প্রচ্ছদ রচনা : মুক্তিযুদ্ধের কবিতা

মুক্তিযুদ্ধের কবিতা

 

আসাদ চৌধুরী

সে রোদটুকু

 

রৌদ্র-পাঠে

অনেক মজা

পড়তে ভালো লাগে।

ঠিক বলি নি

পড়েছিলাম

কয়েক যুগ আগে।

 

কী মনোযোগ, রোদ পড়ছি

প্রেম পড়ছি, ঘৃণা পড়ছি

বৃষ্টি পড়া বাতিল ক’রে

বাজ লিখছি

মানিক দিয়ে গাঁথা,

বিষের বাঁশি

যেন ওড়ায়

ক্ষিপ্ত কোনো ছাতা।

মড়ার চোখে, জ্বরার চোখে

যুবার চুলে, বুড়ার ভুলে

রোদের খেলা রোদের খেলা

সূর্য ওঠে আগের মতো

সূর্য ডোবে আগের মতো

 

সে রোদটুকু

আর দেখি না

যেমন ছিল

একাত্তরে… …

 

 

জুলফিকার মতিন

 

তারা সব যুদ্ধে গেছে

 

না, নেই, কেউ কোথায়ও নেই,

থালাতে ভাত বেড়ে নিয়ে নির্ঘুম চোখে বসে রয়েছে মা,

বোনের মমতা মাখানো মনের কোণে প্রতীক্ষার সলতেও

জ্বলতে জ্বলতে হয়ে যাচ্ছে ছাই,

ঘরের নারীর কাছেও রেখে যায়নি কোন স্মৃতির রুমাল।

 

তারা সব যুদ্ধে গেছে …

 

ডানা মেলবার পাখিরাও নেই আকাশে,

পোড়া গন্ধ প্রকৃতিতে ছড়িয়ে দিচ্ছে বিষণ্ণ বাতাস,

রকেট-মর্টার-শেল ধবংসের পরোয়ানা নিয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে দিকবিদিক,

বসত বাড়িতে আগুন

ফসলের ক্ষেতে বিষ

প্রবাহিত নদীর জলে ভেসে যাচ্ছে মানুষের মৃতদেহ।

 

নিকষ কালো আঁধার রাতের এই পাহারা

মানবসৃষ্ট গজবের এই বিভীষিকা

অধিকার কেড়ে নেয়ার এই কালিমা লিপ্ত ষড়যন্ত্র

ক্রীতদাস বানিয়ে রাখার যত নীলনকশা

ভেদ করে একদিন তো  ফোটাতেই হবে পুষ্পের ভোর।

 

তাই, তারা নেই, কোথায়ও নেই,

ঘাসের শিশিরে শিশিরে কেবল দেখা যায় তাদের পায়ের ছাপ

মুক্তির দিগন্তে শোনা যায় তাদের মুখরিত জীবন স্পন্দন

প্রভাতের অরুণোদয়ে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয় তাদের প্রত্যাশার বীজ।

কেবল বনের মর্মরে

প্রান্তরের সবুজ আভায়

রোদের ঝলকানিতে

তাদের ফিরে আসবার খবর।

 

 

আসাদ মান্নান

 

জলের সানাই

 

পা ভেঙে সময় আজ  প্রকৃতির ব্যভিচারী খাটে শুয়ে আছে;

কে ওকে চিকিৎসা দেবে?… দেবে সেবা অন্নজল ক্ষুধার আগুনে?

বুকের ভেতরে কেন কুকুরের তাড়া খাওয়া শিয়ালের পিঠে

অই একা বসে আছে  প্রিয় নদী যমুনার ঢেউ? যে-মেয়েটি

অপরাহ্নে যমুনাকে বুকে নিয়ে পাহাড়ে উঠেছে,তার বুকে

কত অগ্নি কত দাহ তা কি জানে যমুনার জল? অই জলে

সময়ের কান্না ছাড়া অন্য গান কেউ আর এখন শোনে না।

 

যৌবনের ডিঙ্গি বেয়ে মধুগঞ্জে আজ আর মাধবী আসে না :

করোটির অন্ধকারে তবু  কেন পূর্ণিমার গোপন ইশারা!

হাত-পা ছড়িয়ে দিয়ে স্থবিরতা  বসে থাকে পাহাড়ের  কাঁধেÑ

কুয়াশা বালিশ হয়ে ধরে রাখে আকাশের ঘুমাচ্ছন্ন মাথা;

অই নগ্ন নগরীর পানালায়ে পরিত্যক্ত চেয়ারের নিচে

শূন্য গ্লাসে ঢুকে পড়ে রাশি রাশি নেশাতুর  মশা ও মাছিরা-

কফিন জড়িয়ে গায়ে  অই দ্যাখো উড়ে যাচ্ছে  সময় শিকারি।

 

২.

নিঃসঙ্গ গলির বাঁকে চিৎ হয়ে পড়ে আছে  মাতাল প্রহরী:

স্তব্ধতার হাত ধরে একা রাত্রি হেঁটে যায় ফাঁকা রাজপথে;

বাড়ি যাবো…বাড়ি কই? শাড়ি খুলে চোখ মারে পাড়ার মেয়েরা-

ভাটার গোপন টানে কাম আর অন্ধকার ঘুমিয়ে পড়েছে।

শীতের কামড়ে কেন বসন্তের ইচ্ছেগুলো কাকের বাসায়

পলাতক কোকিলের ডিম হয়ে পড়ে থাকে…কেন ঘাসবনে

শিশির কুড়োতে গিয়ে ভালোবাসা কুড়িয়েছে কাফনের রং?

 

গোপনে  কবরপাখি  মাটি ছেড়ে উড়ে  আসে  বুকের খাঁচায়;

আকাশপ্রেমিকা তবু একা একা  চুল খুলে সমুদ্রের তীরে

উরুফাঁক করে  নিদ্রাহীন শুয়ে আছে কীসের আশায়! … হায়!

মোহনার  ওম ছেড়ে উড়ে যাচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে  শাদা কবুতর :

কেউ তাকে শান্তি বলে, কেউ বলে রোদ; আর কবি বলেÑপ্রেম;

প্রেমে যে আগুন আছে সে আগুনে সূর্যোদয়ে হরিণবালিকা

আসন্ন কামের টানে কান পেতে শুনতে থাকে জলের সানাই।

 

৩.

কে তিনি গোপন প্রেমে মাঝে মাঝে রমণবিহারে যান?…

তিনিও লুণ্ঠন করে নিয়ে যান পরনারী, গরিবের ধন

প্রাচীনকালের  দস্যু রাজার মতন; ঝড় ও ঝঞ্ঝার পরে

প্রকৃতিবালার মনে দস্যুতার রাশি রাশি চিহ্ন পড়ে থাকে;

অনন্ত অপেক্ষা শেষে অই জলে উঁকি মারে  দীর্ঘ রংধনু:

হৃদয়ের ছাইভস্মে পুনর্বার জন্ম নেয় নিহত প্রেমিক,

যেন সে ফিনিক্স পাখি; আগুন কুড়োতে গিয়ে জলে কা’রা ভুলে

 

কুড়িয়েছে অন্ধকার ? হায়! সমুদ্রের ফেনা কা’রা কুড়িয়েছে ?

শূন্যতার যুবরাজ বেলাশেষে শূন্য হাতে ফিরে ঘরে-

দুরন্ত অশ্বের পিঠে স্মৃতি একা; মরুভূমি ঘুমায়  আগুনে।

হায়! এত হাহাকার নিয়ে মানুষ কী করে বাঁচে, বেঁচে থাকে!

আকাশের পেট চিরে বের হচ্ছে  হ্রদের জলের মতো স্বচ্ছ

দিনগুলো : পাহাড়ের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে আছে অন্ধকার;

কে তাকে গভীর প্রেমে কোলে নিয়ে বসে থাকে ঝোপের আড়ালে?

 

৪.

সমুদ্রকে চুমু খেয়ে আমাদের নদীগুলো মত্ত হয়ে ওঠে :

বিশাল বিস্মৃতি নিয়ে শুয়ে থাকে উত্তরার হিমের সম্রাজ্ঞী।

বরফের শাড়ি খুলে অই নাচে কামাতুর জলের নর্তকী;

বাতাসের শিং ধরে কী সাহসে নগ্ন হয়ে পাহাড়ি মেয়েটি

নূপুর বাজিয়ে পায়ে নাচতে নাচতে একা সমতলে নেমে আসে;

দিগন্তে ঝুলিয়ে রাখে খুলে খুলে নগ্নতার স্নিগ্ধ নীলিমাকে;

দুর্বিনীত কামগন্ধে জেগে ওঠে দক্ষিণের  জলের সম্রাট।

 

দূর থেকে ছুটে আসছে উন্মাদিনী ডাকিনীর পায়ের আওয়াজ;

দ্যাখো, দ্যাখো বাতাস  কী করে তাকে ধরে  নাচে জলের  মুদ্রায়!

ঘুমন্ত চিতার চোখে নেমে আসে গলন্ত সিসার মতো রাত্রি;

দুঃস্বপ্নের জাগরণে সারাক্ষণ চৈতন্যের বিপন্ন পাড়ায়

আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে : বরফের জামা গায়ে যে-বিড়াল হাঁটে

তার গোঁফে দীর্ঘ কালো শিখা, চোখে জাগে পুরনো প্রেমের নেশা:

শিকার ধরার জন্য যেন এক চিতাবাঘ ওঁত পেতে আছে।

 

৫.

প্রত্যেক মুহূর্তে অই জনপদে হানা দেয় জীবনশিকারি,

ইঁদুরের বাচ্চা ফেলে সে এখন মানুষের  মাংস খায়, আহা

সুন্দরের আত্মা ছুঁয়ে তার ক্ষুধা পাহাড়ে উঠেছে : অই দ্যাখো,

সমুদ্র কীভাবে আজ তার লেজে বসিয়েছে জলের উৎসব!

অক্টোপাস অন্ধকারে, বাতাসের ঘূর্ণি টানে সমুদ্রের ছায়া

উড়ে যাচ্ছে ; প্রলয়ের শিঙ্গা  ফুঁকে নিদ্রামগ্ন ই¯্রাফিল জাগে :

হরিণীর লাশ দেখে বাঘিনী কী আর্তনাদে নির্জন অরণ্যে

 

গর্জে ওঠে! নদীর অপার  ক্ষুধা প্রকৃতির অদৃশ্য কেল্লায় :

জলের মর্সিয়া শুনে দেবতারা উড়ে যায় চরের শ্মশানে;

আকাশ পড়েছে ভেঙে ঈশ্বরীর অন্নহীন ভাতের হাঁড়িতে;

দুধের বাটিতে, দ্যাখো  নাগ আর নাগিণীর মধুরমিলন :

যুবতীকে ভালোবেসে যে-যুবক আকাশের নাভি ছুঁয়েছিল,

বাতাসের হাত ধরে তার দেহ ঝুলে আছে গাছের আগায়;

এবং গোড়ায় আহা! যুবতীর নগ্নরূপে মাছির উল্লাস!

 

৬.

মৃত্যু অই ঈশ্বরের হাতে ধরা সময়ের দীর্ঘ এক লাঠি,

এ এক এমন লাঠি, যার কোন ক্ষয় লয় ভয় কিছু নেই,

একমাত্র জয় ছাড়া অন্য কিছু তার কাছে কখনও আসে না।

গাভীর ওলান থেকে মৃত্যুকে দোহন করে মাতৃহীন শিশু;

বড়ই  করুণ দৃশ্য : শোকাচ্ছন্ন গাছের পাতায় রৌদ্রহীন

বিবর্ণ প্রহর ; চন্দ্রমুখী মেয়েটির জীর্ণ লাশ বুকে নিয়ে

আকাশ কী করে নাচবে সূর্যোদয়ে অফুরন্ত আশার আলোয়!

 

যে-কুকুর মনিবের মাংস খেয়ে বাঁচে তার লেজে মাথা রেখে

ঘুমোচ্ছেন জঙ্গলের পণ্ডিতমশায়! কোনো হাঁক-ডাক নেই,

বাতাসে বিষাদসিন্ধু ওড়ে আর নগ্ন হয়ে ঘূর্ণি তালে নাচে, –

যেন সভ্যতার রক্ত খেয়ে নাচিতেছে এজিদবাহিনী; যেন

ফোরাতের বাহু থেকে মুক্ত হয়ে ছুটে আসে  নতুন  কারবালা;

হা-ভাতে মানুষ ছোটে রিলিফের গাড়ির পেছনে- ভাত নয়

নরকের সন্তানেরা আগুনের রুটি খেয়ে ঈশ্বরে ঘুমায়!

 

৭.

দক্ষিণের চরে মৃত মহিষের কালো বাঁকা শিং- পড়ে আছে

যেন মহরম চাঁদ। মেঘের আস্তানা ছেড়ে স্বজনের খোঁজে

অই চাঁদ ছুটে যায় বাঘের কেল্লায়; সূর্য দেখে তার লক্ষ কোটি

সন্তানের জ্বলজ্বলে কচি মুখ; যে মুখে উঁইপোকা শুয়ে শুয়ে

মৃত্যুকে পাহারা দিচ্ছে, নিচে সমুদ্রের ফেনা থেকে তৈরি হচ্ছে

নাগিণীর দাঁত, মৃত্যুর বিষাক্ত হিরা। সবুজ বদ্বীপজুড়ে

দ্যাখো আজ হিংস্র বাতাসের নাগিণীর উদ্যত বিষাক্ত ফণা!

 

শূন্যতা ফুঁপিয়ে কাঁদে অরণ্যের গহন আঁচলে মুখ ঢেকে :

নিরীহ উদ্ভিদ শিশু প্রলয়ের থাবা মুক্ত প্রকৃতির মাঝে

মুহূর্তের স্বপ্ন বুকে দীর্ঘজীবী হয়ে আজ বেঁচে থাকতে চায়

কিন্তু কী করে  বাঁচবে বলো, ফের  কী করে আগুন নিয়ে খেলবে

সেই কাঠঠোকর মাছরাঙা ফাল্গুন যুবতী!… সমুদ্রের নামে

আজ খুৎবা পড়ে বাংলার ইমাম : হে প্রভু জলের পিতা! বলো,

মানুষের অপরাধে বনের প্রজারা  কেন সাজা  পেল?… বলো।

 

৮.

নিরীহ গাছের মূলে লবণের বিষ ঢেলে কী সুখ তোমার!

হে অন্ধ জলের রাজা ! কেন যে রক্তের মতো  জায়নামাজে

নারী ও শিশুর লাশ নিয়ে এ কেমন খেলা তুমি শুরু করলে!

একদিন বাতাসে  সাঁতার কেটে কেটে যে-শিশু মায়ের কোলে

পরম নিশ্চিন্ত ঘুমে ছিল, সে এখন মহাশূন্যে  কা’কে খোঁজে?

আজ এই পউষের রাতে কে তাকে মায়ের মতো মমতায়

শীতের চাদর দেবে?… নিভে গেছে বাতিঘরে আলোর ইশারা।

 

লাঙলের ঈষ ঠেলতে ঠেলতে যে চাষা নিজেই  ঈষ হয়ে হাঁটে,

নতুন চরের মতো ভালোবেসে কে আর অমন করে অই

চাষাকে আশার বীজ, আলোঘুম দেবে? হে প্রভু দয়াল সিন্ধু!

বলো, শুধু দয়া দিয়ে বাঁচে কি উদ্ভিদ? … সেও চায় রক্তমাটি,

গভীর ঘুমের মধ্যে জেগে ওঠা এক টুকরো স্বপ্নের মোহনা।

শুধু দয়া দিয়ে শরীর যদিও বাঁচে, মানুষ বাঁচে না কিন্তু;

তার চাই রহস্যবাহিত কালো একঝাঁক ঝিঁঝিঁর উল্লাস।

 

৯.

বলো তুমি হে মুগ্ধ রঙিন প্রজাপতি! সুন্দরীগাছের ওম

সঙ্গীহীন হরিণীকে কী করে জাগাবে! পুরুষ হরিণ ছাড়া

কে আর অমন করে বাসনার জিহŸা দিয়ে চেটে নেবে

হরিণীর যৌবনের মধুরস?  দ্যাখো অই সুন্দরবনের

বিখ্যাত লাবণ্যে আজ ঝাঁকে ঝাঁকে মৃত্যুপাখি বসতি গেড়েছে।

প্রাণের সবুজ থেকে জন্ম নেয়া অবিনাশী বসন্তের পাখি

সে-বনে কী করে যাবে, যে-বনে হরিণ নেই, বাঘ নেই!

 

সূর্য তার লাল জামা গায়ে দিয়ে ফেরি করে  দিনের খাবার,

মানুষের আয়ু খেয়ে বায়ুরাজ ডুব মারে  নির্ঘুম ডেরায়Ñ

বায়ুরথে অশ্বারোহী ফেরেস্তারা উড়ে যাচ্ছে জলের মহলে;

সীমান্ত পেরিয়ে আসে প্রতিশ্রুত জোয়ারের পলি আর ত্রাণ;

যে-বনে সঙ্গমরত শিয়ালিনী লাশ হয়ে ভেসে গেছে জলে

সে-বনে পাখির জন্য তৈরি হবে নিরাপদ পাতার আশ্রম!

 

১০.

কবর দুয়ারে এসে মুখ ঘষে জুতোর তলায়; তবু কেন

গণিকাপাড়ার চাঁদ অন্ধকার বারান্দায় ঝাড়– দিয়ে যায়?

কে না চায় বসন্তের রং দিয়ে পছন্দের গাউন বানাতে-

প্রেমিকা ফেরারি হলে বহুদূরে লুসাকার গহিন জঙ্গলে

পাথর সরিয়ে চোখে উঠে আসে চুম্বনের দুরন্ত প্রহর ;

আকাশে পাহাড় ছুঁয়ে শুয়ে আছে অন্তরঙ্গ রংধনু  হ্রদ:

হ্রদের নির্জন জলে ছায়া ফেলে যৌবনের শিরা-উপশিরা।

 

লবণাক্ত ঢেউ আর নক্ষত্রের ছায়া গুণতে গুণতে একদিন

গভীর জঙ্গলে একা ঢুকে পড়ে জীর্ণ শীর্ণ নগ্ন বোকা নদী :

অন্ধকারে রহস্যের মায়াপাতা সরাতে সরাতে সাপ হয়ে

গোলাপি চাঁদের হ্রদে হিস হিস শব্দ তুলে নেশা নেমে আসেÑ

কী এমন নেশা ছিল, কাম ছিল সে-চাঁদের জ্যোৎস্নারসে!

প্রেমে আর কামে যারা সুপুরুষ তারা সবে  যুদ্ধ শেষে

শূন্য হাতে ঘরে ফিরে; তবু কেউ পরাজয় শিকার করে না।

 

 

কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়

আন্ধারে আন্ধারে প্রাসাদের সারি

 

পড়ে গেলে যুদ্ধের হাওয়া খুব দ্রুত,

টানটান জোড়গিট, খসে গেলে ছিনা টান, স্নায়ু,

যোদ্ধারা তারপর হ’তে-হ’তে বড়,

হয়ে গেছে মোটা।

অহমিকা দখলটা নিলে

শরীরটা বপু হয়, নধর, শিথিল।

মাংস মাংস খেলে

ক্ষুধার যুদ্ধ শেষ,

শুরু হয় যুদ্ধের ক্ষুধা;

ক্ষমতার যোদ্ধারা এলে- যুদ্ধের যোদ্ধারা,

মুক্তির যোদ্ধারা মৃত,

শান্তির যোদ্ধারা মৃত; দেশ গেল কুঁড়েঘরে ফিরে

 

আন্ধারে আন্ধারে প্রাসাদের সারি

 

 

নাসরীন নঈম

যুদ্ধে গেলাম পিতা

 

মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে গেল

পাড়ার মানুষ সব ছাদে উঠে দেখল

আগুন শুধুই আগুন রাজারবাগ

নাকি পুড়ছে। শাখারিবাজারে

ঘুপচি গলিতে নারী ও শিশুর

আর্তচিৎকারে সকাল হয়ে গেল।

 

নবাব বাড়ির চৌরাস্তায় জলপাই রঙা ট্যাঙ্ক এল

গাছের সবুজ ডালপালা মাথায় দিয়ে

দিনদুপুরে সৈন্য সামন্ত ভীড় জমাল

স্কুল কলেজ বন্ধ হযে গেল

এবার কী হবে? ভয়ার্ত প্রশ্ন চোখের কার্নিশে

থমকে দাঁড়াল।

 

দুপুরের পর ঘরে আলো জ্বলে না

কেউ বাজারে যায় না

আর থাকা যাবে না ঢাকায়

কুয়াশার চাদর মাথায় নিয়ে একদিন

শেষ রাতে রওনা দিলাম মুন্সিগঞ্জের দিকে

যে পদ্মা একদিন গিলেছিল আমার বাবার ভিটেবাড়ি।

 

সেইদিকে আবার যাত্রা স্বপ্ন অনিঃশেষ

মাঝির বৈঠায় জড়িয়ে আসে দীঘল কালোকেশ

শিশুদেহ পানিতে পটলা মাছের মতো ফুলে উঠেছে

আমরা ওদের সাথে থাকব না আর

যার খুশি যাক্ আমরা যাব না

লেবু ফুলের ঘ্রাণ শুঁকে শুঁকে নিজেদের উঠানে ফিরব আবার।

 

আমার কুড়ি বছরের একমাত্র ভাই ঝিম্ মেরে

পড়ে থাকে দিনরাত একা একা-

সবাই জানতাম প্রত্যয় ভালোবাসত যাকে ওর নাম মিতা

একদিন সকালে দেখি বাবার বলিশের নিচে

একটুরো শাদা কাগজে লেখা-

যুদ্ধে গেলাম পিতা।

 

 

নাসির আহমেদ

আজও একাত্তর

 

কিছু কিছু স্মৃতি থাকে চিরদিন মর্মলোকে শিখা অনির্বাণ

কিছু কিছু দুঃখ থাকে অবিনাশী স্মৃতিছেঁড়া বিষাদের গান।

তুমি সেরকম স্মৃতি অনন্য দুঃখ-সুখ স্মৃতি চিরকাল

তুমি প্রিয় স্বাধীনতা-বিজয়ের রক্তেরাঙা একাত্তর সাল।

 

তুমি ক্যালেন্ডারে আজও জেগে আছো অক্ষয় অমর

তোমার তুলনা তুমি, চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ আজও তোলে ঝড়।

বর্ণনার ভাষা নেই এমনই গৌরবে- শোকে তুমি মুহ্যমান

বাঙালির বাংলাজুড়ে লাল সবুজের হোক চির অধিষ্ঠান।

 

বাতাসে আগুন যেন ছড়িয়ে চলেছে বোধ আজও দিকে দিকে

ঝড়ের ভেতরে সেই মশালশিখায় স্বাধীনতা আছে টিকে।

নিমগ্ন সত্তার লগ্নে বজ্রকণ্ঠে কেঁপে উঠি আজও অকস্মাৎ

রেসকোর্স স্মৃতি ফুঁড়ে উঠে যাচ্ছে জাতির পিতার ডান হাত।

 

মানুষের আর্তনাদ এবং উল্লাস আজও স্মৃতিতে বাক্সময়

একাত্তর ডাক দিলে এখনও হৃদয় বলে, বাঙালি নির্ভয়।

এখনো সবার উপড়ে মানুষ এবং বাঙলা বাঙালির দেশ

এইখানে চিরদিন মানবতা-প্রগতিই চির অনিঃশেষ।

 

অনিঃশেষ মানুষের শক্তি আর সম্ভাবনাময় একাত্তর

এই দেশ স্বাধীনতা বয়ে আনে প্রতিদিন রক্তরাঙা ভোর।

 

বিমল গুহ

এখন তা বলার সময়

 

আমরা প্রতিনিয়ত বদল করি রূপ

বদল করি পরিবেশ পরিপার্শ্ব সভ্যতার আদি নিদর্শন

মুখের আকৃতিও বদলে নিই কখনো কখনো,

আরÑ তা দেখে দেখে অবয়ব মুখস্থ করি

কখনো তা মনেই রাখি না!

আমরা যুগ-পরম্পরা মুখের আদল মুখস্থ পড়ি,

মুখস্থ পড়ি দিনরাত প্রকৃতির রূপ

মুখস্থ পড়ি মানুষের মুখমণ্ডল- বক্রাকৃতি ভাঁজ

লোল-চামড়ার গড়ন, প্রকৃতি ও শোভা।

 

আমরা পদক্ষেপ দিই রাস্তা মেপে মেপে- মুখস্থ করি এর গতি

কখনো আবার সহজে মুখস্থ করি আমাদের মাতৃপিতৃ-ইতিহাস

আমাদের যাপিত সময়, প্রতিচিন্তা প্রকৃতির চাকার আওয়াজ;

এইভাবে একদিন মুখস্থ করেছি- উনিশ শ’ আটচল্লিশ

পাকিস্তানের গণপরিষদ সভা

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত- মাতৃভাষার প্রথম আকুতি,

আমরা একুশকে মুখস্থ করেছি বছর বছর…

চৌষট্টি বছর ধরে মুখস্থ করেছি-

আমাদের গৌরবগাথা স্বাধীনতা দিনের কথা মুখস্থ করেছি।

আর এখন তা বলার সময়- আমাদের প্রজন্মের কাছে।

 

 

শামীম আজাদ

পরম্পরা

 

এখন আর চোখ বুজতে হয় না

জেগে জেগেই দেখি

এই ছিদ্রহীন পর্দার ছিদ্র দিয়ে

ঐ অদূরে ওপার

 

চিৎকার বন্ধ হলে

শক্ত করে টেনে নিই নাভির নোঙর

কে আমাকে এখন উড়ায় দেখি

সাধ্য কার এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ সংগীত গাইবার

 

বুকের বাতাসে চাষাবাদ চলছে

পায়ে পায়ে পলি এসে গেছে

চল্লিশ বছর যে মুথা ঘাস

শিশিরের ঠোঁটে ধরে ছিল

পিতামহের রক্তজবা চোখ

সেগুলো এখন গ্রেনেইড ফাটাচ্ছে

ট্যাঙ্কের তলা থেকে উঠে এসেছে

ক্লান্ত এক বয়স্ক বেহায়া বাবুই

 

রক্তাক্ত কার্নিশে বসে তাঁর কাছ থেকে

আমি সেই গানটি তুলে এনেছি

বলেছি, তুমি এখন বিশ্রামে যাও বাবা

দাবি ছেড়ে দাও এ গানের, এ লিরিকের

যে শুদ্ধ সুরে গাইবে এ গান এ হবে তাহারই

 

এখন আমার আর খাতা দেখতে হয় না

শব্দগুলোর জন্য চশ্মার কুটো পরিষ্কারের দরকার পড়ে না

আমি দাঁড়িয়ে আছি কি অথৈ সাঁতারে আছি

আমি ধর্ষিত বা আগুনে পুড়ে ফোস্কা গায়ে মেডিক্যালে

না ভিটে উৎপাটিত খোলা আকাশের নিচে

অথবা গুঁড়ো হয়ে যাওয়া বিগ্রহের কাছে পড়ে আছি মৃত

কিছু আসে যায় না

 

কারণ আমি কণ্ঠে তুলে নিয়েছি

পৃথিবীর সব চেয়ে সুন্দর সংগ্রাম

বাংলার বাবুইদের বিশ্বজয়ের অনুপান

এ দাঁত ভাঙা দুর্যোগ পাড়ি দেবার প্রকাÐ প্রবাল

শেখ মুজিবর রহমান

 

আমি শেখ মুজিবর রহমান গাইছি

আমি গাইছি, শেখ মুজিবর রহমান।।

 

 

 

সৌরভ জাহাঙ্গীর

কয়েকটি হিংস্র ছায়া

 

জলপাই রঙের ট্রাকটি এসে যখন থামলো

তখন সন্ধ্যা

চারপাশ নীরব-নিথর, অন্ধকার

হঠাৎ কয়েকটি ছায়া।

দেখতে দেখতে ছায়াগুলো ভেদ করল অন্ধকারকে।

তাদের পায়ের আওয়াজ। কটকট কটকট

ঢুকে পড়ল বাড়ির ভেতর।

 

শিলাদি জানত না আজ অমাবস্যা নামবে।

প্রতিদিনকার মতো সে পরিপাটি করে সাজিয়েছিল নিজেকে

সাজিয়েছিল ঘর-দোর, বিছানা বালিশ।

এবং পরক্ষণেই বেজে উঠল বাঁশির শব্দ।

 

কয়েকটি হিংস্র ছায়া ঢুকে পড়ল আচমকা ঘরের ভেতর

তারপর এভাবে অনেকেই…

আওয়াজ উঠল চাপা কান্নার

মুহূর্তেই আবার নীরব…

ছায়াগুলো অন্ধকারকে গিলতে থাকল ক্রমাগত।

 

তবে কি সে রাতে শিলাদি ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিল

অমাবস্যার হিংস্র গ্রাসে।

 

 

মারুফ রায়হান

এলিজি, খোকন ভাইয়ের জন্যে

 

খোকন ভাই,

আপনাকে আমরা ভুলে গেছি, মানে মনে রাখার দরকার মনে করিনি।

যুদ্ধে গিয়ে যারা আর ফেরেনি, কোনো খোঁজ মেলেনি

তাদের কয়জনকে আমাদের মনে আছে বলুন

কিন্তু আমি ভুলিনি, ভুলতে পারি না

 

রক্তে-বারুদে মেশানো দিনগুলোয়

হঠাৎ একদিন আপনার ঘর থেকে চলে যাওয়া

তার আগে একনাগাড়ে স্বাধীনতা আর লড়াই নিয়ে আপনার

একগাদা আবেগভরা কথা এক বালকের কানে এখনও সেরা গান

আর চোখে ভাসে একখানা রোম্যান্টিক ছবি

কলোনির বাসার নিচতলায় দাঁড়িয়ে আপনি তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে

না, আকাশ নয়, সামনের তেতলার ব্যালকনিতে

সেখানে এক অপরূপ রাজকন্যা নাচাচ্ছে তার দশটি আঙুল

নৃত্যপটিয়সী কোনো পাখিনীর ধরনে

আর তার মুখে লেগে আছে সন্ধেবেলাকার অপার্থিব আলো

আমি তার গাঢ় নীলরঙা কামিজের ওপর ঘুঘুর মতো উড়–ক্কু ওড়নার দিকে

হা করে তাকাতে না তাকাতে আপনার লজ্জাতুর ধমক খেয়ে হেসে কুটি কুটি

 

কে ওই তরুণী, আপনার প্রেয়সী!

প্রকৃতি বাকরুদ্ধ করে রেখেছিল তাকে

তবু তার অভিব্যক্তি কতই না বাক্সময়

এমন কারু জন্য যুদ্ধে যেতে পারে যে কোনো যুবক

যে কোনো খোকন ওই অবরুদ্ধ বাংলার

আমি ফের ধমক ভুলে তাকাই রাঙা রাজকন্যার দিকে

তার হাতে অকস্মাৎ দেখা যায় একখানা বস্ত্রখÐ লাল-সবুজে মেশা

মাঝে তার সর্ষেরঙা হলুদ- এই তো আমার দেশের পতাকা

ইশারায় আপনি বলেন , তুমি নেমে এসো

রাজকন্যা চোখ নাচিয়ে মিনতি করে, আপনি উঠে আসুন

এই নিয়ে খাকিক্ষণ কী মধুর খুনসুটি

কারো ওষ্ঠে বাক্য নেই, তবু শান্তি আর প্রেমের ধ্বনিতে

সূর্য রক্তিম হয়ে ওঠে আর সব পাখি শব্দ থামিয়ে

ভেসে থাকে শূন্যে ওই অশ্রæত ধ্বনি শুনবে বলে

একটি সামান্য বস্ত্রখণ্ড জীবন-পতাকা হয়ে ওড়ে নীলিমায়

 

তারপর

তারপর রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়ে আসে ডিসেম্বর-

আপনি আসেন না খোকন ভাই

কখন কোথায় কীভাবে আপনি…

মৌন রাজহংসীর ডানা ছাটা পড়ে, অশ্রুনদী শুকিয়ে যায়

৪৫ বছরে সব আবেগ ধুয়ে মুছে ধুলো আর কাদা

এখন কত জমজমাট ছাব্বিশে মার্চ

কত ফুর্তিময় ষোলই ডিসেম্বর!

খোকন ভাই আপনার মতো কত সহস্র ত্যাগী তরুণের নাম মুছে গেছে

নিকটজনের শোক অনেকটাই উবে গেছে

অথচ আমি কিছুতেই ভুলতে পারি না

একটা সুখী যুগল জীবনের স্বর্গ রচনার অসমাপ্ত উপাখ্যান, আর

বাংলা মা তার আঁচলের নিচে সংগোপনে ঢেকে রাখে সন্তানের স্মৃতিচিহ্ন…

 

 

তমিজ উদ্দীন লোদী

তা কোনো অপার্থিব নয়

 

তুমি তন্ময় হতে বলছ কিন্তু কিছুতেই স্থিত হচ্ছে না একাগ্রতা

অপার্থিবের খোঁজে আমি চাঁদের ভেতরে ডুবে দেখেছি

এসব অপার্থিব নয়।

 

কমলা রঙের যে আগুন স্পর্শ করে আমরা রজঃস্বলা জ্যোৎস্না ছুঁয়েছিলাম

সেই কোমল আগুনই আমাদের স্পার্টাকাস করেছিল

যেন একেকজন চেগুয়েভারা গেরিলার ছদ্মবেশে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল

ঈশ্বরের অভিপ্রেত দাঢ্যতার কাছে।

 

খুলে যাচ্ছিল আবৃত আকাশ। স্রোতহীন বদ্ধ জলাশয়।

বরং পার্থিব যা কিছু সব আমাদের আঙিনায় জড় হচ্ছিল ক্রমশ

আমরা সেতু পরবর্তী সেতুতে উঠে যাচ্ছিলাম অনায়াসে।

 

শিরদাঁড়ায়, কশেরুকায় বুলেটের দাগ এবং ক্ষত নিয়ে

আমরা উঠে দাঁড়াচ্ছিলাম স্ফ্রিংস কিংবা ফিনিক্সের মতো

আমরা পেরিয়ে যাচ্ছিলাম মাঠের পর মাঠ, গড়খাইয়ের পর গড়খাই

অবশেষে আমরা স্থিত হয়েছিলাম নদী সিকস্তির কাছে।

 

আমরা যে বিমুক্ত ভ‚মি এবং হাওয়া পেয়েছিলাম তা কোনো অপার্থিব নয়।

 

খালেদ হোসাইন

কোথাও তো আলো আছে

এত ঘন অন্ধকার জোনাকির আলোও কোথায়

এতটুকু মারে না ঝিলিক

 

তবু

কোথাও তো আলো আছে

সমবেত মানুষের মনে

প্রয়োজন হলে তারা

উজ্জীবিত হবেই তো রণে

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে

নারকীয় যন্ত্রণার

বিপরীতে সুতীব্র আক্রোশে

 

আমরা যুদ্ধ করি

চেতনাই আয়ুধ হয়ে ওঠে

মা-বোন ধর্ষিতা হয়

গুলিতে ঝাঁঝরা লাশ

নদীতে কি ফুল হয়ে ফোটে?

 

ন মাস যুদ্ধের পর

খাঁচা থেকে মুক্ত হয় পাখি-

পায়ের নিচেই মাটি

নিঃসীম আকাশে চোখ রাখি-

 

আহা কী আনন্দ এসে

ভেঙে ফেলে যাবতীয় বাঁধ-

নতুন পতাকা ওড়ে দিকে দিকে

জাতীয় সংগীত বিশ্বকে আচ্ছন্ন করে তোলে

প্রসন্ন জীবনে এসে খেলা করে-

স্বাধীনতা, হে আনন্দ,

কেবলই তোমার

কিষাণের রক্ত আর হাসিমাখা স্বাদ।

 

আনিসুল হক

ও তিরিশ লক্ষ

 

তোমরা তো করে গেছ তোমাদের কাজ

আমাদের ছিল না তো ঘর

আমাদের ছিল না তো মাটি

আমাদের ছিল না আকাশ

আমাদের ছিল না জানালা

আমাদের ছিল না প্রদীপ

 

তোমরা তো করে গেছ তোমাদের কাজ

তোমাদের পাঁজরের হাড়গুলো খুলে নিলে পর¯পর হাতে

হাড়ে হাড়ে জোড়া দিয়ে গড়ে তুললে অপূর্ব আলয়

আমাদের ঘর হলো আল্পনাময়

নিকোনো উঠোন

উঠোনে মাটির সাথে লেপে দিলে ধমনীর লোহু

প্রতি বিন্দু মৃত্তিকায় তোমাদের রক্ত মেখে আছে

আমাদের মায়েদের অশ্রুজলে সেই মাটি পবিত্র হয়েছে

আমাদের ছিল না আকাশ

আত্মাগুলো নিজ হাতে বুকের পিঞ্জর খুলে উড়িয়ে দিয়েছ

অনন্ত অম্বরতলে আজ তাই আমাদের মাথাগুলো আকাশ ছুঁয়েছে

রাতের আকাশ গায়ে তোমাদের ত্রিশ লক্ষ নিশানা জ্বলিত

নিযুত নক্ষত্র রোজ ঠিকানা জানায়

আমাদের জানালায় আলো খেলা করে

আঙিনায় স্বাস্থ্যবান শিশু

পায়রারা পাখা মেলে নির্ভয় বাতাসে

আর তারা শান্তির বাকম তুলেছে

 

তোমরা নিজেকে পুড়ে আমাদের বর্তিকা হয়েছ

তোমরা নিজেরা পুড়ে আমাদের নির্মাণ করেছ

তোমরা নিজেরা জ্বলে আমাদের নির্বাণ দিয়েছ

 

আমাদের মাথা আজ উঁচু

আমাদের বক্ষ তাই আদিগন্ত বিস্তার পেয়েছে

 

আকাশের গায়ে গায়ে ত্রিশ লক্ষ পবিত্র নক্ষত্র

 

তোমাদের গড়ে দেওয়া এই ঘরে আমরা যেন তোমাদের উজ্জ্বলিত রাখি

তোমাদের গড়ে দেওয়া প্রতিঘরে জ্বালি যেন সান্ধ্যপ্রদীপ

হৃদয়ের আলোয় আগুনে

আর যেন জীবনের রং দিয়ে মঙ্গলের কল্যাণের

শিল্পের সাধনার

সংগীতের জিগীষার

আল্পনা আঁকি

 

তোমরা আমাদের ঠিকানা দিয়েছ

শৃঙ্খলিত ছিলাম আমরা পশুত্বর প্রায়

শৃঙ্খল ভাঙার দিনে তোমরা তো তোমাদের পাঁজর ভেঙেছ

নিজেকে উজার করে এই মাটি এই ঘর এই নদী এ আকাশ এই দেশ

তোমরা দিয়েছ

 

প্রতিবৃক্ষে তোমাদের শোণিত রয়েছে

প্রতিপু®েপ তোমাদের পরমায়ু আছে

প্রতিদানা অন্নভরে তোমাদের অমরাত্মার অংশভাগ আছে

 

ও তিরিশ লক্ষ অমরাত্মাগণ

তোমাদের উপহৃত ঘরে

আমরা আজ লক্ষ কোটি প্রদীপ জ্বেলেছি

প্রতিটা সলতেয় জানি তোমাদের আত্মদান প্রজ¦লিত রয়েছে।

 

 

তারিক সুজাত

তবুও আমরা আছি

উৎসর্গ : জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, শ্রদ্ধাস্পদেষু

 

 

‘হিট লিস্ট’ থেকে বাদ পড়ে গেছে

আমাদের আত্মপরিচয়!

আমাদেরকে দেখার জন্যে যদিও কেউ নেই

তবুও আমরা আছি,

যার যার নিরাপত্তা বলয়ে

স্বনির্মিত কারাগারে

আমরা এখনো বেশ আছি।

 

এখনো যে টের পায়নি ওরা

আমাদের আছেন এক একজন বাতিঘর।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চেয়েও শক্তিধর,

আপনি ও তুমি;

আপনার কলম, তোমার কলম,

আপনার একেকটি বই সময়ের কণ্ঠস্বর

তোমার প্রতিটি লেখা অন্ধকারে আলোর শিখা,

প্রিয় বর্ণমালার অক্ষরে অক্ষর ঘষে

১৯৫২-এ যে আগুন জ্বালিয়েছিলেন

‘রক্ত শপথে আমরা আজিকে তোমারে স্মরণ করি’

আপনার মুখে দেখি আমার পিতার মুখ

তোমার চোখে দেখি আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ,

আপনার ফেলে আসা ক্লাসরুমে

তোমার মাড়িয়ে আসা পথে পথে

আলোর মিছিল, স্বজনের তাজা খুন

১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০

শোক, শংকা, শরণার্থী, শহীদÑ এই শব্দগুলো

জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে ধুলো-মলিন

সংবিধানের গায়ে অশ্রু ফোঁটা হয়ে

টপ্ টপ্ ঝরে পড়ে …

 

আবহমান বাংলা, মুক্তিযুদ্ধ, চারনীতি, জাতির পিতা

তীর্থসম এইসব তালা খুলবার চাবি

আপনার হাত হয়ে আমাদের হাতে হাতে

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বহমান হোক

নব্বই বর্ষের জন্মদিনে আপনার হাত ধরে

আপনারই অর্ধেক বয়সী এই দেশ

আরো একবার

সত্য ও সুন্দরের হাতেখড়ি নিক!

হ্যাঁ,

ভীষণ প্রতিশোধে জ্বলে উঠুক,

বাঙালিত্বের চেতনার উদ্বোধন হোক,

বিকাশ হোক …

‘আপন ভুবনের’ সীমানা ছাড়িয়ে

‘সময়ের মুখে তুলে দিই তাঁহাদের কথা’

বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধানে

আপনার যুবক দু’পায়ের স্পর্শ নিয়ে

আমরাও জোর-কদম হাঁটি

হেইয়ো হো, হেইয়ো হো, হেইয়ো হো …

 

 

ফকির ইলিয়াস

 ধনু রাশির মেয়ে

 

কিছু কিছু পুষ্পের আলো আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

কিছু কিছু বর্ষার বৃষ্টি- গ্রীষ্ম’কে বলে, আমি ছিলাম

তোমার অতীত। যে অতীতে মিশে আছে মানুষের হাতের

শিরা। উপশিরায় বহমান যে রক্তের উত্থান, তা ছিল একান্ত

নদীর মতো অনুগত, বিরল।

 

কিছু কিছু শরৎ আমাকে শাদা মেঘের বশ্যতা দেখায়।

উড়ে যাওয়া নক্ষত্রের রাত যখন প্রদক্ষিণ করে তার

প্রেমিকার চুল- আমার মাথার উপর থেকে তখন

সরে যায় পৃথিবীর সকল অন্ধকার। অথচ কোনো এক

আঁধারে, সকল হায়েনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল এই মাটিবৃক্ষ।

 

আমি যখন তোমাকে হেমন্তের গল্প বলি, তখন ধানঘ্রাণে

ভরে থাকে আমাদের ভোরের উঠোন। একটি সূর্য উঠবে

বলে, পড়ন্ত বিকেলের গায়ে চাদর জড়িয়ে দেয় পৌষের শীত।

 

তুমি তো জানোই, বসন্ত আমাদের প্রেমের প্রতীক। ফালগুনের

ফলন্ত সর্ষেক্ষেতে উড়ে উড়ে গান গায় যে প্রজাপতি, আমি

তার মুগ্ধ শ্রোতা।

ধনু রাশির মেয়ে,

তুমি তো এটাও জানো, ‘তুমি’ মানেই আমার শ্যামল কাব্যগন্ধ

তুমি মানেই,

বাংলাদেশÑআমার মানচিত্রের রোদরেখা।

 

 

দাউদ আল হাফিজ

প্রজন্ম একাত্তরের প্রতি

 

অগ্নি ও জলের মিতালিতে যে-সৌন্দর্য শহরে তা হররোজ বিকোয়। সুতরাং ক্যালিবানসব এইবেলা দেখে নাও বাংলার চিরায়ত মুখ ভাঁটিফুল দোয়েল এইসব হাবিজাবি ছাইপাঁশ শহরে একেবারে আকাশকুসুম অতএব এ-ই সুবর্ণ সময় ও সুযোগ যতক্ষণ মন টানে স্রোতস্বিনীর স্ফটিকে দেখে নাও নিজের মুখচ্ছবি।

আবার এ বারুদগন্ধী হাতেই জ্বালতে হবে আগুন মুখোশে- অন্তরালে সুখনিদ্রা যায় একনিষ্ঠ ঘুণপোকা। জ্ঞানবৃদ্ধ প্রবীণ ইত্যাদি আভিধানিক বাসিশব্দ ঝেরে ফেলো ঝেড়ে ফেলো বুড়োধাড়ি যতসব কিস্সাকাহিনী। সভ্যতার মুখাগ্নি হবে তোমারই হাতে। অমিত শক্তি তোমার বাহুতে হে ক্যালিবান সেটেবসের নবীনপ্রজন্ম। যতখানি পারো অসুন্দরে দেখে নাও অপার রূপ অন্যথায় কেমনে চিনবে তুমি মুখশ্রীর অন্তর্গত মুখোশ ।

ঋগে¦দ উপনিষদ বাইবেল এবম্বিধ পবিত্র পুস্তক থেকে উদ্ধৃতি আপাতত মূলতুবি থাক। হন্তারক সীসা ও বেয়নেট এ-ফোঁড় ও-ফোঁড় করেছে যে-বীরের বুক- দাঁড়াও সকল ক্যালিবান এই বিস্মৃতিধূসর স্মৃতিসৌধে তার। কী ফল আড়ম্বরে? কী প্রয়োজন বৃথা বাকপ্রপঞ্চে কাকপক্ষ করণিকের ? একতাড়া গাঁদা না মিললে একগুচ্ছ ভাঁটিফুলেই চলবে। এ তো কোনো কাগুজে বাঘের সমাধি নয় !

কাকজোছনায় ডালাভরা তারা গুণে গুণে যদি পাও পঞ্চাশটি জেনে রাখো ক্যালিবানসব তোমাদের পূর্বসূরি বীর (অক্সগনা) এই ময়দানে শুয়ে আছে লাখেলাখ আর নাম-ফলক-হীন অযুত শস্যদানার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এ সবুজ মানচিত্র জুড়ে।

মুহূর্তকাল স্তব্ধ হও – প্রাণে পরশ লাগুক শপথধ্বনির। অবশ্যি জানি যাবে তুমি রাক্ষসপুরীতে প্রসপেরো যেখানে সুখে নিদ্রা যায়। কতটুকু সময় বা নেবো তোমার হে প্রজন্ম একাত্তর অমিত তেজোবান। অতঃপর হইও সওয়ার সময়ের সাদা দুলদুলে।

 

 

 

 

 

 

কাজী জহিরুল ইসলাম

পা

 

আজকে দুটো পা কিনেছি আমি

ওই দুটো পা ছিল না খুব দামি

পড়েই ছিল অবহেলায় খোলা টেবিলটাতে

কি খুঁজতে কি খুঁজে পেলাম,

ওরা আমার হাতে।

মোটাসোটা মাংসল পা রংটি খুবই কালো

কী বিচ্ছিরি নোখের ওপর পড়ল এসে আলো

ওখানে তো কাদামাটি, দূরের ধূলিঝড়

পায়ের ওপর তখন দেখি খাড়া একাব্বর।

 

একাত্তরে এই দুপায়েই মাড়িয়ে কাদা-জল

এনেছিল এক মুঠো রোদ টকটকে উজ্জ্বল

হঠাৎ আমায় হেঁচকা টানে নামিয়ে দিল পথে

কোথায় যেন লাগল আঘাত

অচেনা কোন ক্ষতে!

একাব্বরের পাশে আমি, সমান্তরাল কাঁধ

নব্বুইয়ে তো গুঁড়িয়ে দিলাম স্বৈরাচারের বাঁধ।

 

আজকে এমন ভিতু আমি, বুক কাঁপে থরথর

ব্যক্তিগত সুখে আমার নিমগ্ন অন্তর

আমার দেশের জমি চষে অন্য দেশের ভূত

সুখে আমি আঙুল চুষি, আহা কী অদ্ভুত!

 

হে পাও সুখি পাও পথে নেমে যাও

আরও যত পাও আছে সাথে করে নাও

দুই থেকে চার, আট, ষোল হয়ে যাক

রাজপথ আলপথ সরবে দাঁড়াক

 

আজ যে দুটো পা কিনেছি এই দুটো পা কার?

এই দুটো পা বদলা নেবে সমস্ত হত্যার

এই দুটো পা বাংলাদেশের জমিন থেকে আসা

এই দুটো পা একাব্বর আর মঞ্জুরালি চাষা

এই দুটো পা একাত্তরের, এই দুটি পা লাল

এই দুটো পা গণতন্ত্রের মিছিল কী উত্তাল

এই দুটো পা রুখে দেবে কারসাজি-রামপাল

এই দুটো পা মাড়িয়ে দেবে অশুভ জঞ্জাল।

 

মেলার মাঠে চলছে কানাঘুষা

মেয়েটি যেন আরক্তিম এক উষা

বলছে আমায়, পা দুটি কি দেবো?

আমিও ভাবি, এই দুটি পা নেবো?

 

এই দুপায়ে কেমন যেন জলোচ্ছ্বাসের গান

এই দুপা কি দেবে আমায় পথেরই সন্ধান?

এই দুপায়ের ওপর খাড়া গাজি একাব্বর

এই দুটি পা লোহার মতো সুদৃঢ় প্রস্তর

এই দুপায়ে গর্জে ওঠে অনন্য সংঘাত

এই দুপাই গুঁড়িয়ে দেবে দূরের কালো হাত।।

 

মীনা গুহ

গন্তব্য

 

দেশভাগ দেখিনি, দেখেছি মুক্তিযুদ্ধ

যুদ্ধের সময় শহরময় ঘুরে বেড়িয়েছি সারাবেলা।

খোলা আকাশের নিচে ঘাসের বিছানায় ঘুমিয়েছি কত রাত

কত দিন নির্ভয়ে কেটেছে একাকী আমাদের।

অথচ আজ স্বাধীন সার্বিয়ায় দেখো

মৃত্যুর শব কাঁধে দীর্ঘ মিছিল!

 

পৃথিবীর সব শিল্পকর্মকে হার মানিয়ে দিয়েছে

ওই লালগোলাপ শিশুটি

যার অবয়বে ঘুমিয়ে থাকার মতো শান্তিচিহ্ন বিদ্যমান!

যুদ্ধ মানে তো শুধুই কান্না

যুদ্ধ মানে ক্রমাগত ক্ষয়

যুদ্ধ মানে সামনে চলার পথ রুদ্ধÑ দুঃসহ যন্ত্রণা,

পিঁপড়ের সারির মতো লক্ষ মানুষের ঢল

বেঁচে থাকার জন্যে কেবলি হেঁটে চলা অচেনা গন্তব্যে।

 

 

ভাগ্যধন বড়ুয়া

ভাঙাঘরে স্বপ্ন পোড়ে

‘সব ক’টা জানালা খুলে দাও না’…যখন দৃশ্যমান হতো টিভিতে, তখন আমার মা কোথাও নড়তো

না, একটা জ্যোতি মায়ের চোখে-মুখে দোলা দিতো, আর  বিড়বিড় করে বলতো ওরা আসবে…

কারা আসবে কৌত‚হলী হলে মা স্বপ্নের কথা জানাতো দীর্ঘ নিশ্বাসে; একদিন একদল সবুজাভ সত্তা

অভিন্ন আশায় মিলে আঁধার সরাবে ফের!

 

মা,

তোমার মলিন মুখে কীভাবে ফিরাই বিভা;

তোমাকে আশার বাণী কীভাবে শুনাই বলো!

জবাফুল পুড়ে গেছে লালাভ আগুনে…

 

স্বাধীন ভ‚মিতে আমি ভাঙাঘরে রই!

 

তুষার কবির

পাপড়ি ও পালকের গান

 

শ্বেত কবুতর, কিসের ইশারা লিখনে

তুমি মেতে আছ

উড়ালের স্বপ্নডানা চোখে নিয়ে?

 

পাপড়ি ও পালকের গান ছিঁড়ে

পলাতক কয়েদীর সুরে

হাওয়ার অলীক প্রাচীর চিরে

 

এ কোন যুদ্ধবার্তা প্রেরণে তুমি জেগে আছ

আততায়ী স্বপ্নভাষা কাঁধে নিয়ে?

 

দ্যাখো এখানেই পড়ে আছে শাদা তাঁবু

ফুঁসে ওঠা মাস্তুলের গ্রীবা,

সৈকতের তীরে পড়ে আছে রক্তশিশু

যুদ্ধদাবার ধীর কূটচালে

 

আর আমি সীমান্তের দুই দিকে শুনি

ধাতব কান্নার ধ্বনি,

সৈনিকের হাওয়া হরিৎ গান,

নৈশ চক্রান্তের শিস

 

শ্বেত কবুতর; তুমি কি প্রতীক তবু এখনো, শান্তির?

 

আঁখি সিদ্দিকা

একাত্তর

 

গোলাপি বেলুনের ঢাকনায়

ব্লটিং কাগজের ওপর

জলের উৎকন্ঠা;

সিঁড়ির পাশে সাদা অপারাজিতার

নীচে চুঁয়ে পড়া বর্ষা ,

মেঘের রেখায় কুঁকড়ে আছে

তোমার আকারহীন পদচিহ্ন ;

গীর্জার ঘড়িটা

বারোটার কাঁটা পেরোবার আগেই

আমি পৌঁছে গেছি যশোর রোড,

যেখানে অনেক মৃত লোক,

আর

লুটিয়ে ছিল ভেজা রুটি।

সেখান থেকে আমার আর

ফেরা হয়নি;

আমি এখন বøটিং কাগজের ওপর

একটি নাম

একাত্তর।

 

মুজিব ইরম

নিবেদন

আবারও একদিন বসতে যাবো জলের ছায়ায়

হিজল তমাল

করচের ডাকে

হাওরে হাওরে…

 

আল্লার কসম

তোমাকে রাখিয়া আমি কোথাও তো যাই নাই

 

তোমার নয়নতারা ঝোপে

আমি তো কুয়াশা হয়ে আছি

তুমি রোজ জল ঢালো

স্পর্শ রেখে যাও

শীত শীত ভোরে…

 

এই বিজয়ের মাসে

নিরলে দেখিও

ঝরে পড়ি আমি এক বটপাকুড়ের পাতা

নড়বড়ে ডাল

তোমার উঠানে, ফজর ওয়াক্তে, আহ্নিক বেলায়…

 

 

বর্ণশ্রী বকসী

স্বাধীনতা

 

ছুটন্ত সময়ের বাঁকে লেখা রক্ত দানের ইতিহাস

পূর্বপুরুষের দেশে খান সেনাদের অত্যাচার

তুষের আগুনে জ্বলেছিল নদীর ওপার ,

শত শত মায়ের বুক খালি হাহাকার

বাতাসে বারুদের গন্ধ

রক্ত ক্ষয়ের সেই মুক্তি যুদ্ধ লিখেছিল

নব ইতিহাস, বাঙালির জয়গাথা !

 

 

 

 

 

 

অতনু তিয়াস

আবাহন

 

নির্মল হাসিতে ডেকে আনো প্রসন্ন প্রভাত

অস্থির সময়ের বুকে লিখে দাও মুক্তিসনদ

শান্তিসংবাদ।

 

আমাদের চিন্তার আকাশ প্রতিদিন চুরি হয়ে যায়

নিরুদ্দেশ নিরুদ্বেগ-প্রশান্ত ঘুম

সত্যসুন্দরপ্রেম কারা যেন মুছে

নিউরনে বুনে দেয় বিষবৃক্ষবীজ

সুখস্বপ্নকল্পনা হয়ে যায় গুম

লোকারণ্যে মিশে-

রক্তপায়ী হয়ে ওঠে গোপন কিরিচ।

 

বিজয় দিবস আসে

ফিরে আসে স্বাধীনতাদিন

স্মৃতিসৌধের বেদি ঢেকে যায় ফুলে

জয়গাথা সেঁটে থাকে দেয়ালে দেয়ালে

রঙিন হয়ে ওঠে প্রশস্তি-তোরণ

তবু যেন মনে হয় প্রচারসর্বস্ব

আমাদের সমূহ স্মরণ

নিরাবেগ সকল উদ্যাপন।

 

ধাতবে পাথরে খোদাই যে নাম

বিস্মরণের ঢেউয়ে চাপা পড়ে যায়

আমরা তো ভুলপ্রিয় বিস্মৃতিপ্রবণ।

 

দেখাও পথের দিশা তর্জনী উঁচিয়ে

বিভ্রান্ত চৈতন্যে আলো জ্বেলে দিয়ে।

 

 

সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

 

 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares