সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা
শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ


প্রকাশক : মাহফুজা আখতার
সম্পাদক : মোহিত কামাল
সাহিত্য সংস্কৃতি মাসিক পত্রিকা শুদ্ধ শব্দের নান্দনিক গৃহ

বিশ্বসাহিত্য : মোজাফফর হোসেন

November 4th, 2017 10:05 pm
বিশ্বসাহিত্য : মোজাফফর হোসেন

বিশ্বসাহিত্য

বব ডিলানের সাহিত্যে নোবেল

সংগীতের নোবেলের প্রয়োজন

নেই- সাহিত্যের আছে

মোজাফফর হোসেন

 

সবাইকে কিছুটা চমকে দিয়েই ২০১৬ সালে সাহিত্যে নোবেল দেওয়া হলো জনপ্রিয় মার্কিন সংগীতশিল্পী ও গীতিকার বব ডিলানকে। তিনি এর আগেও বেশ কয়েকবার নোবেলের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন। কিন্তু মার্কিন সংগীতের এই পুরোধা যে শেষ পর্যন্ত সাহিত্যে নোবেল পেয়েই যাবেনÑ এমনটা হয়ত অনেকেই ভাবেননি। ফলে তাঁর এই নোবেল জয়ের পর থেকেই পক্ষে-বিপক্ষে কথা হচ্ছে বিশ্বজুড়েই। বব ডিলানের ক্ষুদে ভক্ত আমি। মফস্বলে থাকা সত্ত্বেও তাঁর নামের সঙ্গে পরিচিত হতে পারার কারণ একটিই- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অর্থসহযোগিতার জন্য আয়োজিত কনসার্টÑ ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। বিশ্বখ্যাত সেতার বাদক ও সুরস্রষ্টাপণ্ডিত রবি শংকর(১৯২০-২০১২)-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই কনসার্টে আরেক সংগীত পুরোধা প্রখ্যাত পপ সংগীতশিল্পী, গীতিকার ও বেজ গিটার বাদক জর্জ হ্যারিসন (১৯৪৩-২০০১)-এর সঙ্গে মঞ্চে উঠেছিলেন বব ডিলান। আমেরিকান সরকার মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষ নিলেও বব ডিলান মার্কিন নাগরিক হয়েও আমাদের সঙ্গে একাত্ম হয়েছিলেন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা সেখান থেকেই শুরু। এরপর তাঁর গান যত শুনেছি, তত মুগ্ধ হয়েছি, হয়েছি তত সমৃদ্ধ। বলাবাহুল্য, আমি যখন থেকে তাঁর গান শুনতে শুরু করেছি তার অনেক আগেই তিনি আমেরিকান সংগীতে জীবন্ত কিংবদন্তি রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁকে আমেরিকার সংগীতে অন্যতম পথদ্রষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ডিলান-ভক্ত হওয়া সত্বেও আমি ডিলানের নোবেল জয়ে উচ্ছ্বসিত নই। প্রত্যাশা করেছিলাম সাহিত্যের কেউ এই পুরস্কারটি পাবেন। তবে কি ডিলানের গানের কথাগুলোকে আমি কবিতা মনে করছি না? এর সরাসরি উত্তর ‘না’। তার ব্যাখ্যা দিতে আমি সাহিত্যবোদ্ধা রিচ স্মিথের আমেরিকার সাপ্তাহিক কাগজ দ্য স্ট্রেনজার লেখাটির খানিকটা নিজের মতো করে ব্যবহার করছিÑ ডিলান অনেক বড় মাপের গীতিকার, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু তিনি বড়মাপের কবি নন। কবির কোনো বাদ্যযন্ত্রের দরকার পড়ে না। কবির জন্য কোনো ড্রামের প্রয়োজন নেই। প্রকৃত কবিরা চান না তাঁর কবিতা ড্রামের সঙ্গে পঠিত হোক। কবিরা শব্দের ভেতরের সংগীতকে খুঁজে নেন। তাঁরা শব্দের বিন্যাসের ভেতর দিয়েই যে নৈঃশব্দ সৃষ্টি করেন, তাতেই সুর বাজে। এটা খুব সহজ কাজ না এবং গান রচনার সঙ্গে এর মৌলিক কিছু পার্থক্য আছে।

রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১)-সহ যে সকল গীতি-কবি সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন, তাঁরা প্রধানত কবি। কবি হিসেবেই প্রখ্যাত এবং পঠিত। যেহেতু বব ডিলানকে বিশেষ করে তুলনা করা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে, তাই তাঁদের দুজনকে একটু পাশাপাশি রেখে তুলনা-প্রতিতুলনার ভেতর দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথ গান লিখলেও সেগুলো ছিল প্রধানত কবিতাই। নোবেল-কর্তৃপক্ষ সংগীত হিসেবে রবীন্দ্রনাথের গান শোনেননি। গীতাঞ্জলি বই-আকারে প্রকাশিত হয় ১৯১০ সালে। অর্থাৎ নোবেল পাওয়ার আগে এই গানগুলি বাংলাতেও সেইভাবে গীত হয়নি। এরপর গীতাঞ্জলির ১৫৭টি গীতিকবিতার ভেতর ৫৩টি গান নেওয়া হয় রবীন্দ্রনাথের প্রথম অনুদিত গীতিকবিতার বই সং অব অফারিংস-এ, যার জন্যে তিনি ১৯১৩ সালে নোবেল পেলেন। গ্রন্থের বাকি ৫০টি গীতিকবিতা রবীন্দ্রনাথ বেছে নিয়েছেন গীতিমাল্য, নৈবেদ্য, খেয়া, শিশু, কল্পনা, চৈতালি, উৎসর্গ, স্মরণ ও অচলায়তন থেকে। এই গীতিকবিতাগুলোর অনুবাদে কবিতার ভাবটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নোবেল কমিটি রবীন্দ্রনাথের সং অব অফারিংস-এর জন্য সাহিত্যে নোবেল দেওয়ার কারণ উল্লেখ করে বলেন `…because of his (Rabindranath Tagore) profoundly sensitive, fresh and beautiful verse, by which, with consummate skill, he has made his poetic thought, expressed in his own English words, a part of the literature of the West’. রবীন্দ্রনাথের কাব্যগুণের প্রশংসা করে আইরিশ কবি ইয়েটস (১৮৬৫-১৯৩৯) বলেন, ‘তাঁর (রবীন্দ্রনাথের) কবিতা অনিন্দ্যসুন্দর সব স্পর্শে পরিপূর্ণ; সঙ্গে রয়েছে তাঁর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ও গভীর প্রেমের পরিচয়।’ অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথকে কবি হিসেবেই সকলে পেয়েছেন। এক্ষেত্রে গীতাঞ্জলির একটি গীতিকবিতার অনুবাদের উদাহরণ টানা যেতে পারে। (গীতাঞ্জলি কাব্যের ১২৫ সংখ্যক গানটি উদ্ধৃত করা হল)

আমার এ গান ছেড়েছে তার সকল অলংকার

তোমার কাছে রাখেনি আর সাজের অহংকার।

অলংকার যে মাঝে প’ড়ে

মিলনেতে আড়াল করে,

তোমার কথা ঢাকে যে তার মুখর ঝংকার।

তোমার কাছে খাটে না মোর কবির গরব করা-

মহাকবি, তোমার পায়ে দিতে চাই যে ধরা।

জীবন লয়ে যতন করি

যদি সরল বাঁশি গড়ি,

আপন সুরে দিবে ভরি সকল ছিদ্র তার।

 

রবীন্দ্রনাথের করা ইংরেজি অনুবাদে গীতি-কবিতাটি দাঁড়িয়েছে :

My song has put off her adornments. She has no pride of dress and decoration. Ornaments would mar our union; they would come between thee and me; their jingling would drown thy whispers.

My poet’s vanity dies in shame before thy sight. O master poet, I have sat down at thy feet. Only let me make my life simple and straight, like a flute of reed for thee to fill with music.

লক্ষ্য করার বিষয়, রবীন্দ্রনাথের নিজের অনুবাদেই বাংলা কবিতার যে গীতবৈশিষ্ট্য সেটা ইংরেজি অনুবাদে অটুট থাকেনি। এটা তো ঠিকই যে, রবীন্দ্রনাথকে সাধারণ কবিতা নয় গীতিকবিতার জন্য নোবেল দেওয়া হয়; এবং গীতিকবিতার জন্য রবীন্দ্রনাথই একমাত্র নোবেল পাননি। ১৯৪৫ সালে লাতিন আমেরিকার কবি গ্যাব্রিয়েল মিস্ট্রেলের নোবেল পাওয়ার কারণ হিসেবে নোবেল কমিটি উল্লেখ করেন : ‘…for her (Gabriel Mistral) lyric poetry which, inspired by powerful emotions, has made her name a symbol of the idealistic aspirations of the entire Latin American world.’

১৯৫৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পান স্প্যানিশ কবি হুয়ান র‌্যামন হিমেনেয। তাঁর নোবেল পাওয়ার কারণ হিসেবে নোবেল কমিটি লেখেন : `…for his (Juan Ramón Jiménez) lyrical poetry, which in Spanish language constitutes an example of high spirit and artistically purity’. ইটালির কবি সালভ্যাতর কোয়াসিমোদো সাহিত্যে নোবেল পান ১৯৫৯ সালে। তাঁর ক্ষেত্রেও নোবেল কমিটি উল্লেখ করেন : `…for his (Salvatore Quasimodo) lyrical poetry, which with classical fire expresses the tragic experience of life in our own times.’ সুইডিশ কবি নেলি স্যাশ নোবেল পান ১৯৬৬ সালে। তাঁকে নোবেল দেওয়ার কারণ হিসেবে নোবেল কমিটি প্রায় একইকথা বলেন : `…for her (Nelly Sachs) outstanding lyrical and dramatic writing, which interprets Israel’s destiny with touching strength.’

রবীন্দ্রনাথসহ উল্লিখিত গীতিকবিদের প্রায় সকলেই কমবেশি ভাববাদী কবি ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান গীত হয়েছে অন্যদের হয়নি কারণ বাংলাদেশে (পশ্চিমবাংলাসহ) কবিতাকে সংগীতে রূপ দেওয়ার যে সংস্কৃতি বা প্রবণতা আছে সেই সংস্কৃতি পৃথিবীর সবখানে নেই। যে কারণে বাংলায় অনেক কবিতা গীতিকবিতা না হয়েও শিল্পীরা নিজেরাই সুরারোপ করে গেয়েছেন এবং সেগুলো জনপ্রিয়ও হয়েছে বেশ। আমরা উদাহরণ হিসেবে কবি জীবনানন্দ দাশের ‘আবার আসিব ফিরে’ অথবা কবি শহীদ কাদরীর ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ কবিতা দুটির প্রসঙ্গ টানতে পারি। ইংরেজ কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ বাংলার কবি হলে নিশ্চিত করেই তাঁর অধিকাংশ কবিতা গাওয়া হত গান হিসেবে।

এবার বব ডিলানের প্রসঙ্গে আসা যাক। বব ডিলানকে সাহিত্যে নোবেল দেওয়ার কারণ হিসেবে নোবেল কমিটি বলেছেন : `…having created new poetic expressions within the great American song tradition.’ অর্থাৎ আমেরিকার সংগীত-ঐতিহ্যে নতুন ধরনের কাব্যিক দ্যোতনা সৃষ্টির জন্য ডিলানকে এই সম্মানে ভূষিত করা হলো। মানে ডিলন পরিষ্কারভাবেই সংগীতের মানুষ হিসেবে পুরস্কারটি পেয়েছেন। ডিলানকে বোঝাতে বাংলাদেশে অনেকেই রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি লালনের প্রসঙ্গ টেনেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে লালনকে (কেবল গীতিকার নয়, সার্বিক বিবেচনায়) ডিলানের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে রাখছি। লালন একাধারে একজন আধ্যাত্মিক বাউল সাধক, মানবতাবাদী অ্যাক্টিভিস্ট, সমাজ সংস্কারক এবং দার্শনিক। তাঁর গানের কথা সরল হলেও বক্তব্য অতি গভীর। বব ডিলানের প্রভাব কেবল মার্কিন সংগীতের জগতে। কিন্তু লালনের প্রভাব গোটা ভারতীয় সংগীত-সাহিত্য ও দর্শনচর্চায়। ডিলানের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় স্ববিরোধিতা আছে। তিনি আমেরিকার গণমানুষের অধিকার নিয়ে আন্দোলন করেছেন, যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন- একথা যেমন সত্যি, এও সত্যি যে তিনি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী হয়ে ওঠার দিকে কিছুটা হলেও ঝুঁকে পড়েছেন। ডিলানের জন্ম ইহুদি পরিবারে। ক্যারিয়ারের শুরুতে ইহুদি পরিচয় ছেটে ফেলেন সংগীতের জগতে প্রতিষ্ঠালাভের জন্যে। তবে যুদ্ধবাজরাষ্ট্র ইসরায়েল-প্রীতি তিনি ছাড়তে পারেননি। ১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান চলাকালে ইসরায়েলের সমর্থনে গান গেয়েছেন। আমরা জানি, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সেই সময়ে লেবাননে ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরে বোমা মেরে শিশু, নারীসহ অনেক শরণার্থীকে হত্যা করে। বিশ্বজুড়ে যেখানে ইসরায়েলের সেই আচরণের তীব্র নিন্দা জানানো হয় সেখানে ‘যুদ্ধবিরোধী’ চেতনার মানুষ হিসেবে স্বীকৃত বব ডিলান ইসরায়েলের সমর্থনে ‘নেইবারহুড বুলি’ শীর্ষক গানটি লেখেন ও কণ্ঠ দেন। লালনের ভেতর এই ধরনের স্ববিরোধিতা ছিল না। তিনি সবসময় নিজের ধর্ম-পরিচয়ের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেছেন। মানবতাবোধকে তিনি যেমন তাঁর অন্তরে পরম মমতায় লালন করেছেন তেমন ব্যক্তিজীবনে তা পালনও করেছেন।

শিল্পের জায়গা থেকে, লালনের লেখাগুলোকে সংগীত থেকে আলাদা করার উপায় আছে। সেগুলো গানের কথারূপে লেখা হলেও আজ আলাদাভাবে কাব্য হিসেবে স্বীকৃত। তাই তো লালনকে আমরা মরমী কবি বলে মানি। অন্যদিকে ডিলান পরিষ্কারভাবেই সংগীতের মানুষ। তিনি যতটা না গীতিকবি, তার চেয়ে বেশি গীতিকার। প্রখ্যাত গীতিকার। নিজের ফিল্ডে সর্বোচ্চ শিখরে আসীন তিনি। সেই হিসেবে তিনি সংগীতের জন্য ৪৩বার মনোনয়ন পেয়ে ১২বার গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। ডিলান অস্কার পান ২০০১ সালে বেস্ট অরিজিনাল সং (শ্রেষ্ঠ মৌলিক গান) বিভাগে ‘থিংস হ্যাভ চেঞ্জড্’ গানের জন্য। গানটি ‘ওয়ান্ডার বয়েজ’ সিনেমায় ব্যবহৃত হয়। পুলিৎজার বিশেষ সম্মাননা পান ২০০৮ সালে তাঁর অসাধারণ কাব্যিক শক্তি ও গীতিময়তা দিয়ে আমেরিকার জনপ্রিয় সংগীত ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব রাখার জন্য। সংগীতে পৃথিবীর সেরা পুরস্কারগুলো তার অর্জন করা হয়ে গেছে। এমনই উচ্চমাপের গীতিকার ও সংগীতশিল্পী তিনি। এবং এই কারণেই তিনি সাহিত্যে নোবেল পেতে পারেন না। সমালোচক স্টিফেন মেটকাফ তাঁর একটি আর্টিকেলে ঠিক এই কথাটিই লিখেছেন : ‘ডিলান সংগীতের মানুষ হিসেবে জিনিয়াস। যে কারণে তিনি নানা ভাবে সম্মানিত হয়েছেন- অর্থ, খ্যাতি, সম্মাননা সবকিছুই দুহাত ভরে পেয়েছেন। তিনি এসব প্রাপ্তির যোগ্যতাও রাখেন। তবে তিনি সাহিত্যে নোবেলের যোগ্যতা রাখেন না। হতে পারে ডিলান মুরাকামি কিংবা রথের চেয়ে সমৃদ্ধ, কিন্তু এটা সাহিত্যে নোবেল প্রদানের যুৎসই মাপকাঠি নয়। এই কারণেই একজন পপ মিউজিশিয়ান সাহিত্যের সর্বোচ্চ সম্মাননা পেতে পারেন না।’

স্বনামধন্য এক মার্কিন পত্রিকায় মতামত কলামে একই কথা একটু অন্যভাবে লিখেছেন আনা নর্থ : ‘নিশ্চয় বব ডিলান দুর্দান্ত গীতিকার। নিশ্চয় তাঁর গীতিকবিতা ও আত্মজীবনীর বই বের হয়েছে। নিশ্চয় তাঁর গানের কথাকে কবিতা হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ আছে। তবে ডিলানের লেখা তাঁর সংগীতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি বিখ্যাত কারণ তিনি মহান সংগীতজ্ঞ। এবং যে-কারণে নোবেল কমিটি যখন একজন সংগীতজ্ঞকে এই পুরষ্কার দেন, নিশ্চিত করেই তাঁরা সেটা একজন সাহিত্যিক বা কবিকে বঞ্চিত করেই দেন।…ডিলানের সাহিত্যে নোবেল প্রাইজের প্রয়োজন নেই। কিন্তু সাহিত্যের সাহিত্যে নোবেলের প্রয়োজন আছে। আফসোস, এ-বছর সেটা হল না।’

ডিলানভক্ত হয়েও এই আফসোসটা আমার অন্তরে বাজছে। পৃথিবীজুড়ে সাহিত্যের পাঠক কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে নোবেল কমিটি যেন বিশুদ্ধ সাহিত্যের বাইরে পা ফেলতে চাইছেন। তারা এই পুরস্কারের সঙ্গে  `new cultural currency’ যুক্ত করতে চাইছেন। গত বছর বেলারুশ লেখক-সাংবাদিক সোয়েতলানা আলেক্সিয়েভিচকে সাহিত্যে নোবেল দেওয়া হল সৃজনশীল সাংবাদিকতার জন্য। তাঁর ‘বহুস্বরের’ গদ্যকে সুইডিশ অ্যাকাডেমি অভিহিত করেছে ‘সমকালীন যাতনা আর সাহসিকতার সৌধ’ হিসেবে। তাঁর যে লেখা সেগুলোর সামাজিক- রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক মূল্য আছে নিশ্চয়, কিন্তু সাহিত্যমূল্য কতখানি আছে সেটি ভাববার বিষয়। থাকলেও সেটি কি ফিলিপ রথ কিংবা অ্যাদোনিসের কবিতা অথবা হারুকি মুরাকামি কিংবা মিলান কুন্দেরার গদ্যের মতো শক্তিশালী? বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী কবি ও কথাসাহিত্যিকের তো আকাল পড়েনি! এই মুহূর্তে সাহিত্যের শাখাকে আরও সম্প্রসারিত করে ফেলার কি প্রয়োজন আছে? বিশ্বজুড়ে যখন মুদ্রিত বইয়ের পাঠকের সংখ্যা কমছে তখন অবশ্যই সাহিত্যিকদের এই পুরস্কার দেওয়া উচিত। তাতে করে সাহিত্যের একটা ব্র্যান্ডিংও হয়, পুরস্কৃত লেখকের বই বিক্রিও বাড়ে। এগুলো নোবেল কমিটির ভাবা উচিত।

বব ডিলানের সাহিত্যে নোবেলপ্রাপ্তি নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করলে একটা প্রশ্ন আপনাআপনি চলে আসে- গানের কথার কি তবে কাব্যমূল্য নেই? এর সরাসরি উত্তর না দিয়ে এখন পাল্টা একটি প্রশ্ন করা যায়- টিভি সিরিয়াল অথবা চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের কি সাহিত্যমূল্য নেই? দুটি প্রশ্নেরই উত্তর আমি দিতে চাই এই বলে- নিশ্চয় আছে। তাই বব ডিলান গীতিকার হয়ে সাহিত্যে নোবেল পেলে নিশ্চয় চিত্রনাট্যে সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার দাবি রাখবেন চার্লি কফ্মানের মতো গুণি চিত্রনাট্যকাররা। এজন্য চাইলে নোবেল কমিটি ‘শিল্প-সংস্কৃতি’নামে পৃথক বিভাগ চালু করতে পারেন। অথবা আগামীতে ‘সাহিত্যে নোবেল’ শীর্ষক বিভাগের নাম বদলে ‘শিল্প-সাহিত্যে নোবেল’ হিসেবে নামকরণ করতে পারেন। কিন্তু সেখানেও সমস্যা একটা আছে। সমস্যাটা হলো সাহিত্যের ক্ষেত্রটা আরো ছোট হয়ে আসে তাহলে। যে কারণে একজন কবি কবিতার জন্য, কিংবা কথাসাহিত্যিক উপন্যাসের জন্য (চিত্রনাট্য নয়) অস্কার পান না, গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড পান না, গোল্ডেন গ্লোবের জন্য বিবেচিত হন না, সেই কারণে আমরা প্রত্যাশা করি না একজন সংগীতজ্ঞ সাহিত্যে নোবেল পাবেন। এই বক্তব্য প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ বব ডিলানের বিপক্ষে নয়। এই বক্তব্য নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তের বিপক্ষে।

বব ডিলান শিল্পী হিসেবে মহান। নোবেল পুরস্কারকে তাঁর অনেকগুলো অর্জনের একটি ভেবে আমরা তাঁকে আন্তরিকভাবে অভিনন্দন জানাতে পারি। সঙ্গে এও উল্লেখ করা প্রয়োজন, নোবেল পুরস্কার যখন তিনি পেলেন তখন তিনি নিজেই এই পুরস্কারের অনেক ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন। ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি, এই পুরস্কার গ্রহণে এখন পর্যন্ত কোনো আগ্রহ প্রকাশ করননি ডিলান। এই গদ্যটি লেখা পর্যন্ত, তিনি নোবেল কমিটির সঙ্গে কোনোরূপ যোগাযোগ করেননি। এ বিষয়ে কোথাও প্রশ্ন করা হলে, এড়িয়ে গেছেন। মোট কথা তাঁর ভেতরে অতিরিক্ত কোনো উচ্ছ্বাস লক্ষ করা যায় নি। এই পুরস্কার কিছু অর্থ ছাড়া নতুন কিছু তাঁকে দিতে পারবে না। পৃথিবী তাঁকে চেনে, সম্মান জানাই- সেটি এতটাই পরিপূর্ণ যে এই নোবেল তা একটুও বাড়িয়ে দিতে পারবে না। যে কারণে ফের ফিরে যাচ্ছি আনা নর্থের কথায় : ‘সংগীত ব্যক্তিত্ব ডিলানের সাহিত্যে নোবেল প্রাইজের প্রয়োজন নেই। কিন্তু সাহিত্যের সাহিত্যে নোবেলের প্রয়োজন আছে। আফসোস, এ-বছর সেটা হল না!’