল। এখানে নিত্যদিনের বাঁধা কাজের ফাঁকে গ্রামের শিশুদের সাহচর্য তাকে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবার সুযোগ করে দিত। কিন্তু আকস্মিকভাবেই যুদ্ধের বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতিতে সংসারহীন একাকী এ বৃদ্ধের মনোলোকেও সৃষ্টি হয় উৎকণ্ঠা আর অস্তিত্বসংকট। উনিশশ একাত্তরের মে মাসের শুরুতেই যুদ্ধের সূত্রপাতে নিরীহ গ্রামবাসী প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে কুচবিহার ও জলপাইগুড়ি আত্মগোপন করলেও ডেসমন গির্জা ছেড়ে যেতে চায়নি। জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা এ গ্রামের নির্মল প্রকৃতির অবারিত সাহচর্যে এখানেই থেকে যায়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে পাঞ্জাবি সেনাদল ও তাদের অনুগত রাজাকারবাহিনী একপর্যায়ে গির্জায়ও হানা দেয়। ডেসমনের কাছে মুক্তিযোদ্ধারা ইশ্বরপুত্র যিশুর মতোই আপন, যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিতে দ্বিধাহীন। তাই তাদের প্রতিহত করতে সে অবলীলায় মিথ্যা বলে, মুক্তিযোদ্ধাদের গির্জায় আশ্রয় গ্রহণের বৃত্তান্ত গোপন করে। রাতের অন্ধকারে শত্রুঘাঁটিতে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যে যিশুর কাতারে নিজেদের সামিল করে, ডেসমনের অন্তর্লোকে এ ধারণা গড়ে ওঠে স্বীয় ধর্মীয় বিশ্বাস ও দেশাত্মবোধের একাত্মতায়। তাই তার কাছে দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে প্রাণদানকারী সকল যোদ্ধাই একেকজন যিশু।

 

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘গ্লানি’ গল্পের পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধের অস্থির কালপ্রবাহের ঘনঘটা সক্রিয় থাকলেও গল্পকারের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুই বন্ধুর আন্তরিক সম্পর্কের বিন্যাস। টোকন মুবিনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেনি পারিবারিক দায়িত্ববোধের চাপে। অসুস্থ বাবা-মায়ের সেবা, ছোট ভাইবোনকে দেখাশোনা তার ইচ্ছাকে বাস্তবায়নে বারবার বাধা সৃষ্টি করে। অন্যদিকে মুবিন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে শহীদ হয়েছে জেনে সে প্রবল গ্লানিবোধে আক্রান্ত হয়। কেননা, দেশের জন্য জীবনদানের দুর্বার অনুপ্রেরণা তার মনোলোকেও প্রবলভাবেই জাগ্রত ছিল। কিন্তু একপর্যায়ে সে জানতে পারে, মুবিন বেঁচে আছে। পারস্পরিক সাক্ষাতের অসম্ভাব্যতাহেতু এ সংবাদ বিশ্বাস করতে গিয়ে টোকন অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল। ফলে বাস্তব আর বিভ্রমের দোলাচলে ভুগে তার মধ্যে আত্মগ্লানি প্রবল হয়ে ওঠে।

 

পূরবী বসু

পূরবী বসুর ‘দুঃসময়ের অ্যালবাম’ গল্পে ডায়েরির পাতায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন প্রসঙ্গ মুদ্রিত হয়েছে মে মাসের পরিসরে। ঢাকা এবং এর বাইরের অস্থিরতার চালচিত্র এতে বাক্সময় হয়ে উঠেছে কয়েকটি চরিত্রের লেখনীতে। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালি জনজীবনে পাকহানাদারদের সৃষ্ট ত্রাস আর বিভীষিকার অনুপুঙ্খ রূপায়ণে গল্পকারের পরিশীলিত দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ রয়েছে এ-গল্পে। মঞ্জু সরকারের ‘রাজাকারের ভূত’ ও ইমদাদুল হক মিলনের ‘লোকটি রাজাকার ছিল’ গল্পদ্বয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে উদ্ভূত রাজাকার প্রসঙ্গ কেন্দ্রীয় অভিনিবেশ পেয়েছে। প্রথম গল্পে দেশ স্বাধীন হলে নিজাম রাজাকারের নিহত হয়ে ভূত হিসেবে গ্রামের বটগাছে অধিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আছে লোকসমাজে প্রচলিত অশরীরী সম্পর্কিত বিভিন্ন লোকসংস্কার। বিশেষত শহীদ হাবিবের বাবা মুক্তিযোদ্ধা কুতুবুদ্দির মনোবিকারকে আশ্রয় করে গ্রামীণ জীবনে মুক্তিযুদ্ধের অভিঘাতকে গল্পকার ভিন্ন আবহে উপস্থাপন করেছেন। মিলনের গল্পটি যে মানবিক মূল্যবোধের ধারক, এর মূলে রয়েছে ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্বসংকটের তাড়না। অনাহারী, প্রান্তিক মানুষ যদি পরিবার ভরণপোষণে অসমর্থ হয়, তার ক্ষুন্নিবৃত্তির কোনো সুযোগ না থাকে, তখন প্রাণ বাঁচাতে সে কী নৈতিকতাকে আঁকড়ে ধরবে, নাকি যে-কোনো উপায়েই হোক, জঠরের জ্বালা মেটাবে, এটি এ গল্পের মুখ্য প্রসঙ্গ। মিজান মুক্তিবাহিনীর কাছে ধরা পড়েছিল রাজাকার বলে। সে অকপটেই স্বীকার করেছিল, অভাবের তাড়না, আর্থিক অনটন আর পরিজনের ক্ষুধার্ত মুখের হাহাকার সহ্য করতে না পেরে সে রাজাকার হয়েছিল। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদে সে মুক্তিযোদ্ধাদের জানিয়েছিল, তাকে বিভ্রান্ত করেছে পাক হানাদারদের দোসরেরা। বিস্মকর ব্যাপার হলো, দেশদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত বিধায় সে অকপটেই ঘোষণা করে নিজের মৃত্যুদ-ের পয়গাম। মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে কৃতকর্মের পরিণতি অবলীলায় গ্রহণে তার সুদৃঢ় ব্যক্তিত্ব ও দুঃসাহসী মনোভঙ্গির পরিচয় উন্মোচিত হয়েছে, যা এ গল্পের সবচেয়ে তাৎপর্যম-িত দিক। মইনুল আহসান সাবেরের ‘কবেজ লেঠেল’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে গ্রামের দুই প্রতাপশালী ব্যক্তি আকমল প্রধান ও রমজান শেখের অন্তর্দ্বন্দ্ব চরমে উঠলে কবেজ লেঠেলকে এর মীমাংসায় এগিয়ে আসতে হয়।পালন করতে হয় এর মীমাংসায়। তার নামের সঙ্গে যুক্ত পেশাগত পরিচয়টি নিছক অন্নের সংস্থানের সহায়ক অনুষঙ্গ নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নতুন ভূমিকায় তাকে পরিচিত করায়। আকমল প্রধানের ঘোষিত আর্থিক প্রলোভন বা জমির মালিকানার প্রতি প্রলুব্ধতাবশত নয়, বরং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি রমজানের বিরূপ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় কবেজ তার প্রতি বিক্ষুব্ধ হয়েছিল। এর পরিণামে সে রমজানকে হত্যা করে। আর্থিক প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে দেশপ্রেমের মাহাত্ম্যে উজ্জীবিত হয়ে সে যে এ কর্মকা-ে উদ্বুদ্ধ হয়, তা তার চরিত্রের বিশিষ্টতার পরিচায়ক।

শহীদুল জহির

শহীদুল জহিরের ‘কাঁটা’ গল্পে সাম্প্রদায়িকতা, হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা ও জাতিগত বিভেদ, মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভীষিকাময় পরিস্থিতি, পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের সহায়তায় পুরাতন ঢাকার জনজীবনে সঞ্চারিত ত্রাস, ভারতের অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ভাঙার ইতিবৃত্ত, মৌলবাদের উত্থান, সাধারণ মানুষের আত্মরক্ষার দুর্বার তাগিদে একাত্মবোধক মানবিক আচরণ প্রভৃতি সংবেদনশীল প্রসঙ্গের উপস্থিতি লক্ষণীয়। তবে এ গল্পে লেখক সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কালপরিসরকে অবলম্বন করেছেন, যার ব্যাপ্তি ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে শুরু করে ১৯৯১ সালে ভারতের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের পতনপরবর্তী কয়েক মাস। জাদুবাস্তবতার আবহ ও কাঠামোতে এক হিন্দু দম্পতির ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ধারাবাহিকভাবে তিনবার ভূতের গলির বাসিন্দা হিসেবে আবির্ভাব, প্রতিবেশী মহল্লাবাসীর সঙ্গে ধর্মীয় দূরত্ববোধের পরিবর্তে তাদের সম্প্রীতিময় আচরণ, আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বপরায়ণ মনোভঙ্গি সত্ত্বেও পরবর্তীকালে সংঘটিত একাধিক রাজনৈতিক ঘটনার বিষবাষ্পে তাদের শোচনীয় মৃত্যুর ঘটনায় প্রতীয়মান হয় এতদঞ্চলের সমষ্টিমানুষের অস্তিত্বগত টানাপড়েনের চালচিত্র- কখনও তা নিছক উক্ত দম্পতিকে ঘিরে, কখনও বা তাদের সঙ্গে ইসলাম ধর্মাবলম্বী সংখ্যাগরিষ্ঠ মহল্লাবাসীর সংঘাতের পরিণতিতে। ১৯৭১ সালে সমগ্র বাঙালি জাতির অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হওয়ার অশুভ লগ্ন ছিল ২৫ মার্চের কালোরাত। পুরাতন ঢাকার মুসলমান অধ্যুষিত ভূতের গলিতে একটি হিন্দু পরিবার হিসেবে সুবোধ-স্বপ্না দম্পতির আশ্রয়গ্রহণের ঘটনা জনমনে সংখ্যালঘু সংকটকে সামনে নিয়ে আসে। সেই বিধ্বস্ত পরিস্থিতিতে প্রত্যেকেই যখন নিজেকে রক্ষায় মরিয়া, তখনও এতদঞ্চলের মানুষের মধ্যে পরস্পরের প্রতি একাত্মতাবোধ অটুট ছিল, তার উদাহরণ রয়েছে উক্ত দম্পতির সঙ্গে তাদের প্রতিবেশীদের প্রাত্যহিক দিনযাপনে, কুশল বিনিময়ে, আতিথ্যে, চরম বিপন্ন মুহূর্তে সহাবস্থান ও প্রাণ বাঁচানোর জন্য আশ্রয় দানের ঘটনায়। ২৬ মার্চ, ১৯৭১ সকালে আত্মগোপনের জন্য মহল্লা ছেড়ে উক্ত দম্পতির জিঞ্জিরায় পলায়ন, দুদিনের ব্যবধানে বাসস্থলে তাদের প্রত্যাবর্তন, নিজের গ্রামে ফিরে যাবার আগ্রহ সত্ত্বেও পরিস্থিতিগত প্রতিকূলতা প্রভৃতি ঘটনা সংঘটনের সমান্তরালে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে এ পর্যায়ে সাধারণ মানুষের অস্তিত্বগত টানাপড়েনই মুখ্য হয়ে ওঠে। নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতিবোধ, আতঙ্ক ও অস্থিরতার সামষ্টিক চাপে পিষ্ট হয়েও এ পর্যায়ে মহল্লাবাসীর সঙ্গে সুবোধ-স্বপ্নার আন্তরিকতা অটুট ছিল। ধর্মীয় ভেদাভেদ ও সাংস্কৃতিক ব্যবধানের পরিবর্তে মানবিক বিবেচনা ও শ্রেয়বোধ তাদের সংলাপেই শুধু নয়, বরং ব্যবহারেও ফুটে উঠেছিল। জীবন বাঁচাতে সনাতন বাঙালি নারীসমাজে প্রচলিত সধবা নারীর আচরণের চেয়ে তখন স্বপ্নার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল বেঁচে থাকার অন্তর্তাগিদ। সেকারণেই কপালের সিঁদুর মুছে ও হাতের শাখা খুলে স্বপ্না এবং সুবোধ টুপি মাথায় দিয়ে যখন কলেমা মুখস্ত করে, তখন অনুধাবন করা যায় সংখ্যালঘু হয়ে বেঁচে থাকার হীনম্মন্যতাবোধ তাদেরকে প্রতিনিয়তই বিপন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে মানুষ ধর্মীয় বিশ্বাস ও আবেগকে নির্দ্বিধায় যে জলাঞ্জলি দিতে সক্ষম, এ উপলব্ধি উক্ত দম্পতির চেতনালোকে প্রোথিত হয় পারিপার্শ্বিক নগ্ন বাস্তবতার অভিঘাতে। এমতাবস্থায় পরিস্থিতি যখন ঘোলাটে হয়ে ওঠে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশি দোসর, রাজাকার, শান্তি কমিটির সম্মিলিত দৌরাত্ম্যে, তখন ক্রমশই প্রকটিত হতে থাকে ভূতের গলির মানুষের অস্তিত্বসংকটের রূপরেখা। আবু বকর মওলানার অনুসারী রাজাকারদের উৎপাতে ভীত সুবোধ-স্বপ্না প্রাণ বাঁচাতে ‘সহজ নামায শিক্ষা বই’ থেকে চার কলেমা মুখস্থ করে। কিন্তু তারা জানে, এভাবে কৌশল অবলম্বন করে দিনের পর দিন পাকসেনা ও তাদের অনুচরদের হিংস্র করালগ্রাস থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। ঢাকার মহল্লা ছেড়ে হিন্দুরা প্রাণ বাঁচাতে অন্যত্র সরে পড়লেও সুবোধ-স্বপ্না দম্পতি সেক্ষেত্রে অপারগ ছিল। রাজাকার ও শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আবুবকর মওলানা খবর পেয়েছিল, ভূতের গলিতে একটি হিন্দু পরিবার বাস করছে, আর একবার যদি তাদের ছবি ছাপানোর জন্য পাক হানাদার বাহিনীর পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে তার পোয়াবারো। সেকারণেই সে মে বা জুন মাসে অস্ত্রসজ্জিত পাকসেনাদের নিয়ে ভূতের গলিতে হাজির হয়। রাজনৈতিক বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনের ফলে আবুবকর মওলানা উক্ত মহল্লায় হিন্দু দম্পতিকে অনুসন্ধানের পরিবর্তে মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করতে তৎপর হলে তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। কেননা তার অনুসারীদের পক্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুসন্ধান মহল্লাবাসীর সহায়তা ব্যতীত অসম্ভব ছিল। আর, মহল্লাবাসী যে এক্ষেত্রে তাদের সাহায্য করবে না, তার পক্ষে এমন ধারণা পোষণ সমগ্র পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতান্তই স্বাভাবিক। মুক্তিযোদ্ধাদের খবর বের করতে আবুবকর মওলানা তৎপর হলেও তার প্রচেষ্টা সফল হচ্ছিল না। তবে অনেকটা নাটকীয়ভাবেই সে হিন্দু হিসেবে সুবোধের খোঁজ পায়, কারণ আব্দুল আজিজের বাড়িতে দেয়ালের কাছে সে তুলসী গাছটি দেখতে পায়। তাই সে যখন জানতে চায় তুলসী গাছের পূজা করে কে, তখন তারা অনুধাবন করে, স্বপ্নার হাতের শাখা ভেঙে সিঁদুর মুছে ফেলার প্রচেষ্টা হয়ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে চলেছে। হিন্দু ব্যক্তিকে অন্বেষণে সফল না হয়ে আবুবকর মওলানার পরামর্শে পাকসেনারা সুবোধচন্দ্রসহ পূর্বোক্ত বারোজন পুরষকে আবদুল আজিজ ব্যাপারির বাড়ির ভেতরের প্রাঙ্গণে কুয়ার পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে কলেমা মুখস্ত করার পরীক্ষা নেয়। এতে সবাই উত্তীর্ণ হওয়ায় সে পুনরায় ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কথা বলে তাদের পুরুষাঙ্গ খতনা করা কি না তা যাচাই করতে চায়। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে আকস্মিকভাবেই তাদের কেউ একজন, যে (সম্ভবত) সুবোধের পাশে দাঁড়িয়েছিল, সে তাকে জাপটে ধরে কুয়ার নিচু পাঁড়ের ওপর দিয়ে ঠেলে ভেতরে ফেলে দেয়। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় হতভম্ব দুজন পাকসেনার বন্ধুকের গুলিতে আবদুল আজিজ ব্যাপারির কুয়াতলায় মোট তিনজন মহল্লাবাসী গুলি খেয়ে এবং সুবোধচন্দ্র কুয়ায় পতিত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। ভীতি, আতঙ্ক, লজ্জা, বিপন্নতাবোধ ও মৃত্যুর অভিঘাতে মহল্লাবাসীর জীবন যে পরাভব ও গ্লানি, অন্তর্দাহের শৃঙ্খলে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল, উপর্যুক্ত ঘটনাসমূহ এর সাক্ষ্যবহ। এসব ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় শোকবিহ্বল মহল্লাবাসী মৃতদের লাশ নিয়ে আবদুল আজিজ ব্যাপারির বাড়ি ত্যাগ করার পর প্রবল শোক ও বিভ্রান্তির গোলকধাঁধায় নিপতিত হয়ে তারা সুবোধচন্দ্রের কথা ভুলে যায়, যার পরিণতিতে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। সেদিন বিকেলে মৃতদের দাফন করিয়ে বাড়িতে ফেরার পর সুবোধচন্দ্রের মৃতদেহের কথা তাদের মনে পড়ায় তারা পুনরায় আবদুল আজিজ ব্যাপারির বাড়িতে যায়, কিন্তু ঘরে তারা স্বপ্নাকে দেখতে পায় না। তার বিছানার ওপর ভাঙা শাখা এবং সিঁদুর রাখার খোলা ওল্টানো কৌটা দেখে তারা সমগ্র ব্যাপারটি অনুধাবন করে। এরপর কুয়ার ভেতর দড়ি বেঁধে হুক নামানো হলে সুবোধ-স্বপ্নার জোড়া লাশ উঠে আসে। দেশ স্বাধীন হবার এক বা দুই মাস পর স্বপ্নার ছোটভাই পরানের  উপস্থিতি মহল্লাবাসীর অবচেতনলোকে সন্নিহিত বেদনাদায়ক ইতিবৃত্ত পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়। স্বপ্নার ব্যবহৃত শাখার ভাঙা টুকরোগুলো ছিল সিঁদুর মাখানো। সেই নারী ও তার প্রিয়জনের রক্তাক্ত হৃদয়ের যন্ত্রণার্তি উক্ত প্রতীকের আশ্রয়ে প্রকাশিত হয়েছে। পরান নিজের পরিচয় মহল্লাবাসীকে না জানালেও প্রকৃতপক্ষে তার সম্পর্কে মহল্লাবাসী অবহিত ছিল।  তার নিরাসক্ত, ব্যথাসিক্ত দৃষ্টির অন্তরালে ঘৃণা, শোক, প্রতিহিংসা বা অন্য কোনো মানবীয় অনুভূতির প্রকাশ না ঘটলেও মহল্লাবাসীর সমষ্টিমানসে এ অপরাধবোধ ক্রমশই তীব্রতর হয়ে উঠেছিল যে, তারা সুবোধ ও স্বপ্নাকে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে রক্ষায় অক্ষম। হিন্দু বলেই মূলত, মহল্লায় উক্ত দম্পতির অবস্থান প্রতিনিয়তই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ, যার মাশুল তাদের দিতে হয়েছে জীবনদানের মাধ্যমে।

 

শাহীন আখতার

শাহীন আখতারের ‘আরো এমন রাত ছিল’ গল্পে উত্তম পুরুষে বিবৃত এক নারীর স্মৃতিচারণায় মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভীষিকাময় রাতের অনুষঙ্গসমূহ সংযুক্ত হয়েছে বর্তমানের সমান্তরালে, গড়ে তুলেছে মানব-মানবীর আন্তঃসম্পর্কের প্রতারণা আর অবিশ্বাসকে। প্রেম আর কাম মিলেমিশে যে বুনোট জমাট বাঁধে মানবিক সম্পর্কে, তা যে দিনদিন ঠুনকো হয়ে পড়ছে, বিনিময়ের ছকে সবকিছুই যে আষ্টেপৃষ্ঠে শৃঙ্খলিত হচ্ছে, এ ধরনের নঞর্থক ভাবনাই এ গল্পে মুক্তিযুদ্ধের ভাবাবহে রূপায়িত হয়েছে। নাসরীন জাহানের ‘বিশ্বাস খুনী’ গল্পে রয়েছে বন্ধুত্ব আর শত্রুতার কুহকি সমীকরণ, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের উত্তুঙ্গ পরিস্থিতিতে অস্তিত্বরক্ষার দায়ে  একে অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সততা আর নৈতিকতাকে অস্বীকার করে। ওসমান যে দলের সদস্য, তোফায়েল সে দলেরই একজন হয়ে শত্রুদের কাছে গোপন খবর পৌঁছে দিত। এর পরিণতিতে এ দলের প্রধান আলতাফসহ অন্যদের শত্রুসেনার আক্রমণে শহিদ হতে হয়। ওসমান আহত অবস্থায় সাইফুলের কাছ থেকে নিহত তোফায়েলের বিশ্বাসঘাতকতার বৃত্তান্ত শুনে বিমূঢ় হয়ে পড়ে। কেননা, বন্ধুপ্রতিম মর্যাদায় সে তোফায়েলকে কাছে টেনে নিয়েছিল। সাইফুল এ চক্রান্ত টের পেয়ে তোফায়েলকে অকপটে হত্যা করে। মানবীয় মূল্যবোধের অপচয় যে ব্যক্তিগত স্বার্থোদ্ধারের নেশায় মানুষকে পশুর পর্যায়ে অবনত করে, তোফায়েল এর দৃষ্টান্ত। মামুন হুসাইনের ‘এ এক পুনরুত্থান’, ইমতিয়ার শামীমের ‘মৃত্তিকা-প্রাকপুরাতন’, শাহাদুজ্জামানের ‘অগল্প’, পারভেজ হোসেনের ‘স্তব্ধতার অনুবাদ’, ‘মশিউল আলমের ‘অযোদ্ধা’ প্রভৃতি গল্পে গ্রামীণ ও নাগরিক পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা ও প্রসঙ্গাদি, বিশেষত বিশিষ্ট কথাশিল্পী আনোয়ারা সৈয়দ হক, অদিতি ফাল্গুনী, জাকির তালুকদারসহ আরও আরও গল্পকারের স্বতন্ত্র ভাবনা ও লেখনীতে ভাষ্যরূপ পেয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক সাহিত্যকর্ম দিনদিন রচিত হয়ে চলেছে। এক্ষেত্রে ছোটগল্প সম্পর্কে আমরা একটি অতি সংক্ষিপ্ত ধারণা দিতে চেষ্টা করেছি। যে বিক্ষুব্ধ কালপর্বের ইতিহাস ও জনজীবনের বিপন্নতাকে এসব গল্প ধারণ করেছে, তা থেকে সমসাময়িক বাংলাদেশের সামগ্রিক ধারণা পাওয়া না গেলেও একালের তরুণ প্রজন্ম নিঃসন্দেহে বিষয়টি সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠবে। মুক্তিযুদ্ধ একইসঙ্গে আমাদের জাতীয় জীবনের চরম শোক ও পরম প্রাপ্তির অধ্যায়। প্রিয়জনকে হারানোর মর্মন্তুদ বেদনা আর অজস্র বিয়োগব্যথার বিনিময়ে অর্জিত রক্তিম স্বাধীনতার মাহাত্ম্য অনুধাবনে এসব গল্পের প্রাসঙ্গিকতা তাই অনস্বীকার্য।

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares