মুক্তিযুদ্ধ ও আমাদের কবিতা : আবুল হাসনাত

 

প্রচ্ছদ রচনা

মুক্তিযুদ্ধ ও আমাদের কবিতা

আবুল হাসনাত

 

মুক্তিযুদ্ধ’ এই একটিমাত্র শব্দ আমাদের চেতনা, ভাবানুষঙ্গ, আদর্শ ও জীবনচেতনার সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে, যার বিশদ বর্ণনা করা কষ্টকরও বটে। রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যে গভীর অর্থ বহন করে তার মূল্য ব্যাপক, অসীম। এই চেতনার সঙ্গে মিশে আছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বাঙালিত্বের বোধ ও জাগরণ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, সহিষ্ণু সমাজ নির্মাণ, পরধর্মে আস্থা ও শ্রদ্ধা এবং সকল শোষণ-বঞ্চনার অবসানের লক্ষ্যে বাঙালির মানবিক জীবনসাধনা।

মুক্তিযুদ্ধে তিরিশ লক্ষ মানুষের প্রাণ বিসর্জন, লক্ষ নারীর সম্ভ্রমহানি এই অঞ্চলের যেকোনো বাঙালির জন্য পরম এক ত্যাগ। এই ত্যাগ কোনোদিনই ভুলবার নয়।

মুক্তিযুদ্ধের কবিতা আলোচনা প্রসঙ্গে ষাটের দশকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির আলোচনা প্রাসঙ্গিক বলে বিবেচনা করি। আজ এ-কথা সুবিদিত যে, ষাটের দশক ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন একটি সময়- যে-সময়ে মননশীল এক প্রাবন্ধিকের ভাষায় বাঙালি ‘ঘরে’ ফিরেছে, স্বরূপ চেতনায় বলীয়ান হয়েছে এবং বাঙালিত্বের সাধনাকে নবীন উপলব্ধি নিয়ে বুঝতে শিখেছে। সন্দেহ নেই, এই উদ্দীপন বিভাব এই অঞ্চলের বাঙালির জীবনসাধনা ঐতিহ্য জিজ্ঞাসা ও সৃজনশীলতাকে প্রাণময় করে তুলেছিল। শোষণ-বঞ্চনা অবসানের লক্ষ্যে এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে লড়াইয়ের সূচনা হয়েছিল ’৬২ সালের সামরিক শাসনবিরোধী প্রমত্ত ছাত্র-আন্দোলনের ভেতর দিয়ে, তা অব্যাহত ছিল ষাটের দশকের শেষ দিন অবধি। একদিনের জন্যও এই আন্দোলন থেকে সরে আসেনি এই অঞ্চলের বাঙালি। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই আন্দোলন, এই স্বরূপ চেতনা, এই বাঙালিত্বের সাধনা এই নতুন-পথনির্মাণ করেছিল, যা ছিল ’৪৭-এর রাষ্ট্রিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। বাঙালিত্বের সাধনা, বঞ্চনা ও শোষণের অবসানের লক্ষ্যে এই যে যাত্রা, এর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম-পথই নির্মাণ করেছিল মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল দীর্ঘদিন ধরে।

মুক্তিযুদ্ধের কবিতা, গল্প ও উপন্যাস আলোচনায় এই পটভূমি উপলব্ধির তাৎপর্য ও গুরুত্ব সেজন্যই অসীম।

ষাটের দশকে এই অঞ্চলের যেকোনো কবি বা সৃজনশীল মানুষের জন্য বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা বহন করে এনেছিল। যন্ত্রণা, কষ্ট গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আকুতি থেকে যে কাব্যভাষার নির্মিতি তা বহুবর্ণিল। কবিতার ক্ষেত্রে ভাষার নিত্যনির্মাণ, শব্দব্যবহার, বাকপ্রতিমা নতুন ব্যঞ্জনা খুঁজে নিয়েছিল। ক্ষুধার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে- সংগ্রাম তা বিশ্বস্ততার সঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে কবিতায়। জীবনের হতাশা, বিষাদ গ্রাস করেছিল অনেককেই। অনেকেই পরম এক নেতিবাচক অনুষঙ্গ জীবনে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তাঁদের অনুভূতির জগৎ ভিন্ন হলেও প্রতিবাদী এক রূপকল্প নির্মাণ করে নিয়েছিলেন অনেকেই। সেজন্য তাঁদের সৃজনেও এর প্রভাব পড়েছিল।

ষাটের দশক থেকে মানুষের সংগ্রামী-চেতনা যে-পরিপ্রেক্ষিতে ঋদ্ধ হয়েছে, তারই যেন আশ্চর্য রূপকার হয়েছিলেন শামসুর রাহমান। বিশেষত নিরালোকে দিব্যরথ কাব্যগ্রন্থে তাঁর মানবিক চেতনা প্রখর রূপ নিয়ে উন্মোচিত হয়েছিল। এতদিন তিনি ছিলেন মৃদুকণ্ঠ। এই কাব্যগ্রন্থ থেকেই তিনি বোধকরি প্রবল এক অঙ্গীকার নিয়ে জীবনানন্দীয় ছায়া ও বোধ থেকে বাঁক ফিরলেন। নিম্নকণ্ঠের খোলস ভেঙে যেন বেরিয়ে এলেন বৃহত্তর জগৎ-সংসারে। তাঁর পঠন-পাঠনের দিগন্ত ছিল বিস্তৃত ও ব্যাপক। ছাত্রজীবন থেকেই শুরু হয়েছিল বিশ্বের কবিকৃতী সম্পর্কে আগ্রহ। ঢাকায় বই পাওয়া যেত না ঠিকই, কিন্তু কৌতূহল ও আগ্রহ থাকায় রুচিশীল বই সংগ্রহে কোনো অসুবিধা হয়নি। তিরিশের কবিতারও তিনি ছিলেন অনুরাগী পাঠক। পাবলো নেরুদা, পল এলুয়ার ও বিষ্ণু দের কবিতার ব্যাপক পঠন-পাঠনের ছায়া পড়েছে নিরালোকে দিব্যরথে। নিরালোকে দিব্যরথ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৮ সালে; ষাটের দশক ছিল সংস্কৃতিচর্চার অভিমুখে বাঙালিত্বের সাধনার দশক, ‘ঘরে ফেরা’র দশক। ১৯৬২ সাল থেকে স্বৈরশাসন ও বিরোধী যে প্রমত্ত ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তা ষাটের দশকজুড়ে যুবসমাজকে উদ্দীপ্ত করেছে। বাংলাদেশের আনাচেকানাচে এ-আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৬৯ সালে যে গণ-অভ্যুত্থান হলো তা শামসুর রাহমানকে প্রবলভাবে আন্দোলিত করেছিল। এই আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য যে দমন-নিপীড়ন চলছিল তা মননজীবীর হৃদয়কে নানাভাবে স্পর্শ করছিল। এ-আন্দোলন দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সঞ্জীবিত করেছে। শামসুর রাহমানও আলোড়িত হয়েছেন এই সময়ে।

শামসুর রাহমান এই আন্দোলনের অন্তর্নিহিত শক্তি ও চেতনাকে খুব কাছে থেকে অবলোকন করেছেন। যুবসমাজের স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা, ত্যাগ, সংগ্রামী চেতনা ও আত্মাহুতি তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে। তিনি হয়ে উঠলেন এই সংগ্রামী চেতনার এক আদর্শ রূপকার।

১৯৬৯ সালের জানুয়ারি ছিল প্রবলভাবে উত্তাল। প্রতিদিনই যুবসমাজের মিছিলে ধ্বনিত হয়েছে সামরিক শাসকবিরোধী স্লোগান। ২০ ও ২৪ জানুয়ারি বামপন্থী আসাদুজ্জামান ও মতিউর রহমানকে স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। আসাদের রক্তে রঞ্জিত শার্ট নিয়ে মিছিল করে ছাত্র-জনতা। শামসুর রাহমানের হৃদয়-মনে এই মিছিলটি প্রবলভাবে ছুঁয়ে যায়। আসাদের এই শার্ট নিয়ে তিনি লিখলেন ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি। আসাদ-মতিউরের ওই আত্মাহুতি, সরকারি নির্যাতন ও দমননীতির প্রতিবাদে ২৪ জানুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা শহর। সমগ্র শহরে প্রতিবাদে ও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে মানুষ। শামসুর রাহমানের ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটিতে সেদিনটির প্রতিবাদী চেতনা রূপায়িত হয়েছে।

সেদিন পরবর্তী মাসের ওই সময়কে ধারণ করে লিখলেন আরও কয়েকটি কবিতা। নিজ বাসভূমে কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ছয়টি কবিতায় এই সময়-চেতনা বহুমাত্রা নিয়ে উন্মোচিত হয়েছে। ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’, ‘হরতাল’, এই কবিতাগুলোয় সে-সব দিন  জ্বলজ্বল করে ওঠে। এই কাব্যগ্রন্থের ‘মা’ কবিতাটিও অনন্য। আবুল আহসান চৌধুরীর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শামসুর রাহমান খুবই প্রাণময়ভাবে এই গ্রন্থের  কবিতাবলি সম্পর্কে বলছেন, ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি রচনা প্রসঙ্গে তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি লিখছেন :

‘পাকিস্তানের স্বৈরতন্ত্রবিলাসী একনায়ক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রপ্রেমীদের আন্দোলন ক্রমশ জোরদার হয়ে উঠছিল, যা ১৯৬৯ সালে চূড়া স্পর্শ করে। প্রতিবাদী মিছিলের পর মিছিলে প্রকম্পিত হতে লাগল ঢাকার পথ। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি। সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। মিছিলের স্লোগানে শুধু রাজপথই ঝংকৃত হচ্ছে না, হচ্ছে মুক্তিকামী বাঙালিদেরও মনপ্রাণ। দুপুরে রওয়ানা হলাম দৈনিক পাকিস্তান-এর দিকে। পথে যানবাহন নেই। ঝকঝকে রোদে পথ হাঁটছি। নানা চিন্তা ভিড় করছে মনে। গুলিস্তান সিনেমা হলের কাছে আসতেই যেন সমুদ্রের গর্জন শুনতে পেলাম। একটু পরেই রাস্তায় অসামান্য এক মিছিল। প্রতিবাদী মিছিলের পুরোভাগে একজন যুবকের হাতে অন্যরকম একটি পতাকা। লাঠির ডগায় জড়ানো রক্তাক্ত শার্ট। বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, শার্টটি একজন সদ্য-শহীদের। আমি তাকিয়ে রইলাম আসাদের শার্টের দিকে। তখন হৃদয়ে আমার তোলপাড়, কান্না স্তব্ধ দুচোখে। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। পুরো মিছিল চলে যাওয়ার পর রওয়ানা হলাম অফিসের দিকে।

অফিসে আমার কামরায় একা বসেছিলাম অনেকক্ষণ। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল লাঠির ডগায় ঝুলে-থাকা একটি রক্তাক্ত শার্ট। আসাদের শার্ট। যাকে আমি দেখিনি কোনোদিন, সেই মুক্তিকামী, রাজনীতিসচেতন, দেশপ্রেমিক যুবকের কথা ভেবে মনে এক ধরনের শূন্যতার সঙ্গে সঙ্গে আশার এক পবিত্র প্রদীপ জ্বলজ্বলে হয়ে কাঁপছিল। এই আত্মদান কি বৃথা লুণ্ঠিত হতে পারে পথের ধুলোয়? আমাদের দুঃখিনী বাংলা কি পরাধীনতার শেকলবন্দি হয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদবে শুধু? মুক্তির আলোধারায় স্নাত হবে না কি তার সত্তা? অফিসের চেয়ারে বসেই আমি আমার অজ্ঞাতে যেন নিঃশব্দে উচ্চারণ করছিলাম দুটি শব্দ ‘আসাদের শার্ট।’ সেদিন দুপুর কিংবা বিকেলে কারও সঙ্গে বেশি কথা বলিনি। বলতে পারিনি। গোধূলিবেলায় হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরেও নীরব ছিলাম। সন্ধ্যারাতে লেখার টেবিলে ঝুঁকে প্রায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যে লিখে ফেললাম ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি। এই কবিতা দু’তিন দিন পরেই একটি প্রগতিশীল ছোটকাগজে ছাপা হলো। এই সামান্য কয়েক পঙ্ক্তির একটি ক্ষুদ্রকায় কবিতা যে এত লোকের চিত্তে সাড়া জাগাবে, কল্পনাও করিনি তখন। আসাদুজ্জামান, যিনি পুলিশের বুলেটে শহীদ হন, ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের নেতা ছিলেন। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস, কোনো প্রকৃত দেশপ্রেমিক শহীদকে কোনো সংকীর্ণ সংজ্ঞা কিংবা একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের খোপে আটকে রাখা চলে না। তাই, সেকালে আমার লেখনী থেকে নিঃসৃত হয়েছিল এমন তিনটি পঙ্ক্তি :

আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা, কলুষ আর লজ্জা

সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;

আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা

 

যখন কবিতাটি লিখছিলাম টেবিলে ঝুঁকে আমার সেই সুনসান ঘরে, লিখছিলাম আমার অচেনা এক যুবকের রক্তাক্ত শার্টের ক্ষণিক অথচ দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিকে অবলম্বন করে তখন আসাদ আমার কাছে হয়ে উঠেছিল একটি স্বাধীনচেতা, নির্যাতিত কিন্তু বীর, দুর্জয় জাতির প্রতীকÑ কোনও সংকীর্ণ সংজ্ঞার গণ্ডিতে শৃঙ্খলিত করা কঠিন। একথা আমাকে স্বীকার করতেই হবে, আমার নিজ বাসভূমে কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতাই ১৯৬৯-এ রচিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থেই সঙ্কলিত হয় ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’, ‘হরতাল’, ‘আসাদের শার্ট’, ‘এ শহর’, ‘মা’, ‘দুঃস্বপ্নে একদিন’-এর মতো কবিতাবলী। তখন কোনো কোনও শুদ্ধাচারী সমালোচক পাঠক, অনুমান করি, ভুরু কুঁচকে ছিলেন। আমি কবিতার সর্বনাশ করছি,  স্স্লোগানের জন্ম দিচ্ছি ইত্যাদি উক্তি হাওয়ায় রঙিন ঘুড়ির মতো উড়িয়ে ছিলেন।’

উনসত্তরের এই অব্যাহত ধারার কবিতাচর্চা ও জনমানুষের মর্মযাতনার উপলব্ধি শামসুর রাহমানের কবিমানসকে উদ্দীপিত করেছিল মুক্তিযুদ্ধের অনতিপূর্বকাল ও উত্তাল একাত্তরের দিনগুলিতে।

একাত্তরে ২৬ মার্চ মধ্যরাতে তাঁর বাসভবন আশেক লেনের সন্নিকটে নয়াবাজারে অগ্নিসংযোগ করে পাকিস্তানি বাহিনি। পুরো নয়াবাজার দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। এই কবিতা রচনা প্রসঙ্গে তিনি লিখছেন, ‘ছাব্বিশে মার্চ সারাদিন ও রাত অব্দি ছিল কারফিউ। সেদিনই আমাদের ৩০ আশেক লেনের বাসার প্রায় লাগোয়া নয়াবাজারে পাক সেনারা অগ্নিসংযোগ করে। জোহরা, আমি এবং আমাদের পাঁচ সন্তান দোতলার জানালা দিয়ে দেখছিলাম ছড়িয়ে যাওয়া আগুনের ভয়ঙ্কর জিহ্বা। পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে দোকানপাট। আগুনের তাপ এসে লাগছিল যেন আমাদের মুখে। দেড়-দু’মাস পরে আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে ফিরে এসে লিখেছিলাম ‘তুমি বলেছিলে’ শীর্ষক একটি কবিতা। সেদিনের আমার জীবনসঙ্গিনী জোহরার ভয়ার্ত দৃষ্টি এবং গলিতে শিশুসন্তান কোলে নিয়ে ছুটে-যাওয়া তরুণীর অসহায়তা আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিল কবিতাটি :

দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে ঐ নয়াবাজার

পুড়ছে দোকানপাট কাঠ,

লোহালক্কড়ের স্তূপ, মসজিদ এবং মন্দির।

দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে ঐ নয়াবাজার।

বিষম পুড়ছে চতুর্দিকে ঘর-বাড়ি।

পুড়ছে টিয়ের খাঁচা, রবীন্দ্র রচনাবলী, মিষ্টান্ন ভা-ার,

মানচিত্র, পুরনো দলিল।

মৌচাকে আগুন দিলে যেমন সশব্দে

সাধের আশ্রয়ত্যাগী হয়

মৌমাছির ঝাঁক,

তেমনি সবাই

পালাচ্ছে শহর ছেড়ে দিগবিদিক। নবজাতককে

বুকে নিয়ে উদ্ভ্রান্ত জননী

বনপোড়া হরিণীর মতো যাচ্ছে ছুটে।

অদূরে গুলির শব্দ, রাস্তা চষে জঙ্গী জীপ। আর্ত

শব্দ সবখানে খরতাপ। আলিঙ্গনে থরথর

তুমি বলেছিলে,

‘আমাকে বাঁচাও এই বর্বর আগুন থেকে, আমাকে বাঁচাও,

আমাকে লুকিয়ে ফেলো চোখের পাতায়,

বুকের অতলে কিংবা চোখের পাতায়,

বুকের অতলে কিংবা একান্ত পাঁজরে,

শুষে নাও নিমেষে আমাকে

চুম্বনে, চুম্বনে।’

 

দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে ঐ নয়াবাজার,

আমাদের চৌদিকে আগুন,

গুলির ইস্পাতী শিলাবৃষ্টি অবিরাম।

তুমি বলেছিলে,

‘আমাকে বাঁচাও।’

অসহায় আমি তাও-ও বলতে পারিনি।

 

এই সময়ের কবিতায় সামাজিক চেতনার বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে। বাংলা কবিতায় এ-এক অনবদ্য সৃষ্টি। ষাটের দশকের আত্মপরিচয়ের প্রমত্ত চেতনা ও আকাক্সক্ষা তাঁর কবিতায় যে-মর্যাদা এবং শিল্পিত প্রকরণ নিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে, বিষয়ের বৈচিত্র্যে ও প্রকাশে তা অসাধারণ। চেনা ভূখণ্ডের সীমানা তখন বিস্তৃত হয়েছে। অভিব্যক্তি ও সংবেদন আধুনিক শিল্পগুণান্বিত হয়েছে। শৈলী মেদহীন হয়ে উঠছে। বাঙালির আত্মপরিচয়ের তীব্র সংকটকালে শামসুর রাহমান হয়ে উঠছিলেন আরেক রূপদক্ষ কারিগর, যাঁর আধুনিক চৈতন্য ও ভাষাচেতনা এই সংগ্রামেরই এক পরিপূরক। বিক্ষুব্ধ এই সময়ে তাঁর আত্মমগ্নতার স্বর ভেঙে পড়েছে। নিরালোকে দিব্যরথ থেকে বলার ধরন পালটে গিয়েছে।

ষাটের দশকের এই বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতা স্বাভাবিকভাবেই প্রতিফলিত হয়েছিল কবিতায় এবং ছোটগল্পে।

একাত্তরের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অতর্কিতে সর্বশ্রেষ্ঠ মারণাস্ত্র নিয়ে, ট্যাংক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাঙালি নিধনযজ্ঞে। এই হত্যাকাণ্ডে বাঙালি হতচকিত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু প্রথম প্রহর থেকেই আপামর বাঙালি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল সশস্ত্র যুদ্ধ করে।

গ্রামে-গঞ্জে নবীন কিশোর ও যুবাদের উদ্যোগেই প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। সশস্ত্র পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যে গভীরতা ও প্রস্তুতি নিয়ে প্রতিরোধ গড়ার প্রয়োজন ছিল প্রাথমিকভাবে তা ছিল না। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায় কেটে যেতেই বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ যে-মাত্রা অর্জন করেছিল তা এই ভুবনের কোনো জাতীয় মুক্তি সংগ্রামেরই মতো তীব্র ও গহন।

পরম গৌরব, অহংকারের বিষয় এই যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে বেশ কয়েকজন কবি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। রণাঙ্গনে বন্দুক কাঁধে পরম বিক্রমশালী ও সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। জীবনের ঝুঁকি ছিল; এমনকী, এদের অনেকেই সহযাত্রী যোদ্ধাকে যুদ্ধাবস্থায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে প্রত্যক্ষ করেছেন। বাংকারে বসে এই অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করে কবিতা লিখেছেন অনেকেই।

একাত্তরের পঁচিশে মার্চ মধ্যরাত থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে আপামর বাঙালি অস্ত্র হাতে অসমসাহসী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। এ ছিল বাঙালির অস্তিত্বের লড়াই। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। বৃহৎ শহরে বা গ্রামাঞ্চলে দেশের সকল শ্রেণির তরুণ যে লড়াই করেছিল, সকল ক্ষেত্রে যে তা সফল হয়েছিল তা নয়। সম্মুখ বা অতর্কিত আক্রমণ করতে গিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে অগণিত মানুষকে। আজও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে-না-আসা সন্তানের জন্য পথ চেয়ে বসে থাকেন অনেক মা। মায়ের হৃদয় কিছুতেই যুদ্ধক্ষেত্রে ছেলের জীবন বিসর্জন মেনে নিতে চায় না। এ যে কত বৃহৎ মানবিক এক অনুভূতি যা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে এ দেশের নারীরা যেভাবে অপমানিত, লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত হয়েছেন, একমাত্র নাৎসি বর্বরতার সঙ্গেই এর তুলনা করা যায়। লক্ষ লক্ষ নারী এই সময় ধর্ষিত হয়েছিল। এই মরণপণ যুুদ্ধে অন্যান্য দেশের মুক্তিযুদ্ধের মতো কবিতা আর গান মানুষকে প্রেরণা জুগিয়েছেÑ কখনও যুদ্ধক্ষেত্রে বা অবরুদ্ধ গৃহে। মুক্তিযুদ্ধের ন’মাসে মৃত্যু আর জীবনের উপলব্ধি এ দেশের শিল্প-সাহিত্যে এক নবীন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

মুক্তিযুদ্ধের দিনরাত্রি ছিল একদিকে ভয়ংকর অনিশ্চয়তায় ভরা। অবরুদ্ধ দেশে মৃত্যুকে প্রতি মুহূর্তে আলিঙ্গন করবার জন্য মানসিকভাবে তৈরি থাকা; অন্যদিকে পরাক্রমশালী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করবার অদম্য মনোবল নিয়ে যুদ্ধ করা। বাঙালিকে মৃত্যু তাড়া করে ফিরছে প্রতিদিন। তবু সাহসের সঙ্গে বেঁচে থাকার ও অদম্য বিক্রমে অস্তিত্ব ঘোষণার এমন সুসময় বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে আর আসেনি।

মুক্তিযুদ্ধের পর পয়তাল্লিশ বছর কেটে গেল। পুত্রশোক ভুলেছিলেন। কিন্তু এখনও ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই শত কাজের মধ্যে মনে পড়ে সেই গায়ে-কাঁটা দেওয়া, রক্ত হিম করা দিনরাত্রি নির্যাতনের নানা ঘটনা, নয় মাসব্যাপী নরকযাপনের ইতিহাস। তখনকার বিভীষিকা ও রক্তাপ্লুত, দুঃস্বপ্নময়, কাঁটাতার ঘেরা, বেয়নেটবিদ্ধ, বুলেটদীর্ণ দিনগুলো সহজে ভুলে যাবার নয়। যাদের অভিজ্ঞতা হয়েছে এবং নির্যাতনের মধ্য দিয়ে বেঁচেছিলেন তাদের জন্য এ ছিল বিরল অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা নিয়ে যখন কেউ এমনি এমনি কোনো কবিতা পাঠ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কবিতা, কিংবা কোনো চমকে যাবার মতো লাইন চলচ্চিত্রের ঘটনাপ্রবাহের মতো সেই পাঠকের চোখে ভেসে ওঠে সে সব দৃশ্য। কবিতার কাজ বোধ করি তাই, নাড়িয়ে দেওয়া কিংবা অনুভূতির জগতে কোনো ছোট বা বড় অভিঘাত সৃষ্টি করা। এ কাজই মহৎ কাজ।

আমরা জানি, নানা দেশের মুক্তিসংগ্রামে কবিতা মানুষকে দীপ্তিমান নক্ষত্রের মতো প্রেরণা জুগিয়েছে, যুদ্ধ ও সংগ্রামে বেঁচে থাকতে উদ্বুদ্ধ করেছে। উদ্বুদ্ধ করেছে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে দাঁতে দাঁত চেপে থাকতে; ন্যায়, কল্যাণ, প্রগতি ও শান্তির জন্য লড়াই করতে শিখিয়েছে। কখনও কোনো অবিনাশী পঙ্ক্তি ঘনঘোর অন্ধকারের মধ্যে হতাশায়ও বাঁচতে শেখায়। যেমন শেখায় কখনও রবীন্দ্রনাথের গান। এ-প্রসঙ্গে মনে পড়ে এক বিদেশিনীর কথা। যিনি রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি পাঠ করে যুদ্ধে নিহত ছেলের শোক ভুলেছিলেন। নাৎসি অধিকৃত সেই ঘোর তমসাচ্ছন্ন সময়ে বিশ্বনন্দিত ফরাসি কবিদ্বয় লুই আঁরাগ ও পল এলুয়ারের কবিতার নানা পঙ্ক্তি ও তাঁদের অবরুদ্ধ দেশবাসীদের মুখে মুখে ফিরত। ট্রেঞ্চে ও সম্মুখযুদ্ধে সে-সব কবিতার পঙ্ক্তি ওদের প্রাণময় করে তুলত। আপসহীন প্রতিরোধে সমর্পিত রাজনৈতিক কর্মীদের সংকেতলিপিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেরও কবিতা, আবেগমথিত বাণী, নিগৃহীত, মৃত্যুতাড়িত কিন্তু মুক্তিলিপ্সু ও সংগ্রামশীল জনসাধারণের প্রেরণা হয়ে উঠেছিল।

অদ্ভুত আঁধারগ্রস্ত ন’টি মাসের অভিজ্ঞতা আমাদের প্রবীণ ও নবীন কবিকুল তাঁদের নিজস্ব ধরনে রূপায়িত করেছেন বিভিন্ন কবিতায়।

মুক্তিযুদ্ধের কবিতার প্রথম পূর্ণাঙ্গ একটি সংকলন সম্পাদনা করবার সময়ে লক্ষ করেছি এদেশের প্রবীণ ও নবীন কবিরা মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করে যে-সব কবিতা লিখেছেন তাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কতভাবেই না প্রতিফলিত হয়েছে।

শামসুর রাহমান অবরুদ্ধ দেশে বসে যে কবিতা লিখলেন ‘বন্দিশিবির’ শিরোনামে, তা অবরুদ্ধ, মৃত্যুভয়তাড়িত মানুষেরই এক জীবন-ছবি হয়ে আছে। এই মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে কবিতাগুচ্ছের প্রতিটি পঙ্ক্তিই শিল্পিত অনুভবে উত্তীর্ণ। এ-কথা নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করব এসব কবিতায় বিধৃত রয়েছে অধিকৃত, রক্তাক্ত বাংলার আর্তনাদ, হতাশাপীড়িত মানুষের মৌনমিছিল, মুক্তিসেনার দৃপ্তপদধ্বনি, স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা এবং মানবতার জয়গান। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, একাত্তরের গণ-অভ্যুত্থান যেমন আমাদের কবিতাকে উপহার দিয়েছে বহু নতুন শব্দ, সার্থক বাক্প্রতিমা, তেমনি মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের কাব্যক্ষেত্রে এনেছে নতুন বাঁক। সম্পূর্ণ এক নতুন কবিতা সঞ্চয় করেছে এখানকার কাব্যভুবন এবং সেই অভিজ্ঞতা নানাভাবে মঞ্জরিত হলো তাঁদের কবিতায়। মুক্তিযুদ্ধ ও তার নানা অনুষঙ্গকে ঘিরে এই যে এখানকার কবিদের এই অনুভূতি, নির্মাণ ও সৃষ্টি স্বতন্ত্র অনুভূতিতে ঋদ্ধ। সৃজনভূমির সমৃদ্ধি ও পুষ্টি, তা এ দেশের কাব্যাকাশ যে কত সমৃদ্ধ করেছে তা রীতিমতো গবেষণার বিষয়। এ নিয়ে গবেষণা হচ্ছে না তা নয়। নতুন গবেষকেরা মুক্তিযুদ্ধের কবিতাকে অবলম্বন করে নবীন মাত্রায় গবেষণা অভিসন্দর্ভ তৈরি করছেন।

মুক্তিযুদ্ধের কবিতা দীর্ঘকাল আমাদের মনে অনুরণিত হবে, আমাদের অনুপ্রাণিত করবে সেই পতাকাকে চিরদিন সমুন্নত রাখার জন্য, যার দ্বিবর্ণে জীবনের জয়োল্লাস এবং শহিদের আত্মদান প্রতীকিত হয়ে আছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের কবিতা আমাদের অস্তিত্বেরই গান। আর মুক্তিযুদ্ধ তো নিজেই এই মহৎ কবিতা।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাঙালি বিজয় অর্জনের পর আমরা এ দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে প্রাণের জোয়ারে ও নবীন এক মাত্রায় সঞ্জীবিত হতে দেখেছি। বাঙালির জাতীয় স্বরূপ এই সময় আন্দোলিত ও আলোড়িত হয়েছে জিজ্ঞাসা ও নববিন্যাসে আলোকিত হবার আকাক্সক্ষায়। শিল্প-সাহিত্যÑবিশেষত এ দেশের কবিতা এ সময় থেকে দেশ ও সামাজিক অঙ্গীকারে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। শামসুর রাহমান এই সময় থেকে প্রবলভাবে বাঁক ফিরছেন। হাসান হাফিজুর রহমানের স্বরের মধ্যে অঙ্গীকারের চেতনা স্বতন্ত্র এক ভাষা নির্মাণ করছে। সৈয়দ শামসুল হক তাঁর কবিতায় মনীষার দীপ্তির উজ্জ্বলতায় জীবনের গতানুগতিক ছবির অন্তরালে আরেক ছবি অঙ্কন করছেন। নবীন উজ্জ্বলতায় রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, আবুল হাসান জীবনের নানা অনুষঙ্গের অন্বেষণে নিরন্তর প্রয়াসী হয়েছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে তারা একদিনের জন্য ভোলেননি। কখনও প্রেমিক, কখনও নগর বাউল। আমাদের অগ্রণী কবিদের সৃজনের বৃহৎ এক অংশজুড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের নানা অনুষঙ্গ। শুধু অভিজ্ঞতা, যুদ্ধ জয়ের আকাক্সক্ষা প্রতিবাদ নয় আরও বৃহত্তর ও মহত্তর চেতনাকে লালন করে মুক্তিযুদ্ধ। আমরা সকলে জানি ’৭৫-এর সামরিক অভ্যুত্থান ও বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যে জাতীয় সংকট সৃষ্টি করা হয়েছিল সেখানে জাতীয়তাবাদকে বিপর্যস্ত ও উন্মূল ও শিখরহীন করবার এক হীনচক্রান্ত ছিল। সামরিক শাসন জগদ্দল পাথরের মতো বুকে বসেছিল। এর বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল সেখানে প্রধান ভূমিকা পালন করেন এ দেশে মননজীবী ও লেখক-কবিরা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এই প্রতিরোধ সংগ্রামে বৃহৎ ভূমিকা পালন করে। কবিদের পঙ্ক্তিতে স্বৈরশাসকবিরোধী ধিক্কার ধ্বনিত হয়। এঁদের কবিতা সমাজলগ্ন হয়ে ওঠে। এই ধিক্কার প্রতিবাদ ও ক্রোধ থেকে জন্ম নেয় নতুন এক কাব্যভাষার দিগন্ত। এ রস আহরণ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকেই জীবনযন্ত্রণা ও স্বৈরশাসনবিরোধী তারুণ্যের সংগ্রাম নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এই সময় থেকে প্রতিবাদের চাপ থেকে বাংলাদেশের কবিতা হয়ে উঠেছে গহনসন্ধানী; দেশের অন্তরাত্মার সংকট উপলব্ধির ক্ষেত্রে এক নতুন অবলম্বনও বটে।

এই পর্যবেক্ষণের ভিতর দিয়ে আমরা দু-একটি বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করতে চাই। সত্তরের মাঝামাঝি থেকে এ দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা কবিতার ভুবনকে নানাভাবে ঋদ্ধ করেছে। ভাষার নির্মিতিতে ও কাব্যশৈলীতে এসেছে যথেষ্ট দৃঢ়তা।

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের দেশের জীবনচেতনায় ও জাতীয় কর্মপ্রবাহে হীরকখ-ের মতো দ্যুতিময়। যতদিন যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার তাৎপর্য আমাদের সমাজভাবনা, আমাদের রাজনীতি ও শিল্প-সাহিত্যকে নতুন আলোকে সঞ্জীবিত করবার প্রেরণা দিচ্ছে; যেকোনো সংকটে এই চেতনাই এখন প্রাণিত করছে বুদ্ধিজীবীর মনন, লেখকদের মানসভুবন এবং কবিতার পরিম-ল, রাজনীতির অঙ্গনকেও। বাঙালির জীবনে এ এক বৃহৎ প্রাপ্তিও বটে।

 

দুই

নবীন প্রজন্ম এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান হয়েছে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এবং প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় মৌলবাদগোষ্ঠী বাংলাদেশবিরোধী ভূমিকায়। সেজন্য এই বাস্তবতাকে ধারণ করে নবীন কবিদের যে সৃজন ও কাব্য নির্মিতি সেখানেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। নবীন কবিরা মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করে নানা দিক থেকে কবিতা লিখছেন। কোনো কোনো কবিতা হয়ে উঠছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিশ্বস্ত প্রতিফলন। অনেকের বয়স স্বল্প, কিন্তু পঠন-পাঠন ও নানাজনের স্মৃতির অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে কবিতা লিখে চলেছেন। শিল্প ও সাহিত্য মূল্যে এসব কবিতা খুবই উচ্চমানের। বাংলাদেশের কবিতার ভুবনে এসব কবিতার মূল্য অসীম।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares