সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

গ্রন্থভুবনের বাতিঘর শেক্সপিয়র এন্ড কোম্পানি – কামাল চৌধুরী

September 20th, 2016 11:10 pm
গ্রন্থভুবনের বাতিঘর  শেক্সপিয়র এন্ড কোম্পানি –  কামাল চৌধুরী

ভ্রমণ

গ্রন্থভুবনের বাতিঘর

শেক্সপিয়র এন্ড কোম্পানি

কামাল চৌধুরী

 

প্যারিসে এসেছি বেশ কবার। প্রতিবারই অন্তত একবার হলেও WH Smith Book Store-এ যাই। প্যারিস শহরের প্রাণকেন্দ্রে কনকর্ড প্লাজার কাছে ২৪৮, রু দ্য রিভোলি-তে এ বইয়ের দোকান। WH Smith চেইন বুক শপ― পৃথিবীর বহু দেশে আছে। প্যারিসে এটি বড়ো বইয়ের দোকান― প্রধানত ইংরেজি বই এখানে পাওয়া যায়। এখানে নানা রকম বই আছে― ম্যাগাজিন আছে, ক্ল্যাসিক্ল বইয়েরও একটা কর্নার আছে তবে বেশির ভাগ বই-ই ইংরেজি সাহিত্যের। ফরাসি লেখকদের অনুবাদ গ্রন্থ খুব একটা পাওয়া যায় না। এর আগে আমি এখান থেকে বোদলেয়র, রেবো আপোলিনিয়ার- এঁদের বই কিনেছিলাম। একটা মাত্র সেলফে কয়েকজন ফরাসি লেখকের বই ছিলো। এবার গিয়ে তাও পাচ্ছিলাম না। ক্লাসিক্ল বইয়ের সেলফে আপোলিনিয়ার-এর নির্বাচিত কবিতা তড়হব পেলাম। এছাড়া The Nwe York Reviwe of Books-এর মার্চ ১০-২৩, ২০১৬ সংখ্যাটি কিনলাম। আমি ফরাসি প্রতীকবাদী কবিতার অন্যতম উদ্গাতা মালার্মের বই খুঁজছিলাম, পেলাম না। WH Smith -এ এসে আমি অবাকই হয়েছি; শিল্প-সাহিত্যের শহর প্যারিসে তার কবি-লেখকদের অনুবাদ গ্রন্থ খুঁজে পেতে কষ্ট হয়! বুক স্টোরের এক মহিলা কর্মী আমাকে বললেন তুমি শেক্সপিয়র এন্ড কোম্পানিতে খুঁজে দেখতে পারো, সেখানে কবিতার বই পাবে। Shakespeare & Company-র নাম আগে শুনেছি। কখনও যাওয়া হয়নি। এ সম্পর্কে আমার ধারণাও ছিল না। সঙ্গে গাড়ি ছিল― চালককে বললাম নিয়ে যেতে।

সিন নদীর পাড়ে কিলোমিটার জিরোতে এই বুকশপ অবস্থিত। গিয়ে সত্যিই অবাক হলাম। অদ্ভুত এক বইয়ের দোকান। হেনরি মিলার একে বলেছেন ‘ওয়ান্ডারল্যান্ড অব বুকস’। পাশাপাশি তিনটি সাইনবোর্ড― ২টিতে Shakespeare &  Company লেখা। অন্যটাতে Shakespeare  Company Cafe লেখা। পাশেই সিন নদী। অদূরে বিখ্যাত নটরডেম গির্জা। বুকশপের সামনে লোকজনের ভিড়। কেউ কেউ ছবি তুলছে। সামনে সাজিয়ে রাখা হয়েছে পুরনো বই। পাশে পোস্ট কার্ডের তাক। নাম দেওয়া হয়েছে Room to Read Post Card। এ থেকে প্রাপ্ত অর্থ উন্নয়নশীল দেশের গ্রন্থাগারের জন্য ব্যয় করা হবেÑ লেখা আছে।

ভেতরে গিয়ে আরও অবাক হলাম। ক্রেতা পাঠকের বেশ ভিড়। অপরিসর দোকান; চতুর্দিকে, মাঝখানে প্রচুর বই। ফরাসি কবিতার বই খুঁজছি; সামনের ডেস্কের মেয়েটিকে বলতেই সে কম্পিউটারে চেক করে দোতলায় যেতে বলল। সরু সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠলাম। সিঁড়িতে ওঠার দেয়ালে লেখা ওপরে কবিতার বই পাওয়া যাবে। যে স্থানে বই পাওয়া যাবে বলেছিলো সেখানে একটা ডিভান তার ওপর বসে ২টি মেয়ে ও একটি ছেলে আড্ডা দিচ্ছে। ভেতরে বসার ও পড়ার ব্যবস্থা আছে। এটি এক সঙ্গে বুকশপ ও লাইব্রেরি, আবার ঘুমানোরও জায়গা আছে।

Printআমার সঙ্গে মনজুর (যুগ্ম সচিব ও বাংলাদেশ ইউনেস্কো কমিশনের সচিব)। বই খুঁজে না পেয়ে তাকে বললাম দোকানের একজনকে ডেকে আনতে। মনজুর অল্প বয়েসি একটা মেয়েকে ডেকে নিয়ে এল। তাকে বলতে সে ডিভানের পাশের তাকে খুঁজতে বললো। কিন্তু ছেলেমেয়েগুলো আড্ডা দিচ্ছে― তবু তাদের বললাম একটু জায়গা দিতে। জানি রসভঙ্গ হয়েছে তাদের কিন্তু আমার তো বই খোঁজা চাই। সেখানে মালার্মের Selected Poems ও পল ভালেরির Selected Writings পেলাম। এ দুটো বই ও Poetry ম্যাগাজিন কিনলাম দুই কপি।

ভেতরে আরও ২টা কক্ষ। শুধু বই পড়ার জন্য। এগুলো লাইব্রেরি। একটিতে আবার পিয়ানো বাজানোরও ব্যবস্থা আছে। বিছানাও আছে। কেউ ইচ্ছে করলে শুয়ে শুয়ে পড়তে পারে। ঘুমোতেও পারে।

এই বুকস্টোরের প্রতিষ্ঠাতা জর্জ হুইটম্যান (George Whitman)। তাঁর ভাষায় এই বুকশপ ‘তিন শব্দে লেখা একটা উপন্যাস।’ জর্জ লিখেছেন :

‘মানুষ যেমন উপন্যাস লেখে তেমনি আমি এই বুকস্টোর সৃষ্টি করেছি। প্রতিটি কক্ষ একটি অধ্যায়ের মতো করে সাজিয়েছি। আমি চাই বই যেমন মানুষকে তাদের কল্পনার জাদুর পৃথিবীতে নিয়ে যায় তেমনি বই খোলার মত করে মানুষ এর দরজা খুলুক।’

১৯৫১ সালে নটরডেমের ছায়ায় জর্জ এই বুকশপ চালু করেন। তখন এর নাম ছিল খব Mistral। ১৯৬৪ সালের এপ্রিল মাসে জর্জ এর নাম পরিবর্তন করেন উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ৪০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে। সেই সঙ্গে শেক্সপিয়র এন্ড কোম্পানির মূল প্রতিষ্ঠাতা সিলভিয়া বিচের প্রতি সম্মান প্রদর্শনও তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো।

Printনিউ জার্সি থেকে আসা আমেরিকান অভিবাসী সিলভিয়া বিচ প্রথম ১৯১৯সালে শেক্সপিয়র এন্ড কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন ১২ রু দ্য odéon এ। ১৯২০  সালের দিকে এ বুকস্টোর ছিল তৎকালীন তরুণ লেখকদের মিলনস্থল। এংলো-আমেরিকান সাহিত্য-সংস্কৃতি ও আধুনিকতার অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয় এ বুকস্টোর। সিলভিয়া বিচ ১৯২২ সালে তার বন্ধু জেমস জয়েসের ইউলিসিস ছেপেছিলেন যখন কোনো প্রকাশক এই বই ছাপতে সাহস করেনি। লস্ট জেনারেশেনের এজরা পাউন্ড, জেমস জয়েস, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে- এ রকম নামি লেখকরা তখন আসতেন এখানে। ১৯৪১ সালে জার্মান দখলের সময় এটি বন্ধ হয়ে যায়― আর কখনও খোলেনি।

জর্জ সিলভিয়া বিচের প্রতিও সম্মান দেখাতে এ প্রতিষ্ঠানের নাম পূর্বের নামে পরিবর্তন করেন।

এটি প্রতিষ্ঠার পর লেখকদের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। বিট জেনারেশনের লেখকরা― এলেন গিন্স বার্গ, গ্রেগরি করসো, উইলয়াম বরো, হেনরি মিলার, এনাইস নিন, লরেন্স ফার্লিংগেটি ও জেমস বলডুইন এরা এখানে নিয়মিত আসতেন।

অদ্ভুত মানুষ এই জর্জ হুইটম্যান। জন্মগ্রহণ করেন ১২ ডিসেম্বর ১৯১৩ সালে নিউ জার্সিতে। কারও ধারণা কবি ওয়াল্ট হুইটম্যানের কোনো জ্ঞাতি হবেন তিনি। জ্ঞাতি না হলেও একটা সম্পর্ক আছে। জর্জের পিতার নামও হুইটম্যান তবে তিনি ছিলেন বিজ্ঞান লেখক। জর্জ ওয়াল্ট হুইটম্যানকে তার আধ্যাত্মিক পূর্বপুরুষ হিসেবে ভাবতেন। তিনি প্রায়শই হুইটম্যানের লিভস অব গ্রাস থেকে আবৃত্তি করতেন।

Printজর্জের জন্মের পর জর্জের পরিবার ম্যাসাচুসেটসে বসবাস শুরু করেন। জর্জ বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজমে স্নাতক হন। পরে কিছু সময় মেক্সিকো, পানামা এসব দেশে ঘুরে বেড়ান। কোনো কোনো রাতে মাটির মেঝেতে ঘুমিয়েছেন তিনি। একবার অসুস্থ হলে এক অপরিচিত লোক তাঁকে তার বাসায় নিয়ে যান সুস্থ না হওয়া অব্দি সেখানে রাখেন। এ ঘটনা জর্জের মনে গভীর ছাপ ফেলে। মানব হিতৈষণার ব্রতে তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে। তাঁর বুকশপের দোতলার প্রবেশ পথের দেয়ালে লেখা আছে:

Be not inhospitable to strangers

lest they be angels in disguise.

জর্জ ১৯৩৯ সালে ম্যাসাচুসেটসে ফিরে এসে হার্ভার্ডে ভর্তি হন কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে তাঁর ইচ্ছে সফল হয়নি। তিনি মেডিকেল ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন ও প্রশিক্ষণ নেন। পরে গ্রিনল্যান্ডে নিয়োগ পান। সেখানে তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে বসবাস করেন। সেখানে তার একজন সুন্দরী এস্কিমো মেয়ে বন্ধু ছিলো। তারপর তিনি ইউরোপ ঘুরে বেড়ান এবং ১৯৪৫ সালে থিতু হন প্যারিসে। এখানে তার সঙ্গে গিন্সবার্গের হাউল (Howl)এর প্রকাশক সানফ্রানসিসকোর সিটি লাইটস বুকস্টোরের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত কবি লরেন্স ফারলিংগেটির সঙ্গে পরিচয় হয়। ফারলিংগেটি তখন সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন।

কিলোমিটার জিরো থেকে প্যারিসের সব রাস্তা শুরু হয়েছে। বুকশপ ভবনটি ১৬ শতকে নির্মিত। এটি তখন ছিল Monasterz― La Maison du Mustier। মধ্যযুগের মনাস্টেরিতে বাতি জ্বালানোর জন্য frere lampier থাকত। জর্জ নিজেকে সেরকম মশালচি ভাবতেন।

কমিউনিস্ট মতাদর্শের একজন বলে নিজেকে দাবি করতেন তিনি। তাঁর দোকানকে বলতেন ‘সমাজতান্ত্রিক ইউটোপিয়া।’

Printপাগলামিরও শেষ ছিলো না তার। ফারলিংগেটি তাঁর সম্পর্কে বলেছেন যে তিনি এত চন্দ্রাহত (ঊপপবহঃৎরপ)  লোক দেখেননি। একবার জর্জ একজন অপরিচিত ক্রেতাকে বললেন কিছু সময়ের জন্য তাঁর দোকানে বসতে। ‘আমি দশ মিনিটের মধ্যে আসব। টাকা রাখার জায়গা এটা’- এই বলে যে চলে গেলেন ফিরলেন ৭ দিন পর।

জর্জ চাইতেন লেখকরা তাঁর দোকানে আসুক ও থাকুক। তিনি তাদের অনুরোধ করতেন, চাবি ছুঁড়ে দিতেন, কেউ আপত্তি করলে রাগ করতেন। প্রথম দিন থেকেই তিনি লেখকদের এখানে তাক ও বইয়ের স্তূপের ভেতর ঘুমানোর জন্য আমন্ত্রণ জানাতে শুরু করেন; গিন্সবার্গ, ফারলিংগেটি অনেকে এখানে থেকেছেন। হিসাব অনুযায়ী গত ছয় দশকে ২০০০০ তরুণ লেখক বা লেখক-সতীর্থ এখানে থাকার জন্য এসেছেন। জর্জ এসব বাসিন্দাকে বলতেন টাম্বলউইডস (Tumbleweeds)।

যারা থাকতে চাইতেন তাদের সরাসরি জর্জের কাছে আসতে হতো। জর্জ তাদের সাক্ষাৎকার নিতেন― কী বই প্রকাশিত হয়েছে? তুমি কি লেখক? ইত্যাদি। তবে সকলকে নয়― পছন্দ না হলে এখান থেকে বের করে দিতেন। মেজাজের জন্য খ্যাতি ছিলো তার। এসব Tumbleweedদের তিনটি কাজ করতে হতো। একদিনে একটা বই পড়তে হবে, দিনে এক ঘণ্টা দোকানের কাজে সাহায্য করতে হবে, এবং এক পৃষ্ঠা অটো বায়োগ্রাফি লিখতে হবে। এভাবে জর্জ হাজার হাজার অটোবায়োগ্রাফি সংগ্রহ করেছেন।

২ জন টাম্বলউইডস একটি কবিতায় চমৎকারভাবে এই টাম্বলউইড হোটেলের চিত্র এঁকেছেন:

কখনও যদি প্যারিসে আসো, তুমি

বৃষ্টিভেজা শীতের কোন রাতে,

আর খুঁজে পাও শেক্সপিয়র স্টোর

পড়বে তুমি স্বাগত-দৃষ্টিতে

কেননা এর একটা নীতি আছে,

বন্ধুতা আর প্রাজ্ঞজনচিত

আগন্তুকের প্রতি সদয় হও

হয়তো বা সে ছদ্মবেশি দূতও

 

এখানে তুমি সুখে থাকতে পারো

ইচ্ছে পূরণ কুয়োর চেয়েও বড়ো

টাম্বলউইড এই হোটেলের নাম

যদি, একটি দিনে একটি বই পড়ো।

 

এখানে পাবে রোমিও জুলিয়েট

টম জোন্স আর লিটল নেলও আছে

টাম্বলউইড এই হোটেলের

বই-সাজানো দেয়ালগুলোর মাঝে।

 

রোববার ছিলো জর্জের প্রিয় দিন। সেদিন যারা থাকতো তাদের জন্য তিনি প্যানকেক  ব্রেকফাস্ট তৈরি করতেন। ৪টায় লেখকদের এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড স্টাইলে ম্যাড হ্যাটার টি পার্টি দিতেন দোতলার এপার্টমেন্টে― সেখানে বিখ্যাত লেখকরাও আমন্ত্রিত হতেন।

Print১৯৫০ থেকে ১৯৬০ এর দশকের সময়কালে ফরাসি কর্তৃপক্ষ জর্জের এধরনের আয়োজনের প্রতি সন্দেহ শুরু করে। তারা চেয়েছেন প্রত্যেক রাতের অতিথি সম্পর্কে জর্জকে তথ্য দিতে হবে। জর্জ তার কপিতে প্রত্যেকের পর্যবেক্ষণ যুক্ত করে রাখতেন। এরকম একটি পর্যবেক্ষণে একটি মেয়ে লিখেছে, তার পছন্দ বৃষ্টি, রাত এবং সমকালীন ফরাসি কবিতা। ১৯৫২ সালে সাহিত্য পত্রিকা মার্লিন প্রকাশিত হয়। এখানে তরুণ জ্যাঁ পল সার্ত্রের লেখা ছাপা হয়েছিলো। প্রকাশক ও সম্পাদকরা এই স্টোরকে তাদের সম্পাদকীয় ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করেছে। কারও কারও চিঠিপত্র এ ঠিকানায় আসত।

১৩ এপ্রিল বিকেলে রাষ্ট্রদূত মো. শহিদুল ইসলামকে নিয়ে আবার শেক্সপিয়র অ্যান্ড কো¤পানিতে গেলাম। গতবার কাউন্টারে ২টা মেয়ে বসা ছিলো। এবার দুটো ছেলেকে পেলাম। তাদের জিজ্ঞেস করলাম আগের মতো এখনও এখানে লেখক পড়ুয়ারা রাত কাটাতে পারে কিনা। তারা বলল, ‘হ্যাঁ, তবে মালিকের সঙ্গে দেখা করতে হবে, অর্থাৎ আগের নিয়ম― থাকা, বই পড়া, কাজে সাহায্য করা সবই চালু আছে। তারা জানাল বিকেল ৪টায় দোতলায় লেখা পাঠ করবেন একজন লেখক। তখন ৪টা বাজতে ১০ মিনিট বাকি। ভাবলাম দেখে যাই। এই ফাঁকে লেখক এলেন কার্তিকা নায়ার। পরিচিত হলাম। কার্তিকা বললেন তিনি সুন্দরবনের উপর একটি বই লিখেছেন― বাচ্চাদের জন্য, Honey Hunter। এটি বাংলায় মধুশিকারী নামে অনুবাদ করেছেন শামীম আজাদ। ইউপিএল থেকে বেরিয়েছে। কার্তিকা এই বই থেকে পড়বেন। কার্তিকা ভারতীয় বংশোদ্ভূত ফরাসি। এখানেই থাকেন। হে ফেস্টিভ্যালে ২০১৪ তে ঢাকায় গিয়ে ছিলেন। দোতলায় রুমে বেশ কজন জড়ো হয়েছে। ছোটো ছেলেমেয়েরাও আছে। কার্তিকা তার বই থেকে পাঠ করলেন, সঙ্গে একজন জানালার সাদা কাঁচে সুন্দরবনের ছবি আঁকলেন। পড়া শেষে কার্তিকাকে ধন্যবাদ দিলাম।

Printবুকস্টোরে আসা মানে পকেটের ওপর চাপ পড়া। আমি বই পাগল― মনের লাইব্রেরিতে জীবনের সৌন্দর্যকে খুঁজে ফিরি। রাবোর Complete Works ও A Season in Hell (নরকে এক ঋতু) কিনলাম। বেরিয়ে দেখি বাইরে গান হচ্ছে। এর মধ্যে বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে শেক্সপিয়র এন্ড  কোম্পানি ক্যাফেতে গেলাম। সেখানে কফি-স্ন্যাকসের সঙ্গে বইও আছে। বাথরুমের তাকেও বই আছে; জর্জ খাবারের সঙ্গেও বইয়ের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। যে  ট্রেতে আমাদের কফি পরিবেশন করা হল তার উপর একটি কাগজ বিছানো, সেখানে অনেকগুলো প্রশ্ন লেখা; তার কয়েকটি নমুনা দিচ্ছি :

এই মুহূর্তে আপনার মনের অবস্থা কী?

আপনি কীভাবে সময় কাটাতে ভালোবাসেন?

আপনাকে যদি পশু হতে হতো, তাহলে কোন পশুটা হতে চাইতেন?

কোন বই পড়লে অন্য একটা যুগে বাস করার ইচ্ছে হয়?

জীবনে যত জিনিস খেয়েছেন তার মধ্যে কোনটা সব চেয়ে অদ্ভুত?

আপনার প্রিয় ভ্রমণ কোনটি?

বাস্তব জীবনে আপনার নায়ক কে? উপন্যাসে আপনার নায়ক কে?

কোন শব্দ বা শব্দগুচ্ছ আপনি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেন?

বাকি জীবন যদি আপনাকে কোনো বইয়ের কোনো চরিত্রের সাথে কাটাতে হয়, তাহলে কে হবে সেই চরিত্র?

আপনার তিনজন প্রিয় লেখকের নাম বলুন।

আপনি কখন মিথ্যে বলেন?

আপনার প্রিয় গন্ধ কোনটি?

 

Printফারলিংগেটি ঠিকই বলেছেন তিনি এরকম চন্দ্রাহত মানুষ আর দেখেননি। এ বুকস্টোরে আসলে তাই মনে হবে। জর্জ মানুষকে মহা সমুদ্রের কল্লোল শোনাতে চেয়েছেন― বই পড়ার আনন্দের মধ্যে জীবনের সার্থকতা খুঁজেছেন। লেখক- সাহিত্যিকদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন। নিজে লেখেননি, কিন্তু চিরায়ত মহৎ উপন্যাসের মতো রেখে গেছেন গ্রন্থপাঠের বাতিঘর শেক্সপিয়র এন্ড কোম্পানি।

আজও এই বুকস্টোর আছে, পুরনো চেহারায়। এখনও এখানে আড্ডা হয়। লেখকরা আসেন। ছেলেমেয়েরা ছোটোছোটো কাগজে তাদের অনুভূতি লিখে রাখে। জর্জ নেই কিন্তু তার মেয়ে সিলভিয়া হুইটম্যান এটিকে পরিচালনা করছেন; পিতার কীর্তি ধরে রেখেছেন তিনি। তাঁর ভাষায় :

শেক্সপিয়র এন্ড কোম্পানি বইয়ের একটা ঘোরানো, পাক-খাওয়া, পাকদ-ীর মতো গোলকধাঁধা; একটা সাহিত্যিক আখড়া, লেখক আর বই প্রেমিকদের জন্য এক আশ্রয়। এ হলো― আমার বাবা জর্জ হুইটম্যান যেমনটা বলেছেন― “তিন শব্দের একটা উপন্যাস।”

[এ লেখার অনেক তথ্য জর্জ হুইটম্যান-এর মেয়ে সিলভিয়া হুইটম্যান-এর লেখা  ‘Shakespeare and Company- A Brief History of a Persian Bookstore’ থেকে নেয়া হয়েছে।]