সম্পাদকীয়- তৃতীয় বর্ষ    দ্বাদশ সংখ্যা   ডিসেম্বর ২০১৬

সম্পাদকীয়

তৃতীয় বর্ষ    দ্বাদশ সংখ্যা   ডিসেম্বর ২০১৬

নবীনদের গল্প-কবিতায়

মুক্তিযুদ্ধের নতুন দিগন্ত

 

আ মাদের গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ কেবলই শৌর্যবীর্য এবং ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তদানের মধ্যে গ্রথিত নয়। এ-গৌরবের শিকড় অসামান্য স্বীকৃতি নিয়ে গেড়ে বসেছে কথাসাহিত্যে এবং কবিতার পঙ্ক্তিমালায়। কেবলমাত্র পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর-আশি-নব্বইয়ের দশকের কবিদের মধ্যেই তার প্রতিচিত্র ছাপ ফেলেনি, এখনও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমান হারে তুমুল আলোড়নে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে উত্তরপ্রজন্মের তরুণ কবিদের। তারই ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এখনও রচিত হচ্ছে অনবদ্য সব কবিতা এবং গল্প-উপন্যাস। ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের দেশের জীবনচেতনায় ও জাতীয় কর্মপ্রবাহে হীরকখণ্ডের মতো দ্যুতিময়। যতদিন যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার তাৎপর্য আমাদের সমাজভাবনা, আমাদের রাজনীতি ও শিল্প-সাহিত্যকে নতুন আলোকে সঞ্জীবিত করবার প্রেরণা দিচ্ছে; যেকোনো সংকটে এই চেতনাই এখন প্রাণিত করছে বুদ্ধিজীবীর মনন, লেখকদের মানসভুবন এবং কবিতার পরিমণ্ডল, রাজনীতির অঙ্গনকেও।… নবীন প্রজন্ম এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান হয়েছে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এবং প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় মৌলবাদীগোষ্ঠী বাংলাদেশবিরোধী ভূমিকায়। সেজন্য এই বাস্তবতাকে ধারণ করে নবীন কবিদের যে সৃজন ও কাব্যনির্মিতি, সেখানেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। নবীন কবিরা মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করে নানাদিক থেকে কবিতা লিখছেন। কোনো কোনো কবিতা হয়ে উঠছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিশ্বস্ত প্রতিফলন। অনেকের বয়স স্বল্প, কিন্তু পঠন-পাঠন ও নানাজনের স্মৃতির অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে কবিতা লিখে চলেছেন। শিল্প ও সাহিত্যমূল্যে এসব কবিতা খুবই উচ্চমানের।’- মুক্তিযুদ্ধের কবিতা নিয়ে অগ্রগণ্য গবেষক-সম্পাদক আবুল হাসনাতের এই উপলব্ধির মধ্য থেকে সাহিত্যাঙ্গনে আমরা আশার আলো দেখতে পাই। পরিতোষ হালদারের ‘মুক্তিযুদ্ধের কবিতা : রক্তের অক্ষরে লেখা পঙ্ক্তিমালা’ আলোচনায়ও আমরা দেখতে পাই স্বাধীনতার চেতনার দীপ্যমান আলো।

পূর্ববর্তী প্রবীণ গল্পকারদের পাশাপাশি দ্বিতীয় প্রজন্মের লেখকদের গল্পে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কীভাবে রূপায়িত হয়েছে, তারই তদন্ত-তত্ত্ব-তালাশ করতে গিয়ে আমরা পেয়েছি অনবদ্য সব প্রকরণ-কৌশল, বিষয় ও আঙ্গিক। ‘পূর্ববর্তী প্রবীণ গল্পকাররা মুক্তিযুদ্ধের গল্পে তুলে ধরেছেন প্রধানত হানাদার বাহিনীর ও তাদের দোসর রাজাকার বাহিনীর নির্মম অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা, নৃশংসতার চিত্র। কারণ, তাঁরা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন যুদ্ধকে, অনেকে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। লিখতে বসে সেই অভিজ্ঞতাকেই চিত্রায়িত করেছেন। দ্বিতীয় প্রজন্মের গাল্পিকদের অনেকের জন্ম স্বাধীনতার প্রায় এক দশক পরে। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর সাময়িক উত্তেজনা তারা দেখেননি। তাই মুক্তিযুদ্ধকে কেউ সরাসরি ইতিহাসের পাতা থেকে জীবন্ত তৎপরতায় তুলে ধরেছেন। কেউবা মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার টানাপড়েনকে প্রতীকে, ইঙ্গিতে রূপায়িত করেছেন। কেউবা রাজনৈতিক চক্রাবর্তের শিকার মুক্তিযুদ্ধের বিপর্যস্ত বাস্তবতার দ্বার উদ্ঘাটন করেছেন।’- আহমেদ মাওলার এ-বিশ্লেষণ ও তাশরিক-ই-হাবিবের নিবন্ধেও দেখা যাবে কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের অন্য আলো।

এ-মাসেই সৈয়দ শামসুল হক ও রাবেয়া খাতুনের জন্মদিন (২৭ ডিসেম্বর)। বাংলাসাহিত্যের এই দুই দিকপালের জন্মদিনে দ্বিতীয় সৈয়দ হক, স্বপন নাথ, চন্দন আনোয়ার, আহমাদ মাযহার ও মুহিত হাসানের লেখায় সমৃদ্ধ বিশেষ ক্রোড়পত্র নিয়ে শব্দঘর জানাচ্ছে শ্রদ্ধার্ঘ। ডিসেম্বরে জন্মগ্রহণকারী আরও বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক-প্রাবন্ধিক-কবিদের মধ্যে আছেন রিজিয়া রহমান (২৮ ডিসেম্বর), শামসুজ্জামান খান (২৯ ডিসেম্বর) ও রুবি রহমান (৩ ডিসেম্বর) প্রমুখ। তাঁদের সকলেকেই জানাই জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

আকস্মিক চলে গেলেন কবি-গল্পকার ও শব্দঘর-এর সুহৃদ মাহবুবুল হক শাকিল। তরুণ এই কবির মৃত্যুতে জাতি শোকস্তব্ধ। তাঁর পরিবারের প্রতি আমরা সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares