প্রচ্ছদ রচনা : মুক্তিযুদ্ধের চেতনা : দ্বিতীয় প্রজন্মের গল্পকারদের গল্পে : আহমেদ মাওলা

মুক্তিযুদ্ধের গল্প বিষয়ক প্রবন্ধ

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা :

দ্বিতীয় প্রজন্মের গল্পকারদের গল্পে

আহমেদ মাওলা

 

আমাদের একটি বিজয়মন্ত্র ছিল-‘জয় বাংলা’। এখনও তা আছে মানুষের বুকের গভীরে। সময়ের প্রয়োজনে, জনতার সৌন্দর্যে তা বিকশিত হয়, বিস্তৃত হয়। ‘গণজাগরণ মঞ্চে’ তৃতীয় প্রজন্মের লাখো কণ্ঠে যখন উচ্চারিত হয়Ñ ‘জয় বাংলা!’ তখন স্বাধীনতার ভিন্ন এক তৎপর্য আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। সেই তৎপর্য কিছুতেই উপেক্ষা করা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের পর গত চারদশকে স্বাধীন ভূখণ্ডের রাজনৈতিক মঞ্চে অনেক পলাবদল ঘটেছে। পরাজিত, পুরোনো শকুন আবার মাথাছাড়া দিয়ে উঠেছে। আজও স্থানে স্থানে তারা সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ায়, ধর্মের আলখাল্লা পরে মঞ্চে আবির্ভূত হয়। জায়গায় জায়গায় জ¦লে ওঠে সহিংসতার আগুন। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার আমাদের শঙ্কিত করে। এসব আমাদের ভাবায়Ñ তবে কি আমরা মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাসের  কথা ভুলে গেছি? অসম্প্রদায়িক দেশ, শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন, কেবল  স্বপ্নই থেকে যাবে? বারবার ভূলুণ্ঠিত হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? এতসব বিভ্রান্তি, বিপত্তির মধ্যে বসে দ্বিতীয় প্রজন্মের গল্প লেখকরা কীভাবে তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধেকে, কোন দৃষ্টিতে দেখছেন মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর সমাজ ও রাজনীতিকে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা দরকার। দ্বিতীয় প্রজন্মের লেখকদের গল্পে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কীভাবে রূপায়িত হয়েছে, তারই তদন্ত-তত্ত্ব-তালাশের প্রয়াসে এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টামাত্র।

পূর্ববতী প্রবীণ গল্পকাররা মুক্তিযুদ্ধের গল্পে তুলে ধরেছেন প্রধানত হানাদার বাহিনীর ও তাদের দোসর রাজাকার বাহিনির নির্মম অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা, নৃশংসতার চিত্র। কারণ, তাঁরা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন যুদ্ধকে, অনেকে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। লিখতে বসে সেই অভিজ্ঞতাকেই চিত্রায়িত করেছেন। তৃতীয় প্রজন্মের গাল্পিকদের অনেকের জন্ম স্বাধীনতার অনেক পরে। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর সাময়িক উত্তেজনা তারা দেখেননি। তাই মুক্তিযুদ্ধেকে কেউ সরাসরি ইতিহাসের পাতা থেকে জীবন্ত তৎপরতায় তুলে ধরেছেন। কেউবা মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার টানাপড়েনকে প্রতীকে, ইঙ্গিতে রূপায়িত করেছেন। কেউবা রাজনৈতিক চক্রাবর্তের শিকার মুক্তিযুদ্ধের বিপর্যস্ত বাস্তবতার দ্বার উদ্ঘাটন করেছেন। ‘তাড়িখানার বিস্ময়কর বালক ও পশ্চাৎ কাহিনি’ মহীবুল আজিজের সেই ভিন্নমাত্রার গল্প। গল্পের ঘটনা উনিশ’শ একাত্তরে ইয়াকুবনগরের বিহারীদের কর্তৃক বাঙালি নিধনের নৃশংসতা। যেখানে গল্প কথকের কাকা, যিনি রেলওয়ে চাকুরিসূত্রে ইয়াকুব নগরের অধিবাসি ছিলেন এবং বিহারীদের হাতে নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হন। মুক্তিযুদ্ধের বিশ বছর পর সেই ইয়াকুব নগরে বন্ধু এজাজ তাড়ি খেতে নিয়ে যায় তাকে। নেশার আমেজ ভরা চোখে তার মনে পড়ে কাকিমার কথা। কাকি বলেছিলেন, ইয়াকুবনগরের নিষ্ঠুর জল্লাদ রুস্তুমের ছুরির চিনে কাটা পড়েছে অনেক জীবন্ত মাথা। দিঘির পাড়ে সমাহিত মৃতদের অধিকাংশের হত্যাকারী সেই রুস্তম। তাড়ির সঙ্গে রুস্তÍমের বানানো উপাদেয় কাবাব খায় তারা। গল্পের ভাষায় :

‘আমি বরং রুস্তমকে দেখি। মুখের, শরীরের চমড়া ঢিলে হয়ে গেছে। কোঁকড়ানো চামড়া কিসমিসের মিল। ভাঁজ করা দুই হাঁটুর মাঝখানে ঢুকে পড়েছে এককালের সমস্ত শক্তির কেন্দ্র মাথাটা। খুব করুণা বোধ করি। এই রুস্তম ইয়াকুবনগরের সেই হত্যাকারী, এবং আমি স্বজন হারানো মানুষের একজন হয়ে যদি ওরদিকে এগিয়ে যাই, প্রতিশোধমত্ততায় বাম পায়ের বুড় আঙুলের একটুখানি খোঁচাতেই সে গড়িয়ে পড়বে ছোট্ট উননের মধ্যে। তাড়ির নেশায় একবার তার মনে হয়-এগিয়ে গিয়ে একবার জিজ্ঞেস করবে নাকিÑআজ থেকে কুড়ি বছর আগে রক্তের নেশায় পশুর মতো কেন মানুষ হত্যা করেছো? ভাবনাটা তার করোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।’

গল্পের সমাপ্তিতে দেখা যায়, একাত্তরে স্বজন হারানো স্বজন, কাকার খুনিকে সামনে পেয়েও প্রতিশোধ নিতে পারে না। তাড়ির নেশা তার চেতনাকে শিথিল করে রাখে। মহীবুল আজিজের মুক্তিযুদ্ধের গল্পে তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিক্রিয়াকে এভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর ‘মৎস্যপুরাণ’, ‘আয়না পড়া’ গল্পের অনুরূপ চেতনার গল্পে ‘আমাদের জয় বাংলা’ গল্পে দেখা যায় সেঝো ভাই যুদ্ধে গিয়ে সম্মুখ-সমরে শহীদ হয়েছেন। তারা সহযোদ্ধারা মেঝোভাইর একটা খাতা মার কাছে দিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের পর কান্না আর ওই খাতাটাই মার সঙ্গী। মার কাছ থেকে ওই খাতা কিছুতেই উদ্ধার করা যাচ্ছে না। এমন কি নাতনি কথাও অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। গল্পের ভাষায় :

‘জয় বাংলা বলে আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নিজ গৃহে ফেরত আসার ঘটনা আমরা স্মরণ করি এদেশের প্রতি ইঞ্চি জয়গায় যে রক্তের দাগ লেগে আছে, তা অনুভব করতে থাকি। কথার মেঝোচাচা তো আর আসে না, তার বদলে একটা খাতা ওর এক সহযোদ্ধা আমাদের মায়ের হাতে দেয়। তার সহযোদ্ধারা এমন কথাও বলে যে, এ-খাতাতে তাদের যুদ্ধের নানান ঘটনা আছে।’

গল্পের সমাপ্তিতে দেখা যায়, মায়ের কাছ থেকে সেই খাতাটা কথার বাবা তুলে নেয়। খাতাটা খুলে তার চোখ যেন বিদ্যুতের আলো ঠিকরে পড়ে। পুরো খাতাটাই অন্ধকার। মা তখন দূর থেকে বলেন :

‘আরে বেকুব! এ-খাতা তো অন্ধকারের ভিতর চালু রাখা হয়! আমি হতচকিত হতে থাকি। খাতার ভিতরে আমাদের জয়বাংলার এ-কেমন রূপ দেখি আমি! খাতা তো দেখি একজনের কাছে একেকরূপ নিয়ে হাজিরা দেয়।’

খাতার প্রতিটি লাইনে জয়বাংলার ইতিহাস আছে। কিন্তু সেই ইতিহাস একজনের কাছে ‘একেক রূপ নিয়ে হাজিরা দেয়।’ বাক্যটির মধ্যে যে দ্যোতনাটি আছে তার মধ্যেই গল্পের মূল ম্যাসেজ লুক্কায়িত। মুক্তিযুদ্ধকে এখন এক-এক জন একেকভাবে দেখে, নিজের স্বার্থসিদ্ধির প্রয়োজনে ব্যবহার করে। এই বাস্তব সত্য উন্মোচিত হয়েছে কামরুজ্জামানের এ-গল্পে। এ-সময়ের খ্যাতিমান গল্পকার জাকির তালুকদারের ‘একাত্তরে যেভাবে বদলে যায় দোয়াকালাম’ গল্পটি যেন ইতিহাসের পাতা থেকে সরাসরি উঠে এসেছে। গল্পের বর্ণিত ঘটনা একাত্তর সালেরই হলেও জাকির তালুকদার ঘটনা বিন্যাসে যথেষ্ট মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।

নারদ নদীর লিয়াকত ব্রিজের নিচে হ্যাপি, আতা এবং অবিনাশকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ারে মেরে ফেল পাঁকের মধ্যে পুঁতে চলে যাওয়ার সময় পাকিস্তানি মেজর জামসেদ সেই কবরে ছরছর করে ‘পচ্ছাপ’ করে করে যায় পাশের জঙ্গল থেকে এ-ঘটনা দেখে পোস্ট অফিসের পিয়ন মোসলেম। মুসলমান মরলে পড়তে হয় ‘ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাহে রাজেউন’ আর বিধর্মী মরলে পড়তে হয় ‘ফিনারে জাহান্নামা খালেদিনা ফিহা’ মোসলেম পিয়ন মোক্তবে তা শিখেছে। হিন্দু-মুসলমান দুই ধর্মের লোককে সে মরতে দেখেছে, তাই দুটো দোয়াই সে পড়ে। তারপর মোসলেম পিয়নের মনে হলো, বিধর্মীদের নামে যে দোয়া সে উচ্চারণ করেছে, তার মধ্যে বিধর্মীদের সম্পর্কে নিশ্চয় খারাপ কিছু আছে। গল্পের শেষে দেখা যায়, পীরের মাজারে আশ্রয় নেয়া ঘুমন্ত মানুষেগুলোকে চিৎকার করে জাগিয়ে তোলে। ওপারে তখন মিলিটারি গ্রামের পর গ্রাম জ¦ালিয়ে দিয়ে আসছে। বড় আমগাছের আড়ালে লুকিয়ে মোসলেম পিয়ন দেখে, মিলিটারি কিছু লোককে সারবেঁধে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার মেরে ফেলছে আর কিছু মানুষকে একপাশে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। তাদেরকে দিয়ে মাঝির কাজ করিেেয় নদী পার হবে মিলিটারি। মোসালেম পিযন দেখে-

“যে নদীকে কাল রাতে তার কাছে নীলনদের মতো বিশাল মনে হচ্ছেল, এখন মনে হচ্ছে সেই নদী আসলে তেমন বড় নয়। তাছাড়া তাদের দলের মধ্যে তো মুছা নবী নাই। নাই তার হাতের তেলেসমাতি ক্ষমতার আসা।…পাকবাহিনীকে কায়দামতো মাঝনদীতে এনে নৌকা থেকে ঝাঁপ দিয়ে পানিতে পড়েছে বাঙালি মাঝির দল।…টুপ টুপ করে তলিয়ে যাচ্ছে নন্দকুজার চোরা ¯্রােতের টানে। মোসলেম শুনেছে পাঞ্জাবিরা নাকি মুসলমান। তবু তাদের মৃত্যু দেখতে দেখতে সজোরে উচ্চারণ করে সেÑ ‘ফি নারে জাহান্নামা খালিদিনা ফিহা।”

ফেরাউনের আক্রমণের মুখে মুছা নবী তাঁর দলবল নিয়ে আল্লাহর অলৌকিক শক্তির বলে নীলনদের পানি দুভাগ করে রাস্তা করে দিলে সদলবলে নবী মুছা নীলনদ পেরিয়ে যায়। কিন্তু ফেরাউনের দল পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করে। ওই মিথিওকল ঘটনার সঙ্গে জাকির তালুকদার খুব আশ্চর্যজনকভাবে মিশিয়ে ভিন্ন এক শিল্পমাত্রা দান করেছেন। এখানেই গল্পটির সার্থকতা এবং ব্যঞ্জনা অসাধারণ। জাকির তালুকদারের ‘অন্ত্যেষ্টি যাত্রা’ গল্পটি মূলত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর শেষ রাষ্ট্রীয় সম্মান দেয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। মুক্তিযোদ্ধা শওকত আলীর মৃত্যু হলে এসিল্যান্ড সুলতান আহামদের উপর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বার্তায় তাকে গার্ড আব অনার দিয়ে সমাহিত করা । অনেক বিপত্তি, গ্রাম্য কাদাপথ পেরিয়ে পুলিশ জিপে করে ম্যাজিস্টেট সুলতান শওকত আলীর মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট চায় কিন্তু-

‘সার্টিফিকেটটা বছর দুই আগে নিজ হাতে ছিঁড়ে পুড়িয়ে ফেলেছিল শওকত আলী। কেন? তার বড় মেয়ে হামিদার ইজ্জতের ওপর হামলা চালিয়েছিল শান্তি কমিটির মেম্বর ওয়াজেদ মিয়ার ছেলে আক্কাস। গ্রাম্য শালিস, থানা পুলিশ সব জায়গায় টাকার জোরে পার পেয়ে গেল সেই ছেলে। স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নিয়ে দুয়ারে দুয়ারে ধর্না দিয়েও সুবিচার পায়নি শওকত আলী। আর লোকটা ছিল খুব বদরাগী, গোঁয়ার গোবিন্দ গোছের। রাগের চোটে- শালার সার্টিফিকেট না বাল- এই কাগজ দিয়া শুয়োরের বাচ্চা রাজাকারের একখানা বালও উপড়ান যায় না- বলে পুড়িয়ে ফেলল কাগজটাকে।’

দ্বিতীয় প্রজন্মের গল্পে মুক্তিযুদ্ধে- উত্তর দেশ ও সমাজ অসাধারণ বাস্তবতায় উঠে এসেছে। গল্পে বর্ণিত বাক্যÑ ‘সার্টিফিকেট না বাল’ এই উক্তির মধ্যে দিয়ে একজন অসন্তুষ্ট মুক্তিযোদ্ধার কি পরিমাণ রাগ-ক্ষেভ প্রকাশ পেয়েছে, তা বোঝা দরকার। যদিও গল্পে শেষপর্যন্ত শওকত আলী কাফন খুলে তার দেহের গুলি লাগার জায়গা শনাক্ত করার পর তাকে গার্ড অব অনার দিয়ে সমাহিত করা হয়। কিন্তু বুলেটে জখমি গর্ত বেআরু করে দেখার মধ্য দিয়ে তার সম্ভ্রমটুকুও সমাজ কেড়ে নেয়। জাকির তালুকদার এভাবে গল্পের মর্মার্থকে পাঠকের হৃদয়ে সঞ্চার করে দেন।

প্রশান্ত মৃধার গল্প ‘বাঁ-পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে’ মূলত সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। গল্পে বিপ্লব নামের একজন অভয়নগরে গিয়ে হঠাৎ আটকা পড়ে। পরিবহন ধর্মঘট, বিপ্লব তখন চিন্ময়ের ফোন ধরে, অভয় নগরে পলাশদার সঙ্গে যোগাযোগ  করতে বলে। ঘটনা দ্রুত ফ্ল্যাশব্যাকে মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনা এসে যায়। বিপ্লব মায়ের পেটে থেকে সেদিন বুড়ো আঙুল দিয়ে পলাশদাকে ঠেকিয়ে রেখেছিল’ এনিয়ে হাসাহাসি। যাত্রীদের একজন তখন বলে-

‘জানি জানি, সব যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানের জন্য! পাবলিক সাগু খায় না, ভাত খায়।’

পরিবহন ধর্মঘটের মূল কারণ ইলেকশনে দুই প্রার্থীর মধ্যে দ্বন্দ্ব। মা বলে, জীবনে রাজাকার দেহি নাই, ওই দেখলাম। পলাশদা বলে, ঘরামির বাড়ির তিনজন মানুষ মারল। চিন্ময় পলাশদাকে বলে- ‘ও দা রাজাকারে মুহে মুইতে দেলে না কী জন্য?’ মা তখন বলে- ‘কত্ত রাজাকার আছে এহোন মুক্তিযোদ্ধা সাজিচে।’ চিন্ময় বলেÑ ‘সেদিন যারা আইলো, তাগো একজন এহোন নৌকা মার্কা, একজন ধানের শীষ।’ গল্পের এই পরিণতিতে পাঠক মনে নতুন করে মোচর দিয়ে ওঠে। সমাজ বাস্তবতা থেকে এই দৃশ্যকে কিছুতেই আলাদা করা যায় না। জাতীয় রাজনীতির ভূল বিকাশকে তুলে ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যে আজ রাজনীতির স্বার্থান্ধ খপ্পরে পড়েছে, তাকে গল্পে এভাবে পরিচর্যা করেছেন তৃতীয় প্রজন্মের গাল্পিকরা।

‘অপরাজিতা’ আহমাদ মোস্তাফা কামালের এই গল্পটি পাঠক-হৃদয়কে শুধু আর্দ্র করে না একই সঙ্গে বুকে তীব্রভাবে অভিঘাতও করে। গল্পটিতে তুলে আনা হয়েছে একাত্তরে হানাদার বাহিনীর কর্তৃক ধর্ষিতা এক বীরাঙ্গনার নির্মম বেদনার কথা। অনীক- অপরাজিতা শহরেই থাকে কিন্তু অনীকের গ্রাম দেখতে খুব ইচ্ছা হয়। অপরাজিতার বাবার বাসাও যেহেতু শহরে, তাই অপরাজিতার দাদির কাছে গ্রামের বাড়িতে যায় তারা। প্রায় ভরাট হয়ে যাওয়া একটা খাল দেখিয়ে দাদি বলে, এই যে খালটা দেখছো, এটাও অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে। যুদ্ধের সময় কত যে বেওয়ারিশ লাশ এই খাল দিয়ে ভেসে গেছে!’ এই গাঁয়ের এক বউ সুযোগ পেলে খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতো। তার চোখের লোনা পানি মিশে গিয়েছিল খালের পানিতে। মেয়েটিকে পাকিস্তান আর্মিরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল জুন মাসে। সতেরই ডিসেম্বর ক্যাম্প থেকে তাকে উদ্ধার করে এক মুক্তিবাহিনীর পৌঁছে দিয়েছিল গ্রামে। ধর্ষিতা মেয়ে, সম্ভ্রম হারানো মেয়ে জীবনের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। পরিবার মা-বাপ কেউ তাকে নিতে চায় না। সর্বস্ব হারানো মেয়েকে নিয়ে কি করবে তারা? সমাজের লোকেরা বলল, বিয়ে দিতে না পারলে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলো। তখন সন্তানহীন মামা-মামি ত্রাতা হয়ে এগিয়ে আসে। তারা মেয়েটাকে নিয়ে গিয়ে শুধু নামই পাল্টায় না, পিতা-মাতার নামও পাল্টিয়ে দেয়। তিনে শুধু নেতা ছিলেন না, সত্যিকার অর্থে একজন পিতা ছিলেন। তিনি বললেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিতা সকল মেয়ের বাবার নামের জায়গায় আমার নাম লিখে দাও, আর ঠিকানা লিখে দাও ধানমন্ডি ৩২ নম্বর।’ অনেকদিন পর যে মুক্তিযোদ্ধা তাকে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিল, সে তাকে খুঁজতে আসে এবং অনেক খেঁজাখুঁজির পর মামার বাড়িতে এসে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। তাদের বিয়ে হয়, মেয়েটির নতুন নাম লেখা হলো- অপরাজিতা রহমান, পিতা শেখ মুজিবুর রহমান, ঠিকানা ৩২ ধানমন্ডি, ঢাকা। বুদ্ধিমান অনীক সব বুঝে ফেলে। গল্পের ভাষায়Ñ

‘দাদির কণ্ঠে ক্ষোভ নেই, রাগ নেই, আছে গভীর বেদনার দীর্ঘশ্বাস। অনীক আর কোনো কথা না বলে তার পাশে মাটিতে বসে পড়ে’ তারপর দুহাত তাঁর একটা পা তুলে নেয়।…মুখ নামিয়ে পায়ের পাতায় চুমু খায়…’

আহমাদ মোস্তাফা কামালের এ-গল্পে বীরাঙ্গনার বেদনাবিধুর কষ্টের কথা শুনলে সত্যি বুক ভেঙে কান্না আসে। জাতির জনকের অসাধারণ ভূমিকার কথা এগল্পে নতুন এক শিল্পমাত্রা পায়। আমরা বিস্ময়ে লক্ষ করি, দ্বিতীয় প্রজন্মের হাতে, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়, যাদের জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে রক্তাক্ত ঘটনা, তার ক্ষতচিহ্ন, প্রভাব, মানসিক যন্ত্রণার কথা চমৎকারভাবে রূপায়িত হয়েছে। মোহিত কামালের গল্প ‘জলবোমা’ মূলত একাত্তরের পরাজিত শক্তির ইন্ধনে প্রায় তিনমাসব্যাপী অবরোধ, পেট্টোল বোমা, আগুন সন্ত্রাসকে পটভূমি করে লেখা এক মর্মান্তিক কাহিনি। গল্পের কাহিনিতে দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রাজু চৌধুরী অবরোধ কর্মসূচির মধ্যে তার নাতনি ফুলকথাকে স্কুল থেকে আনতে একটা অটোতে ওঠে। অটোর চালক ছিল একাত্তরে শান্তিকমিটির প্রধান রহমত আলীর বড় ছেলের নাতি চন্ডাল মাস্তান। গল্পের ভাষায়-

‘কমান্ডার স্যার, আমি শুনেছি আপনার কারণে ওই সময়ে দাদাজানের জান বাঁইচ্যা গেছিল।… (কমান্ডার) মনে মনে বলেনÑ‘ভুল করেছিলাম।…তাকে মেরে ফেলাই উচিত ছিল। শত্রুর বীজ রাখা ঠিক হয়নি। ভুল করেছিলাম মায়ার হাতে বন্দি হয়ে। এখন রহমত আলীর প্রজন্ম স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ভয়ালরূপে আবির্ভূত হয়েছে। জ¦ালাও পোড়াও করেছে সর্বত্র।’

ফুলকথাকে সঙ্গে নিয়ে অটোতে ফেরার পথে চকিতে পেট্রোল বোমা উড়ে এসে আঘাত করে অটোতে। দাউ দাউ করে জ¦লে উঠা আগুনশিখা এসে পড়ে জলবোমা। যাত্রীসহ অটো নেমে গেল খাদে। চন্ডাল মাস্তান চীৎকার করে বলতে লাগল ‘আমার অটো যাত্রীসহ খাদে ডুবে গেছে। সবাই জানল রাজু চৌধুরী ও ফুলকথা দুর্ঘটনায় মারা গেছে। বারুদ ভিজে গেলেও জ্বলে, ভেজা বারুদ থেকে আগুন বেরুচ্ছে। কিন্তু সে আগুন চন্ডাল মাস্তানের বোধের জগৎ স্পর্শ করে না। মোহিত কামালের এগল্পে উঠে এসেছে মূলত একাত্তরের পরাজিত শত্রু তৃতীয় প্রজন্মের বীজ থেকে প্রতিহিংসার প্রতিদৃশ্য। অথচ একদিন এই রাজু চৌধুরী যে শান্তিকমিটির প্রধানকে প্রাণে বাঁচিয়েছিল আজ তারই উত্তর প্রজন্ম তাকে নাতনিসহ সুকৌশলে হত্যা করেছে। ঘটনার বিন্যাস ও কাহিনি নির্মাণে মেহিত কামালের মুনশিয়ানা রয়েছে। তাঁর ‘ছোবল’ গল্পটি এ-প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। জাহেদ মোতালেবের ‘ঢেউয়ের মতো’ গল্পে পত্রিকা অফিসে লেটনাইট ডিউটেতে গিয়ে লেখক নাসিরের মুখে একটা বাক্য শুনতে পায়Ñ‘একটা রাজাকার নদীতে ফেলে দিলে পঞ্চাশ টাকা দিত।’ নিউজ ছাপানোর জন্য কেউ পকেটে তেনশ টাকা ঢুকিয়ে দিয়েছে সাংবাদিক বশিরের হাতে। গুফ সেকশনে ঢুকে সে বলে ‘বদ্দা ইক্যিনি চাইয়ন।’ প্রদ্যুৎ বাবু প্রশ্ন করে- ‘দ্যাশ ইয়েন কি হবো খায়া খায়া স্বধীন অইয়্যে?; হারুন বশিরকে বলে, ‘তুইও তো রাজাকার’ বশির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে- ‘ঠিক তো। আঁরা বেয়াক রাজাকার। রাজাকারে দ্যাশ ভরি গেয়ি।’ বশিরের সামনে তখন পত্রিকার হেড লাইন ‘আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ করেনিÑ খালেদা।’ বশিরের মুখ তখন ঢেউয়ের মতো নাচতে থাকে। তার মনে হয় কোথাও কোনো যুদ্ধ হয়নি। রাজাকারের সৃষ্টি হয়নি। গুলির শব্দও কেউ শুনেনি। জাহেদ মোতালেবের এই গল্পে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভুলে যাওয়ার করুণচিত্র উঠে এসেছে। ‘গুম-জনপদের ভাষ্য’ গল্পের ফজলুল কবির গল্পে ভাঙা-মরচেপড়া একটা ট্রাঙ্ক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা যুবক ঠিকানাহীন ঠিকানা খুঁজতে আসে গ্রামে। তার মানুরীবানুর কজেছেঁড়া ধন বুকে নিয়ে কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। যুদ্ধের এতবছর পর কেউ তা মনে রাখেনি। তারপর ওই গ্রামে কোনো নারী স্বামীসহবাসে কোনো সন্তান ধারণ করেনি। যুবক বদিউর রহমান সেই গ্রামে এসে সেই কড়–ই গাছে খেঁজে কিন্তু গুম হয়ে যাওয়া জনপদে সেই গাছের হদিশ কেউ দিতে পারে না। এ-গল্পে ‘গুলাল আজম’ আসলে গোলাম আযমের প্রতীকী চরিত্র। গল্পের পরিণতিতে দেখা যায় মরচেপড়া ট্রাক থেকে থেকে যুবক বদিউর যে ঠিকানা বের করে’ তার পাঠোদ্ধার কেউ করতে পারে না। অর্থৎ মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস আজ আমাদের কাছে জাঁপসা হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধ আজ গন্তব্যহীন হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতাকে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন দ্বিতীয় প্রজন্মের গল্পকারেরা। ‘একাত্তরের একটি বিবর্ন সকাল’ গল্পে আহমেদ মাওলা তুলে ধরেছেন মূলত মুক্তিযুদ্ধকালীন হানাদার বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত দেবরামপুর গ্রামের নির্মম অত্যাচারের কাহিনি। গল্পে দেখা যায়, হিন্দুপাড়ায় সবগুলো বাড়ি জ¦লিয়ে দেয়, তিনজনকে উঠোনে দাঁড় করিয়ে, একগুলিতে হত্যা করে, তরুণি আরতি শীলকে জীপে তুলে নিয়ে যায়। তার চিৎকার বিষণ্ন হয়ে ওঠে ভেরের আকাশ-

গ্রামের আকাশে কু-লি পাকিয়ে উড়ছে ধোঁয়া। পোড়া বাড়ি। উঠোনেগুলি খাওয়া রক্তাক্ত মৃতদেহ। মণীন্দ্র-শচীন্দ্র-তরণীর নিথর দেহের চারপাশে ভনভন করে উড়ছে মাছি।’

অদিতি ফাল্গুনীর ‘অপৌরষেয় ১৯৭১’ গ্রন্থের গল্পগুলোতে তুলে ধরা হয়েছে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পুরুষহীনত্বের অন্তর্দাহ। সংবাদিক  মেয়েটি বারবার অনুরেধ করে, কিছু বলার জন্য। মেয়েটি জানে না, নিজাম মধুর মতোই শিশ্নহীন। যুদ্ধাহত, পঙ্গু,আপৌরষ- ‘আমি যে তোকে আর বাচ্চা দিতে পারবো নানে, তোর এই ভরা যৌবন, আমি যে নপুংসক হয়ে গেলাম রে বউ।’- এই আর্তনাদ কি নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে এতটুকু মর্মযাতনার উদ্রেক করবে না? হয়ত না। শিশ্নহীন মুক্তিযোদ্ধ মুধু, শামসের আলী কেবল জানবে সেই বেদনার কথা, আর বুঝবে তার স্ত্রী লতা নপুংসক কী? হরিশঙ্কর জলদাসের ‘থু থু’ গল্পে উঠে এসেছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও তার বিরুদ্ধে জেগে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের তারুণ্যপ্রদীপ্ত চেতনা। এছাড়া শাহানাজ মুন্নি, জেসমিন মুন্নি, চন্দন আনোয়ার, মোস্তফা তারিকুল আহসান, শিমুল মাহমুদ, জাকির সেতু, চন্দন চৌধুরী, মেহেদী উল্লাহ, বদরুন নাহার, লতিফ জোয়ার্দার, শুভাশিস সিনহা, পাপড়ি রহমান, হুমায়ুন মালিক, স্বকৃত নোমান, জয়দীপ দে প্রমুখের গল্পে দ্বিতীয় প্রজন্মের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিন্নতর মাত্রার রূপায়ণ লক্ষ্য করা যায়। হানাদার বাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতনের ঘটনার পরিবর্তে দ্বিতীয় প্রজন্মের গল্পে উঠে এসেছে মূলত মুক্তিযুদ্ধোত্তর মনোদৈহিক প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ার বাস্তবতা। আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে চাই আরও অনেক লেখকের অবদানের কথা। স্বল্প আলোচনায় তাঁদের নাম উল্লেখ করা সম্ভব হয়নি বলে আমরা দুঃখবোধ করছি।

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares